
রবীন্দ্রনাথের সব থেকে আলোচিত, বহু পঠিত এবং অবশ্যই বিতর্কিত দুটি উপন্যাস হচ্ছে –‘ঘরে-বাইরে’ এবং ‘চার অধ্যায়’। বই দুটি প্রকাশের সময়েই বিতর্কের ঝড় উঠেছিল, আজও তর্ক শেষ হয়নি। সেদিন রবীন্দ্রনাথের আত্মপক্ষ সমর্থন সবাইকে সন্তুষ্ট করেনি, আজও অনেককেই করে না। এই দুটি উপন্যাসকে কেন্দ্র করে তৎকালীন রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি ইত্যাদি নিয়ে অনেক আলোচনার অবকাশ আছে যা আজও প্রাসঙ্গিক। কিন্তু আজ আমি সেই আলোচনার মধ্যে যাব না। আজকের বিষয় একেবারেই ভিন্ন। এখানে বলতে চাইছি বাংলা চলচ্চিত্র এবং নাট্য-জগতের দুই কিংবদন্তী ব্যক্তিত্বের সৃষ্টিতে কীভাবে ওই দুটি কাহিনীর অন্তিম দৃশ্য উপস্থাপিত, এবং এই প্রেক্ষিতে আমার ভাবনায় উঠে আসা একটিই প্রশ্ন।

প্রথমেই আসি সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘ঘরে-বাইরে’ প্রসঙ্গে। উপন্যাসটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ১৯১৬ সালে। ‘পথের পাঁচালী’ তৈরিরও আগে সত্যজিৎ ‘ঘরে-বাইরে’র একটি চিত্রনাট্য লিখেছিলেন পরিচালক হরিসাধন দাশগুপ্তের জন্য। নিখিলেশ চরিত্রটির জন্য রাধামোহন ভট্টাচার্যও নাকি মনোনীত হয়েছিলেন। আমার ভেবে খুব আশ্চর্য লাগে এবং শ্লাঘা বোধ করি যে, এই খবরটি শোনার অনেক আগেই উপন্যাসটি পড়তে পড়তে নিখিলেশের চরিত্রে রাধামোহন ভট্টাচার্যের মুখটাই আমার মনে আসতো। যাই হোক, সে ছবি হয়নি। অবশেষে ১৯৮৫ সালে সত্যজিৎ নিজেই সে ছবি করলেন। বলতেই হয়, সত্যজিতের একজন পরম গুণমুগ্ধ হিসাবেই বলি, ‘ঘরে-বাইরে আমার নানা কারণেই ভালো লাগেনি। সে আলোচনাও আপাতত মুলতবী থাক । আমার আসল আপত্তির কারণটির কথাই শুধু বলি। বলার আগে উপন্যাসটি রবীন্দ্রনাথ কীভাবে বিমলার আত্মকথায় শেষ করেছেন পড়ে নেওয়া যাক।
“রাজবাড়ির দেউরিতে ঢং ঢং করে দশটা বাজল। তার খানিক পরে দেখি রাস্তায় অনেকগুলো আলো, অনেক ভিড়। অন্ধকারে সমস্ত জনতা এক হয়ে জুড়ে গিয়ে মনে হল একটা প্রকাণ্ড কালো অজগর এঁকেবেঁকে রাজবাড়ির গেটের মধ্যে ঢুকতে আসছে।
দেওয়ানজি দূরে লোকের শব্দ শুনে গেটের কাছে ছুটে গেলেন। সেই সময় একজন সওয়ার এসে পৌঁছতেই দেওয়ানজি ভীতস্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, জটাধর খবর কী?
সে বললে, খবর ভালো নয়।
প্রত্যেক কথা উপর থেকে স্পষ্ট শুনতে পেলুম।
তারপরে কী চুপিচুপি বললে, শোনা গেল না।
তারপরে একটা পাল্কি আর তারই পিছনে একটা ডুলি ফটকে মধ্যে ঢুকল। পাল্কির পাশে পাশে মথুর ডাক্তার আসছিলেন। দেওয়ানজি জিজ্ঞাসা করলেন, ডাক্তারবাবু কী মনে করেন?
ডাক্তার বললেন, কিছু বলা যায় না। মাথায় বিষম চোট লেগেছে।
আর অমূল্যবাবু ?
তাঁর বুকে গুলি লেগেছিল, তাঁর হয়ে গেছে।”
তাহলে শেষ পর্যন্ত নিখিলেশের কী হলো ? স্পষ্ট করে রবীন্দ্রনাথ কিছু বললেন না। চলচ্চিত্রের যে নিজস্ব ভাষা আছে, দাবি আছে, যার জন্য সাহিত্যের কাছে আত্মসমর্পণ করা চলচ্চিত্রের কাজ নয় – এই শিক্ষা আমরা সত্যজিৎ রায়ের কাছ থেকে অবশ্যই পেয়েছি। কিন্তু তাই বলে কোনো লেখক তাঁর কাহিনীতে শেষ পর্যন্ত যা উহ্য রেখে আমাদের এক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিলেন তার উত্তর দেওয়ার দায়টুকু চলচ্চিত্রকারের তো না নেওয়াই ভালো। কোনো কাহিনীকে ঘিরে কাহিনীকারের যে মূল ভাবনা এবং তজ্জনিত কোনো প্রশ্ন অথবা অনুচ্চারিত উত্তরকে সম্মান জানানোই চলচ্চিত্রকারের দায়িত্ব। তাই বলতেই হয়, উপন্যাসটির পরিণাম চলচ্চিত্রের মান্যতা পায়নি। তাছাড়াও ‘ঘরে-বাইরে’ চলচ্চিত্রের শেষ দৃশ্যে দেওয়ালের ছবিতে বিমলার সধবার বেশকে ক্রমশ বৈধব্যে রূপান্তরিত করার এমন দুর্বল উপস্থাপনা সত্যজিতের মতো এক অসাধারণ শিল্পীর কাছ থেকে আশাই করা যায় না। সব কিছু জেনে যাওয়া অথবা জানিয়ে দেবার দায় কাহিনীকারেরও নয়, চলচ্চিত্রকারেরও নয়।

সত্যজিতের সমগ্র সৃষ্টির তালিকায় ‘চারুলতাকে’ আমি সবার উপরে রাখি। ১৯৬৪ সালে ‘পরিচয়’-এর পাতায় এই ছবিটি সম্পর্কে অশোক রুদ্রের তীব্র সমালোচনার দীর্ঘ উত্তর দিয়েছিলেন সত্যজিৎ। তারই এক জায়গায় ভূপতি-বিমলার নতুন করে মিলনের সম্ভাবনা সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্তে আসার অপারগতায় শেষ দৃশ্য নিয়ে তাঁর যুক্তি ছিল “… নতুন করে সুখনীড় রচনা সম্ভব কি? মিলন সম্ভব কি ?… এ-দৃশ্যে তাই হাতে হাত মিলতে পারে না। ভবিষ্যতে মিলবে কি ? জানি না। জানার প্রয়োজনও নেই। রবীন্দ্রনাথও জানার প্রয়োজন বোধ করেননি। আজকের মতো ঘর ভেঙে গেছে, বিশ্বাস ভেঙে গেছে, ছেলেমানুষি কল্পনার জগৎ থেকে রূঢ় বাস্তবের জগতে নেমে এসেছে দু’জনেই। এটাই বড় কথা।” আপনাদের মনে পড়ে কি ‘একদিন প্রতিদিন’-এর সেই মেয়েটির কথা ? সকালে কাজে বেরিয়ে মধ্যরাত পর্যন্ত কোথায় ছিল সে ? বহু মানুষের এমন প্রশ্নে ছোট্ট উত্তর দিয়েছিলেন মৃণাল সেন – “জানি না”।
‘ঘরে-বাইরে’র শেষ পরিণাম নিয়ে যে সিদ্ধান্ত সত্যজিৎ নিয়ে ফেললেন সে সম্পর্কে প্রশ্ন কিন্তু আগেই উঠেছে। সীতা দেবী তার ‘পুণ্যস্মৃতি’ গ্রন্থে লিখছেন “… ‘ঘরে-বাইরে’র কিছু সমালোচনা হইল। অজিতকুমার চক্রবর্তী বলিলেন, ‘ওটা কেমন যেন unfinished লাগে।’ রবীন্দ্রনাথ তাঁহাকে বুঝাইতে চেষ্টা করিতে লাগিলেন যে উহা অসম্পূর্ণ নয়। তখনও তর্ক থামে না দেখিয়া বাবার দিকে ফিরিয়া বলিলেন, ‘দেখছেন মশায়, কিরকম সাংঘাতিক লোক, নাকের সামনে বসে সমালোচনা করে।” The Home and the World নামে উপন্যাসটির ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হবার পর বিদেশের পত্রিকাগুলিতে যে আলোচনা হচ্ছিল, কাহিনীর পরিণাম নিয়ে এই রকম আপত্তি সেখানেও কখনও কখনও উত্থাপিত হয়েছে। যেমন – “At the end of the story grows confused; the counterpoint of the cause and the characters is lost in a mere muddle of both and we are left hardly knowing what has happened. It is, in fact, not an end at all but merely a stop; and we wish to ask a number of questions which the author does not answer.” ( The Times Literary Supplement, 29 May 1919) এই বিযয়ে রবীন্দ্রনাথের একটি মন্তব্য দিয়ে ‘ঘরে-বাইরে’ প্রসঙ্গটি শেষ করবো। মন্তব্যটি খুবই লঘু ধরণের, তবু তাৎপর্য আছে। নির্মলকুমারী মহালনবিশ তাঁর ‘বাইশে শ্রাবণ’ গ্রন্থে লিখছেন – “শুনেছি একবার একটি ছোট মেয়ে ওঁর ‘ঘরে-বাইরে’ বই-এর নিখিলেশের জন্যে উদ্বেগ প্রকাশ করে লেখে যে গুলি খেয়ে নিখিলেশ বাঁচলো কি মরলো আমাকে শীগগির জানাবেন।… তৎক্ষণাৎ উত্তরে লিখলেন, ‘নিখিলেশের অবস্থা অত্যন্ত সংকটজনক, তাতে সন্দেহ নেই। তবে তেমন তেমন বড় ডাক্তার, যেমন নীলরতন সরকারকে দিয়ে চিকিৎসা করালে হয়তো এখনও বাঁচতে পারে।”

এবারে আসি ‘চার অধ্যায়’ প্রসঙ্গে। এটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথের শেষ উপন্যাস, বিশ্বভারতী গ্রন্থালয় থেকে প্রকাশিত (২২।১২।১৯৩৪)। বেঙ্গল লাইব্রেরি ক্যাটালগে বইটির পরিচয় হিসাবে লেখা হয়েছিল – ‘A love story in terrorist setting incidentally exposing the hollownesss of the so-called patriotic pursuits.’ কেবল রাজনৈতিক দিক দিয়েই নয়, ‘চার অধ্যায় প্রকাশিত হবার পর রবীন্দ্রনাথকে অন্যরকম সমালোচনাও শুনতে হয়েছিল। প্রতিমা দেবীর কাছে একটি চিঠিতে তিনি লিখছেন (মে ১৯৩৫): ‘সাহিত্যসম্বন্ধীয় বিশেষ উল্লেখযোগ্য খবর হচ্চে এই, চার অধ্যায়কে নিয়ে সৌম্য ঠাকুর অত্যন্ত গম্ভীর গলায় প্রতিকূল সমালোচনা করেচেন, সুভো ঠাকুর লিখেছেন যে স্বামী চন্দ্রেশ্বরানন্দ নামক এক ব্যক্তির লেখা থেকে ওটা আমি চুরি করেছি, … ।’ প্রথম প্রকাশকালে ‘চার অধ্যায়’-এর সূচনায় একটি ‘আভাস’ অংশ যুক্ত ছিল । সেখানে ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়ের চারিত্রিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত ছিল। গ্রন্থপ্রকাশের পরে পাঠকসমাজের ক্ষোভ লক্ষ করে রবীন্দ্রনাথ দ্বিতীয় সংস্করণ থেকে সেটিকে বর্জন করেন। সাহিত্যের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের এমন আপোস ব্যতিক্রমী ঘটনা হলেও আমাদের বিস্মিত করে। তিনি একটি কৈফিয়ত’ও লেখেন ‘প্রবাসী’ পত্রিকায়। অনেক সমালোচনা সত্ত্বেও প্রথম থেকেই চার অধ্যায় অসম্ভব জনপ্রিয়তা লাভ করে। রবীন্দ্রনাথ অমিয় চক্রবর্তীকে লিখেছেন (১২ এপ্রিল ১৯৩৫), ‘চার অধ্যায়ের যে দিকটা পাঠককে ভোলায় সে ওর কবিতার অংশ। ওর ভাষায় লাগিয়েছি যাদু, সেইটের ভিতর দিয়ে তারা যে জিনিষটা পায় সেটা ঠিক খাঁটি গদ্যের বাহন নয়। অন্তু আর এলার ভালোবাসার বৃত্তান্তটা লিরিকের তোড়া রচনা – নবেলের নির্জ্জলা আবহাওয়ায় শুকিয়ে যেতে হয় তো দেরি হবে।’
শম্ভু মিত্র নাটক হিসাবে ‘চার অধ্যায়’কে প্রথম মঞ্চস্থ করেন ১৯৫১ সালে। আমি নাটকটি দেখি ‘বহুরূপী’র রজতজয়ন্তী বর্ষে (১৯৭৩।৭৪)। মনে আছে খুব ভোরে আলো ফোটার আগেই গিয়ে কলামন্দিরের বিশাল লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট সংগ্রহ করেছিলাম। সেটা হাতে পেয়ে সে কী তৃপ্তি! আর তা হবে নাই বা কেন, গিরীশ কনরাডের মতো মানুষের সমালোচনাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে শম্ভু মিত্রই তো তাঁর সন্দেহাতীত যোগ্যতায় অনেক আগেই প্রমাণ করেছেন, রবীন্দ্রনাথের নাটক কত সার্থকভাবে মঞ্চস্থ করা যায়। আগে রেডিওতেও শুনেছি, কতবার পড়েছি, কিন্তু সেদিনের চাক্ষুস অভিজ্ঞতার স্বাদই আলাদা। এই লেখাটি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের নিজের মূল্যায়ন যে কত অভ্রান্ত, শম্ভুবাবুর কণ্ঠমাধুর্য এবং অভিনয়ের মধ্য দিয়ে আবার তার প্রমাণ পেলাম। কিন্তু তুলনাহীন এই অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও একটু অস্বস্তি একটু অতৃপ্তি সেই শেষটুকু নিয়েই। আসুন, রবীন্দ্রনাথ কীভাবে শেষ করেছেন আগে একটু পড়ে দেখি ।
এলার বাড়ির ছাদ। ছাদের দরজা বন্ধ করে দিয়ে শুধু এলা আর অতীন। এমন পরিবেশে মনের আগল উন্মুক্ত করে দুজনের মধ্যে উঠে আসে অনেক কথা। শেষে এসে রবীন্দ্রনাথের লিখছেন –
“এলা অতীনের পা জড়িয়ে ধরে বললে, ‘মারো আমাকে অন্তু, নিজের হাতে। তার চেয়ে সৌভাগ্য আমার কিছু হতে পারে না।’ মেঝের থেকে উঠে দাঁড়িয়ে অতীনকে বারবার চুমো খেয়ে খেয়ে বললে, ‘মারো, এইবার মারো।’ ছিঁড়ে ফেললে বুকের জামা। অতীন পাথরের মূর্তির মতো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

এলা বললে, ‘একটুও ভেব না অন্তু। আমি যে তোমার, সম্পূর্ণই তোমার – মরণেও তোমার। নাও আমাকে। নোংরা হাত লাগতে দিওনা আমার গায়ে, আমার এ দেহ তোমার।’
অতীন কঠিন সুরে বললে, ‘যাও, এখনি শুতে যাও, হুকুম করছি শুতে যাও।’
অতীনকে বুকে চেপে ধরে এলা বলতে লাগল – ‘অন্তু, অন্তু আমার, আমার রাজা, আমার দেবতা, তোমাকে কত ভালোবেসেছি আজ পর্যন্ত সম্পূর্ণ করে তা জানতে পারলুম না। সেই ভালোবাসার দোহাই, মারো, আমাকে মারো।’
অতীন এলার হাত জোর করে ধরে তাকে শোবার ঘরে টেনে নিয়ে গেল, বললে, ‘শোও, এখনি শোও। ঘুমোও।’
‘ঘুম হবে না ।’
‘ঘুমোবার ওষুধ আছে আমার হাতে ।’
‘কিচ্ছু দরকার নেই অন্তু। আমার চৈতন্যের শেষ মুহূর্ত তুমিই নাও। ক্লোরোফর্ম এনেছ ? দাও ওটাকে ফেলে। ভীরু নই আমি; জেগে থেকে যাতে মরি তোমার কোলে তাই করো। শেষ চুম্বন আজ অফুরান হল। অন্তু! অন্তু!
দূরের থেকে হুইস্লের শব্দ এল ।”
আমরা জানি ‘চার অধ্যায়’-এর চতুর্থ অধ্যায়ে দলের নির্দেশে অতীন এসেছে এলাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে। এলাও বুঝেছে। উভয়ের উক্তির মধ্যেই রয়েছে মৃত্যুর ইঙ্গিত। দু’জনের মধ্যে বন্ধনহীন দীর্ঘ সংলাপের পর হুইস্লের শব্দ। এই মৃত্যুর ইঙ্গিতেই উপন্যাসটির যবনিকাপাত। কিন্তু নাটকের শেষটুকু আমরা মঞ্চে দেখলাম এইভাবেঃ হুইস্লের শব্দ – অতীন পকেট থেকে বার করল পিস্তল – গুলির আওয়াজ – মঞ্চের সামনে পর্দা নেমে এল। কাহিনীতে শুধু উক্তির মাধ্যমে মৃত্যুর ইঙ্গিত আর হুইস্লের শব্দকে হয়তো circumstantial evidence বলা যেতে পারে। কিন্তু এটা কি অতীনের গুলি চালনা এবং এলার মৃত্যুর ঘটনাকে যথার্থই establish করে? এখানে রবীন্দ্রনাথ আমাদের জন্য রেখে গেলেন একটা বড়ো প্রশ্নচিহ্ন। কেন ? যে ‘পেট্রিয়টিজম কুমিরের পিঠে চড়ে পার হবার খেয়ানৌকা’ তার ঊর্ধ্বে উঠেই তো এলা-অন্তুর প্রেমের দীপশিখাটি জ্বালিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। আমার মনে হয়, শেষ পর্যন্ত তিরতির করে কাঁপা ওই শিখাটি মুহূর্তের মধ্যে নিবিয়ে কাহিনীর দাবি মেটাতে গিয়ে পিছুটানে আটকা পড়লেন রবীন্দ্রনাথ। তাই গুলির শব্দে নয়, হুইস্লের মধ্যে দিয়ে গ্রন্থের যবনিকাপাতের এই compromise তাঁকে করতেই হলো শেষ পর্যন্ত। আচ্ছা, খুব ভালো হতো নাকি, যদি শম্ভু মিত্র তাঁর এই অসাধারণ প্রযোজনায় রবীন্দ্রনাথের conclusive statementকেই মান্যতা দিতেন? আর তাই যদি শেষে এমন ঘটতোঃ আমরা শুনলাম এলার শেষ উক্তি, ‘অন্তু! অন্তু!’ – ক্রমশ স্তিমিত হয়ে এল আলো – দূরের থেকে আসা শুধু হুইস্লের শব্দ – অন্ধকার ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে মঞ্চের পর্দাও নেমে এল! এমনটা হলে অনুমান নির্ভর সিদ্ধান্ত নয়, মঞ্চে শিল্প এবং কাহিনীর দাবি একই সঙ্গে মিটত বলেই আমার বিশ্বাস।


দুটি আখ্যানের প্রতিই পাঠক বাঙালির দ্বিধাহীন সম্মোহন রয়েছে। এরকম মৌচাকে ঘা দেওয়া সুপণ্ডিত মানুষের পক্ষেই সম্ভব। চলচিত্রের নিরিখে ‘ চার অধ্যায় ‘ সত্যজিতের সেরা কীর্তির মধ্যে পড়েনা। যদিও অভিনয়ে পাল্লা দিয়ে গেছেন দুই নায়কই। তুলনায় নায়িকা কিছুটা ম্রিয়মাণ , আড়ষ্ট। সে সময় সত্যজিৎ এর শারীরিক অবস্থা কিছুটা প্রতিকূল ছিল। তবু হয়ত আরেকটু মনযোগ আশা করা যেত।
চার অধ্যায় দেখা হয়নি কিন্তু আমি শ্রুতি মাধ্যমে খুঁটিয়ে শুনেছি বার বার। সে সময় , হয়ত এখনো, সেই কিংবদন্তি অভিনেতা ও অভিনেত্রীর মোহ থেকে বেরিয়ে আসা যায় নি। অমোঘ উচ্চারণের মায়াবী টান নিয়ে যায় সাতটি অমরাবতীর জাদু মহলে। কাব্য গন্ধী সংলাপ অবিরল বলে যাচ্ছেন দুজন যেন এই তাদের স্বাভাবিক কথ্য ভঙ্গী। অনির্বচনীয়।
সৃষ্টি ও তার প্রয়োগ শাশ্বত কি না, তা কালের কষ্টি পাথরে পরখ করার সময় সমাগত। যোগ্য মানুষ হিসেবেই হিমাদ্রী বাবু তার কলম তুলে নিয়েছেন। যে ভাবে রচনাকার ও চলচ্চিত্রকারের স্বাধীনতার সীমারেখা, অস্পষ্টতার আবরণ সরিয়ে না নেওয়া, এবং অধিকার সংক্রান্ত প্রশ্ন তিনি তুলেছেন তা সৎ সাহসের পরিচয়। পাঠকের মূল্যায়নের দিকে আমিও সোৎসাহে তাকিয়ে আছি।
অসাবধানতা বশত রায় সাহেবের আলোচ্য চলচিত্রের নাম ভুল হয়েছে। ওটি ঘরে বাইরে হবার কথা। দুঃখীরাম দুঃখিত।