
‘সরস্বতী, বিদ্যেবতী / তোমায় দিলাম খোলা চিঠি / একটু দয়া করো মা-গো বুদ্ধি যেন হয়, / এসব কথা লিখছি তোমায় নালিশ করে নয়।’ সনৎ সিংহের সেই গানটি আমাদের শৈশবে শুনে শুনে মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। গানের প্রতিটি কথা শুনে মনে হতো, আরে এ তো আমারই কথা বলছে! ইতিহাসের সন তারিখ ভুলে যাওয়া, মাথায় না ঢোকা অঙ্ক— এই সমস্যা তো প্রায় সব শিশুরই। সেই শিশু সমস্যাকে মজার ঢংয়ে গীতিকার তাঁর গানে প্রকাশ করেছেন। তখনও জানতাম না গানটি কার লেখা। পরে যখন বড় হয়ে শুনলাম, এই গান এবং ‘বিস্তীর্ণ দু’পারের’ গানটি শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা, তখন সত্যিই ভাবতে কষ্ট হয়েছিল, যে একজন গীতিকার ভিন্ন মেজাজের গান এভাবে তৈরি করতে পারেন!
অথচ শিবদাস কোনওদিনই গীতিকার হওয়ার কথা স্বপ্নেও ভাবেননি। তিনি চেয়েছিলেন কবি হতে। কবিতা লেখেন। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় পাঠান। কিছু কিছু ছাপা হয়। কখনও কখনও চলে যান বিভিন্ন কবিতা পাঠের আসরে। এভাবেই চলছিল। একবার দমদমের মতিঝিলে এক কবিতা পাঠের আসরে উপস্থিত ছিলেন কবি ও সাহিত্যিক প্রেমেন্দ্র মিত্র। সেটা ১৯৫৪ সাল। সভাশেষে ট্যাক্সি করে ফিরছেন প্রেমেন্দ্র মিত্র। সঙ্গে রয়েছেন শিবদাসও। প্রেমেন্দ্র তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তুমি গান লেখো না কেন? গান লেখো।’

মনে রাখা দরকার, সেই সময় প্রেমেন্দ্র মিত্র একের পর এক সুপারহিট ছবি পরিচালনা করে চলেছেন। ছবির প্রয়োজন মেটাতে গান লিখছেন তিনি। তাই সেদিন জহুরি প্রেমেন্দ্র মিত্র শিবদাসের কবিতার শব্দচয়ন দেখেই বুঝেছিলেন, এই ছেলের ভিতরে গীতিকারের এলিমেন্ট আছে। শুধু উৎসাহ দিয়েই প্রেমেন্দ্র ক্ষান্ত হননি। একদিন শিবদাসকে বগলদাবা করে নিয়ে গেলেন আকাশবাণীতে। সেখানে গিয়ে শিবদাসকে আকাশবাণীর গীতিকারের তালিকায় নাম তুলে দিলেন। তখনও শিবদাস জানেন না, কেমন করে গান লিখতে হয়। কিন্তু একটু একটু করে চিনেছেন জীবনকে। প্রতিদিনের নানা ছন্দের মধ্যে চিনেছেন জীবনের লড়াইকে। দেশ, মানুষ, যন্ত্রণা, মানবিকতার হাহাকার, এসব তাঁর কবিতার ছন্দে বাঙ্ময় হয়ে উঠত।
জন্মেছিলেন তিনি খুলনা শহরে। ১৯৩২ সালের ২৭শে ডিসেম্বর। বাবা ছিলেন পুলিশ অফিসার শচীগোপাল বন্দ্যোপাধ্যায়। মা ছিলেন রাধারানি দেবী। স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম যোদ্ধা ছিলেন রাধারানি। কী আনন্দের ছিল শিবদাসের শৈশব। ভৈরব নদ, রূপসা নদী, চারিদিকে সবুজ গাছপালা, একছুটে মাঠ পেরিয়ে আকাশ ধরতে যাওয়া, ইচ্ছেমতো নদীতে নাও ভাসানো। সেই আনন্দের নাওয়ে ভাসতে ভাসতে ভাসতে এল কৈশোর। সেই জীবন আর সুস্থিত রইল না। তারই মধ্যে গায়ে এসে লাগল স্বাধীনতা আন্দোলনের আঁচ। সে যেন এক ক্রান্তিকাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, নেতাজির অন্তর্ধান, গান্ধীজির ভারত ছাড়ো আন্দোলনের ডাক। এরই মধ্যে চলে গেলেন রবীন্দ্রনাথ। বাড়ছিল স্বাধীনতা আন্দোলনের তীব্রতা, সেই সঙ্গে বাড়ছিল অভ্যন্তরীণ অশান্তি। সেই অশান্তি হয়ে উঠল দ্বিমুখী। একদিকে পঞ্চাশের মন্বন্তর এবং অন্যদিকে ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা। সেই হিংসা শিশুমনে ভয়ঙ্কর এক যন্ত্রণার সৃষ্টি করেছিল। শিবদাস নিজেই সেকথা লিখেছেন, ‘দেখতে দেখতে কৈশোর পেরিয়ে তারুণ্যের ছায়া মাড়িয়ে, যৌবনের দোরগোড়ায় এসে পৌঁছেছি। খুলনা-যশোর, পাকিস্তান-আনসার বাহিনীর দানবীয় ধ্বনিতে আমরা কম্পমান। বাড়ি-ঘর, সহায় সম্বল ছেড়ে, জন্মভূমিকে শেষবারের মতো প্রণাম জানিয়ে বিদায় নিলাম।’

বহু মানুষের মতোই ছিন্নমূল হয়ে তিনি চলে আসেন এপার বাংলায়। পিছনে পড়ে রইল রক্তাক্ত মাটি, হারানো শৈশব, ভালোবাসার নদী, প্রাণের বন্ধুরা। পড়ে রইল ধানের মড়াই, তুলসী মঞ্চ, পাঠশালা, ভালোবাসার আলপথ। সঙ্গে নিয়ে এলেন যন্ত্রণার একবুক স্মৃতি।
এপার বাংলায় এসে যে বাস্তবের মাটিতে পা রাখলেন, তা যেন এক বিপরীত জগৎ। যৌবনের সেই রিক্ত সময়ে বাস্তুহারা পরিবারের ছেলে শিবদাস বুঝে গেলেন, এই যৌবনেরই অপর নাম বোধহয় সংগ্রাম। বুঝে গেলেন, ‘বাঁচতে গেলে লড়তে হবে।’ এই যে চেতনা, এই যে অন্যতর বিশ্বাসে তাঁকে পৌছে দিল জীবন, এগুলিই পরবর্তী সময়ে উৎসারিত হয়েছিল গীত হয়ে। তাঁর গানের কথার মধ্য দিয়ে জীবনের লড়াই, সংগ্রাম, মূল্যবোধ, সাম্যচেতনা, অধিকার বোধ, সমষ্টিশক্তির প্রয়োজনের কথা বারবার প্রকাশ পেয়েছে।
‘কাঠকুড়োতে বেলা গেল মা-গো মা/ পেটের মধ্যে আগুন জ্বলে/ খরায় পোড়ে গাঁ / খয়রাতিতে পেটে জ্বালা আর তো জুড়ায় না / কেউ খেতে দিলেক না।’ এই গানে ক্ষুধার্ত মানুষের কান্নাই যেন ধ্বনিত হয়। সমাজের নিচুতলার মানুষের কথা, শ্রমজীবী মানুষের কথা তিনি অত্যন্ত দরদ দিয়ে লিখেছেন। তার মধ্যে মিশে রয়েছে তাঁর সমবেদনা। প্রতিটি শব্দে ফুটে উঠেছে গণচেতনার প্রতি দায়বদ্ধতা। কী নরম করে বলা, অথচ কী দৃঢ় সেই শব্দের প্রত্যয়। যেন আগুনে সেঁকা প্রতিটি পংক্তি। ‘ও বন্ধু রে / ও সাথী রে / ডাক দিয়েছে আগামী কাল / সুরজ ওঠে পুরব কোণে আন্ধার ভেঙে আসে সকাল।’
আবার কখনও তাঁর গানে মানবিকতা ও মূল্যবোধের সুরের অনুরণন ছড়িয়ে পড়ে। যেমন ‘মানুষ মানুষের জন্য, / জীবন জীবনের জন্য / একটু সহানভূতি কি মানুষ পেতে পারে না?’
সেই সঙ্গে লিখেছেন অসংখ্য দেশাত্মবোধক গানও। ‘ভারত আমার ভারতবর্ষ স্বদেশ আমার স্বপ্ন গো, তোমাতে আমরা লভিয়া জনম ধন্য হয়েছি ধন্য গো।’ কিংবা ‘ভারতবর্ষ সূর্যের এক নাম, আমরা রয়েছি সেই সূর্যের দেশে।’ এই গানের শেষ লাইনে এসে তিনি চমকে দিলেন। তাঁর সমস্ত ভাবনা-চিন্তার আলো প্রস্ফুটিত হল এই পংক্তির মধ্যে। ‘দেবতা এদেশে মানুষ হয়েছে জানি / মানুষকে দেখি গণদেবতার বেশে।’
এই ভাবনার স্তরে একদিনে তিনি উন্নীত হননি। যৌবনের প্রতিটি মার খাওয়া দিন, তাঁর ভাঙাচোরা পারিপার্শ্বিক, নিরন্ন মানুষের যন্ত্রণা— এসব তাঁকে এক নিজস্ব মানসিক অভিব্যক্তি সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে।
ওপার বাংলা থেকে এসে উঠলেন বাঁশদ্রোণীতে। সেখানে একটা স্কুলে সামান্য বেতনের চাকরি করতে লাগলেন। সেই শান্তিটুকুকে আশ্রয় করে বেড়ে উঠতে চেয়েছিলেন নিজস্ব লেখলেখির পরিধির মধ্যেই। কিন্তু ভাগ্য তাঁকে টেনে নিয়ে গেল অন্য এক পরিমণ্ডলে, সৃষ্টিশীলতার অন্য এক পথে। সেই ঘটনাটি বেশ চমকপ্রদ। শিবদাসের দিদি ছিলেন শিবানী চট্টোপাধ্যায়। তিনি অত্যন্ত গুণী মহিলা ছিলেন। লেখালেখি করতেন আবার ছবিও তুলতেন। সেই সূত্রে তাঁর সঙ্গে বিভিন্ন পত্রপত্রিকার যোগাযোগ ছিল।
সেই দিদির পাশের বাড়িতে থাকতেন অপরেশ লাহিড়ী ও বাঁশরী লাহিড়ী। তাঁরা হলেন সঙ্গীত পরিচালক বাপি লাহিড়ীর বাবা ও মা। অপরেশ লাহিড়ীর সঙ্গে শিবদাসের দাদা-ভাইয়ের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একদিন স্কুলে ক্লাস নিচ্ছেন শিবদাস। সবে চতুর্থ পিরিয়ড শেষ হয়েছে। দেখেন অপরেশবাবু একজনকে তাঁর কাছে পাঠিয়েছেন। খুব আর্জেন্ট ব্যাপার। তিনি বললেন, ‘আপনাকে এক্ষুণি যেত হবে। অপরেশদা ডেকে পাঠিয়েছেন।’ টিফিনের সময় তিনি গেলেন ‘অপরেশদা’র বাড়ি।

গিয়ে দেখেন ঘরভর্তি লোকজন। তাঁদের কাউকেই শিবদাস চেনেন না। ঘরের কয়েকজনের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলেন অপরেশ। তাঁদের মধ্যে ছিলেন নাট্যকার সলিল সেন, অভিনেতা নেপাল নাগ ও অভিনেত্রী বাণী গঙ্গোপাধ্যায়। পরিচয় করিয়ে দিয়ে এবার অপরেশদার নির্দেশের পালা। বললেন, ‘শোনো, এঁরা হলেন আরএসপির সাংস্কৃতিক সংগঠন ক্রান্তি শিল্পী সঙ্ঘের সদস্য। পার্ক সার্কাস ময়দানে এঁদের সম্মেলন হবে। পাঁচদিন ব্যাপী সেই সম্মেলনে আমাকে আর বাঁশরীকে প্রতিদিন গান গাইতে হবে। তুমি বাপু মোক্ষম একটা উদ্বোধন সঙ্গীত লিখে দাও তো।’ সেই সময়কার অনুভূতির কথা ব্যক্ত করতে গিয়ে শিবদাস তাঁর ‘গঙ্গা আমার মা পদ্মা আমার মা’ বইতে লিখেছেন, ‘আমার বুকের ভেতর হাতুড়ি পেটার শব্দ শুরু হয়ে গেল। সেতারের ছেঁড়া তারের মতো গুটিয়ে গেলাম। ভাবছি অপরেশদার একী ব্যবহার? একঘর লোকের সামনে আমাকে ডেকে এনে, এমনভাবে অপদস্থ করা! তিনি ভালো করেই জানেন, আমি গান লিখিনি কোনওদিন, লিখতেও জানি না। পরিস্থিতির হাত থেকে রক্ষা পেতে আমি বিনীতভাবে বললাম, ‘গান আমি জানি না।’ তাছাড়া আরএসপির আদর্শ উদ্দেশ্যও কি বক্তব্য তাদের, তাও আমার অজানা। মুখের কথা কেড়ে নিয়ে সলিল সেন বললেন, দুঃসহ , অসহায়, নিপীড়িত মানুষদের কথা লিখুন। লিখুন হ্যাভস আর হ্যাভ নটসদের কথা নিয়ে। আপনিও তো তাদেরই একজন। সলিল সেনের রাজনৈতিক ইঞ্জেকশনে কাজ হল। সমস্ত শরীর জ্বলে উঠল। চোখের কোণের অশ্রুবিন্দু। দেশ হারানোর ব্যথা মনের মধ্যে মোচড় দিয়ে উঠল। অপরেশদা বললেন, কবিতাই লেখ। তাতে আমি সুর দেব।’
এই আত্মবিশ্বাস থেকে লিখে ফেললেন গান। সব হারানোর শূন্যতার বোধ থেকে গানের মধ্য দিয়ে জীবনের আস্তিক্যবোধে মুখ ফেরানোর চেষ্টা শুরু হল। বুঝলেন, হারানোর কিছু নেই। কিন্তু জয়ের জন্য আছে গোটা দুনিয়া। লিখলেন, ‘এই কি পৃথিবী সেই / যেথায় আশার আলো শুধু ছলনা করে / চোখের তারায় যে আশা কেঁদে মরে /পৃথিবীর বুকে তবু কি মমতা নেই।’ এই গানের মধ্য দিয়ে সেদিন নিঃশব্দে জন্ম হল এক বলিষ্ঠ গীতিকারের, যাঁর গানে একদিন ফুটে উঠবে দিনবদলের প্রত্যয় আর স্বেদসিক্ত মানুষের জীবনের কথা। তাঁরই কলম দিয়ে পরবর্তীকালে বেরিয়ে এসেছিল সেই বিখ্যাত গান। ‘দোলা হে দোলা,/ হে দোলা হে দোলা / আঁকাবাঁকা পথে মোরা / কাঁধে নিয়ে ছুটে যাই / রাজা মহারাজাদের দোলা/ আমাদের জীবনের / ঘামে ভেজা শরীরের বিনিময়ে / পথ চলে দোলা।’ এই শ্রমের গানে শ্রমজীবীদের বঞ্চনার কথা ফুটে ওঠে। আমরা যেন তাঁদের ঘাম ঝরে পড়ার শব্দ পাই। শ্রমজীবীদের জীবনের শরিক হতে না পারলে এই কথা লেখা যায় না। সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘রানার’ কবিতায় যেমন রানারের জীবনের যন্ত্রণা ফুটে উঠেছে তার ছোটার ছন্দে, এখানেও যেন পালকি বা দোলার বাহকদের গানের কথায় ও ছন্দে সেই বঞ্চনা ও গতিময়তা ফুটে ওঠে।
একবার পুজোর সময় অপরেশদা শিবদাসকে বললেন, ‘এবার পুজোয় তোমাকে আমার জন্য গান লিখতে হবে। কয়েকদিন খেটেখুটে শিবদাস লিখলেন দু’টো গান। অপরেশদা বললেন, ‘এটা নিয়ে তুমি যাও ভি বালসারার কাছে। কথাটা শুনেই শিবদাস কেমন মিইয়ে গেলেন। ভি বালসারা জাতে পার্সি। সদ্য বোম্বাই থেকে কলকাতায় এসেছেন। ভালো বাংলা জানেন না। তিনি দেবেন বাংলা গানের সুর!

তবে হ্যাঁ, কলকাতায় পা দিয়েই তখন জনপ্রিয় হয়ে গিয়েছেন ভি বালসারা। একটা নতুন বাদ্যযন্ত্র তিনি বাজাতে পারেন। নাম তার ইউনিভক্স। তার শব্দ ও সুর অসাধারণ। বিভিন্ন সুরকার তখন তাঁদের গানে সেই ইউনিভক্স বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার করতে চাইছেন। মন না চাইলেও অপরেশদার নির্দেশে ভি বালসারাকে দিয়ে এলেন গান দু’টি। তার মধ্যে একটি গান পরবর্তীকালে মানুষের মুখে মুখে ঘুরতে লাগল। ‘লাইন লাগাও, লাইন লাগাও’। খাদ্য আন্দোলনের সময় মানুষের দুর্ভোগের কথা এমনভাবে লিখলেন, যা মানুষের কাছে ঝড়ের বেগে পৌঁছে গেল। ১৯৫৫ সালের সেই গানটি খুব দ্রুত শিবদাসকে শিল্পীমহলে জনপ্রিয় করে তুলল। তখন অনেকেই তাঁর লেখা গান গাইতে চাইতেন।
শিবদাসের সাঙ্গীতিক প্রতিভা ছিল বহুমুখী। বিভিন্ন মেজাজের, অনুভূতির, অভিব্যক্তির প্রকাশ ঘটত তাঁর গানের মধ্য দিয়ে। প্রেমের গান, বিরহের গান, বিদ্রোহের গান, সাম্যের গান, মুক্তির গান— এসব তো লিখেছেন, সেই সঙ্গে লিখেছেন অজস্র সুপারহিট লোকগান। সেই সব লোকগান অংশুমান রায় ও স্বপ্না চক্রবর্তীর কণ্ঠে সুপারহিট হয়েছিল। একসময় বাঙালির ঘরে লোকসঙ্গীতকে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন নির্মলেন্দু চৌধুরী। মাটির গানকে নাগরিক পরিমণ্ডলে তিনি জনপ্রিয় করে তোলেন। সব সময় শহরে বসে লোকসঙ্গীত লিখলে, সেখানে আইডেন্টিটি অনেক সময় নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু শিবদাসের সঙ্গে ছিল মাটির যোগ, তাই তাঁর প্রতিটি লোকগানে লোকায়ত জীবন ও মাটির গন্ধ বার বার ফিরে এসেছে। অংশুমান রায়ের সুরে স্বপ্না চক্রবর্তী রেকর্ড করলেন, ‘আমার কচি ছানাটা বড় পাকা হয়েছে’ এবং ‘কাঠকুড়াতে বেলা গেল মা-গো মা’। অংশুমান রায় নিজের সুরে গাইলেন দু’টি গান। ‘আমার বেটার বিয়া দিব সময় হয়েছে’ এবং ‘বলি, ও খোকার মা পান খেয়ে গাল পুড়েছে।’ তখন এই গানগুলি এতই জনপ্রিয় হয়েছিল যে, সেগুলি পুজোতেও মাইকে বাজত।
তাঁর সব থেকে সুপারহিট গান হল, ‘বিস্তীর্ণ দু’পারের অসংখ্য মানুষের..’। এই গান তাঁকে অমর করে রাখবে। তবে এই গানটি মৌলিক হলেও অনুপ্রাণিত। গানটির একটি প্রেক্ষিত রয়েছে। সেটি অবশ্যই জানা দরকার। প্রায় একশো বছর পূর্বে, ১৯২৭ সালে দুই বন্ধু কবি অস্কার হ্যামারটাইন জুনিয়র এবং সুরকার জেরোম কার্ন তাঁদের পরবর্তী প্রযোজনার জন্য একটি গান বাঁধলেন। সেটি ছিল ‘Old man river’। পাঁচের দশকে পল রোবসনের গলায় সেই গান দাবানলের মতো সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ল। গান সেখানে আর নান্দনিক বিনোদনের মাধ্যম হয়ে রইল না। তা সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ হয়ে উজ্জীবিত করল সারা বিশ্বের মানুষকে। বিশেষ করে যাঁরা নিপীড়িত, যাঁরা বর্ণবৈষম্যের শিকার, তাঁদের কাছে এই গান হয়ে উঠল হাতিয়ার।

সেই সময় এক ভারতীয় ছাত্র ছিলেন কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকগানের গবেষক। সেই গানের স্ফুলিঙ্গ তাঁকেও স্পর্শ করেছিল। তিনি মিসিসিপির সেই গানের ভেলাকে ভাসিয়ে দিলেন ব্রহ্মপুত্রের খরস্রোতে। সেই ছাত্রটি ছিলেন ভূপেন হাজারিকা। তৈরি হল অসমিয়া ভাষায় ‘বিস্তীর্ণ পারারে’। একদিন ভূপেন হাজারিকা শিবদাসকে বললেন, ‘এই গানটি বাংলা ভাষায় লিখে দিন।’ ব্যস, মিসিসিপি ও ব্রহ্মপুত্রের পর সেই গান তৈরি হল গঙ্গাকে নিয়ে। শিবদাস লিখলেন, ‘বিস্তীর্ণ দু’ পারের’ গানটি। গাইলেন ভূপেন হাজারিকা। কথা, সুরে ও গায়কীর ত্রিধারায় যেন ইতিহাস সৃষ্টি হল। গান যে এমন উদ্দীপক হতে পারে, প্রেরণার উৎস হতে পারে, কিংবা রোমাঞ্চিত করতে পারে, তা আবার নতুন করে বোঝা গেল। এখানে বহমান গঙ্গা যেন বিপ্লবের মন্ত্রদাত্রী হয়ে ওঠে। মানুষকে জাগিয়ে তোলার এক শক্তি হয়ে ওঠে। তাই বার বার শিবদাস গঙ্গার কাছে প্রশ্ন রাখেন, মানবতার পতন দেখেও গঙ্গা নিঃশব্দ অলসভাবে বইছে কেন? কিংবা বলেন, কেন সে এই শিথিল সমাজকে ভাঙতে পারে না? পরের স্তবকের শেষে ফের প্রশ্ন করেন, তুমি কেন আজ প্রেরণা দিতে অক্ষম বা লক্ষ কোটি ভারতবাসীকে জাগাতে পারছে না? এই গানের কথা যেন এক সাম্যবাদের ভাবনাকেই প্রকাশ করে, কলুষিত সমাজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ স্রোত বইয়ে দেওয়ার কথা বলে। একই সঙ্গে সহস্র বরষার উন্মাদনার মন্ত্রে লক্ষ মানুষকে সংগ্রামী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হওয়ার কথা বলেন। আজও এই গান অমর হয়ে আছে। পরে এই গানটি রুমা গুহঠাকুরতার নেতৃত্বে ক্যালকাটা ইয়ুথ কয়ারও পরিবেশন করত।

সময়ের ভাঙাগড়া, পালাবদল, অবক্ষয়, দারিদ্র্য, অসাম্য এসব তিনি দেখেছেন। সেগুলিই তাঁকে অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ করেছে। মন্বন্তরে ক্ষুধার্ত মানুষের হাহাকার তাঁর মানবিক যন্ত্রণাকে অস্থির করে তুলেছিল। সেই অস্থিরতাই প্রকাশ পেয়েছিল শব্দের মধ্য দিয়ে গানের আঙ্গিকে। ‘তুমি কি দেখেছো / উলঙ্গ শিশু ফুটপাতে শুয়ে রাতে/ মাতা মেরিদের বুকে মুখ রেখে / অনাহারে শুধু কাঁদে।’
‘চারমূর্তি’ ছবির জন্য টেনিদারূপী চিন্ময় রায়ের লিপে একটি গান রাখার কথা ভেবেছিলেন পরিচালক উমানাথ ভট্টাচার্য। তাঁর ইচ্ছে ছিল একটি কমেডি গান রাখার, যেটি চরিত্রের সঙ্গে মিলে যায়। ‘ভারত আমার ভারতবর্ষ’ গানটি মান্না দে’র কণ্ঠে শুনে পরিচালকের বেশ ভালো লেগে যায়। তিনি প্রথমে ভেবেছিলেন এটি দ্বিজেন্দ্রগীতি। পরে যখন শুনলেন সেটি শিবদাসের লেখা এবং অজয় দাসের সুর, তখন আরও বেশি অবাক হয়ে যান। উমানাথ সিদ্ধান্ত নিলেন, চরিত্রের সঙ্গে এই গান না মিললেও তিনি ব্যবহার করবেন। কেননা এই গান হিট করবেই। ঠিক তাই হয়েছিল। সেই সময় এবং এখনও বহু জায়গায় স্বাধীনতা দিবস, সাধারণতন্ত্র দিবসে এই গান মাইকে বাজানো হয়। এখানেই স্রষ্টার সার্থকতা।

শিবদাস একবার লিখলেন, ‘আমি জন্মে শুধু কান্না নিলাম / তোমার কোলে এসে / দু’চোখ ভরে অশ্রু নিলাম / তোমায় ভালোবেসে। ’ সেই গান শুনে শিবদাসের মায়ের কী কান্না! তিনি ভাবলেন, ছেলেকে ঠিকমতো মানুষ করতে পারেননি বলেই ছেলের এত অভিমান, এত দুঃখ ও কান্না। শিবদাস মাকে সেই গানের অন্তর্নিহিত অর্থ বোঝালেন। বললেন, ‘মাগো, এ আমার ব্যক্তিগত দুঃখের কথা নয়। এই দুঃখ এদেশের প্রতিটি সন্তানের। তাঁদের চোখে জল, কেননা তাঁদের মা অর্থাৎ দেশমাতা পরাধীন।’ বোঝালেন, ‘এ আমার খুলনা- আমার জন্মভূমির গান।’ সেই কথা শুনে তাঁর মা আশ্বস্ত হলেন। বললেন, ‘এমন গান আরও লেখ বাবা।’ ঘনিষ্ঠ মহলে শিবদাস বলেছিলেন, ‘এটাই ছিল তাঁর জীবনে সব থেকে বড় পুরস্কার।’
শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনে যে সাফল্য, তার জন্য তিনি বহুজনের নাম করে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেছেন। তবে বিশেষ করে চারজনের কথা উল্লেখ করেছেন। শিবদাস লিখেছেন, ‘একটা কুঁড়েঘর বানাতে গেলে চারটে খুঁটির দরকার হয়। দালানবাড়ি বানাতে গেলেও চারটি থামের দরকার হয়। আমার গানের কুঁড়েঘরের চারটে খুঁটি— অপরেশ লাহিড়ী, ভি বালসারা, ক্যালকাটা ইয়ুথ কয়্যারের প্রাণপ্রতিমা শ্রীমতী রুমা গুহঠাকুরতা এবং জগদ্বিখ্যাত গায়ক কিশোরকুমার। এঁদের সহানুভূতি ও সহায়তা, আশ্রয় ও প্রশ্রয় না পেলে আজ আমি যেখানে এসে পৌঁছেছি, সেখানে কখনও পৌঁছতে পারতাম না। ’

কিশোরকুমার তাঁকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছিলেন বহু প্রেমের গান। সেই প্রেমের গানে ছিল নানা ধরনের শেড। নিজের সুরে কিশোরকুমার গেয়েছেন সেই গানগুলি। আজও অত্যন্ত জনপ্রিয় সেই গানগুলি। ‘আমি দুঃখকে সুখ ভেবে বইতে পারি / যদি তুমি পাশে থাকো’, ‘প্রেম বড় মধুর / কভু কাছে, কভু সুদূর’, ‘হাওয়া, / মেঘ সরায়ে ফুল ঝরায়ে / ঝিরি ঝিরি এলে বহিয়া’।
জীবনের চলার পথে, যেসব আলো অন্ধকারের সাক্ষী থেকেছেন তিনি, সেগুলিই গানের মধ্য দিয়ে মানুষকে উপহার দিয়ে গিয়েছেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত অন্তর্মুখীন এক মানুষ। গানের খাতা নিয়ে দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে বেড়াননি। নিজের আনন্দে, নিজেকে প্রকাশ করার তাড়নায় লিখে গিয়েছেন গান। তাই হয়তো তাঁর গানের সংখ্যা খুব বেশি নয়। কিন্তু যেটুক লিখে গিয়েছেন, তা তাঁর প্রতিভার অনন্যতাকে প্রকাশ করতে সক্ষম। আজও তাঁর গান মানুষ গেয়ে ওঠেন। আজকের নবীন শিল্পীরাও মঞ্চে তাঁর গান গেয়ে মানুষকে খুশি করেন। তিনি চলে গিয়েছেন ২০০৯ সালের ৮ই আগস্ট। কিন্তু রয়ে গিয়েছে তাঁর গানের উজ্জ্বল ভুবনখানি। যে গান সব সময় বিশ্বাসের আলোয় আলোকিত করে মানবাত্মাকে। ‘একদিন সূর্যের ভোর / একদিন স্বপ্নের ভোর / একদিন সত্যের ভোর আসবেই / এই মনে আছে বিশ্বাস / আমরা করি বিশ্বাস / সত্যের ভোর আসবেই একদিন।’ উজ্জ্বল পংক্তির এই দীপালোকে ভাস্বর হয়ে থাকবেন শিবদাস।

