শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

দস্তয়েভস্কির জীবন, প্রেম ও সাহিত্য (২য় পর্ব)

মিলিটারি ইঞ্জিনিয়ারিং ক্লাসে অঙ্ক বা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পাঠ নিতে নিতে ক্লান্তি আসত দস্তয়েভস্কির। সেখানে ধর্ম, ইতিহাস, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সঙ্গে সঙ্গে পড়ানো হতো রুশ সাহিত্য, ফরাসি ভাষাও। রুশ সাহিত্য পড়াতেন ভি টি প্ল্যাকসিন। আলোচনায় আসতেন পুশকিন লের্মোনতোভদের লেখার প্রসঙ্গ। সেখানে তিনি সাহিত্যে রোমান্টিসিজম নিয়ে খুবই উৎসাহিত হয়ে পড়লেন। বিশেষ করে ফরাসি সাহিত্যের রোমান্টিসিজম। তাঁর বন্ধু, ইভান সিদলোভস্কির সঙ্গে জার্মান সাহিত্যিক ই টি এ হফম্যানের সাহিত্য নিয়ে প্রচুর আলোচনা করতেন। পরবর্তীকালে তিনি অবশ্য এই রোমান্টিসজমকে আঁকড়ে পড়ে থাকেননি। সেই রোমান্টিসিজমকে তিনি একেবারে ভেঙেচুরে তাঁর সাহিত্যে পরিবেশন করেছিলেন। কখনও কখনও সেই রোমান্টিসিজমের ভিতরে তাঁর স্যাটায়ারিক্যাল ভাবনাকে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। ফরাসি বিপ্লবের পর সেই সাহিত্যে যে নতুন রংয়ের পোচ লাগল, সেটাও নজর এড়াল না দস্তয়েভস্কির। আসলে হফম্যানের প্রতি তাঁর আগ্রহটা তৈরি হয়েছিল তাঁর অগ্রজ রুশ সাহিত্যেক বেলিনস্কির কথায়। বেলিনস্কি বলেছিলেন, হফম্যানের সাহিত্যক্ষমতা শেক্সপিয়রের মতোই। সেই কথা শুনে দস্তয়েভস্কি হফম্যানের প্রতি আকৃষ্ট হন।

E T A Hofman

হফম্যানের কিছু লেখা রুশ ভাষায় অনূদিত হয়েছিল। সেগুলি চটপট পড়ে ফেললেন। কিছু অনূদিত হয়নি। সেগুলি মূল জার্মানিতেই পড়ে ফেললেন।  অসাধারণ সব রোমান্টিক কমেডি, রোমান্টিক ফ্যান্টাসি লিখেছিলেন তিনি। ‘দ্য গোল্ডেন পট’, দ্য স্যান্ডম্যান’, ‘দ্য লাইফ অ্যান্ড ওপিনিয়নস অফ দ্য টমক্যাট মুর’ ইত্যাদি পড়ে ফেললেন দস্তয়েভস্কি। পড়ে ফেললেন গ্যেটের ফাউস্টও। হফম্যান ছাড়া অন্য যে সাহিত্যিক তাঁর মনোজগতে প্রভাব ফেলেছিলেন, তিনি হলেন এডগার এলান পো। দু’জনের জীবনকে পাশাপাশি ফেললে দেখা যায় দু’জনের জীবনের মধ্যেও খুঁটিনাটি কিছু মিল রয়েছে। কীভাবে হফম্যান ও পো তাঁর মনোজগতে একটা সুস্পষ্ট ভাবনার স্তর তৈরি করেছিল, তা দস্তয়েভস্কি পরবর্তীকালে লিখেছিলেন। তিনি লিখেছেন, ‘Poe merely supposes the outward possibility of an unnatural event, though he always demonstrates logically that possibility and does it sometimes even with astounding skill; and this premise once granted, he in all the rest proceeds quite realistically. In this he differs essentially from the fantastic as used for example by Hoffmann. The latter personifies the forces of Nature in images, introduces in his tales sorceresses and specters, and seeks his ideals in a far off utterly unearthly world, and not only assumes this mysterious magical world as superior but seems to believe in its real existence.’

Edgar Alan Pow

কোথায় তাঁর মনে পো একটা নতুন ভাবনা ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন? সেটা হল, সাধারণ মানুষের ধারণা, কোনও খুনি মানেই তাঁর মানসিক অসুস্থতা বা বিকৃতি রয়েছে। কিংবা রয়েছে কোনও কমপ্লেক্স।  পো এবং দস্তয়েভস্কি মনে করেন, আসলে একটা পরিস্থিতিই একজন সুস্থ মানুষকেও হন্তারক করে তুলতে পারে। খুনটিকে মধ্যবিন্দু ধরে নিলে তার আগে ও পরে একটা ঘটনা প্রবাহ থাকে। সেই প্রবাহটা একটা জার্নির মতো। পো এবং দস্তয়েভস্কির ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’, ‘দ্য টেল-টেল হার্ট’, ‘দ্য ব্ল্যাক ক্যাট,  ‘দ্য কাস্ক অফ অ্যামোন্টিলাডো’ ইত্যাদি উপন্যাসের মধ্য দিয়ে এই তত্ত্বই ফুটে উঠেছে।

সুতরাং এই পর্বটা ছিল দস্তয়েভস্কির মানসিক পরিমণ্ডল গড়ে তোলার সময়। যদিও পরবর্তীকালে অর্থাৎ তাঁর লেখার দ্বিতীয় পর্বের সময় তার অনেক কিছুই ভেঙেচুরে তৈরি হয়েছিল ভাবনার নতুন ভ্রুণ, কিন্তু তাঁর একটা সামগ্রিক পরিকাঠামো এই সময়েই তৈরি হয়ে গিয়েছিল, যা আজীবন শুধু অটুটই থাকেনি, তা আরও শক্তপোক্ত হয়েছিল। তিনি বিশ্বাস করতে শিখলেন, সাহিত্য মানে পর্যবেক্ষণ এবং তাঁর ভাষ্য। বরং এই সময় থেকেই তাঁর মনে হয়েছিল, সাহিত্য মানেই দৃশ্যমান জগৎ, মানুষের ব্যবহার বা ঘটনার বস্তুনিষ্ঠ বিবরণ নয়। সাহিত্যিককে যেতে হবে আরও গভীরে। বাহ্যিক পর্যবেক্ষণের পরেও থেকে যায় কল্পনা এবং আত্মদর্শনের একটি অধ্যায়। লেখকের তৃতীয় নয়ন সেই অন্বেষণের কাজটি করে। এই অন্বেষণ এতদূর পর্যন্ত হয়, যেখানে পাঠক পৌঁছতে পারেন না। তাই পাঠককে গভীর সেই মননের খবরটুকু লেখককে পৌঁছে দিতে হয়। এই সাহিত্যবোধ এবং বিশ্বাস থেকেই গড়ে উঠেছে তাঁর নিজস্ব সাহিত্যতত্ত্ব। এটুক যথার্থভাবে অনুধাবন করতে পারলে তাঁর যজ্ঞ সাহিত্যের আপাত কাঠিন্যটুকু ভেদ করে অনায়াসে তার রসাস্বাদন করা যায়। মজে যান পাঠক দস্তয়েভস্কির কাহিনি এবং চরিত্রে।  

দস্তয়েভস্কি যখন ১৮৪৫ সালে তাঁর প্রথম উপন্যাস  ‘দ্য পুওর ফোক’ বা ‘বেদনি লুজিয়া’ লিখলেন, তখনও বঙ্কিমচন্দ্রের প্রথম আদর্শ বাংলা উপন্যাস ‘দুর্গেশনন্দিনী’ লিখতে ২০ বছর দেরি আর রবীন্দ্রনাথের জন্মের ১৫ বছর বাকি। উপন্যাসে দস্তয়েভস্কি এক মার খাওয়া, পর্যুদস্ত, বিপন্ন মানুষের গল্প বললেন। দুই দরিদ্র প্রেমিক ও প্রেমিকার পরস্পরের প্রতি পত্র লেখার মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে তাঁদের প্রেম, মানসিক ভাবনা এবং সামাজিক পরিমণ্ডল। কিন্তু সমস্ত হীনমন্যতার মধ্যেও দু’টি সামাজিকভাবে অসুখী মানুষের হৃদয়ে ফুটে ওঠে প্রেমের আনন্দ। এই প্রেমের অনুভূতিই তাঁদের অবশেষে পৌঁছে দেয় এক সুন্দর বোধের প্রান্তে। ‘যত ক্ষুদ্রই আমি হই না কেন, শেষ পর্যন্ত আমি একজন মানুষ।’ 

দস্তয়েভস্কির ‘পুওর ফোক’এর মধ্যে যদিও গোগোলের ‘ওভারকোট’ এবং পুশকিনের ‘পোস্টমাস্টার’ গল্পের প্রভাব ছিল, কিন্তু তা সত্যেও রুশ সাহিত্যের মান্যবর এবং বিদগ্ধ ব্যক্তিত্ব বেলিনস্কি ঠিক চিনতে পেরেছিলেন দস্তয়েভস্কির প্রতিভাকে। তিনি বলেছিলেন, ‘এই তরুণ লেখক জয় করতে এসেছে’। বলেছিলেন, ‘ওর হাতে আছে এক জাদুকাঠি। যা মহৎ সাহিত্য সৃষ্টি করতে পারে অনায়াসে।’ এই উপন্যাসের মধ্য দিয়ে দু’টি প্রেমিক হৃদয়ের যন্ত্রণাকে সমকালীন রুশ সমাজের প্রেক্ষাপটে তিনি এঁকে বুঝিয়ে দিলেন, প্রেমকে বিচ্ছিন্ন করা যায়। বাস্তব জগতে তা বিচ্ছিন্ন হলেও মনের গভীরে তা শাশ্বত।

ভিক্টোরিয়ান যুগের সাজানো গোছানো রোমান্সকে ভেঙে চুরমার করে এক নতুন সরণির দ্বার খুলে দিলেন দস্তয়েভস্কি। তাঁর সাহিত্যে নতুন ধারার ন্যারেশন ও চরিত্র নির্মাণের মধ্য দিয়ে সাহিত্যে এসে পড়ল মনস্তস্ত্বের নতুন আলো। চরিত্রগুলি আর শুধু কাহিনী বর্ণনার ভারবাহক হয়ে রইল না। শব্দের, বাক্যের মধ্য দিয়ে আমরা দেখতে পেলাম তাঁদের অন্তরের মনস্তত্ত্বমূলক দ্বন্দ্ব, জটিলতা। জীবনের অন্ধকারতম, নিভৃত অলিন্দে ঢুকে পড়ল সাহিত্য। সাহিত্যের ভিতরে অনায়াসে ঢুকে পড়ল জীবনের নানা আলোছায়া পথ। যেখানে মনের রহস্যের জাল কেটে বেরতে হয়। যেন মাকড়সার জালবোনা অন্দর, যেখানে আগে সেভাবে সাহিত্যিকদের যাতায়াত ছিল না। সেখানেই আলো ফেললেন দস্তয়েভস্কি। সেই সঙ্গে বিশ্ব সাহিত্যকে নতুন পথ দেখালেন তিনি। পরবর্তীকালে সেই পথে আমরা দেখেছি কাফকা, ক্যামু, ন্যুট হামসুন, জেমস জয়েসকে। ফ্রান্‌ৎস কাফকার ‘দ্য ট্রায়াল’, আলবেয়ার কাম্যুর ‘দ্য আউটসাইডার’, স্যামুয়েল বেকেটের ‘ওয়েটিং ফর গোডো’—বিখ্যাত সব অস্তিত্ববাদী লেখার শুরুয়াত কিন্তু দস্তয়েভস্কির উপন্যাস ‘দি নোটস ফ্রম আন্ডারগ্রাউন্ড’থেকে। এমনকী জ্যঁ পল সার্ত্রেরও পথপ্রদর্শক ছিলেন দস্তয়েভস্কি। কিন্তু ক’জন এই তথ্য জানি যে, তাঁর উপন্যাস ‘দ্য নোটস ফ্রম আন্ডারগ্রাউন্ড’  উপন্যাসটিও রালফ এলিসনকে তাঁর বিখ্যাত ‘ইনভিজিবল ম্যান’ লেখার পথ দেখিয়েছিল?

তার কারণই হল দস্তয়েভস্কির নতুন ধারায় অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন পরবর্তীকালের পাঠককূল। এরপর ১৮৪৬, ’৪৭, ’৪৮ সালে পর পর লিখে ফেললেন যথাক্রমে ‘দ্য ডাবল, ‘দ্য মিস্ট্রেস এবং ‘হোয়াইট নাইটস’। এগুলোতেও তিনি গোগোলের ভাবধারা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি। এর মধ্যেই তাঁর সাহিত্যসাধনার প্রথম পর্ব শেষ হয়। সেনাবাহিনীর চাকরি এবং নির্বাসন জীবন কাটিয়ে আবার তিনি সাহিত্যের জগতে ফিরে এলেন ১৮৫৯-এ। পর পর কয়েকটি কয়েকটি উপন্যাস লিখলেন বটে তবে আলোড়ন ফেলে দিল ১৮৬৬ সালে প্রকাশিত ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’ উপন্যাসটি। অপরাধ তত্ত্বের পিছনে যে মনস্তত্ত্ব, তাকে নিয়ে নিয়ে গেলেন এক নতুন দিশার দিকে। একজন অপরাধীর দৃষ্টিকোণ থেকে সাজালেন প্লট। সেখানে অপরাধ তত্ত্ব নিয়ে দিলেন নতুন ব্যাখ্যা। অপরাধী যেন নিজেই তার অপরাধের শাস্তির অন্বেষণ করে বেড়াচ্ছে। মনে রাখতে হবে, তখনও ফ্রয়েড কিন্তু মনস্তত্ত্ব নিয়ে ব্যাখ্যা করেননি। কেননা ফ্রয়েড তখন দশ বছরের বালক মাত্র। 

তাঁর জীবনের শেষ উপন্যাস সুদীর্ঘ ‘দ্য ব্রাদার্স কারামাজোভ’। উপন্যাসের বড় ভাই দিমিত্রির মধ্যে এসে পড়ে লেখকেরই জীবনের ছায়া। তার বিচার ক্ষমতা কম। সে ইন্দ্রিয়ের দাস, কিছুটা নীচ প্রকৃতির। মেজোভাই ইভান সেজোভাই আলিওশা সকলেই পরস্পরবিরোধী সত্তার বৃত্তে অবস্থান করে। ভালো-মন্দ, পাপ-পুণ্য, ধর্ম-অধর্ম, প্রতিবাদ ও আনুগত্য, নিষ্ঠুর ও কোমল প্রভৃতি সত্তার মধ্যেই তারা আবর্তিত হয়। কিন্তু সামগ্রিক এক অধঃপতন, ক্ষমতা ও লোভ যেন শেষ পর্যন্ত ভাসিয়ে নিয়ে যায়। এখানে ছোটভাই স্মেরদিয়াকভ তার বাবাকে লোভের বশবর্তী হয়ে খুন করে। তাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা উপন্যাসে মানব চরিত্রের রহস্য উন্মোচিত। মনের ভাঙাগড়া যুক্তি এবং অপযুক্তির মধ্য দিয়ে যেন ঘটনা একসময় ভালো ও মন্দের মধ্যে একটা ভারসাম্য তৈরি করে ফেলে।

দস্তয়েভস্কির চরিত্রগুলির জীবনজুড়ে এই যে টানাপোড়েন, আলো আঁধারির উন্মেষ, তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর আধখেপা, বেপরোয়া জীবন। সেই জীবনের সঙ্গে সমাজের নিচুতলার মানুষের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তাঁকে সাহিত্যের চিরাচরিত দিগ্বলয় ভেঙে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে নতুন ভাষ্যের পথে। সেই জীবনের মধ্যে তিনি দেখেছিলেন, জীবনের অস্তিত্বহীনতাকে। তাই তিনি অনায়াসে বলতে পারেন, মানুষের অস্তিত্বের রহস্য কেবল তার বেঁচে থাকার মধ্যেই নেই। বরং কেন বেঁচে আছি, এই সত্যটাকে উপলব্ধি করার মধ্যেই তার আনন্দ লুকিয়ে আছে (দ্য ব্রাদার্স কারমাজোভ)। তিনি জানতেন, ‘কোনও নতুন পদক্ষেপ বা নতুন শব্দ উচ্চারণের স্বীকৃতি মেলে না। কেননা সেখানে অনিশ্চয়তা জড়িয়ে থাকে।’ ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’–এ  তিনি সেই কথা বললেন। তিনি জানতেন, অচেনা সেই পথে আলো জ্বেলে চলার স্বীকৃতি হয়তো নাও মিলতে পারে। তা সত্ত্বেও নতুন আন্তরিক কথনে, কাহিনি বিন্যাসে, চরিত্র নির্মাণে কিংবা বাক্য গঠনে জীবনের নিহিলিজমকে তিনি সাহিত্যে এঁকে ফেললেন। সত্যি কথা বলতে কী দস্তয়েভস্কির উপন্যাস পড়ার মধ্য দিয়ে পাঠকের মধ্যে তিল তিল করে জন্মাতে থাকে একটা দুঃখবোধ, একটা অস্তিত্বহীন, অবাস্তব অথচ খুব কাছের একটা জগৎ। সেই চেনা জগৎ সেভাবে সাহিত্যে উঠে আসেনি। বাস্তবতার চরিত্র বদল হল দস্তয়েভস্কির হাতে। তাঁর সাহিত্যের অন্তঃসলিলা শক্তিই হল এই নিঃশব্দ যন্ত্রণাকাতর অভিব্যক্তি। সেই কথাই লিখে গিয়েছেন বহু সমালোচক। তাঁর মধ্যে একজন হলেন ডব্লু এফ মেরেডিথ। তিনি বলেছেন, ‘দস্তয়েভস্কির উপন্যাস পড়লে ধীরে ধীরে আমাদের চারপাশে ছায়ার মতো ভিড় করে আসে অসুস্থ, বঞ্চিত, বিপথগামী মানুষেরা। তাদের সুপ্ত বেদনা, বিকার সহ বহু অভিব্যক্তির প্রভাব পড়ে আমাদের মস্তিষ্কে এবং চৈতন্যে। আমাদের বোধকে একটা জ্বরভাব, তাপের আচ্ছন্নতা বিকল করে।’ 

তাঁর উপন্যাস পড়তে পড়তে সন্দেহ হতে পারে, তাহলে কি চূড়ান্ত নাস্তিবাদের সড়কপথে এগিয়েই শেষ হয়ে গিয়েছে তাঁর পথ? না, তাহলে তাঁর সাহিত্য সারা বিশ্বে এত জনপ্রিয় হতো না। ক্লাসিকের তকমাও পেত না। তাঁর জন্মের দুশো বছর পরেও তাঁর সাহিত্য নিয়ে আলোচনা ও সমীক্ষার শেষ হয়নি। বরং বিশ্বজুড়ে তাঁর সাহিত্যের আঙ্গিক এবং মনস্তত্ত্ব ও জটিলতা নিয়ে গবেষণা আরও বেড়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হচ্ছে নব উন্মোচন। সময় দস্তয়েভস্কিকে ঠিকমতো চিনতে পারেনি। রুশ বিপ্লবের বহু আগেই তিনি দেখিয়েছিলেন, ‘বিপ্লবের মধ্যেও ব্যর্থতার কলুষিত কালো দাগ থেকে যায়।’  

সুখকে দস্তয়েভস্কি বাহ্যিক সুখের বস্তু হিসেবে কখনওই মনে করেননি। তিনি মনে করতেন, সুখের ভিতর সুখকে খুঁজলে তাকে পাওয়া যায় না। সুখকে প্রাপ্ত করার জন্য যে সাধনা বা পথ চলা তার মধ্যেই আছে সুখের অস্তিত্ব। তার স্বরূপকে চিনতে পারলেই প্রকৃত সুখের সন্ধান মেলে। এ যেন কবিগুরুরই বাণী, ‘আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ।’ অথবা ভারতীয় উপনিষদের মধ্যে যে পথ চলার দর্শন লুকিয়ে আছে, তাকেই সাহিত্যে অন্যভাবে টেনে আনলেন দস্তয়েভস্কি। 

মনের অশুভ বোধ বা অপরাধ বোধ সম্পর্কেও তিনি দিলেন এক নতুন ভাষ্য। যা আধুনিক জটিল মননশীলতার সঙ্গে দারুণভাবে খাপ খেয়ে যায়। তিনি বললেন, ‘অপরাধটা আসলে কর্মের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। অপরাধবোধে অথবা অশুভবোধে জারিত মানুষও আসলে একজন অপরাধী। কেউ যদি ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে অবিশ্বাসী হয় এবং আত্মার অমরত্ব নিয়ে সন্দিহান হয়, তাহলে তার কাছে অন্যায় বোধ বলে কিছু থাকতে পারে না। আসলে সমাজের নৈতিক আবহের মধ্যে যে অসাম্য রয়েছে, সেটাই আামাদের মনের ভিতরে জাগিয়ে দেয় এক বিপরীত প্রতিক্রিয়া। সবাই যে অন্যায় করে তা নয়। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষই অন্যায় বোধকে মনে পোষন করে।’      

সব মিলিয়ে লেখক হিসেবে জীবদ্দশায় দস্তয়েভস্কি হয়ে উঠেছিলেন এক বিখ্যাত মানুষ। তিনি এতই বিখ্যাত হয়ে ওঠেন যে, দ্বিতীয় জার আলেকজান্ডার রাজপ্রাসাদে তাঁকে লেখা থেকে পাঠের আমন্ত্রণই শুধু জানাননি, অনুরোধ করেছিলেন নিজের ছেলেকে পড়ানোর জন্যও। ভাবা যায়, এই একই পরিবার একসময় তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল, সাইবেরিয়ায় নির্বাসনে পাঠিয়েছিল!

১৮৮১ সালে ৯ ফেব্রুয়ারি তাঁর মৃত্যু হয়।  মৃত্যুশয্যায় তাঁর ঠোট থরথর করে কাঁপছে। স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদের বললেন, ‘তোমরা সবাই আমার কাছে এসে বসো। কন্যা লুবোভকে বললেন, আমাকে বাইবেলের গল্প থেকে ওই ‘দ্য প্যারাবল অফ দ্য প্রডিগ্যাল সন’টা শোনাও। শুনতে শুনতে চোখের কোণ তাঁর ভিজে ওঠে। যেন এক ‘পাপবিদ্ধ’ মানুষ তাঁর অনুতাপের মধ্য দিয়ে পরিশোধিত হয়ে উঠছেন।  উচ্ছন্নে যাওয়া ছেলেটা যেমন শুদ্ধ হয়ে তাঁর পিতার কাছে ফিরে এসেছিলেন। তিনিও যেন  জীবনের সমস্ত ‘কালিমা’ ধুয়ে চলে যাচ্ছেন পরমপিতার কাছে।

স্ত্রীকে বললেন, ‘অ্যানা, আমি যাচ্ছি। তোমার ভালোবাসার স্বাদটুকু আমার জীবনে এক বিশ্বাসের জন্ম দিয়েছিল। সেই বিশ্বাসের আমি কখনও অমর্যাদা করিনি। বাস্তবে তো নয়ই, এমনকী চিন্তার ভিতরে সেই বিশ্বাসটুকু অটুট থেকেছে। আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি অ্যানা।’ এক গভীর বিশ্বাসের বন্ধনে আশ্লিষ্ট ভালোবাসাটুকু ছিন্ন করে দিয়ে গেল মৃত্যু। দস্তয়েভস্কি হয়ে গেলেন অতীত। প্রবল ঠান্ডার মধ্যেও তাঁর শবযাত্রায় সেদিন পা মিলিয়েছিলেন ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ। সেন্ট পিটার্সবার্গে তাঁকে সমাহিত করা হয় তাঁর দুই প্রিয় কবির পাশে। তাঁরা হলেন নিকোলাই কারামজিন এবং ভাসিলি জুকোভস্কি। সেখানেই পরবর্তীকালে গড়ে তোলা হয় সমাধি। সেই সমাধি ফলকে আজও লেখা আছে—  “Verily, verily, I say unto You, except a corn of wheat fall into the ground and die, it abideth alone: but if it dies, it bringeth forth much fruit”  

(শেষ)

[লেখকের অন্য রচনা]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x