শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা


আমি ব্রাত্য, আমি মন্ত্রহীন,

দেবতার বন্দীশালায়

আমার নৈবেদ্য পৌঁছল না।

পূজারী হাসিমুখে মন্দির থেকে বাহির হয়ে আসে,

আমাকে শুধায়, “দেখে এলে তোমার দেবতাকে?”

আমি বলি, “না।”

অবাক হয়ে শুনে বলে, “জানা নেই পথ?”

আমি বলি, “না।”

প্রশ্ন করে “কোনো জাত নেই বুঝি তোমার?”

আমি বলি, “না।”

” রবীন্দ্রনাথ / পত্রপুট

উত্তরাধিকার সুত্রে পাওয়া বলেই ধর্মটাকে নিয়ে আদিখ্যেতা করতে হবে, অথবা নিজের বলে গ্রহণ করতেই হবে, এমন কথা স্বীকার করতে রবীন্দ্রনাথের অবশ্যই আপত্তি। ক্রমশ ভাঙতে ভাঙতে নিজেকে তিলে তিলে গড়ে তুলেছেন রবীন্দ্রনাথ, বিশেষ করে যবে থেকে Concept of Visva-Bharati – where the world makes its home in a single nest-এর পোকা নিঃশব্দে মাথায় বাসা বেঁধেছিল । ১৯৩০ সালের মে মাসে অক্সফোর্ডে ‘Hibbert Lecture’ দিতে গিয়ে আরও একেবার নিজের উপলব্ধ ধর্মের কথা শোনালেন – ‘The Religion of Man’। ক্রমশ প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা থেকেই বহুদিন ধরে তৈরি হয়েছ তাঁর বিশেষ মানসিক গঠন – যা উপেক্ষা করতে পেরেছে সব পারিপার্শ্বিক প্রভাবকে। বক্তৃতায় স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন “I was born in a family which, at that time, was earnestly developing a monotheistic religion based upon the philosophy of Upanisad. Somehow my mind at first remained coldly aloof, absolutely uninfluenced by any religion whatever. It was through a idiosyncracy of my temperament that I refused to accept any religious teaching merely because people in my surroundings believed it to be true. I could not persuade myself to imagine that I had a religion because everybody whom I might trust believed in its value.”

The Hibert Lectures
Cover “The Religion of Man”

বস্তুত, জ্বলতে থাকা প্রদীপটার সলতে পাকানো শুরু হয়েছিল অনেক আগে, বোধ হয় তারও আগে, যখন প্রভাতসংগীত পর্যায়ের বাইশ বছরের রবি সদর স্ট্রিটের বারান্দায় কোনো এক সকালে গাছের ফাঁক দিয়ে প্রত্যক্ষ্য করেছিল তাঁরই মিতার আবির্ভাবকে! সেই মুহূর্তে তার অনুভব – “ দেখিলাম, একটি অপরূপ মহিমায় বিশ্বসংসার সমাচ্ছন্ন, আনন্দে এবং সৌন্দর্যে সর্বত্রই তরঙ্গিত।” প্রকৃতির এই সৌন্দর্য চেতনাই তো শেষ পর্যন্ত তরঙ্গিত হতে হতে পূর্ণের চরণে আশ্রয়ের প্রত্যাশী সেই রবির transformation ঘটল রবীন্দ্রনাথে “দেশ-ধর্ম-জাতি সম্পর্কে নতুন চেতনার পরিচয় পাওয়া গেল সেই – ‘The Relligion of Man’!

লক্ষ করার বিষয়, রবীন্দ্রনাথের জীবনটা ক্রমশ গড়ে উঠেছে তাঁর সামাজিক, রাজনৈতিক এবং ধর্ম সম্পর্কীয় প্রজ্ঞার বিবর্তনের হাত ধরে। কালের হিসাবে এই ইতিহাসটাকে মোটামুটি দুটি পর্বে ভাগ করা যায়। স্ত্রী এবং বিশেষ করে পিতার মৃত্যু(১৯০২/১৯০৫), বড়জোর বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের ইতি পর্যন্ত (১৯১১) সময়টাকে, পর্বের প্রথম অধ্যায় হিসাবে চিহ্নিত করা যায়। এর পর ১৯৪১ পর্যন্ত সময়কালটাই হচ্ছে অন্তিম পর্বের এক বর্ণময় ও গর্বিত ইতিহাস। সাহিত্যে, শিক্ষা ও সামাজিক দায়িত্ব “বিশ্বভারতীর কর্মযজ্ঞ ও বাণীপ্রচারে বিশ্বব্যাপী পরিব্রাজকের ভূমিকা “দুই বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষিতে মানবতা ও শান্তির অন্বেষণে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তাঁর যাবতীয় উদ্যম “বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের পর নিজেকে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রাখলেও ভারতবর্ষের রাজনৈতিক প্রসঙ্গকে এড়িয়ে থাকতে না-পারা “গান্ধীজির সঙ্গে সম্পর্কের একই সঙ্গে অপরিসীম শ্রদ্ধা ও রাজনৈতিক-সামাজিক নানা প্রসঙ্গে তীব্র মতদ্বৈধতার জটিল রসায়ন – সর্বোপরি প্রচলিত ধর্মমত থেকে মানুষের ধর্মে উত্তরণ। এ যেন এক মহাকাব্যিক পরিক্রমণ! সম্ভবত হোমার সম্পর্কে এলিয়টের প্রশস্তিকে স্মরণ করেই ধীমান রাজনৈতিক ভাবুক হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় রবীন্দ্রনাথকে এমন করেই বিশেষিত করেছেন – ‘Himself is a true poem’।

বিগত শতাব্দীর প্রথম দশক থেকেই নানা ভাবে কবিতায়, উপন্যাসে, প্রবন্ধে, চিঠিপত্রে সর্বত্রই ধর্মমোহ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের সেই একই সতর্কবাণী – “ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে/ অন্ধ সে জন মারে আর শুধু মরে।/ নাস্তিক সেও পায় বিধাতার বর,/ ধার্মিকতার করে না আড়ম্বর।” দ্বিধাহীন চিত্তে ‘রাশিয়ার চিঠি’-তে বললেন, “এ-পর্যন্ত দেখা গেছে, যে রাজা প্রজাকে দাস করে রাখতে চেয়েছে সে রাজার সর্বপ্রধান সহায় সেই ধর্ম যা মানুষকে অন্ধ করে রাখে। সে ধর্ম বিষকন্যার মতো; আলিঙ্গন ক’রে সে মুগ্ধ করে, মুগ্ধ ক’রে সে মারে। শক্তিশেলের চেয়ে ভক্তিশেল গভীরতর মর্মে গিয়ে প্রবেশ করে, কেননা তার মার আরামের মার … ধর্মমোহের চেয়ে নাস্তিকতা অনেক ভালো” (বড় হরফ আমার)।

কিন্তু এটাও তো লক্ষ করতেই হবে, ‘সভ্যতার সংকট’ পর্বে এসে শেষ পর্যন্ত মানুষের প্রতি বিশ্বাসটাকেই তিনি আঁকড়ে ধরে থাকতে চাইলেন অবশ্যই; তাই বলে ঈশ্বর সম্পর্কে আজন্মলালিত ঔপনিষদিক প্রত্যয় শেষ পর্যন্ত নাস্তিকতার আগুনে পুরো ভস্মীভূত হল কি? না, হয়নি। তবে রাশিয়া পারবে – তাঁর এই অন্তিম বিশ্বাস তাঁর বিদায়ের পরে ফলপ্রসু হলেও, নারকীয় অভিজ্ঞতা ও মানবতার চূড়ান্ত অবমাননার মধ্য দিয়ে বিশ্বযুদ্ধের শেষ ইতিহাসটা প্রত্যক্ষ করার দুর্ভাগ্য কবির হলে, সেই নাস্তিকতা সম্পর্কে তিরতির করে কাঁপা সংশয় আর বিশ্বাসের একটা চোরাস্রোত শেষ পর্যন্ত কোন পরিণতির দিকে তখন তাঁকে ঠেলে দিত সেটাই বড় জিজ্ঞাসা হয়ে রইল। তবে ধর্ম সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ultimate testament তো হেমন্তবালা দেবীকে লেখা চিঠিগুলোতে দিয়েই রাখলেন; যেখানে একটি চিঠিতে তিনি লিখছেন, “তোমাদের জীবনে লক্ষ্যকে একটি বিশেষ রূপে মূর্ত্ত করে প্রতিষ্ঠিত করেচ, একটি সুনির্দিষ্ট কক্ষপথে বিবিধ উপাচারসহ তাকে প্রদক্ষিণ করচ। ওখানে বাসা বাঁধবার মতো প্রকৃতিই আমার নয়। তুমি মনে করতে পার যে, আমার মন ব্রাহ্ম সংস্কারে চালিত – একেবারেই নয়, নূতন বা পুরাতন কোনো প্রচলিত সংস্কারে আমাকে কোনোদিন বাঁধে নি। মাঝে মাঝে ধরা দিতে গিয়ে ছিন্ন করে বেরিয়ে চলে এসেছি – আমার জায়গা হয় নি। কোনো সনাতন বা অধুনাতন ছাঁচে-ঢালা উপজগতের মধ্যে নিজেকে ধরাতে পারলুম না।”

হেমন্তবালা দেবী

রবীন্দ্রনাথের সুগভীর ধর্মভাবনার শেষ খুঁজতে বসে দেখছি ‘শেষ নাহি যে শেষ কথা কে বলবে’! রবীন্দ্রনাথের সমগ্র জীবনে যত বিচিত্র পথে নানা ভাবনার সন্নিবেশ ঘটেছে তার মধ্যে তাঁর ধর্ম সম্পর্কিত অনুধ্যান-নিরীক্ষণ-অনুশীলন সব থেকে বেশি জটিলতায় আবর্তিত। হ্যাঁ, ‘সব পথ এসে মিলে গেল শেষে তোমার দুখানি নয়নে’র তৃপ্তি নিয়েই তাঁর ধর্ম – মানুষের ধর্ম। তবু, তথাপি, তাঁর আত্মপরিচয়ের সার্বিক রূপটাকে অনুধাবন করার যখন চেষ্টা করি তখন তো সেই সত্যটা আর অধরা থাকে না যে, তাঁরই মিতা প্রথম দিনের সূর্যের কাছে ‘কে তুমি’র উত্তর মেলেনি; বৎসর বৎসর চলে যাওয়ার পরেও দিনের শেষে সেই প্রশ্নর উত্তরও তো সে পেল না!

এই উত্তরের অন্বেষণেই আদি ব্রাহ্মসমাজের সম্পাদকের পদ গ্রহণের শুরু থেকেই রবীন্দ্রনাথের মধ্যে ধর্ম সম্পর্কীয় একটা দ্বন্দ্ব “আকর্ষণের মধ্যে বিকর্ষণের একটা চোরাটানও অনুভূত হয়। সেটা অস্বাভাবিক নয় মোটেই। শুরুতেই কিছু ক্ষেত্রে সমাজের রক্ষণশীল প্রথার বিরুদ্ধে আঘাত হানতে চাইলেও পিতার প্রচ্ছন্ন সমর্থনটুকু যথেষ্ট না থাকায় রবীন্দ্রনাথের সে প্রচেষ্টা বিফলেই গেল। শেষ পর্যন্ত পিতার মৃত্যুর পরে আদি ব্রাহ্ম সমাজের রক্ষণশীল ঘেরাটোপ থেকে নিজেকে ক্রমশ মুক্ত করতে করতে নিজেকে অবশ্যই ভারমুক্ত করার পালা – যাবতীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে ওঠার যাত্রা শুরু। মূর্তিপূজার বিরোধী হলেও দেবেন্দ্রনাথের ধর্ম-ভাবনা আদতে রক্ষণশীলতায় জারিত ছিল। তিনি কখনোই ব্রাহ্মসমাজকে হিন্দুত্ব থেকে পৃথক করে দেখেননি। হিন্দুসমাজের প্রচলিত বর্ণভেদ এবং সামাজিক প্রথার প্রচলিত বাধ্যতার সঙ্গে তাঁর ছিল আপস।

দেবেন্দ্রনাথের রক্ষণশীলতার একটা ছোট্ট উদাহরণ এখানে দেওয়া যেতে পারে। ১৮৯৯ সালের ১৯ অগাস্ট বলেন্দ্রনাথের মৃত্যু হলে তাঁর বিধবা স্ত্রী সাহানা দেবীকে পিতা ফকিরচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এলাহাবাদে নিয়ে যান এবং কন্যার পুনরায় বিবাহের উদ্যোগ নেন। কিন্তু ফকিরচন্দ্রের অকস্মাৎ মূত্যুতে দেবেন্দ্রনাথ আর কালবিলম্ব না করে রবীন্দ্রনাথকে পাঠিয়ে সাহানা দেবীকে নিয়ে এসে সম্ভবত শিলাইদহে রাখার ব্যবস্থা করেন। সাহানার পুনরায় বিবাহ সম্পর্কে তাঁর পিতার সদিচ্ছাকে মান্যতা দেওয়ার বাসনা হিন্দুসমাজের কোনো সামাজিক সংস্কার ও বিধবাবিবাহ আন্দোলনের বিরোধী দেবেন্দ্রনাথের আদৌ ছিল না। অন্তরে ভাঙন শুরু হয়ে গেলেও পিতার নির্দেশ নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলাও পুত্র রবীন্দ্রনাথের পক্ষে সেদিন সম্ভব হয়নি। সম্ভব হল; উত্তরটাই রবীন্দ্রনাথ দিলেন ১৯০৫-এ দেবেন্দ্রনাথের মৃত্যুর পরে। পরবর্তী পাঁচ বছরে ভাবনার পথে কী অসম্ভব উত্তরণ ঘটে গেছে রবীন্দ্রনাথের! ১৯১০-এ পুত্র রথীন্দ্রনাথের বিবাহ হল গগনেন্দ্রনাথ-সমরেন্দ্রনাথ-অবনীন্দ্রনাথের ভগিনী বিনয়িনী দেবীর বিধবা কন্যা প্রতিমার সঙ্গে (প্রাক্তন স্বামী নীলানাথ মুখোপাধ্যায়)। ঝড় উঠেছিল। কিন্তু সমস্ত বিপত্তিকে অগ্রাহ্য করে ঠাকুবাড়িতে প্রথম বিধবাবিবাহ সম্পন্ন করলেন রবীন্দ্রনাথ। দীর্ঘকালের লালিত সংস্কারকে শুধুই আঘাতই করলেন না তিনি, এই ঘটনার পর আদিব্রাহ্মসমাজের বহু সংস্কার ভেঙে গেল – ঘটে গেল অসবর্ণ, প্রতিলোম বিবাহও।

মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর

দেবেন্দ্রনাথের এই মানসিকতার কারণেই ব্রাহ্মসমাজে ভাঙন এবং কেশবচন্দ্র সেন কর্তৃক ‘ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ’-এর সৃষ্টি। এ কথা ঠিক, রবীন্দ্রনাথের জীবনে দেবেন্দ্রনাথের প্রভাব এতই ব্যাপক ও গভীর যে তা পরে অনেকটাই ফিকে হয়ে এলেও বিলীন হয় নি। দেবেন্দ্রনাথেরই বিশ্বাসমতো ব্রাহ্মধর্ম রবীন্দ্রনাথের কাছে প্রকৃত পরিচয় ছিল না, তা ছিল সাময়িক। ‘আত্মপরিচয়’ লিখতে বসে রবীন্দ্রনাথ আমাদের জানাতে ভুললেন না, ব্রাহ্মসমাজকে তাই আমি হিন্দুসমাজের ইতিহাসেরই একটি স্বাভাবিক বিকাশ বলিয়া দেখি। এই বিকাশ হিন্দুসমাজের একটি বিশ্বজনীন বিকাশ।” এখানে রামমোহন রায়ের প্রসঙ্গটি তাঁর বিচারে অধিক গুরুত্ব পেয়েছে – “আমাদের দেশে বর্তমানকালে, কী বলিয়া আপনার পরিচয় দিব তাহা লইয়া অন্তত ব্রাহ্মসমাজে একটা তর্ক উঠিয়াছে। অথচ এই তর্কটা রামমোহন রায়ের মনের মধ্যে একেবারেই ছিল না দেখিতে পাই। … কী বলিয়া আপনার পরিচয় দিব সে বিষয়ে তাঁহার মনে কোনোদিন লেশমাত্র সংশয় ওঠে নাই। কারণ হাজার হাজার লোক তাঁহাকে অহিন্দু বলিলেও তিনি হিন্দু এ সত্য যখন লোপ পাইবার নয় তখন এ সম্বন্ধে চিন্তা করিয়া সময় নষ্ট করিবার কোনো দরকার ছিল না।”

এই পর্যন্ত ঠিকই ছিল। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের মুখে শুনছি হিন্দুত্বের নতুন এক সংজ্ঞা, নতুন এক narrative – “হিন্দু শব্দে এবং মুসলমান শব্দে একই পর্যায়ের পরিচয়কে বুঝায় না। মুসলমান একটি বিশেষ ধর্ম কিন্তু হিন্দু কোনো বিশেষ ধর্ম নহে। হিন্দু ভারতবর্ষের ইতিহাসের একটি জাতিগত পরিণাম।” এখানে একটা প্রশ্ন অবশ্যই মনে আসে, তাই যদি হয়, তা হলে সেই জাতিগত দিক দিয়ে হিন্দু কি মুসলমান-খ্রীষ্টান-বৌদ্ধ-শিখ ইত্যাদি ব্যতিরেক নিজস্ব কোনো বিশেষ ধর্মমতের অংশীদার হতে পারে না? প্রশ্ন থাকেই, দেবেন্দ্রনাথ-রবীন্দ্রনাথের কাছে সেই ‘হিন্দুত্ব’ বিষয়টা তবে কী যারই অংশীদার নাকি ব্রহ্মসমাজ? আমার এমন প্রশ্নের উত্তরটা রবীন্দ্রনাথের কাছে হয়তো “‘আমি বৈষ্ণব, আমি শাক্ত ইত্যাদি’। আচ্ছা, রবীন্দ্রনাথের কাছে ধর্ম আর সমাজ কি সমার্থক? ‘আত্মপরিচয়’ পড়ে (১৩১৯ এবং আশ্বিন-কার্তিক ১৩২৪) ঠিক এই বিষয়গুলো আমার কাছে স্পষ্ট হয় না।

রবীন্দ্রনাথ

এত কথা বলার পরেও প্রশ্ন থেকেই যায়, কোন প্রচলিত ধর্মমত অথবা মোহ শেষ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ নিজের মধ্যে লালন করেছিলেন? রবীন্দ্রনাথ হিন্দু কি ব্রাহ্ম এই বিচারের একটা ঝোঁক পাঠক সমাজে সেদিনও ছিল, আজও আছে। আমি ‘চতুরঙ্গ’ উপন্যাস থেকে জ্যাঠামশাই জগমোহন প্রসঙ্গটি এনে এখানে ইতি টানতে চাই। বাহুল্য হলেও, যাঁরা উপন্যাসটা এখনও পড়েননি তাঁদের সুবিধার্থে চারজনের পরিচয় এখানে দেওয়া গেল। জগমোহন ও তাঁর ছোটো ভাই হরিমোহন, যাঁদের সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের মন্তব্য – “সকাল এবং বিকাল যেমন বিপরীত, সংসারে বড়ো ভাই এবং ছোটোভাই তেমনি বিপরীত – এমন দৃষ্টান্তের অভাব নাই”। হরিমোহনের বড় ছেলে পুরন্দর বাবার একেবারে সুপুত্র। ‘প্রচুরতম মানুষের প্রভূততম সুখসাধন’কে ব্রত করে ছোটো ছেলে শচীশ কিন্তু নিজেকে ‘ধার্মিক নয়, নাস্তিক’ ভাবা সেই জ্যাঠামশায়ের সাক্ষাৎ চেলা। আলোচ্য প্রসঙ্গটি এই রকম –

বাড়ির লোক একদিন দেখিল, বাড়ির যে মহলে জগমোহন থাকেন সেই দিকে একটা বৃহৎ ভোজের আয়োজন হইতেছে। তার পাচক এবং পরিবেষকের দল সব মুসলমান। হরিমোহন রাগে অস্থির হইয়া শচীশকে ডাকিয়া বলিলেন, তুই নাকি যত তোর চামার বাবাদের ডাকিয়া এই বাড়িতে আজ খাওয়াইবি?

শচীশ কহিল, আমার সম্বল থাকিলে খাওয়াইতাম, কিন্তু আমার তো পয়সা নাই। জ্যঠামশায় উহাদের নিমন্ত্রণ করিয়াছেন।

পুরন্দর রাগে ছটফট করিয়া বেড়াইতেছিল। সে বলিতেছিল, কেমন উহারা এ বাড়িতে আসিয়া খায় আমি দেখিব।

হরিমোহন দাদার কাছে আপত্তি জানাইলে জগমোহন কহিলেন, তোমার ঠাকুরের ভোগ তুমি রোজই দিতেছ আমি কথা কই না। আমার ঠাকুরের ভোগ আমি একদিন দিব ইহাতে বাধা দিয়ো না।

“তোমার ঠাকুর?”

“হ্যাঁ, আমার ঠাকুর।”

“তুমি কি ব্রাহ্ম হইয়াছ?”

“ব্রাহ্মরা নিরাকার মানে, তাহাকে চোখে দেখা যায় না। তোমরা সাকারকে মান, তাহাকে কানে শোনা যায় না। আমরা সজীবকে মানি তাহাকে চোখে দেখা যায়, কানে শোনা যায় – তাহাকে বিশ্বাস না করিয়া থাকা যায় না। (বড় হরফ আমার)”

“তোমার এই চামার মুসলমান দেবতা?”

“হ্যাঁ, আমার এই চামার মুসলমান দেবতা। তাহাদের আশ্চর্য এই এক ক্ষমতা প্রত্যক্ষ দেখিতে পাইবে, তাহাদের সামনে ভোগের সামগ্রী দিলে তাহারা অনায়াসে সেটা হাতে করিয়া তুলিয়া খাইয়া ফেলে। তোমার কোনো দেবতা তাহা পারে না। আমি সেই আশ্চর্য রহস্য দেখিতে ভালবাসি, তাই আমার ঠাকুরকে আমার ঘরে ডাকিয়াছি। দেবতাকে দেখিবার চোখ যদি তোমার অন্ধ না হইত তবে তুমি খুশি হইতে।”

যাবতীয় ধর্মমোহ ও সংকীর্ণতাকে জয় করার এই খুশির অন্বেষণেই তো রবীন্দ্রনাথের হৃদয়ের রক্তক্ষরণ।

[লেখকের অন্য রচনা]

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
4 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
চন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য্য
চন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য্য
7 months ago

শ্রদ্ধেয় হিমাদ্রি বাবুর রবীন্দ্র অন্বীক্ষা আমাদের মতো রবীন্দ্রসাহিত্যোৎসাহী সাধারণ পাঠককে প্রতি মুহূর্তে ঋদ্ধ করে চলেছে। আমি অন্তত কায়মনোবাক্যে তাঁর রবীন্দ্র বিষয়ক রচনাগুলিকে দু’মলাটের মধ্যে দেখতে চাই এবং আমার ধারণা এ ব্যাপারে আমার মতো অনেকেই একই রকম উৎসাহী। প্রতিবারের মতো বর্তমান সংখ্যাতেও ওঁর গহনসঞ্চারী মন রবীন্দ্রমহাসাগরের গভীর থেকে রবীন্দ্রনাথের ধর্ম বিষয়ক বিভিন্ন মণি- মাণিক্য উদ্ধার করে একটি অত্যন্ত সুলিখিত প্রবন্ধে উপস্থিত করে আমাদের কৃতজ্ঞতাভাজন হয়েছেন। যেহেতু ওনার লেখা ভাবি প্রজন্মের কাছে প্রামাণ্য সূত্র হিসেবে ব্যবহৃত হবার যথেষ্ট কারণ রয়েছে,তাই একজন জিজ্ঞাসু হিসেবে সবিনয়ে জানাই ওনার নিম্নোক্ত উক্তি আমাকে বেশ দ্বিধাগ্ৰস্ত করে রেখেছে :
“এ যেন এক মহাকাব্যিক পরিক্রমণ! সম্ভবত হোমার সম্পর্কে এলিয়টের প্রশস্তিকে স্মরণ করেই ধীমান রাজনৈতিক ভাবুক হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় রবীন্দ্রনাথকে এমন করেই বিশেষিত করেছেন – ” Himself is a true poem.”
যতদূর মনে পড়ে উক্তিটি এলিয়টের নয় , জন মিল্টনের এবং হোমারের উদ্দেশে নয় । তাঁর বলার উদ্দেশ্য ছিল যে কোনো সৎ কবিতার মতোই কবিও হবেন একইরকম সৎ এবং শুদ্ধাচারী। কিন্তু হাতের কাছে প্রামাণ্য বই না থাকায় আমাকে গুগলের স্মরণাপন্ন হতে হল। সেখানে যা পেলাম তার নির্যাস এখানে তুলে ধরলাম। শ্রদ্ধেয় হিমাদ্রি বাবু যদি দয়া করে আমার এই সংশয় নিরসন করেন তো আমি চিরকৃতজ্ঞ থাকব :
John Milton’s famous quote, “He who would not be frustrate of his hope to write well hereafter in laudable things ought himself to be a true poem,” means that a poet aspiring to create great and praiseworthy works must first embody those qualities in their own life and character. It’s not enough to simply write about virtue and excellence; one must strive to be a living example of those ideals.
From John Milton’s “Apology for Smectymnuus”.

বিনীত
চন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য

Himadri Kumar Das Gupta
Himadri Kumar Das Gupta

 

ভেবে শ্লাঘা বোধ করছি, আমার লেখা চন্দ্রনাথবাবুদের মতো কিছু লোককে অন্তত ঋদ্ধ করে চলেছে। আমি প্রাণিত! অ্যাকাডিমিক চর্চার ক্ষেত্রে আমার মতো এমন অকিঞ্চিৎকর মানুষের পায়ের তলার মাটিটা অতটা শক্ত নয় বলেই টালমাটাল অবস্থা সামলাতে এমন করে কারও হাত বাড়িয়ে দেওয়াটায় পরিত্রাণ পাই। হ্যাঁ, মনে পড়েছে। কথাটা মিলটনের, আদৌ এলিয়টের নয়। আমার লেখার এই বিচ্যুতিকে dementia-র ঢাল দিয়ে আড়াল না করে চন্দ্রনাথবাবুর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেই শান্তি পাচ্ছি বেশ। শুধু একটা কথা। অনেকদিন আগে বইটির সমালোচনা পড়েছিলাম একটা। সেখানে নামের প্রসঙ্গে মিলটনের সঙ্গে হোমরকেও যুক্ত করা হয়েছিল মনে হয়। একটা অস্বস্তি রয়েছে। যাক, তথ্যহীন কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। হীরেনবাবুর বইটিও হাতে কাছে নেই, এখন পাওয়াও যায় না। অবশ্য সেখানেও কোনো সূত্রের উল্লেখ ছিল বলে মনে পড়ছে না। 

শুধু শেষ একটা কথা । গত রাতে হঠাৎ গুগুলে নজর পড়ল _ “HIMSELF IS A TRUE POEM is from Walt Whitman’s poem SONGS OF MYSELF” ওর বাবা! ১৯৬১ বইটির নামকরণ করতে গিয়ে তা হলে আবার হুইট্‌ম্যানকে আত্মীয় ভেবে নেননি তো হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়? কী ঝামেলা!    

Last edited 7 months ago by Himadri Kumar Das Gupta
চন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য্য
চন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য্য
Reply to  Himadri Kumar Das Gupta
7 months ago

এটাকে রবীন্দ্রনাথের ভাষা ধার করে বলা যায় ‘কৃতীর প্রমাদ’।’কাজ করি আমরা যে, তাই করি ভুল।’
শঙ্খবাবুর ‘উর্বশীর হাসি’ বইটি পড়লে দেখবেন এমন কি রবীন্দ্রজীবনীকারের মতন বিশেষজ্ঞ মানুষও জ্যোতিরীন্দ্রনাথকে রবীন্দ্রনাথের সেজদাদা বা বাল্মীকিপ্রতিভায় সরস্বতীর ভূমিকায় নেমেছিলেন প্রতিভা দেবী কে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কন্যা বলে উল্লেখ করেছেন , তাও আবার ভারতকোষের মতন বইতে। এমন অসংখ্য কৃতীর প্রমাদ সারা বইতেই ছড়িয়ে আছে।
আমার নিজস্ব মতামত এই যে হিমাদ্রি বাবুর রবীন্দ্রবিষয়ক লেখাগুলি একত্র করে সংরক্ষণ করা জরুরি , তাই আমাদেরও দায়িত্ব থেকে যায় সে বই যেন যতটা সম্ভব ত্রুটিমুক্ত হোক।
হিমাদ্রি বাবুকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম।

চন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য।

Himadri Kumar Das Gupta
Himadri Kumar Das Gupta

ধন্যবাদ