শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

আর সব দিনের মতো আজও থলে হাতে বাজারে প্রাণতোষবাবুর চোখ টাটকা সবজির দিকে। শীতকালের সাজানো বাজার রোদে ঝিলমিল। আহা! ডুমুরগুলো দেখ! বেগুনগুলোর গা থেকে বেগুনি আভা যেন ঠিকরে পড়ছে। বোঁটার কাছে ধারালো কাঁটা। কোনোটা লম্বা, কোনোটা বেঁটে, গোলগাল। আর ওদিকে রোদ পোহাচ্ছে লাল টমেটোগুলো। এখন আর সেই দেশী টমেটো দেখতে পাওয়া যায় না। সাউথ থেকে আসে বড় বড় চালানি টমেটো। প্রাণতোষবাবুর বাজার করা একধরনের বিলাসিতা। থলে হাতে প্রাণতোষবাবু তন্ময়। সেসময় সুলতার কথাও মনে পড়ে গেল। বেরোবার সময় পইপই করে বলে দিয়েছেন আজ যেন তিনি সবজির বাজারে না ঢোকেন। শুধু মুরগি আর ভেটকির ফিলেট্ আনলেই হবে। গিন্নি আবার বলতে শিখেছেন ফিলে, উচ্চারণ কিছুটা ফিল্- এর মতো। গিন্নিকে ছেলেমেয়েদের কাছে মডার্ন হয়ে থাকতে হয়।
চিকেন রোস্ট না কী একটা বানাবে আর ভেটকির ফিলেটে মশলা মাখিয়ে ভেটকির বাটার ফ্রাই। আজ প্রাণতোষবাবুর বৌমা আসছে। থুড়ি, তাকে আবার বৌমা বলা চলবে না। গিন্নি আর মেয়ের কথামতো পরিষ্কার ইংরেজি উচ্চারণে বলতে হবে ক্যাটরিনা। মেম-বৌ বলে কথা। আর দুই নাতি- নাতনি। সিড আর অ্যাডি। সিদ্ধার্থ থেকে সিড আর আদৃতা থেকে অ্যাডি। ওই চালানি টমেটোগুলো আসতে আসতে দেশী নামগুলোরও রূপ বদলে গেল। বিকৃত। কী আর করা যাবে! ছেলে যখন তারই, তখন বৌমাকে ক্যাটরিনা বলে ডাকতেই হবে আর নাতি নাতনিকে সিড আর অ্যাডি। বুড়োবয়সে আরও কত কী যে দেখার আছে! দোষ প্রাণতোষবাবুর নাকি বিশ্ববাজারের? সারা দুনিয়া জুড়ে তখন বিশ্বায়নের পাগলা হাওয়া। সমীর আমেরিকা যাবার আগে প্রাণতোষের দাদা মহীতোষ তো বলেই ফেললেন তাহলে তোর ন্যাশনাল স্কলার ছেলের ট্যালেন্ট দেশের কোনও কাজে লাগল না? একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন প্রাণতোষ। না, এ দেশের প্রতিভা দেশের কোনো কাজে লাগে না। কত ব্রিলিয়ান্ট ছেলেমেয়ে যে দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। ভাগ্যিস! তার মেয়ে সঙ্গীতার মাথা তেমন ভালো নয়। ইংরেজিতে এম এ করে এখন যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে পোস্টগ্রাজুয়েট করছে। বিয়ে করে এখানেই থিতু হওয়ার
ইচ্ছে। প্রাণতোষবাবুর বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। তিনি সবজিবাজার থেকে চোখ ফিরিয়ে মাছের বাজারে ঢুকলেন। খুব বড় সাইজের ভেটকি না কেনাই ভালো। বম্বে ভেটকি যদিও ভদ্রলোকের মাছ নয়, তবু গিন্নির আদেশ শিরোধার্য। মেয়েও বলে দিয়েছে ফিলেট আনতে। ভেটকি ফ্রাই হবে। দেশি ভেটকি থাকতে এখন খেতে হবে বম্বে ভেটকির ফ্রাই। কলকাতা ভেটকির কিন্তু কোনো আঁশটে গন্ধ থাকে না। কোথায় গরম ভাতে সরষে- ভেটকির মহোৎসব হবে, তা নয়, এখন বৌমাকে ভেটকি ফ্রাই খাওয়াতে হবে। দু’ ধারে বঁটি হাতে বসে মাছওয়ালা, মাছউলিরা। সামনে মাছের স্তূপ। আঁশেভরা পিচ্ছিল পথ। মেছুয়াদের ডাকের বহরে বাজার সরগরম।

প্রাণতোষকে দেখে মাছওয়ালা নাড়ু চেঁচিয়ে উঠল-
‘ইলিশ মাছের গাদা পিস করে দেব নাকি দাদা?’ এবার বর্ষায় ইলিশ হয়েছিল বটে। খিচুড়ির সঙ্গে ইলিশমাছ ভাজা খাওয়া হয়েছে বিস্তর। শীতকালের ইলিশে তেমন স্বাদ কোথায়! নাড়ুর কথা কানে না তুলে পাশ কাটিয়ে চলে গেলেন প্রাণতোষবাবু। শীতের ঋতু এখন ছোটমাছ দিয়ে ভরা। কোনোদিকে না তাকিয়ে তিনি ভেটকি মাছের দিকে এগিয়ে গেলেন।
–‘কই হে নিমাই, দাও তো ভেটকি ফিলেট করে। কিলোখানেক। ফ্রাই হবে।’
নিমাই সামান্য হেসে বলল ‘দেশি ভেটকি নিয়ে যান দাদা। ঝোল করে খাবেন।’ এক মুহূর্ত ভাবলেন প্রাণতোষ। তারপর মাথা নেড়ে বললেন, — ‘ না- হে, ফিলেটই দাও।’ নিমাই ভেটকির ফিলে কাটছিল। প্রাণতোষ থলে ধরে অপেক্ষা করতে লাগলেন।

মুরগির বাজারের দিকে পা বাড়ালেন প্রাণতোষবাবু। গা-টা গুলিয়ে উঠল। প্রাণতোষের চোখের সামনেই মুরগিগুলোর পালক খসিয়ে ছাল ছাড়িয়ে মড়াৎ করে ঘাড় মটকে এক এক করে ওদের ফেলে রাখছিল সামনে। বাতাস ভরে উঠছিল ওদের নিরুপায় কান্নায়। এ দৃশ্য চোখে দেখা যায় না। তার চেয়ে লিসিয়াস এর দোকান থেকে প্যাকেটে ভরা চিকেন পিস নিলেই ভালো হত। এ হত্যাদৃশ্য দেখতে হত না। প্রয়োজন মতো মুরগি কিনে টাকা বের করে দাম মিটিয়ে দিলেন প্রাণতোষ। দেরি করা চলবে না। মুরগি আর ভেটকি বাড়ি পৌঁছালে মা আর মেয়ে রান্নায় হাত দেবে। রান্না আর কী! চিকেন পিসে মশলা মাখিয়ে সঙ্গীতা ওটিজিতে রোস্ট বানাবে আর সুলতা বানাবে ভেটকি বাটার ফ্রাই। ঘর থেকে বেরনোর আগে দেখে এসেছেন প্রাণতোষ, মা আর মেয়ে মিলে একটা চকোলেট কেক বানাতে হিমসিম খাচ্ছে। কাল থেকে দুজন ব্যস্ত নতুন রেসিপি নিয়ে। গ্রীন পিজ পোলাও, চিকেন মাশরুম স্যুপ, মালাই কোফতা, চিকেন রোস্ট, ফ্রুটস স্যালাড আর সুইট ডিশ।

প্রাণতোষবাবু সবজিবাজারের পাশ দিয়ে যেতে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। আহা! চোখ আর মন জুড়িয়ে যাচ্ছে। নটে শাক, সরষে শাক আর পালংশাকের ঘন সবুজ কান্তির দিকে লোভনীয় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন কয়েক সেকেন্ড। শাক আর সবজির বর্ণময় জগতে ডুবে যেতে যেতে তিনি মনস্থির করে ফেললেন। না:! সুলতাকে ভয় পেলে চলবে না। সুলতার বারণ সত্ত্বেও থলে ভরে তিনি নিয়ে যাবেন শাক আর সবজি। প্রাণতোষবাবুকে দেখে সবজিওয়ালারা নড়েচড়ে বসল — ‘এই যে দাদা, আজ এদিকে মোটেও আসেননি। নিয়ে যান পালংশাক। কেমন নধর আর তাজা দেখেছেন তো।’
প্রাণতোষ কিছু বলার আগেই শ্যামলা বৌটি দাড়িপাল্লায় তুলে দিয়েছে কয়েক গোছা পালংশাক। নরম ভেজা পাতাগুলো শীতের সকালে ঝলমল করছে। প্রাণতোষবাবু বৌটির হাতের দাড়িপাল্লার দিকে মুগ্ধদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। পালংশাক কিনে থলেতে ভরে তিনি কিনলেন মাঝারি সাইজের কচি বেগুন, একফালি কুমড়ো, মুলো আর আধাকিলো আলু। পালংশাকের পাতাগুলো থলের থেকে মুখ বাড়িয়ে দুলতে লাগল প্রাণতোষবাবুর হাঁটার ছন্দে তাল মিলিয়ে।
প্রাণতোষবাবুর ফিরতে দেরি হচ্ছে বলে সুলতা আর সঙ্গীতা ঘর বাইরে করছিল। থলের ভিতর থেকে মাথা বের করে থাকা পালংশাকের সবুজ পাতাগুলো চোখে পড়তেই তেড়ে উঠল সুলতা। -‘তোমার সাহস তো কম নয়। পইপই করে বলে দিলাম না আজ শাকসবজি নিয়ে ঘরে না ঢুকতে। কথা শুনলে না যে বড়? আর এদিকে দেরি হয়ে গেল। আয় মামন, আমরা তাড়াতাড়ি হাত লাগাই। তোর বাবার সঙ্গে পরে বোঝাপড়া করব।’
সঙ্গীতাও বিরক্তির দৃষ্টিতে তাকালো প্রাণতোষবাবুর দিকে। ধমকের সুরে বলল –‘ আজকের দিনটা এসব না আনলেই পারতে বাবা। আজ কিন্তু কোনো শাকসবজি হবে না বলে দিলাম।’
–‘ আলবাত হবে।’ প্রাণতোষের পৌরুষ গর্জে উঠল। ‘ বিদেশি বৌ আসবে বলে কি দেশি খাবার ত্যাগ করব? আর কিছু না হোক, আজ আমি পালংয়ের চচ্চড়ি খাবোই খাব। সরষে কাঁচালঙ্কা বাটা আর বড়ি দিয়ে জম্পেশ করে চচ্চড়িটা বানাবে তোর মা। সঙ্গে দেবে কুমড়ো, মুলো বেগুন আর আলু। কোনো কথা আমি শুনছি না।’ রাগে গজগজ করতে করতে তিনি বাজারের থলে দুটো ঠক করে রান্নাঘরের মেঝেতে নামিয়ে রাখলেন। এক ঘন্টার মধ্যেই মা আর মেয়ে বাকি রান্না নামিয়ে ফেলল। মেম বৌ আসবে বলে কী আদিখ্যেতাই যে শুরু করেছে ওরা। কবের থেকে ঘর পরিষ্কারের পালা চলছে। বাথরুমের মেঝে ঘষে ঘষে ঝকঝকে করেছে। কমোড আর বেসিন অ্যাসিড দিয়ে পরিষ্কার করেছে। এক কাঁড়ি টাকা খরচ করে সমস্ত জানালায় নেট লাগানো হয়েছে। সাহেব বাচ্চারা আবার মশার কামড় খেতে জানে না। ধুলো- বালি ঢাকতে সারাঘর কার্পেট দিয়ে মুড়ে ফেললে ভালো হত। ভাগ্যিস, শীতকাল। নাহলে হয়তো এসিও লাগাতে হত। এত কান্ডের পর ছেলে কিনা কাল জানিয়েছে এখানে ওরা একবেলাই থাকবে। এখানে থাকলে বাচ্চাদের ডাস্ট অ্যালার্জির সম্ভাবনা। হোটেলে তো বিদেশের মতোই সব ব্যবস্থা। তাই ওখানে থেকেই ক্যালকাটা দেখবে ওরা।

সুস্বাদু নানা খাবারের গন্ধে শীতের বাতাস ম-ম করছে। রান্নাঘর থেকে পাঁচফোড়ন আর শুকনো লঙ্কার গন্ধ ভেসে আসছে। তাহলে সুলতা পালংয়ের চচ্চড়ি বানাচ্ছে। প্রাণতোষ খুশি হলেন মনে মনে।
সমীর যখন আমেরিকায় চাকরি করতে গেল তখন কি প্রাণতোষ ভেবেছিলেন, ছেলে আর এ দেশে ফিরবে না? ওদেশের মেয়ে বিয়ে করে ওখানেই পাকাপাকিভাবে থাকার ব্যবস্থা করে নিল সমীর। কি করে ঐ অচেনা শহর ওদের দেশ হয়ে যায়! প্রাণতোষের মৃত্যুর পর তাঁর বংশধর হিসেবে সমীরের ছেলে কিংবা তার ছেলেমেয়েদের কি কোনো অস্তিত্ব থাকবে? দে নো নাথিং এবাউট বেঙ্গল। আমেরিকার চটক দেখে গরীব মাতৃভূমিকে ভুলে গেল সমীর। না, এ প্রাণতোষেরই দোষ। তখনই শক্ত হাতে হাল ধরা উচিত ছিল। বেশি লোভ করেছিলেন। ভেবেছিলেন অনেক ডলার কামিয়ে ছেলে দেশে ফিরে আসবে। প্রাণতোষের চোখে জল চলে এল। ধুতির খুঁট দিয়ে সন্তর্পণে চোখ মুছে নিলেন তিনি।

একটা ক্যাব এসে দাঁড়াল বাড়ির সামনে। হৈ- হৈ করে নেমে পড়ল নীল চোখের ক্যাটরিনা আর বাদামি চোখের সিড আর অ্যাডি। পিছনে মাথা নিচু করে সমীর। ছেলেটা বেশ রোগা হয়ে গেছে। সুলতা আর সঙ্গীতা গাড়ির আওয়াজ শুনে দৌড়ে বেরলো ঘর থেকে। প্রাণতোষ দেখলেন ওদের বাড়ির সামনে একটা ছোটখাটো ভিড় জমে গেছে। তিনি স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। জিনস্ আর টপ পরা সামনের তরুণী মেয়েটি যে প্রাণতোষের বৌমা আর সাহেবের মতো টকটকে ফর্সা বাচ্চা দুটো যে তাঁরই বংশধর তা বিশ্বাস করতে প্রাণতোষের বেশ সময় লেগে গেল। সঙ্গীতা এগিয়ে এলো ওদের আপ্যায়ন করতে। –‘কাম ক্যাটরিন, ওয়েলকাম হোম।’ কেমন নির্দ্বিধায় ক্যাটরিনার হাত ধরে টেনে আনল সঙ্গীতা। তারপর বাচ্চা দুটোকে জড়িয়েও ধরল। একসময় মেয়েটাকে কোলেও তুলে নিল। সুলতারও কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। আশ্চর্য! এ কি সেই সুলতা! সমীর মেম বিয়ে করেছে বলে যে কান্নাকাটি করে ভাসিয়েছিল আর প্রতিজ্ঞা করেছিল ছেলের মুখ কোনোদিন দেখবেন না। তাহলে কি সময়ের পলি পড়ে যায় সব ক্রোধ, ক্ষোভ আর বেদনার উপর! সুলতা ছেলের হাত ধরে সোজা ঢুকে গেল ভিতরে। ওদের সঙ্গে কিন্তু কোনো মালপত্র নেই। তার মানে মালপত্র হোটেলে রেখে শুধু বুড়ি ছুঁতে ওরা এসেছে এ বাড়ি। অভিমানে প্রাণতোষের দু’ চোখে জল চলে এলো। তিনি নিজের ঘরে সেঁধিয়ে গেলেন।

সমীর ঘরে ঢুকে যখন প্রাণতোষের পা ছুঁলো, তখন তার সম্বিত ফিরে এলো।
–‘কেমন আছ বাবা? এসো না এই ঘরে। সকলের সঙ্গে কথা বল। মা আর মামন তো দিব্যি ওদের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে।’
–‘হ্যোয়ার ইজ আওয়ার গ্র্যান্ড পা? হ্যোয়ার ইজ হি?’ বলতে বলতে বাচ্চা দুটো ঘরে ঢুকেছে। অবাক হয়ে ওরা দেখছে প্রাণতোষকে। যেন কোনও প্রাগৈতিহাসিক জীব দেখছে ওরা। শুধু প্রাণতোষকে নয় — দেখছে ঘরের পুরানো আসবাব, রঙজ্বলা দেয়াল, বিবর্ণ পর্দা। ক্যাটরিনা নামের মেয়েটাও ঘরে ঢুকে সমীরের কথামতো পা ছুঁয়ে প্রাণতোষকে প্রণাম করল। তারপর মিষ্টি হেসে বলল –‘প্লিজ, কাম ড্যাডি। লেটস হ্যাভ লাঞ্চ।’
সুলতা আর সঙ্গীতা ততক্ষণে ডাইনিং টেবিল সাজিয়ে ফেলেছে। চকচকে কতগুলো চামচও জোগাড় করে ফেলেছে। কায়দাকানুনগুলো ভালোই রপ্ত করেছে মা আর মেয়ে। প্রাণতোষ অনিচ্ছাসত্ত্বেও এসে বসলেন ওদের সঙ্গে ডাইনিং টেবিলে।
–হোয়াট এ গ্রেট সাপার! মম অ্যাণ্ড সাংগীটা, এ বিগ থ্যাঙ্কিউ ফর এভরিথিং। ‘
ক্যাটরিনা উচ্ছল ভঙ্গিতে দুলে দুলে খাচ্ছে, এনজয় করছে। তা দেখে মা আর মেয়ের চোখমুখ থেকে আলো ঠিকরে পড়ছে। বাচ্চা দুটো খাবার ফেলছে, ছড়াচ্ছে। সমীর শুধু মাথা নিচু করে একমনে খেয়ে যাচ্ছে। মাথা তুলে একবার বলল, ‘ বাবাকেও খাবার দিয়ে দাও না মা।’ প্রাণতোষের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙছিল ধীরে ধীরে। তিনি একটু জোর দিয়ে বললেন, — ‘ আমাকে একটু ভাত দিয়ো। সঙ্গে পালংয়ের চচ্চড়ি। আমি এসব খাব না।’
সুলতা আর সঙ্গীতা মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। ওদের মুখ থমথম করছে রাগে। সুলতা একবার অগ্নিদৃষ্টি ছুঁড়ল প্রাণতোষের দিকে। ক্যাটরিনা একবার ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলল –‘হোয়াট ইজ দ্যাট ড্যাড ওয়ান্টস? হোয়াট ইজ পালং? হোয়াট ইজ চনচড়ি?’
ক্যাটরিনার কথা হাঁ করে গিলছিল বাচ্চাগুলো। কিছু না বুঝেই মিষ্টিসুরে বলে উঠল –‘হোয়াত ইজ পালং? হোয়াত ইজ চনচড়ি?’
সঙ্গীতা অপ্রস্তুত হলেও ব্যাপারটা সামলে নিয়ে বলল –‘ইট ইজ এ বেঙ্গলি প্রিপারেশন, অ্যান এথনিক ডিশ। ড্যাড’ স ফেভারিট। বাট ইট ইজ নট ডান অ্যাজ ইয়েট।’ সঙ্গীতা প্রাণতোষের দিকে তাকিয়ে চোখ দিয়ে ইশারা করল।
সুলতা আর সঙ্গীতাও বসে পড়ল ওদের সঙ্গে। অগত্যা মুখ চুন করে প্রাণতোষকেও বসতে হল। খেতে হল সাহেবি খানা।
কিছুক্ষণের ঝড় বইয়ে ওরা চলে গেল। প্রাণতোষের মনে হল ওদের সকলকে বিদেশী গন্ধ শুঁকিয়ে গেল সমীর। ওদের দেয়া দামী উপহারগুলো পড়েছিল বিছানায়। মা আর মেয়ে কেমন নির্বিকারভাবে প্যাকেট খুলে আদেখলার মতো দেখছে বিদেশী জিনিসগুলো। যেন কিছুই হয়নি। কিছুই আসে যায় না। ওর একমাত্র ছেলেটার ভুল সুলতা বুঝতে না পারলেও প্রাণতোষ বোঝেন ছেলেটার রক্তে এখন আর এ দেশটা নেই। মাটির গন্ধও নেই। তিনি একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপিচুপি রান্নাঘরে ঢুকলেন। গ্যাস উনোনে কড়াইয়ের মধ্যে পালং য়ের চচ্চড়ি রাখা ছিল। তার থেকে খানিকটা বেড়ে নিলেন একটা বাটিতে। তারপর পিঁড়ি পেতে আরাম করে বসে তারিয়ে তারিয়ে খেতে লাগলেন। তাঁর কানে তখন ভেসে আসছে দুটো রিনরিনে স্বর — ‘ হোয়াত ইজ পালং? হোয়াত ইজ চনচড়ি?’ প্রাণতোষ হাত চাটতে চাটতে হো- হো করে হেসে উঠলেন। তারপর নাতি নাতনির উদ্দেশে বললেন –‘মাই চাইল্ড। দিস প্রিপারেশন ইজ কলড হচ্ পচ্ কারি।’

[লেখকের পূর্ব রচনা]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x