শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

জে বি এস হ্যালডেন : ভারতের দিনগুলি

(প্রাক-কথন : এই প্রবন্ধটি লিখেছিলাম ঠিক ছয় বছর আগে। আর একটি Web Magazine-এর জন্য। সেটা ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। তার পরেই করোনাকালের গ্রহণের ছায়ায় দীর্ঘদিনের জন্য ঢেকে গিয়েছিল আমাদের চেনা পৃথিবী। নানা সমস্যায় পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়, আমার এই লেখাও তাই অপ্রকাশিত থেকে গিয়েছিল। খুব সীমাবদ্ধ বিদ্যা নিয়ে কেন JBS Haldane-কে নিয়ে লিখতে আগ্রহী হয়েছিলাম, তার কোনো নির্দিষ্ট উত্তর নেই। তবে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় সাহিত্য, শিল্প বা রাজনীতি নিয়ে যত লেখা প্রকাশিত হয়, বিজ্ঞান বা বিজ্ঞানীদের সম্বন্ধে লেখা তার তুলনায় অতি সামান্য। Science City-র সন্নিকটে E. M. Bypass এর একটি অংশ এখন Haldane-এর নামাঙ্কিত। কিন্তু আজকের দিনে কজন শিক্ষিত বাঙালি জানেন তাঁর পরিচয়, অথবা এদেশের সঙ্গে এই প্রতিভাবান বিজ্ঞানীর নিবিড় সম্পর্কের কথা? এমন নানা এলোমেলো ভাবনা থেকেই হয়তো লেখাটির সূত্রপাত।
… আজ সেই ছ ‘বছর আগেকার ফাল্গুন চৈত্রের ঝিমধরা দুপুরবেলা মনে পড়ছে। সেই ভরা বসন্তে হঠাৎ নেমে আসা বিরতি, মুখোশে ঢাকা বিপন্ন দিনরাত্রি। এতকাল পরে পুরানো লেখাটি কিঞ্চিৎ পরিমার্জিত করে “রবিচক্র”র জন্য দিলাম।)

১৯৫৭ সাল। ব্রিটিশ সরকারের অন্যায় ও সাম্রাজ্যবাদী নীতির প্রতিবাদে ব্রিটেন থেকে সস্ত্রীক স্থায়ীভাবে ভারতে চলে আসার সিদ্ধান্ত নিলেন এক বিদেশি বিজ্ঞানী। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার কাজ থেকে অবসর নিতে তাঁর তখন অল্প দু’এক বছর বাকি। জীববিজ্ঞানের গবেষণায় সে সময়ে তাঁর খ্যাতি বিশ্বজোড়া। কয়েক বছর পরে তিনি ভারতীয় নাগরিকত্ব নিলেন, স্বেচ্ছায় গ্রহণ করলেন ভারতের বেশভূষা। এমন একজন বিজ্ঞানীকে সসম্মানে কলকাতার ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিকাল ইনস্টিটিউটে আমন্ত্রণ জানালেন বিখ্যাত সেই প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ।

JBS Halden & P. C. Mahalanbish


জে বি এস হ্যালডেন ( JBS Haldane )। আজ বিজ্ঞান জগতের বাইরে অনেকেই এই নামটি ভুলে গেছেন। এক অভিজাত স্কটিশ পরিবারে তাঁর জন্ম ১৮৯২ সালের ৫ই নভেম্বর। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে ও Classics-এ ট্রাইপস পরীক্ষায় সগৌরবে উত্তীর্ণ। জ্বলন্ত অগ্নিশিখার মতো তাঁর প্রতিভা, তাতে শুধু উজ্জ্বল দীপ্তি নয়, গনগনে আঁচের সমতুল্য একটি উত্তাপ ছিল। মেধা ও তীক্ষ্ম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে মিশেছিল সত্যান্বেষণের অদম্য আগ্রহ, কঠোর আদর্শবাদ ও চরিত্রের অনমনীয় ঋজুতা। ছাত্রজীবনের শেষে ক্রমশঃ আকৃষ্ট হলেন জীববিজ্ঞান ও প্রজনন বিদ্যার (genetics) গবেষণায়। যদিও বিজ্ঞানের এমন কোনো শাখা নেই যাতে তাঁর অপরিসীম অধিকার ছিল না। এবং প্রত্যেকটি শাখা যে পরস্পরের সঙ্গে সম্পৃক্ত, একথা দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করতেন। প্রজনন বিদ্যার গবেষণায় সংখ্যাতত্ত্বের সফল প্রয়োগ ঘটালেন তিনি। তাই হ্যালডেনের আক্ষেপ ছিল যে জীববিজ্ঞানের ছাত্ররা গণিতের তত্ত্বের সঙ্গে যথেষ্ট পরিচিত নয়। নিশ্চয়ই তাঁর মনে হয়েছিল, এই দু’ ধরনের জ্ঞানের সমন্বয় ঘটালে তবেই তাদের গবেষণার মান যথার্থ উন্নত হওয়া সম্ভব।

সংখ্যাগত দিক থেকে কোনো বিষয়কে জানা ও পর্যবেক্ষণ বিজ্ঞান শিক্ষার সবচেয়ে জরুরি দিক। হ্যালডেন চেয়েছেন, বরানগরে স্ট্যাটিসটিক্যাল ইনস্টিটিউটের তরুচ্ছায়ায় ঢাকা বিশাল প্রাঙ্গণে কী ধরণের কতগুলি বনস্পতি, লতাপাতা, ঝোপঝাড় আছে, ছাত্রছাত্রীরা তার সঠিক গণনা করুক। এমন একটি আনুমানিক হিসেব তিনি নিজেই এক সময়ে করেছিলেন। তাঁর কাছে এ কাজ তুচ্ছ নয়, সময়ের বৃথা অপব্যয়ও নয়। কারণ পারিপার্শ্বিক সম্বন্ধে স্পষ্ট ধারণা ছাড়া বিজ্ঞান শিক্ষাকে তিনি অর্থহীন বলে জানতেন।

হ্যালডেনের রাজনৈতিক মতবাদ ছিল স্পষ্ট ও সোচ্চার। সাম্যবাদী চিন্তায় অগাধ বিশ্বাস রেখেছেন আজীবন। সমাজের পরিবর্তন ও কল্যাণের জন্য বিজ্ঞানকে একান্ত আবশ্যক বলে মনে করতেন গত শতকের যে ক’জন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী, তাঁদের অন্যতম ছিলেন হ্যালডেন। ব্রিটেনের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হয়েছিলেন, এক সময়ে ছেড়েও দিয়েছেন বীতশ্রদ্ধ হয়ে। কিন্তু মূল আদর্শের প্রতি অবিচল থেকেছেন চিরদিন।

হ্যালডেনের ভারতে আসার পিছনে একাধিক কারণ ছিল। তিনি মনে করতেন, এদেশের প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য তাঁর কাজকর্মের সহায়ক হবে। এখানকার উষ্ণ জলবায়ু বিদেশি হয়েও তাঁর কাছে উপভোগ্য ছিল। অন্য কারণটি কিছুটা রাজনৈতিক। জওহরলাল নেহেরুর নেতৃত্বে সদ্য স্বাধীন ভারত তখন একটি প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক সমাজের স্বপ্ন দেখছে; তার বৈদেশিক নীতিও নিরপেক্ষ ও শান্তিকামী। মুক্তচিন্তার এই মধুর পরিবেশে স্বচ্ছন্দ ভাবে বাকি জীবন কাটাবেন, আশা করেছিলেন হ্যালডেন।
তাঁর সে আশা একেবারে ব্যর্থ হয় নি। স্ট্যাটিসটিকাল ইনস্টিটিউটে তখন নিয়মিত আসতেন বহু প্রসিদ্ধ বিজ্ঞানী ও মনীষী। তাঁদের মতবিনিময়ে সমৃদ্ধ হত প্রতিষ্ঠানের গবেষণা। হ্যালডেনের প্রভাবশালী উপস্থিতিতে আই এস আই নতুন করে প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠল। প্রজনন বিদ্যা ছাড়াও বিজ্ঞানের আরও বহু বিষয়ে গবেষণার জন্য নতুন বিভাগ খোলা হল তাঁরই আগ্রহে। ছাত্রদের প্রকৃতি পর্যবেক্ষণে উৎসাহ দিতেন। বিজ্ঞানের ফলিত ও তাত্ত্বিক-দু’দিকেই সমান পারঙ্গম ছিলেন এবং দিনের অধিকাংশ সময় কাটাতেন ল্যাবরেটরিতে। ইনস্টিটিউটের B.Stat এবং M.Stat পরীক্ষার পাঠ্যসূচি তিনি প্রণয়ন করেন অধ্যাপক মহলানবিশের সঙ্গে যৌথভাবে। এই পাঠক্রম যে আজ দেশে বিদেশে উচ্চ প্রশংসিত, তা হয়তো অনেকেই জানেন।

Haldane-JBS-lecturing.


কিন্তু গবেষণাগারের বাইরেও যে বিজ্ঞানীর একটি ভূমিকা আছে, সে সম্বন্ধে তীব্রভাবে সচেতন ছিলেন হ্যালডেন। জনসাধারণকে সহজ ভাষায় বিজ্ঞানের মৌলিক সত্য ও তথ্য সম্বন্ধে অবহিত করা এবং তাঁদের মধ্যে বিজ্ঞান চেতনার সঞ্চার করা তিনি নিজের মহৎ কর্তব্য বলে মনে করতেন। এই উপলক্ষ্যে তিনি অজস্র সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধ লিখেছেন ও ভাষণ দিয়েছেন। সেসব প্রবন্ধে তাঁর গভীর জ্ঞান ও অনবদ্য রসবোধের পরিচয় রয়ে গেছে।

বিজ্ঞানকে সমাজকল্যাণের কাজে প্রয়োগ করলে যে তার বিশুদ্ধতা নষ্ট হয়, এই ধারণার মূর্ত প্রতিবাদ ছিলেন হ্যালডেন। তাঁর বৈজ্ঞানিক প্রতিভার সঙ্গে মিশেছিল প্রখর সামাজিক বিবেক, যার জন্য আমরা তাঁর কাছে ঋণী। আজকের দিনে অবশ্য সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার ধারণা প্রায় অচল হয়ে এসেছে। আত্মকেন্দ্রিক, সমাজবিমুখ মননশীলতার পর্ব পেরিয়ে যদি আবার সভ্যতার অন্য অধ্যায় আসে, তাহলে হয়তো সামাজিক দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার নতুন মূল্যায়ন সম্ভব হবে।

স্বভাবে হ্যালডেন ছিলেন বড় একরোখা প্রকৃতির। আই.এস.আই তে তাঁর স্বেচ্ছাচারিতা মাঝে মাঝে খামখেয়ালির পর্যায়ে পৌঁছত। কখনো কলকাতায় নিজের বাসস্থানের গৃহসজ্জা সম্বন্ধে খুঁতখুঁত করতেন, বা কোথাও যাতায়াতের সময়ে তাঁর সঙ্গীর খরচ দাবি করে বসতেন ইনস্টিটিউটের কাছে। এমন ব্যবহারে ক্রমশ অতিষ্ঠ হয়ে উঠছিলেন অধ্যাপক মহলানবিশ। ১৯৬১ সালে সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রীর ইনস্টিটিউট পরিদর্শনে আসা নিয়ে দুজনের মধ্যে স্থায়ী মনোমালিন্য দেখা দিল। কলকাতা ছেড়ে চলে গেলেন হ্যালডেন।

আই এস আই এর সঙ্গে বিচ্ছেদ হ্যালডেনের জীবনে একটি করুণ অধ্যায়। ভারতে আসার পরে এখানেই কাটিয়েছিলেন তাঁর শ্রেষ্ঠ সময়টি। এর পরে উড়িষ্যার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর আমন্ত্রণে তিনি চলে যান ভুবনেশ্বরে, একটি নতুন গবেষণা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে।

১৯৬৪ সালের ১ লা ডিসেম্বর কর্কট রোগে হ্যালডেনের মৃত্যু হয়। তাঁর চরিত্রের প্রবল পৌরুষে ভাবপ্রবণতার লেশমাত্র ছিল না। নিদারুণ রোগযন্ত্রণা অগ্রাহ্য করে তিনি পরিহাস ছলে একটি কবিতায় লেখেন –
“My final word, before I’m done,
Is “Cancer can be rather fun “.
Provided one confronts the tumour
With a sufficient sense of humour…
I know that cancer often kills,
But so do cars and sleeping pills;
And it can hurt one till one sweats,
So can bad teeth and unpaid debts.
A spot of laughter, I am sure,
Often accelerates one’s cure.”

সেরে ওঠা অবশ্য আর হয়নি তাঁর। কিন্তু অতুলনীয় কৌতুকবোধে সমৃদ্ধ এই কবিতাটি বিখ্যাত হয়ে আছে সঙ্গত কারণেই।

এমন মনোভাবের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই মরণোত্তর দেহদানের অঙ্গীকার করে যান তিনি। প্রতিষ্ঠিত বিশ্বাসকে প্রশ্ন ও যাচাই করে নেওয়াই যে বিজ্ঞানচর্চার গোড়ার কথা, হ্যালডেন নিজের জীবনে তার প্রমাণ রেখে গেছেন। বিজ্ঞানকে তিনি একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে চেয়েছিলেন। তার জন্য এমন অনেক ঝুঁকি ও দুঃসাহসিক জীবনযাপনকে মেনে নিয়েছিলেন যা আমাদের নিশ্চিন্ত, সতর্ক মনোভাবে আমরা কল্পনা করতে পারি না। দীর্ঘকালের নিবিষ্ট ও সত্যনিষ্ঠ জ্ঞানসাধনার পরে তিনি নিজের যে উপলব্ধির কথা লিখে গেছেন তা আজকের দিনে বিশেষ ভাবে স্মরণীয়- “Our only hope of understanding the universe is to look at it from as many different points of view as possible…Now, my own suspicion is that the universe is not only queerer than we suppose, but queerer than we can suppose.”

আমাদের দেশের পক্ষে অত্যন্ত গৌরবের কথা, যে বরণীয় এই বিজ্ঞানী তাঁর শেষ পর্যায়ের কর্মক্ষেত্র হিসেবে নির্বাচন করেন ভারতবর্ষকে।

[লেখকের অন্য রচনা]

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x