শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

ট্রেন যখন গন্তব্যে পৌঁছল তখন বেলা চারটে চল্লিশ। স্টেশনটা অনেক প্রশস্ত। ওভার ব্রিজ ধরে এগোতে এগোতে তিন নম্বর প্ল্যাটফর্মের মাথায় এসে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে চারপাশটা দূর থেকে দেখতে ইচ্ছে হল অনিমিখের। ময়ূরাক্ষী। তাঁর বাবা এই নদীটিকে খুব ভালবাসতেন। কাঁধ থেকে ব্যাগটা নামিয়ে পায়ের কাছেই রাখল। দূরে আবছা ময়ূরাক্ষী। ধবধবে সাদা বালি আর নেই। রিভার বেড জুড়ে শুধুই ক্ষত চিহ্ন। এপারে অবশ্য প্রচুর এলোমেলো বাড়িঘর, মাঝেমধ্যে ফ্ল্যাটবাড়ি। বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর মালগাড়িটা একটা ঝাঁকুনি দিয়ে নড়ে উঠল। ময়ূর এগিয়ে গেল দুই নাম্বারের দিকে।

‘আরে, ওখানেই তো ছিল বাসস্ট্যান্ড, গেল কোথায় !

উত্তর খুঁজে পেয়ে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা টোটোতে উঠল।
বাসস্ট্যান্ড এখন শহরের একেবারে পূর্ব প্রান্তরে।
কয়েকটা পুরনো মারুতি, সাদা এম্বাসেডরের চালকরা তখনও তাঁর পিছু ছাড়েনি।

‘চলুন দাদা, মাত্র এক হাজার।

ওদের হাত ছাড়িয়ে, টোটোওয়ালা হনহন করে এগোতে লাগল রেল বাজার সংলগ্ন রাস্তা ধরে।

‘ ভাই, একটু ধীরে। এখানেই তো ছিল রাধামাধব মিষ্টান্ন ভাণ্ডার।

‘ কবেই উঠে গেছে বাবু। মাধবদার মেয়ে আমেরিকায়। দেখাশোনা করার লোক কোথা ?

‘ লাস্ট বাস ক’টায়?

‘ বাস এখন নাই। আপনি বহরমপুরের বাস ধরে কোটাসুর ইস্কুল মোড় থেকে অটো পেয়ে যাবেন। আমার টোটোতে বেশি চার্জ নাই, নইলে যেতাম।

পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধ্যা নামল। দুপাশে সবুজ আলুর জমির ফাঁকে হলুদ আলোর মত সর্ষে ফুলের ছটা। আরেকটু এগিয়েই কোল্ড স্টোরেজ। পাঁচিলের ধারে ধারে আমের গাছগুলোতে বোল এসেছে। হাল্কা গন্ধ ভেসে আসছে। রাস্তার ধার ঘেঁষে একটা কুকুর ছুটে গেল। কেউ কেউ আমার দিকে এমন ভাবে তাকিয়ে থাকল যেন আমি কোনো অদ্ভুত জীব। ঠিক এরকম ভাবেই কোনো শহুরে লোকজন গ্রামে এলে ছোটবেলায় আমরা বিস্ময়ে চেয়ে থাকতাম।

‘ অটো চালক বললেন, ‘কুকুর নয়, শেয়াল।’ নদীর বালি তুলতে তুলতে সরবনও শেষ। ওরা যাবে কোথায় ? এখন নদীপারের কৃষিজমির তলা থেকে বালির স্তরের খোঁজ চলছে। লোকালয়ে হাঁস মুরগির সন্ধানে এসেছিল।

গ্রামে ঢোকার মুখেই খেজুরতলা। এখান থেকে একটা রাস্তা ডাইনে কেটে সটান মিশে গেছে ময়ূরাক্ষীর ওপর নির্মিত সদ্য সমাপ্ত তারাশঙ্কর ব্রিজে। সেই রাস্তা জুড়ে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে বিশাল বিশাল বালিবাহী লরি। একটা পুলিশের ভ্যান সামনে। কয়েকটা সিভিক পুলিশ লরি চালকদের সঙ্গে দরদাম করছে। টোটোচালক ভাই জানালেন, “পয়সা তোলা শ্যাষ হলে গাড়িগোলানকে সব রেতে ছাড়বে। লদীটোকে খাল করে ছেড়েছে, রাস্তাটোও বেশিদিন টিকবে না। চোর পুলিশ সিভিক সরকার সব একাকার।”

এক আটপৌরে করে শাড়ি পরা মহিলা কাঁখে ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে। টোটো চালক ভাইকে হেঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “বেলতলা যাবা লাকি?”

বহুদিন আগের ফেলে আসা ভাষা আজও রয়ে গেছে। জগৎ এত দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে, অথচ এখনো কিছু মানুষ তাঁদের পুরোন ভাষা আগলে টিকে আছে। আকাশে ফিরতি পাখিদের ঝাঁক। ফেলে যাওয়া ভিটেতে ঢুকতে মন চাইছে না। পুরনো জমা ধুলোবালি মেখে প্রবেশ করা এখন শেষ বেলার দায়। গলির মুখে পরপর তিনটে বাড়ি যেন নিভে যাওয়া প্রদীপের সলতে। দরজার দিকে এগোতেই ওপাশের বাড়ি থেকে কুকুরের ঘেউ ঘেউ।

‘ দ্যাখ তো কে ?

ছাদের উপর একটা ঘর। বাকিটা ফাঁকা। দোতলাটা সম্পূর্ণ করতে পারেননি। মাস্টারমশায়ের তিন ছেলে ও এক মেয়ে। গত বছর স্ত্রী মারা গেছেন, তার ঠিক একবছর আগে করোনা হয়ে মেয়ে। ফুলের মতো তাজা জ্যেষ্ঠ সন্তানের অকাল মৃত্যু তাঁর মা সহ্য করতে পারলেন না।

আজ মাস্টারমশাইকে দেখতে এসেছেন।

অনিমিখ সেন। মস্ত অফিসার। এই গ্রামের ইস্কুল থেকে এমন ছাত্র খুব কমই বেরিয়েছে। আসামের ডিগবয়ে এখন তাঁর বসবাস। দেশের বাড়ি বিক্রিবাটা করবে বলেই এসেছেন। ফেরার পথে খবরটা পেয়েই একবার দেখা করতে এসেছিলেন।

বাড়ির বাইরে খামার বাড়িতে নবান্নের ধানের পালুই বাঁধা চলছে।

‘ বুঝলে, অনি, জমিজমা আর বিশেষ তেমন নেই। মেয়ের বিয়েতে কিছু বিক্রি করে দিয়েছি, তারপর তোমার মাসিমার অসুখ বিসুখেও চলে গেছে প্রায় দেড় বিঘে মত।
বাকিটা ছেলেদের ভাগ করে দিয়েছি, নইলে ওরাই বা খাবে কি। চাকরি বাকরি তো হল না। বড়র মুদিখানা মন্দ চলে না। ছোট জীবনবীমা করে। তোমার কথা ওকে বলেছি।’ মেজোর কথা বলতে গিয়েও প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে থেমে গেলেন।

সবে উৎসবের মরশুম শেষ হয়েছে। চারিদিকে নিস্তব্ধতা।কয়েকদিন আগে পাড়ায় কার যেন জন্মদিন ছিল। বেশ ঘটা করে হল। পাড়াটা ক্রমে ক্রমে অচেনা হয়ে উঠছে। আশপাশের গাঁয়ের মানুষেরা ফাঁকা বাড়ি কিনে নিচ্ছে। এ পাড়ায় মেয়ের সংখ্যা বেশি ছিল। তাঁদের বিয়ে হয়ে যাওয়াই পাড়াটা কেমন মুষড়ে পড়েছে। ভোরবেলা গলা সাধার শব্দ পাওয়া যায় না। একটা রবীন্দ্রজয়ন্তী পর্যন্ত এখন আর হয় না। ছেলেরা চাকরি পেয়ে গ্রাম ভুলেছে। তাছাড়া ডাক্তার, ভালো ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের এখানে অভাব। সময় যখন যা দাবি করে মানুষ তো এড়াতে পারেনা। ইস্কুলের হোস্টেল বন্ধ। চারিপাশে ইস্কুলের আর অভাব নেই। ছাত্রছাত্রী টান পড়েছে। যে কটা আছে, তারাও ইংরেজি মিডিয়ামে ছুটছে। এ পাড়ার ভূগোলটা একেবারেই পাল্টে গেছে। রাস্তায় তাপ্পি জমতে জমতে পুরনো বাড়িগুলোর রোয়াক ডুবে গেছে। বিকেল বেলায় সেইসময় জোয়ান বৃদ্ধ শিশু পথ চলতি মানুষ ,কেউ না কেউ চলার পথে দুদণ্ড সুখ দুঃখ ভাগ করে নিত রোয়াকিদের সঙ্গে। এখনকার প্রজন্ম অনিমিখকে তেমন চেনে না। তাদের পরিচয় জানতে তাঁকেও ফিরতে হয় আগের মানুষদের ভিড়ে।

চেনাজনেরা হারিয়ে গেলে জায়গাটাও যেন বিস্মৃতির অতলেই তলিয়ে যেতে চায়। আবার ফিরতে চাইলে মনে বিষাদ নামে। বদলির চাকরিতে তাঁর জীবনের অর্ধেকের বেশি সময় চলে গেছে নিজের পরিচিতি তৈরিতে। বাঁধন তৈরি হতে হতেই বন্ধন মুক্তির ডাক আসা জীবনই তাঁর পাথেয়। অনিমিখের তীর্থ এখন এই বিভিন্ন ছোট বড়ো বন্ধনী । সময় সুযোগ প্রয়োজন এক লাইনে এসে গেলে সাময়িক বিরতি নেন এমনই কোথাও কোথাও। পথের টানের চেয়েও তখন মূল্যবান হয়ে যায় কিছুক্ষণের আলাপ বিলাপ।

‘ মাস্টারমশাই, জীবিত অবস্থায় বীমাতে লাভ কম। আমার বিনিয়োগ বেশি শেয়ার বাজারে।

‘ তা তো বটেই। আমি ফাটকা কারবার কোনোদিন ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। বাংলার মাস্টার তো, অঙ্ক আর হল না।

‘ আপনার মেজ ছেলে তো জাঁকিয়ে ব্যবসা করছে ?

‘ তা করছে। সে এদিকে তেমন আসে না। অনেক অভিমান আমার ওপর।

‘ কেন?

‘ ওর অভিযোগ, আমার জামাইয়ের জন্যই মেয়ে মারা গেল। ঠিকমত চিকিৎসা হয়নি। চিকিৎসকের ভুল ধরার ক্ষমতা আমার ছিল না। তাছাড়া মেয়েকে বাপের বাড়িতে এনে চিকিৎসার ভার নিতেও অপারগ ছিলাম। মেয়েটা শ্বশুরবাড়িতে অনাদর পেয়েছিল বটে কিন্তু জামাই তাঁকে পরে আলাদা করে রেখে চিকিৎসার কোনো ত্রুটি করেনি। আসলে গোড়ায় গলদ, বুঝলে অনি। বিবাহের প্রথম কয়েকটা বছরই জীবনের মধুর স্বপ্ন বোনার দিন। সেই সুতো একবার কেটে গেলে জোড়া দেওয়া খুব কঠিন। নিত্যদিনের শ্বশুর শাশুড়ির এত খোঁটা ও সহ্য করতে করতে সংসার, স্বামী সকলের থেকেই একরকম একা হয়ে গেছিল। স্বামী ওঁর অপমানে চুপ থেকেছে, এমনকি আমরাও। যখন স্বামীর ভুল ভাঙল তখন মেয়ে একাকীত্বের চাপে রোগ জর্জরিত। মেয়ের সংসারে তাঁর বাপ মায়ের নাক গলানো নাকি অশান্তি বাড়ায়। এখন মনে হয়, সবই আমার ভুল। নাক গলালে মেয়েটাকে এইভাবে এত দুর্বল হতে হত না। হয়তো তোমাকে মেনে নিলে ….

এই পর্যন্ত বলে মাস্টারমশাই থেমে গেলেন। ছোট ছেলের বউ অনিমিখের জন্য চা জলখাবার নিয়ে হাজির। ছোট ছেলে পুলক বাবার গায়ে চাদর জড়িয়ে মাথায় টুপি পরিয়ে জানালা দুটো বন্ধ করে দিল। বিকেলের এই সময়ে বড্ড মশা ঢোকে, খোলা ছাদের হাওয়া এসে ধাক্কা মারে দরজায়।

অনিমিখ এক চুমুক চা খেয়ে বললেন, ‘ আপনি নীচের ঘরে থাকলেন না কেন?’

জানালার ধারে রাখা ইনহেলারটা টেনে নিয়ে বললেন, ‘অনেকদিন নীচ থেকে মাথা উঁচু করে উপরের দিকে চাইলাম, এই শেষ বয়সে কাছ থেকে আকাশ দেখবার সাধ হল অনিমিখ। নীচে থাকতে থাকতে বড্ড ছোট হয়ে গেছি রে, আগে যদি উঠতাম তাহলে মেয়েটাকে হারাতাম না। জাত বড়ো বালাই। তোদেরকে শেখাতে পেরেছি, কিন্তু নিজেকে শেখাতে পারিনি।

অনিমিখ তখন এগারো ক্লাস। শিখা দশম। ওই বয়সের প্রেম সবুজ ধানে হলুদ আভা ছড়িয়ে পুষ্ট করেছিল নব যৌবনের শীষ। দুজনেই অত্যন্ত নরম স্বভাবের, প্রকাশ বিমুখ। তাই নীরবেই বইছিল এই অমৃত ফল্গুধারা। মাস্টার মশাই কেমনভাবে টের পেলেন, অনিমিখ আজও বুঝতে পারছে না। তবে ছাত্র চেনার জহুরি চোখ তাঁর ছিল নইলে পেট্রোকেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বার যাবতীয় বন্দোবস্ত তাঁর বাবার পক্ষে সম্ভবই হত না।
অথচ ওঁর নিজের সন্তানেরা কেউই তেমন উচ্চশিক্ষা লাভে সমর্থ হয়নি। এই নিয়ে পাড়ায় বহু গুঞ্জনও আছে। নিজের ছেলেমেয়ের চেয়ে পরের ছেলের ভালোমন্দ নিয়েই বেশি চিন্তিত থাকতেন ‘ এমন কয়েকজন শিক্ষক তাঁদের ইস্কুলে ছিল সেইসময়।

পেরেক বিদ্ধ শিখার ছবিটার দিকে একঝলক তাকাতেই অনিমিখের চোখ আবার পুড়ল। জীবিত ও মৃতের ভিতর কোনো প্রভেদই সে করতে পারল না। তারপর কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতা।

বন্ধ জানালার কাচে টোকা দিল পাখিটা।

পুনরায় নীরবতা ভাঙলেন মাস্টারমশাই। এই ছাত্রটিকে পড়াতে তাঁর বরাবরই ভালো লাগত। তাছাড়া তাঁর স্বভাবেই পড়াবার নেশা। অবসরের পরেও বিনে পয়সাতেই পাড়ার ছেলেমেয়েদের পড়াতেন। এখন আর তেমন কেউ আসে না। বাংলা পড়ার দরকার ফুরিয়েছে।

‘ বুঝেছ অনিমিখ, এই চিলেকোঠা থেকে নীচতলার পিন পতনের শব্দটিও বেশ স্পষ্ট শুনতে পাই। আমাকে নিয়ে ছেলেরা বড়ই বিব্রত। ওদের নিত্য টানাপোড়েন সত্ত্বেও আমাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টায় ছোট ছেলে কোনো ঘাটতি রাখে না।

ইতিমধ্যে ছোট ছেলের বউ শ্রীরূপা আরেক দফা জলখাবার নিয়ে হাজির। বাড়িতে মস্ত অফিসার এসেছেন শ্বশুরমশাইকে দেখতে । তাই সে লুচি ও গাজরের হালুয়া বানিয়ে এনেছে।

‘ বাবা, আপনাকেও দুটি দিই ?

‘ দাও দাও, আজ মনে হয় বমি হবে না।
কী সব ওষুধ বেরিয়েছে আজকাল যে এক রোগ সারাতে অন্য রোগ ধরে যায়। সারাদিন মুঠো মুঠো ওষুধ খেতে খেতে জিভ একেবারেই নষ্ট হয়ে গেছে।

‘ হ্যাঁ, যা বলছিলাম…
বাংলা পড়তে কলকাতার কলেজে ভর্তি হলাম। পয়সা কোথায় তখন ? কতদিন ফুটপাথে ঘুমিয়েছি। আশ্চর্যের ব্যাপার হল, ওই ঠান্ডায় কম্বল জড়িয়ে কিন্তু ঘুম হত দারুণ। পায়ের উপর দিয়ে ইঁদুর ছুঁচো পারাপার করত, পাগল পাগলীরা বিড়বিড় করত ‘ তবুও খোলা আকাশকে বড়ো আপন মনে হত। তখন কলকাতার আকাশে অনেক তারা দেখা যেত। ভোরবেলায় গাড়ির হর্ন, লোকজনের চলাচলে ঘুম ভাঙত। সেই ঘুম শান্তির ছিল না, তবুও এখন ফিরে পেতে চেয়েছি এই চিলেকোঠা ঘরে। ঠকঠক করে যখন রাতচরা পাখিদের পায়ের আওয়াজ শুনি, আকাশের দিকে তাকিয়ে অন্ধকার দেখি, তখন আমার পরপারে পৌঁছবার খিদেটা তীব্র হয়।

‘পরপার’ শব্দটা শুনে অনিমিখ বাধ্য ছাত্র থেকে একটু অবাধ্য হয়ে মাস্টারমশাইকে একটু শাসনের সুরেই বলেন, ‘সে বয়স এখনও আপনার হয়নি। আপনি আবার ঘুরে দাঁড়াবেন।’

‘ তোমাদের কাছে পেলেই বারবার বেঁচে উঠি। আচ্ছা, বলতো অনিমিখ, ক্লাসে তোমার সঙ্গে আর পাঁচটা ছেলের প্রভেদ আমি কি কখনও করেছিলাম ? যদিও আমি জানতাম, তুমি অনেকের চেয়ে মেধাবী। এইটা আমি ঘরে বাইরে কাউকে বোঝাতে পারিনা যে ক্লাসে আমি সবার মাস্টারমশাই, সবাই আমার আপন। কেউ আগে শেখে, কেউ বা পরে, শেখার সময়, ধরণ প্রত্যেকের এক কেমন করে হবে? কত ছেলেমেয়েকে দেখলাম সময়ের পাঠ অসময়ে শিখেও কেমন তরতর করে এগিয়ে গেল। মানুষ তাঁর প্রকৃতি অনুযায়ী নিজেকে গড়ে পিটে নেয়। যে ছাত্র আমার রিক্সা চালায় সেও দেখা হলে পায়ে হাত ছোঁয়ায়, এ কি কম বড়ো পাওনা ? আমার মেজ ছেলে তাঁর মতো করে এটা ওটা ব্যবসা করে দাঁড়িয়েছে। সে তো ভালো কথা, তাই বলে অন্যদের বিদ্রুপ করা কি শোভা পায়? সংসারে কত রকমের যে অশান্তি …. ।

আজ যেন মাস্টারমশাই এর কথা ফুরোতেই চাইছে না। সেই ক্লাসে নজরুল পড়াবার সময় এমন ভাবেই জ্বলে উঠতেন তিনি, কিন্তু এড়িয়ে যেতে চাইতেন জীবনানন্দকে, অথচ আমাদের চোখ জুড়ে তখন বনলতা সেন। পৃথিবীর অন্ধকার যেন ছাত্রদের দৃষ্টিতে বিভ্রম না সৃষ্টি করে। প্রতিটি ছাত্র’ছাত্রীর গুণাবলী প্রকাশের দিকে সতত নজর ছিল তাঁর।

‘ অনিমিখ, এবার তোমার কথা বলো। বউ ছেলে মেয়ে, বাবা মা সকলে কেমন আছে ?

‘ ভালো আছে সকলে। এখনকার ঘরবাড়ি জমিজমার এবার একটা ব্যবস্থা করতে হবে।

‘ শুনেছি, ও পাড়ার নবীন তোমার বাড়িটি কিনবে বলেছে।

‘ ঠিকই শুনেছেন। ও ছাড়া হাতে আর পয়সা কার আছে?

‘ আমাদের এত সম্পন্ন পাড়া ধীরে ধীরে খালি হয়ে গেল। নতুন মানুষজন আসছে। পরিবর্তন তো হবেই। আবার কেউ কেউ দেশ বিদেশ ঘুরে ফিরছেও গাঁয়ে, ওই দিনকয়েকের জন্য। এখন তো ইস্কুলের দূরের মাস্টারমশাইরাও কেউ ঘরভাড়া করে এখানে থাকেন না। মাইনে বেড়েছে, যাতায়াতের খরচের পরোয়া নেই। নিজের গ্রাম ছেড়ে এই ইস্কুলের গ্রামটি তখন তোমাদের টানেই আমার আপন হয়ে গেছিল।

মায়ার মতো শত্রু হয় না।

অনিমিখ কিছুক্ষণ উদাস হয়ে চেয়ে রইল বন্ধ হওয়া জানালার দিকে। চোখ পড়ে গেল শিখার ছবিতে। বিয়ের ছবি। মালাবদলের দৃশ্যখানি বড়ো যত্নে তোলা হয়েছে। এখন পেরেক বিদ্ধ। একটা কবেকার শুকনো গোলাপের মালা ঝুলছে। কোনো এক মৃত্যুবার্ষিকীতে পরানো হয়েছিল হয়তো। রজনীগন্ধা শিখা পছন্দ করত না,বলত গন্ধে মৃত্যু লেগে থাকে। এই চিলেকোঠার ঘরেই বসত শীতকালীন পুতুলখেলার আসর। আজও বসেছে। পার্থক্য এটুকুই ‘ তখন আলো ছিল, এখন অন্ধকার।

মাস্টারমশাই বালিশটা মাথার কাছে টেনে আনলেন। চোখ যে এবার তাঁর জড়িয়ে আসছে।

অনিমিখের এই তীর্থ সেরে মাস্টারময়ইয়ের পায়ে হাত ঠেকিয়ে বললেন, ‘আসি এবার, আবার দেখা হবে।’

উঠনের হরিতলায় জ্বলতে থাকা প্রদীপ শিখাটি তখন নিভু নিভু।

এবার ধুলো মেখে তাঁর একদা ফেলে যাওয়া গৃহে প্রবেশ। বর্তমানকে স্বেচ্ছায় বিদায় জানিয়ে যা হারিয়ে গেছে তার দিকে জীবনের বাঁক। তিরিশ বছর কম নয়। ফিলাডেলফিয়া হয়ে কায়রো, সেখান থেকে হ্যানয়, তারপর আবার সানফ্রান্সিসকো হয়ে আসাম। শিখা কি এখন তাঁকে চিনতে পারত ? এখন তার ভাষা ডিজিট্যাল । হার্ড ডিস্ক জুড়ে মার্কেটিং। বেচো বেচো, কে কত বেচতে পারছে, তার উপর নির্ভর করছে বেঁচে থাকা। ধুলো ঝুল ঝাড়তে ঝাড়তে সে যখন তাঁদের রাস্তার ধারের ঘরের বারান্দার দরজাটা খুলল, সেখান থেকে দেখতে পেল বাড়ি সংলগ্ন রোয়াকটিকে গ্রাস করেছে ক্রম সম্প্রসারিত রাস্তা যেখানে মানুষের চেয়ে বেশি চলাচল করছে মালবাহী ষোল চাকা লরি, যার প্রত্যেকটা এক একেকটা ভূমিকম্পের এপিসেন্টার। একদিন অর্থের টানে বিদ্যেবোঝাই বাবুমশাই হয়ে সেও পাচার হয়েছিল স্বদেশ ছাড়িয়ে।

বহুদিন পর অনিমিখ শেয়ালের হুক্কাহুয়া শুনতে পেল। ভাবল, মানুষ এসব সহ্য করে কীভাবে ? সে যেন বহির্জগত থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো প্রেত। অনেকখানি ঝুল ধুলো পরিষ্কার করে সে খুঁজে পাচ্ছিল নিজের হারানো সত্তাকে। কিন্তু সেই আদল আদপেই সুখকর নয়। অতীতকে সাময়িক অতিথি রূপে পেতে যতখানি ভালো লাগে, পুনরায় সহবাসে ভয় হয় তার চেয়ে ঢের বেশি। অনিমিখতো এ বাড়ি বেচতেই এসেছে। কিন্তু সব গুলিয়ে যাচ্ছে তাঁর। যে সময়ের ইকোসিস্টেম তাঁর অস্তিত্বকে ভয় ধরায় তাকে ছুঁয়ে থাকতে থাকতে কিছুক্ষণেই সে হাঁপিয়ে ওঠে। এ বাড়িকে তাই আবার পোকামাকড় ধুলো ঝুল টিকটিকি পায়রা ইঁদুর সাপখোপ আগাছাদের ফিরিয়ে দিয়ে সে ফিরে যায় বর্তমানে।

ঘুম যখন আসছেই না তখন সে লেটার বক্স থেকে প্রাপ্ত চিঠিগুলো ধুলো ঝেড়ে একে একে পড়তে শুরু করল। কয়েকটা বিয়ের কার্ড, শ্রাদ্ধের নেমন্তন্ন, বিভিন্ন লিফলেট সে জড়ো করে একটা জং ধরা লোহার বালতিতে ফেলে দিল। হাতে রইল কেবল মতিহার মল্লিকের চিঠি। সেটাও ফেলেই দিচ্ছিল কিন্তু খুলে দেখতে ইচ্ছে হল। নদী পারের জমি তাকে ছাড়া যেন কাউকে বিক্রি করা না হয়। দাম বিঘা প্রতি এক লাখ। অনিমিখের মাথা গরম হয়ে উঠল। এই লোকটা কে ? ওই ফসল না হওয়া বালি পড়া জমির প্রতি এত লোভই বা কিসের? এ যে থ্রেটনিং!

সকালবেলার রোদে পুবদুয়ারি বারান্দা ভাসছে। রেলিং এ জমে থাকা ধুলো থেকে গা বাঁচিয়ে প্লাস্টিক জড়ানো চেয়ারটা টেনে আনতেই একটা ইঁদুর ছুটে বেরিয়ে গেল।
মাস্টারমশাইয়ের ছেলে সুভাষ তাঁকে দেখতে পেয়ে বলে গেল, ‘এ কদিন যেন সে উনুন জ্বালানোর ব্যবস্থা না করে। চা জলখাবার রেডি।’

‘ কেমন ঘুম হল? চোখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। ধুলোর সঙ্গে ভালো যুদ্ধ করেছ।

‘ না মাস্টারমশাই, যুদ্ধ এখন বালির সঙ্গে। এই দেখুন।

‘ ওরে বাবা, স্বয়ং ময়ূরাক্ষী তোমায় টেনেছে ।

‘ মানে ?

‘ মতিহার মতিহার। জন্মস্থানের কাছে এ নদী মতিহার নামে পরিচিত ছিল। ভুরভুর নামক একটা ছোট নদীর সঙ্গে মিলনের পর ময়ূরাক্ষী বা মোর নদী, বামে ব্রাহ্মণী দ্বারকা, ডানে বক্রেশ্বর কোপাই। সরহপাদের একটি চর্যাগীতে আছে:
বাম দহিন জো খাল ‘ বিখলা।
সরহ ভণই বাপা উজবাট ভিলা।।

পথে অর্থাৎ বামে দক্ষিণে অনেক খাল ‘ বিখাল ; সরহ বলেন, সোজা পথ ধরিয়া চলো অর্থাৎ খাল ‘ বিখালের মধ্যে ঢুকিয়া পড়িও না, সোজা চলিয়া যাও। তখন নিম্ন প্রবাহের এই নদী ছিল নাব্য। গনুটিয়া বন্দরের ধবংসচিহ্ন তার প্রমাণ। রেশম শেষ, জলপথও। সম্পদ পাল্টে গেলে পথও পাল্টে যায়, এটাই বাণিজ্য নীতি।

১৮৫৯ সালের সেপ্টেম্বরে সাহেবগঞ্জ লুপের খানা’রাজমহল বিভাগের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছিল। ১৯১৭ সালে ম্যাকলিওডস লাইট রেলওয়ে দ্বারা প্রতিষ্ঠিত আহমেদপুর’কাটোয়া ন্যারো’গেজ লাইন দিয়ে শুরু হয় লাভপুরের রেল। এই স্টেশন পর্যন্ত পুরোটা পথ নদী পেরিয়ে আমরা হেঁটে যেতাম। পায়ের জোর ছিল বটে !

‘ দ্যাখো, তোমাকে সেই ছোট্ট বালকটি ভেবে কত জ্ঞান দিয়ে যাচ্ছি। কতদিন হল নদীর সঙ্গে দেখা হয়নি আমার। শেষের পথে পুরো শরীরটা ছাই হয়ে মিশে যাবে এই ময়ূরাক্ষীতেই।

‘ চলুন, আজ একবার ঘুরে আসি।

‘ কী দেখাবে?

‘ মতিহারে আর সে মতি নেই , মতিচ্ছন্ন ধরা মানুষের নজর পড়েছে সেখানে। খুঁড়ে চলেছে। সভ্যতার কঙ্কাল না দেখা অব্দি শান্তি নেই।

‘ মাস্টারমশাই, আমার জমিতে কোনো ফসল হয় না এখন। শুধুই বালির চড়া। ওই চড়া এখন সম্পদ। মাফিয়ারা এখন সরকারী চাকর । নিজে খাও, সরকারকে দাও। কেউ কথা বলবে না। সরকারি ভাণ্ডার তাহলে ঢুকবে না,পাকা বাড়ি করে দেবে না, হাজত বাস হবে।

‘ অনি, তোমার জমিতে মতিহার মতি খুঁজতে চায়।
ময়ূরাক্ষী, ময়ূরের চোখ। সেই বাঁচাতে পারে, যুগে যুগে বাঁচিয়ে চলেছেও।

‘ তাহলে কি নদী, জলাভূমি এভাবেই ধ্বংস হয়ে যাবে?

‘ অর্থনীতি যদি এইসব সম্পদের উপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে সাধ্য কার তাকে বাঁচানোর! তুমি কি ভাবছ, ময়ূরাক্ষী বরাবর এত শিবমন্দির শুধু ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য?
ধন আগলানোর জন্য। শুধু ময়ূরাক্ষী কেন, সোমনাথ, বিশ্বনাথ থেকে বৈষ্ণদেবী, কেদারনাথ, অমরনাথ, হিংলাজ সবাই আগলে বসে রয়েছেন এই পৃথিবীর বৈভবকে। বড়ো বিচিত্র এই দেশ রে অনি, একই তরণীতে কেউ বাণিজ্য করতে করতে সম্পদের নেশায় দিশা হারায়, আবার কেউ উদ্বোধিত চিত্তে বহু স্তর পেরিয়ে পৌঁছে যায় মহাসুখপুরে।

চা জলখাবার শেষ করে অনিমিখের মাথায় এল গতকাল এখানে আসবার সময় একটা মিছিলের আগে আগে যে হাঁটছিল এই কি সেই মতিহার? এই মতিই কি তাঁর সঙ্গে ক্লাস ফাইভ অব্দি পড়েছিল! সে তো নিরীহ গোবেচারা ছিল। লেখাপড়ায় অমনোযোগী হবার জন্য শিক্ষকদের কাছে ক্রমাগত তিরস্কার সহ্য করতে করতে আজকে অঞ্চল প্রধানের ভূমিকায়।

মাস্টারমশাই বললেন, ‘মতি চিনতে ভুল হয়নি, ভুল হয়েছিল আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার। আমরাই পারিনি তাদের উপযুক্ত কাজ শেখাতে, শুধু ভালো’মন্দের মধ্যে বিরাট দূরত্ব তৈরি করে ওর হাতে অস্ত্র তুলে দিয়েছি। ওকে এবং ওর মতো অনেককেই কিনে নিচ্ছে সরকার।’

‘ মাস্টারমশাই, জানেন তো, এই নদী মাঠ ঘাট , কৃষি, শস্য, গোরু বাছুর, অঞ্চলের প্রান্তীয় মানুষদের ওই চিনিয়েছে। ভাতের কোণে লেগে থাকা এক চিমটে শাক ও নুন লঙ্কা ওর প্রতিদিনের ভাতের পাতে থাকত। কতদিন অভুক্ত থেকেছে। ঘুগনি দোকানের পাশে চেয়ে থাকত কখন ফ্রিতে একটু ঘুগনি জুটবে তার কপালে। তবুও তো চুরি করেনি।

‘ সেদিন খিদের জ্বালা ছিল, এখন হয়েছে টেক্কা দেওয়ার জ্বালা। কে কত খেতে পারে, কত তাড়াতাড়ি খেতে পারে। মতি এখন টক্কর দেওয়ার নেশায় মেতেছে। ক্ষমতায় টিকে থাকতে হলে যা অত্যন্ত জরুরি।

‘ আমাকে মতির সঙ্গে দেখা করতেই হবে।


পরদিন সকালে অনিমিখ উপস্থিত হল মতির বাড়িতে। তিনটে গ্রাম পেরিয়ে সেই প্রাসাদোপম বাড়ি। বহিরঙ্গের জৌলুশ দেখে চেনা দায় ভিতরের মানুষগুলোকে। মতির বউ বলল তাঁকে চেনে সে। আপ্যায়নের কোনো খামতি ছিল না। কিন্তু অনিমিখ মতি কোথায় জানতে চাইলে সে জবাব দিতে কুণ্ঠিত হল। প্রমাণ সাইজের এল ই ডি টিভির পাশে রাখা খেগো অ্যাপল চিহ্ন আঁকা মোবাইল বাজতেই সে ছুটে গেল। ফোনের ওপারে যে আছে সে বোধহয় আজ ফিরতে পারবে না। পুলিশ উকিল ফাঁড়ি এমন সব টুকরো টুকরো কথা তার কানে এল। তারপর মতির বউ ফিসফিশ করতে করতে ঘরের ভিতর চলে গেল।
মিনিট দশেক পর বেরিয়ে এসে সটান জিজ্ঞেস করে বসল, “বাবু, জমিটো আমাদিকে বেচেন ক্যানে। বালিপড়া জমিতে ফসল তো হয়ই না।”

‘ আরে সেইজন্যই তো মতির সঙ্গে দেখা করতে এলাম। মতি আমার ছেলেবেলার বন্ধু। ওর হাতেই আমার জমি তুলে দিতে পারলে শান্তি। তা মতি ফিরবে কখন ?

‘ উনি কাল ফিরলেই আপনার কাছে যেতে বলব। জমি জমি করেই তো মারামারি। বেশি টাকা দিয়ে কোথাকার কোন দুদিনের লবাব লেবে বলছে। সাহস দ্যাখেন ক্যানে, কাল রেতে জমি খুঁড়তে এসেছিল। জানে না তো, ময়ূরাক্ষীর চন্দ্রবোড়াকে।

‘ মতি এই নদীকে হাড়ে মজ্জায় চেনে। নদীর কোথায় চোরাবালি, বর্ষায় জল বাড়লে কোথায় কতটা গভীরতা , নদীর ধারের জমি কোন্ কোন্ বাবুদের, সবই তার নখদর্পণে। এমনকি এ অঞ্চলের সাপখোপের গতিবিধিও তার চেনা।

‘ বাবু, চা জলখাবার খেয়েই তবে যাবেন।

মতি ফিরে এল কিন্তু দেখা করতে এল না। উল্টে তার বউ এসে বলল, “বাবু, আমার নামেই রেজিস্টারি করে দেন। ওর শরীরটো সুবিধের লয়। জ্বর খুব।”

অনিমিখ বুঝে গেল, মতি তাঁকে এড়িয়ে যেতে চাইছে। এটাই স্বাভাবিক। এমন থ্রেটনিং দেওয়া চিঠির ফলাফল এভাবে মিলবে, ওর ধারণাতেও ছিল না।

পরদিন মাষ্টারমশাইকে সঙ্গে নিয়েই অনিমিখ মতির গ্রামে রওনা হল। অশক্ত শরীরে মাস্টারমশাই আর বাইরে বেরোতে চান না। পাছে ছেলেদের তাঁকে নিয়ে কোনো বিপদ হয়, এমনটা তিনি চান না। অনিমিখ তাঁর জন্য হুইল চেয়ার জোগাড় করে এনেছে।


বহুদিন পর ঘরের বাইরে পা ফেলতে খুব আড়ষ্ট লাগছিল।
দীর্ঘদিনের ভয় চেপে বসেছে মগজে। অনিমিখের হাতে হাত রেখে তাঁর মনে হচ্ছিল এ যেন জীবনের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার। ছাত্র ও নিজের সন্তানদের আলাদা তিনি কোনোদিন ভাবতে পারেননি। অদ্ভুত এক শক্তি তাঁর নুইয়ে পড়া শরীরটাকে মাটির উপর সোজা করে দাঁড় করালো।

‘ মতি, মতিহার আছ ?

মাস্টারমশাই এর গলা শুনে চমকে উঠল মতি। কিন্তু দরজা খুলল তার বউ।

‘ মতি কোথায় ?

‘ বাবু, তেনার খুব জ্বর ।

‘ ওঠ, আর জ্বরের ভান করে তোকে পড়ে থাকতে হবে না। বালি জমি সব তোর। চন্দ্রবোড়া হয়ে রক্ষা কর ময়ূরাক্ষী। দেখি, আমার ছাত্র পারে কিনা !

অনিমিখের কাল বেলা দশটার ট্রেন।

রেলওয়ে ওভারব্রীজের সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে ক্লান্ত হয়ে তিন নম্বর প্ল্যাটফর্মে নামবার আগে একটু জিরিয়ে নিল অনিমিখ। সেই একই জায়গা, যেখানে আসার দিনও থেমেছিল কিছুক্ষণ। পাখির চোখ দিয়ে দেখেছিল ফিরে পাওয়া ক্ষত বিক্ষত ময়ূরাক্ষীকে। আজও একবার অপলক চেয়ে রইল।

দৃশ্য একই। তখন ছিল শেষ বিকেলের ধোঁয়াশা। এখন বেলা বাড়ার রোদ পড়ে ক্ষতে জমে থাকা জল চিকচিক করছে।

অনিমিখ পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখ মুছল।

ওইতো, সিগন্যাল হয়ে গেছে।

[লেখকের অন্য রচনা]

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x