
সুশোভন সরকার তাঁর এক মনোগ্রাহী স্মৃতিচারণে লিখেছিলেন – “ইতিমধ্যে আমি বার বার শান্তিনিকেতনে যেতে আরম্ভ করি। সেখানে তখন বাড়িতে বাড়িতে, রাস্তাঘাটে রবীন্দ্রসংগীত ধ্বনিত হচ্ছে। সেই সংগীতরসে আমার মন ডুবে যেত।” পুরনো দিনের শান্তিনিকেতনের এই বর্ণনা আমাকে মুগ্ধ করেছিল। কিন্তু ১৯৮৩-৮৪ সালে আমি যখন নিতান্ত ছেলেবেলায় শান্তিনিকেতনে যেতে শুরু করি, সে সময়ে বা তারপরে সেখানে কোনো উৎসব বা অনুষ্ঠান ছাড়া খোলা গলায় কাউকে রবীন্দ্রনাথের গান গাইতে শুনিনি। পরে নিজের মনে ভেবেছি, সুশোভন সরকারের দেখা সেই শান্তিনিকেতনের পরিবেশ কবে থেকে এমন বদলে গেল?
আসলে রবীন্দ্রনাথের সমকালের আবহ ও রুচিবোধ থেকে আমরা সরে এসেছি অনেকখানি। রবীন্দ্রজীবনীকার ও প্রসিদ্ধ সমালোচক E.J Thompson কতদিন আগেই বলেছিলেন “To the new India that is coming much of his work will make little appeal, it will seem luxurious and lacking in strength and power, much of it enervating and effeminate and trivial after the terrible years through which the nations have lived.” মানুষের মনে মূল্যবোধের এই পরিবর্তন শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রবল ভাঙাগড়া থেকেই। তবে মোটামুটি আশির দশক পর্যন্ত তার গতি ছিল ধীর, উদ্দাম নয়। বিশেষ করে বাঙালি জীবনে রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে গৌরববোধের অবশেষ তখনও রয়ে গিয়েছিল। কবির সংস্পর্শে এসেছেন এমন অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি তখনও জীবিত ছিলেন। রবীন্দ্রসংগীতের নিবিষ্ট শ্রোতা বা তাঁর কাব্যের নিবিষ্ট পাঠকেরও অভাব ছিল না।

দৃশ্যটি ধীরে ধীরে বদলে যায় এই শতকের প্রথম দিক থেকেই। এখন মুষ্টিমেয় কিছু অনুরাগী ও পণ্ডিত মানুষের রবীন্দ্রচর্চার বাইরে, রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে সাধারণ মানুষের অবহেলা বা অনাগ্রহ খুব স্পষ্ট। তাঁর রচিত সাহিত্যের তুলনায় সাম্প্রতিক কালের কবিতা ও গল্পের জনপ্রিয়তা অনেক বেশি। এই প্রজন্মের পাঠকরা রবীন্দ্রনাথের নিজের লেখা থেকে তাঁকে যতটা জেনেছে, তার চেয়ে বেশি জেনেছে সাম্প্রতিক কালের কবি ও লেখকদের রচনা থেকে। সব মিলিয়ে বলা যেতে পারে, বর্তমান প্রজন্মের বাস্তবতার জগতে রবীন্দ্রনাথের প্রত্যক্ষ উপস্থিতি খুবই কম ।
তবে কি রবীন্দ্রনাথ অনাধুনিক ছিলেন? টমসন সাহেব যে আশঙ্কা ব্যক্ত করেছিলেন, সেটাই কি সত্যি ছিল তবে ? তা তো হবার কথা নয়, কারণ তিনি যে বিশ্বে বন্দিত হয়েছেন, তার একটা বড় কারণ তাঁর দূরদর্শিতা ও প্রাসঙ্গিকতা। যে মুক্তচিন্তার পরিসর আজ ক্রমশ সংকীর্ণ হয়ে আসছে, তার প্রতিবাদে আজ থেকে একশো বছর আগে তিনি লিখেছেন ‘অচলায়তন’ নাটক । যখন প্রকৃতি ও পরিবেশে আজকের মতো সংকট ঘনিয়ে আসেনি, তখন তিনি যে শুধু গানে ও কাব্যে শ্যামল প্রকৃতিকে আবাহন করেছেন তা নয়, গাছপালার নিবিড় ছায়ায় ছাত্রদের শিক্ষা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন। নারীবাদ সংক্রান্ত আন্দোলন সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ার অনেক আগেই তিনি লিখেছেন “স্ত্রীর পত্র”র মতো ছোটগল্প। তাহলে তাঁর ভাব, ভাষা ও অনুভূতির সঙ্গে একালের বিচ্ছেদের কারণটি ভেবে দেখার মতো।
রবীন্দ্রনাথের মনোবীক্ষণে যদিও ভবিষ্যতের অনেক কিছুই নিখুঁত ভাবে ধরা পড়েছিল, একবিংশ শতকের পৃথিবীতে কিছু অস্বাভাবিক পরিবর্তন বোধহয় তাঁর পক্ষেও ধারণা করা সম্ভব হয়নি। মুক্ত অর্থনীতি নামে এক বিচিত্র আর্থিক ব্যবস্থার ফলে আজ’ যা কিছু সব ব্যক্তিগত’ সবই ‘নিয়ন আলোয় পণ্য’ হয়ে গেছে এবং বৈষয়িক চিন্তায় লিপ্ত থেকে মানুষ স্বাধীন চিন্তার ইচ্ছা এবং অবকাশ দুটোই হারিয়েছে। এই অবকাশ এমন এক জিনিষ যার অভাবে রবীন্দ্রনাথের লেখাকে বোঝা বা ভালোবাসা খুবই শক্ত কাজ। তাঁর রচনা অধ্যয়নের জন্য প্রয়োজন গভীর অভিনিবেশ, যে কোনো ধ্রুপদী সৃষ্টির মতোই এ সাহিত্য কেবল বিনোদন বা তাড়াহুড়ো করে পড়ার জন্য নয় ।

তীব্র তাপপ্রবাহে ঊষর পৃথিবী – যেখানে মেরুপ্রদেশের বরফ গলে যাচ্ছে ক্রমশঃ, যেখানে মানুষের বুদ্ধির বিকল্প খোঁজা শুরু হয়ে গেছে Artificial Intelligence-এ – সেই অস্তিত্বের সংকটে বিপন্ন ধরাতলকে কি কখনো কল্পনায় দেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ? জানা নেই। তাহলে বর্তমান সময় তাঁর মায়াময় কাব্য ও সঙ্গীতকে, আস্তিক্যের ও প্রত্যয়ের আভায় আলোকিত জীবনদর্শনকে কেন এত মূল্য দেবে, আজ এটাই বড় প্রশ্ন।
রবীন্দ্র সাহিত্যের ললিত লাবণ্য, তার রুচির সূক্ষ্মতাই সম্ভবতঃ এ’যুগের সঙ্গে তাঁর দূরত্বের একটা বড় কারণ। তা যদি হয় তবে তাঁকে আরো ভালো ভাবে জানার জন্য আমাদের অতিক্রম করতে হবে সেই দূরত্বকে। মাঝে মাঝে অন্ততঃ আমাদের বিরল অবসর সময়ে সঙ্গী হোক রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও গান, অসামান্য চিঠিপত্র আর প্রবন্ধগুলি। তাঁর সমুদ্রসম প্রবন্ধ সাহিত্যের কিছু অংশ মন্থন না করলে জানা যাবে না সত্যদ্রষ্টা রবীন্দ্রনাথকে। জানা যাবে না, কবি হয়েও তিনি কত যুক্তিবাদী ও নির্মোহ হতে পারতেন। আজ দেশে, সমাজে ও পরিবেশে যে সব বিপর্যয়ের আমরা মুখোমুখি, বিরল অন্তর্দৃষ্টিতে তার অনেকখানি আভাস পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ; তার কারণ ও সমাধানের সুচিন্তিত সূত্রও তিনি রেখে গেছেন । সুস্থ সমাজ ও নির্মল প্রাকৃতিক পরিবেশ সৃষ্টির জন্য আমরা আজও সাধ্যমতো তাঁর চিন্তাকে কাজে অনুসরণ করতে পারি ।
যিনি বলেছিলেন “নেশন গড়িতে যেমন স্মৃতির দরকার, তেমনি বিস্মৃতির দরকার – নেশনকে বিচ্ছেদবিরোধের কথা যত শীঘ্র সম্ভব ভুলিতে হইবে” (ভারতবর্ষীয় সমাজ),” ভারতবর্ষের কল্যাণ যদি চাই তা হলে হিন্দুমুসলমান কেবল যে মিলিত হতে হবে তা নয়, সমকক্ষ হতে হবে। সেই সমকক্ষতা তাল- ঠোকা পালোয়ানির ব্যক্তিগত সমকক্ষতা নয়, উভয়পক্ষের সামাজিক শক্তির সমকক্ষতা” (সমস্যা, কালান্তর) , যিনি নিজে জমিদার হয়েও বলতে পারেন “জমিদারির জমি আঁকড়ে থাকতে আমার অন্তরের প্রবৃত্তি নেই। …আমি জানি জমিদার জমির জোঁক; সে প্যারাসাইট, পরাশ্রিত জীব। …প্রজারা আমাদের অন্ন জোগায় আর আমলারা আমাদের মুখে অন্ন তুলে দেয়- এর মধ্যে পৌরুষও নেই, গৌরবও নেই।” (রায়তের কথা) – তাঁকে আজ নতুন করে আবিষ্কার করার সময় এসেছে ।
E. J Thompson এর ভাষায় “He died before his country had gained her political freedom. But he himself had found his own freedom long ago” রবীন্দ্রনাথের রচনা পাঠ করলে তবেই এই উক্তির সম্পূর্ণ তাৎপর্য আমরা বুঝতে পারব।
বেশ ভালো লাগলো।
তোমার নিবন্ধটি সাগ্রহে পড়ে মনে হল এমন সুন্দর সুকুমার শিল্পসম্মত লেখার ওপর কিই বা বলার থাকতে পারে? শুধু তোমার সঙ্গে সহমত হয়ে বলতে পারি, রুচির সূক্ষ্মতায় বর্ণনার দক্ষতায় ভাষণের গৌরবে রবীন্দ্রনাথের সমগ্র সৃষ্টি যে উচ্চতাকে স্পর্শ করেছিল তা বুঝতে হলে পাঠকের মধ্যেও তার কিছু পরিমাণ গুণের আবশ্যকতা জরুরি।বর্ষার জলধারাকে জলাশয় ধরে রাখতে পারে, মরুভূমি পারেনা। রবীন্দ্রনাথ কোন এক প্রবন্ধে এমনই বলেছিলেন।