
২০২০ সাল। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জন্মের দ্বিশতবর্ষ উদযাপিত হচ্ছে। প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন পত্র পত্রিকা। এমনই একটি পত্রিকায় বিদ্যাসাগরকে নিয়ে পড়তে গিয়ে একটি নাম এবং তাঁর একটি কাজের কথা নজরে এলো। আমার পড়াশুনার পরিধি অত্যন্ত সীমিত কিন্তু তবুও কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের কোথাও বাংলার নবজাগরণের ইতিহাসে এই নাম বা ঘটনা পড়েছি বলে মনে করতে পারলাম না।খুঁজতে শুরু করলাম সেই মানুষটাকে। খুঁজতে খুঁজতে যেটুকু পেয়েছি তাই নিয়েই আজকের এই নিবন্ধের অবতারণা।
ঘটনাটা একটু গোড়া থেকেই শুরু করা যাক। তখন বিদ্যাসাগর মশায়ের বিধবা বিবাহ আন্দোলনের অভিঘাতে বঙ্গদেশ তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে।একদিকে রক্ষণশীল সমাজপতিদের বিরুদ্ধতা অন্যদিকে নব্য আলোক প্রাপ্ত যুবকদের কোমর বাঁধা লড়াই — বাধা আর বাধা অতিক্রমের নিরন্তর প্রচেষ্টায় উনিশ শতকের বঙ্গদেশের সামাজিক জীবন তখন আলোড়িত। এই সময় এক বিধবা বিবাহের ঘটনাকে কেন্দ্র করে জ্বলে উঠলো আগুন। অনেক বিধবা বিবাহ দেখেছে এদেশ কিন্তু নিজের অকাল বিধবা মাকে নিজেরই এক বন্ধুর সঙ্গে দাঁড়িয়ে থেকে বিবাহ দেওয়ার নজির বোধহয় এ দেশে বিরল । উনিশ শতকীয় বঙ্গদেশে সেই সমাজবিপ্লবটি ঘটিয়েছিলেন যিনি তিনি দুর্গামোহন– দুর্গামোহন দাশ। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের জ্যাঠামশাই।

কিন্তু তাঁর এই কাজ কুসুমাস্তীর্ণ পথে সম্ভব হয়নি। দুর্গামোহনের ইচ্ছের কথা জানাজানি হতেই তাঁর আত্মীয়-স্বজন কৌশলে তাঁর বিমাতাকে চুরি করে পাঠিয়ে দিলেন কাশীতে। কিন্তু যাঁর জীবনের মূল মন্ত্র, শিবনাথ শাস্ত্রী মশাইয়ের ভাষায়, “যখন কাজ তখন পুরা পুরা কাজ,আধাআধি নহে” তখন তাঁকে বাধা দেবার সাধ্য আছে কার? “তখন চোরের উপর বাটপাড়ি করিবার পরামর্শ স্থির হইল। অনেক ব্যয় ও অনেক কৌশলে বিমাতা কে কাশী হইতে চুরি করিয়া আনিয়া বিদ্যাসাগর মহাশয়ের সাহায্যে বিবাহ দেওয়া হইল। ওদিকে বরিশাল ও সমস্ত বঙ্গদেশ তোলপাড় হইয়া যাইতে লাগিল।” ভাগ্যহীনা এক নারীকে নতুন জীবন দেওয়ার এই মানবিক কাজের মাশুল দুর্গামোহন কে দিয়ে যেতে হয়েছে আজীবন।
এবার একটু পিছনে ফেরা যাক।দেখে নেওয়া যাক তাঁর ছোটবেলা,তাঁর পড়াশোনা এবং কিছু অনিবার্য ঘটনা,যা তাঁকে এনে ফেলেছিল নারীমুক্তি আন্দোলনের মূল স্রোতে।
দুর্গামোহন বিক্রমপুর জেলা( ঢাকা)’র তেলিরবাগ গ্রামে ১৮৪১ খ্রিস্টাব্দে নভেম্বরে জন্মগ্রহণ করেন। সেই বিক্রমপুর, যা দ্বাদশ শতাব্দীর সেন রাজাদের রাজধানী ছিল। দুর্গামোহনের পিতা কাশীশ্বর দাশ ছিলেন বরিশাল কোর্টের গভর্নমেন্ট প্লিডার। অল্প বয়সে মাতৃহীন দুর্গামোহন কিছুদিন গ্রামে গুরু মশায়ের পাঠশালায় পড়াশোনা করে বাবার কাছে বরিশালে আসেন এবং সেখানে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ে ১৪ বছর বয়সে জুনিয়র স্কলারশিপ পান। এই স্কলারশিপ নিয়ে দুর্গামোহন ভর্তি হন কলকাতার হিন্দু কলেজে। পরবর্তীকালে তিনি সিনিয়র স্কলারশিপ নিয়ে প্রেসিডেন্সি কলেজে আইন নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে আইনের প্রথম পরীক্ষা লাইসেন্সিয়েট অফ ল পাস করে দুর্গামোহন কলকাতা সদর আদালতে আইন ব্যবসা আরম্ভ করেন।তিনি আদালতে যাওয়ার জন্য রাস্তায় বের হলেই লোকে গালাগালি দিয়ে গায়ে ধুলো ছুঁড়তেও কসুর করেনি। মায়ের বিবাহ দেওয়ার অপরাধের শাস্তি তাঁকে এভাবেই মাথা পেতে নিতে হয়েছিল।পন্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রী লিখছেন,”এ সকল কষ্ট তিনি হাসিয়া সহ্য করিতেন;একটী কটূক্তিরও দ্বিরুক্তি করিতেন না;…এমনকি ছয়মাস কাল গভর্ণমেন্টের মোকদ্দমা ভিন্ন একটিও বাহিরের মোকদ্দমা পান নাই।” পসার তেমনভাবে না জমায় তিনি শেষপর্যন্ত বরিশাল ফিরে আসেন।

দুর্গামোহন যখন প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ছেন এই সময় ইতিহাসের অধ্যাপক এডওয়ার্ড কাউএল এর সংস্পর্শে তিনি খ্রীস্ট ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন। কাউএল অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর জীবনে এমনই প্রভাব বিস্তার করেন যে দুর্গামোহন একসময় সস্ত্রীক খ্রীস্টধর্ম গ্রহণ করবেন বলে মনস্থির করে ফেলেন। কলকাতায় দুর্গামোহন কালীঘাটে তার পিতৃব্য বীরেশ্বর দাশ মহাশয়ের বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করতেন।তিনি রক্ষণশীল হিন্দু। খ্রীস্ট ধর্মের প্রতি দুর্গামোহনের এই প্রবল অনুরক্তির কারণে পিতৃব্যর বাড়ি থেকে তাঁকে শেষপর্যন্ত বিতাড়িত হতে হয়। ভাই গৃহহীন জেনে এই সময় তাঁর জ্যেষ্ঠ সহোদর বরিশাল হাইকোর্টের সুপ্রসিদ্ধ উকিল কালীমোহন দাশ (প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি,এই কালিমোহন দাশ পরবর্তী কালে পরিচিত হবেন বরিশাল ব্রাহ্ম সমাজের বড় কর্তা রূপে। এবং তাঁর প্রয়াণের পর তাঁর স্মৃতিতে ‘ব্রহ্মবাদী’ পত্রিকায় জীবনানন্দ লিখবেন তাঁর জীবনের প্রথম গদ্য) তাঁকে নিজের কাছে ডেকে নেন এবং মার্কিন সাধু থিওডর পার্কারের কতগুলি বই তাঁর হাতে তুলে দিয়ে বলেন, এই বইগুলি পড়ার পর তিনি যেন মনস্থির করেন। ক্রমশঃ পার্কার তাঁর মনোভূমির দখল নিয়ে নিঃশব্দে বুনে দেন একেশ্বরাবাদের বীজ। ফলে তাঁর মনকে টেনে নেয় পার্কার প্রদর্শিত উদার আধ্যাত্মিক ও সার্বভৌমিক একেশ্বরাবাদের ধারণা। এই সময় থেকেই তিনি আকৃষ্ট হলেন ব্রাহ্মসমাজের দিকে। নিজের কিছু বন্ধুবান্ধবকে সঙ্গে নিয়ে দুর্গামোহন স্থাপন করলেন বরিশাল ব্রাহ্মসমাজ। এই ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠা ও ব্রাহ্ম আন্দোলনের মধ্যে দিয়েই তাঁর জীবনের অভিমুখ নির্দিষ্ট হয়ে যায়। তাঁর ব্যক্তিত্বের চুম্বকীয় আকর্ষণে ও নেতৃত্ব গুনে বরিশালের নব্য যুবক দল একের পর এক অসবর্ণবিবাহ ও বিধবা বিবাহের ঘটনার মধ্য দিয়ে সাড়া ফেলে দেন– এতটাই যে, কলকাতার ব্রাহ্মগণও সেই দৃষ্টান্তে উৎসাহিত হয়ে উঠেছিলেন।
এবারে দেখে নেওয়া যাক,দুর্গামোহন যখন কলকাতায় এসে পৌঁছচ্ছেন তখন নারীশিক্ষা এবং নারীমুক্তি আন্দোলনের অভিমুখ কেমন ছিল।
উনবিংশ শতাব্দীর ৭০ এর দশকে নারী শিক্ষা ও স্বাধীনতার আন্দোলন একটা অন্য মাত্রা ছুঁয়েছিল। ততদিনে কেশবচন্দ্র সেনের নেতৃত্বে উদারনৈতিক আন্দোলনের প্রশ্নে মহর্ষী দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্রাহ্মসমাজ ভেঙে ‘ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ’ গঠিত হয়েছে । ১৮৭০ এর অক্টোবর মাসে ইংল্যান্ড থেকে দেশে ফিরে কেশবচন্দ্র সাধারণ এবং কারিগরি শিক্ষার প্রচলন, সুলভ সাহিত্য প্রচার, সুরাপান নিবারণ, নারী জাতির উন্নয়নের জন্য তাদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের নীতি –এই লক্ষ্য গুলি সামনে রেখে ব্রাহ্মসমাজ আন্দোলন পরিচালিত করছিলেন। এইরকম একটি আবহে ১৮৭০– ৭১ সালে দুর্গামোহন কলকাতায় এসে উপস্থিত হলেন। তাঁর আগমনের সঙ্গে সঙ্গে কলকাতার সমাজ সংস্কারার্থী ব্রাহ্মদের দলের তিনিই হয়ে উঠলেন মধ্যমণি। ইতিপূর্বে নারী জাতির মধ্যে আধুনিক শিক্ষা বিস্তারের প্রশ্নে কেশবচন্দ্রের সঙ্গে শিবনাথ শাস্ত্রীদের যে মতপার্থকের সূত্রপাত হয়েছিল দুর্গামোহন কলকাতায় আসার পর তাইই বিরোধের শীর্ষ দেশ স্পর্শ করলো। উনিশ শতকে নারী শিক্ষা বা তার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সাধারণের কী ধারণা ছিল সেদিকে যদি একটু দৃষ্টি দিই তাহলে দেখব,প্রথা জীর্ণ, অবসাদগ্রস্থ ,হাজারো কুসংস্কারে আচ্ছন্ন বাঙালি সমাজের উত্তরণে কি অসম্ভব কণ্টকাকীর্ণ পথে দুর্গামোহনদের হেঁটে যেতে হয়েছিল।

স্ত্রী শিক্ষার বিরুদ্ধে বাঙালি হিন্দু সমাজে তখন জমাট বাঁধা সংস্কার । শিবনাথ শাস্ত্রী তাঁর আত্মজীবনীতে অকপটে লিখেছেন সে কথা। লেখাপড়া শিখলে মেয়েরা বিধবা হবে, কুলত্যাগিনী হবে, ঘর সংসারে মন না দিয়ে বিলাস ব্যসনে মেতে উঠবে — এমন সব বিচিত্র ধারণা পোষণ করতেন সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ, সেখানে অবতলের মানুষ আর টিকিধারী শাস্ত্রজ্ঞ ব্রাহ্মণ পন্ডিতদের মধ্যে বিশেষ পার্থক্য কিছু ছিল না। রসিকতা বা টিকা টিপ্পনীও কিছু কম হতো না। নাট্যকার রামনারায়ণ রসিকতা করে বাবুদের মজলিসে বসে বলতেন,” বাপরে বাপ, মেয়েছেলেকে লেখাপড়া শিখালে কি আর রক্ষা আছে ? এক ‘আন’ শিখাইয়া রক্ষা নাই,চাল আন,ডাল আন, কাপড় আন করিয়া অস্থির করে। অন্য অক্ষর গুলো শেখালে কি আর রক্ষা আছে?” আসলে মেয়েদের শিক্ষা হতে পারে বড়জোর একটা সীমাবদ্ধ পরিসরের মধ্যে। ধোপার হিসাবটা রাখতে পারে, বাজারের হিসাবটা দেখতে পারে, সংসারে কারো শরীর খারাপ হলে চিঠি লিখে খবরটা দিতে পারে — ব্যাস,এতেই নারীজাতির উদ্ধার সম্পূর্ণ!
উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বাঙালি সমাজে মোটামুটিভাবে দু ধরণের স্ত্রী শিক্ষা প্রচলিত ছিল। প্রথম ধরণের শিক্ষার সঙ্গে ধর্মের কোন সংস্রব ছিল না। ধর্মসংস্রবহীন এই ধরনের শিক্ষা দেওয়া হতো বেথুন স্কুলে, বিদ্যাসাগর প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন বালিকা বিদ্যালয় এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আর দ্বিতীয় ধরনের শিক্ষা ছিল ধর্মের নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ। কেশবচন্দ্র ও তাঁর অনুগামীরা বিশ্বাস করতেন,’ ধর্মশূন্য শিক্ষা শিক্ষাই নহে, সে শিক্ষা অধঃপতনের মূল’। কেশবচন্দ্র নারী ও পুরুষের শিক্ষনীয় বিষয়ের স্বাতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি মনে করতেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচির অন্তর্গত উচ্চ গণিত, জ্যামিতি, লজিক, মেটাফিজিক্স প্রভৃতির পাঠ গ্রহণ নারীদের পক্ষে অপ্রয়োজনীয়। স্ত্রী শিক্ষার এই পদ্ধতি নিয়ে প্রগতিশীল ব্রাহ্মদের সঙ্গে কেশবচন্দ্রের বিরোধ,প্রথমে শিবনাথ শাস্ত্রীদের সঙ্গে পরবর্তীতে সংঘাতের অপরপ্রান্তে এসে পড়েন আনন্দমোহন বসু, দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায় এবং সর্বোপরি দুর্গামোহন দাশ।
নারীদের উচ্চ শিক্ষা দেওয়ার আকাঙ্খায় ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে ২২ নম্বর বেনেপুকুর লেনে মাত্র পাঁচটি ছাত্রী নিয়ে প্রতিষ্ঠা হয় ‘হিন্দু মহিলা বিদ্যালয়’ নামে এক উচ্চ শ্রেণীর বোর্ডিং স্কুল। বিলাত থেকে নবাগতা মিস এক্রয়েড বিদ্যালয়টির সুপারিনটেনডেন্ট এবং ‘অবলা বান্ধব’ দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায় বিদ্যালয়ের পন্ডিত নিযুক্ত হন। এই বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠায় আর্থিক সাহায্যে উদারভাবে এগিয়ে আসেন দুর্গামোহন। যদিও এই বিদ্যালয়টি বেশীদিন চলেনি।বরিশালের জজ বেভেরিজ সাহেবের সঙ্গে এক্রয়েডের বিবাহের পর ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে এটি বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু নারীমুক্তি যাঁর জীবনের ব্রত তিনি হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন কী করে? মাত্র দু মাসের মধ্যেই দ্বারকানাথ ও আনন্দমোহন বসুকে সঙ্গে নিয়ে দুর্গামোহন ১লা জুন, ওল্ড বালিগঞ্জ রোডে পুনরায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিকে অনুসরণ করে নারীদের জন্য ‘বঙ্গমহিলা বিদ্যালয়’ নামে স্বতন্ত্র একটি বিদ্যালয় স্থাপন করলেন। শুধু বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাই নয় দুর্গামোহন তাঁর দুই কন্যা– আবলা(পরবর্তীতে আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর স্ত্রী লেডি অবলা বসু )ও সরলা(পরবর্তীতে ডঃপ্রসন্ন রায়ের স্ত্রী)কে এই বিদ্যালয়ে ভর্তিও করে দিলেন ।এই বিদ্যালয়ের কার্যপ্রণালী বিষয়ে কিছু বিবরণ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রী শিবনাথ শাস্ত্রীর কন্যা হেমলতা দেবীর লেখা থেকে পাওয়া যায়। তিনি লিখছেন যে, সারাদিনে মেয়েরা এখানে একটিও বাংলা কথা বলতে পারত না। বাংলায় কেউ কথা বললে তার গলায় কালো রঙের পদক ঝুলিয়ে দেওয়া হতো। দিনের শেষে যে মেয়ের গলায় কালো পদক ঝুলত সে পেতো ব্ল্যাক মার্ক। ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দের ১লা আগস্ট বঙ্গমহিলা বিদ্যালয় বেথুন স্কুলের সঙ্গে মিশে যায়।

দুর্গামোহনের চরিত্রের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর কথা ও কাজের মধ্যে কোন স্ববিরোধ ছিল না। যে নারী শিক্ষা ও স্বাধীনতার জন্য তিনি গোটা জীবন ব্যয় করলেন, সেই পরিবেশ সবার আগে তিনি নিজের পরিবারের মধ্যে গড়ে তুলেছিলেন। নিজের কন্যাদের শিক্ষিত করা তো বটেই তাছাড়া তাঁর সমস্ত প্রথাভাঙ্গা কাজের সঙ্গী করেছিলেন স্ত্রী ব্রহ্মময়ী কেও; সে কাউএলের সংস্পর্শে খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণের পরিকল্পনাই হোক বা কেশবচন্দ্রের ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মমন্দিরের মধ্যে প্রকাশ্য স্থানে মহিলাদের বসবার আসন নির্দিষ্ট করতে বিলম্বের জন্য মন্দিরের উপাসনা কালে পুরুষ উপাসকদের মধ্যে সস্ত্রীক আসন গ্রহণ করে হুলস্থুল বাধানোই হোক –দুর্গামোহন তাঁর সমাজ বিপ্লবের কাজে সঙ্গী করেছিলেন নিজের স্ত্রীকে। এমনকি বঙ্গ মহিলা বিদ্যালয় এর ছাত্রীদের সবচেয়ে কাছের মানুষও হয়ে উঠেছিলেন ব্রহ্মময়ী স্বয়ং। শিবনাথ শাস্ত্রী লিখছেন, “ছুটির দিনে তাঁহার গৃহই বালিকা দিগের বিশ্রাম ও বিনোদনের স্থান হইত। সে সময়ে তাঁহার ভবনে পদার্পণ করিলেই দেখা যাইত যে ব্রহ্মময়ী স্বীয় ও অপরের কন্যা বৃন্দে পরিবৃত হইয়া রহিয়াছেন। তাঁহাকে আবেষ্টন করিয়া তাহাদের কি আনন্দ!” এই একটি ক্ষেত্রে দুর্গামোহন সম্ভবত বিদ্যাসাগর কেউ ছাপিয়ে গিয়েছেন।বিদ্যাসাগর তাঁর নিজের কর্মক্ষেত্রে ছিলেন একমেবদ্বিতীয়ম। কিন্তু সামাজিক কোনো কাজেই তিনি তাঁর পরিবারকে সংযুক্ত করতে পারেননি।বিধবা বিবাহ প্রসঙ্গে আর একটা কথা উল্লেখের দাবি রাখে, বাংলাদেশে বিধবা বিবাহ প্রচলনের জন্য দুর্গামোহন যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছিলেন একমাত্র বিদ্যাসাগর ছাড়া আর কেউ তা করেননি।
শুধু সমাজ, শিক্ষা আন্দোলন ই নয়, উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য আমাদের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি– যা পরবর্তীতে জাতীয়তাবাদের জাগরণে বড় ভূমিকা নেবে।এ ক্ষেত্রেও আমরা আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করি দুর্গামোহনের সচেতন সক্রিয়তা। যখন আমাদের দেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে উঠছে, বিশেষ করে শিশির কুমার ঘোষ ও শম্ভূচরণ মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ‘দ্য ইন্ডিয়ান লীগ’ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে ১৮৭৫ এর সেপ্টেম্বরে, আনন্দমোহন বসুর সঙ্গে সেই রাজনৈতিক সংগঠনে যোগ দিচ্ছেন দুর্গামোহন। শুধু তাইই নয়। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রতিষ্ঠিত ‘ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন’এরও সক্রিয় সমর্থক ছিলেন দুর্গামোহন।এ প্রসঙ্গে মাননীয় পাঠক,একটা কথা স্মরণ করতে অনুরোধ করব — সুরেন্দ্রনাথ ও তাঁর ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েনের রাজনৈতিক কার্যক্রমই যে ১৮৮৩’র কলকাতা সম্মেলনের পরবর্তী কালে ‘জাতীয় কংগ্রেস’প্রতিষ্ঠার ভিত্তি ভূমি রচনা করেছিল — একথা ইতিহাস স্বীকৃত। সুতরাং একথা বললে কি খুব বেশী বলা হবে,আমাদের জাতীয়তাবাদের জাগরণে যে সমস্ত মণিষী প্রাতঃস্মরণীয় দুর্গামোহন তাঁদেরও একজন?
এতক্ষণ আমরা সমাজ সংস্কারক, নারীমুক্তি আন্দোলনের পুরোধা, জাতীয়তাবাদী রাজনীতিমনষ্ক দুর্গামোহনের পরিচয় পেয়েছি।সমাজের বৃহত্তর প্রেক্ষিত ছাড়িয়ে ক্ষুদ্র পারিবারিক প্রেক্ষাপটে দাঁড় করিয়েও যদি আমরা দুর্গামোহনের দিকে তাকাই তাহলে দেখব, সেখানেও তিনি কতটা পরিপূর্ণ পারিবারিক মানুষ ছিলেন।১৮৭৫ খ্রীষ্টাব্দে সকল কাজের সঙ্গী স্ত্রী ব্রহ্মময়ীর অকাল প্রয়াণ দুর্গামোহন কে সাময়িক ভাবে অবিন্যস্ত করে দিলেও তিনি স্ত্রীর অবর্তমানে পারিবারিক দায়িত্ব পালনের কর্তব্য নিষ্ঠা থেকে দূরে সরে যাননি।তাঁর কন্যাদের শিক্ষিত করার পাশাপাশি দায়িত্ব নিয়ে সৎপাত্রস্থ করেছেন(ডঃপ্রসন্ন রায়, বিজ্ঞানী আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু ছিলেন তাঁর জামাতা,আগেই উল্লেখ করেছি)।তিন পুত্র কে বিলাত থেকে ব্যারিস্টারী পাশ করিয়ে এনে নিজের নিজের আইন ব্যবসায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন।ছেলে মেয়েদের নিজের নিজের সংসারে প্রতিষ্ঠিত করার পর এবার তিনি প্রকৃতই নিঃসঙ্গ হয়ে পড়লেন।সেই নিঃসঙ্গতা দূর করতে দুর্গামোহন দ্বিতীয় বিবাহের সিদ্ধান্ত নিলেন।এতদিন তিনি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে অসংখ্য বিধবা বিবাহ দিয়েছেন।এবারে নিজেই করলেন বিধবা-বিবাহ।সেই সময়ে ঢাকার কালীনারায়ণ গুপ্তের বিধবা কন্যা হেমন্তশশী সেনকে তিনি বিবাহ করেন,যিনি ছিলেন গীতিকার অতুল প্রসাদ সেনের মা।যদিও এই বিবাহ নিয়েও তাঁকে অনেক সামাজিক নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছিল।
১৮৮৮ সালের পর থেকেই তাঁর স্বাস্থ্য ভেঙে পড়তে থাকে।১৮৯৭ খ্রীঃ ১৯ শে ডিসেম্বর এই মহাপ্রাণের দেহাবসান হয়।মৃত্যুর পূর্বে তিনি তাঁর ব্যক্তিগত জীবন দর্শন প্রসঙ্গে বিনয়ের সঙ্গে বলেছিলেন,”ধর্মের উঁচু উঁচু কথা অধিক জানিনা;ধর্মের গূঢ় তত্ব অধিক বুঝিনা;পার্কার দুই চারিটি কথা শিখাইয়া গিয়াছেন,তাহাই ধ্যানে জ্ঞানে রাখিয়াছি,–একটা কথা এই, মনে,বাক্যে,কার্য্যে খাঁটি থাকিতে হইবে।দ্বিতীয় কথা এই — জীবনের কর্তব্য সুচারু রূপে পালন করিয়া ঈশ্বরের পূজার উপযুক্ত হইতে হইবে।”
এরকম একজন আপোষহীন,উদারচেতা,কর্তব্যনিষ্ঠ ও স্বদেশপ্রেমিক মানুষ কে কত সহজেই আমরা ভুলে যেতে পেরেছি!
—————————————————————-
তথ্য ঋণঃ
১.রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গ সমাজ। -শিবনাথ শাস্ত্রী।
২.বাঙালী সমাজে স্ত্রী শিক্ষাঃশিবনাথ শাস্ত্রীর ভূমিকা।-স্বপন বসু।
৩.শিবনাথ শাস্ত্রীঃ সমাজ সেবা ও সমাজ সংস্কার।-রাখাল চন্দ্র নাথ।
৪.সংসদ বাঙালী চরিতাভিধান।
—————————————————————–
[লেখকের অন্য রচনা]
একটি জানলা খুলে গেল। কত অল্প জানার পরিধি আমাদের বারবার তাই জানিয়ে দেন গবেষকরা। কৃতজ্ঞতা রইল ।
আপনার মন্তব্যটির জন্য ধন্যবাদ।
অনেক ধন্যবাদ।
বাংলার নবজাগরণের পুরোধা প্রাতঃস্মরণীয় ঈশ্বরচন্দ্রের
পরবর্তীকালে স্ত্রীশিক্ষা ও স্ত্রীস্বাধীনতার জন্য যাঁরা সংগ্রাম
করেছিলেন তাঁদের মধ্যে দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায় দুর্গামোহন দাশ শিবনাথশাস্ত্রীপ্রমুখ মহান্ মনীষীগণের জীবনেতিহাসের প্রতি বর্তমান শতকের প্রজন্মকে
উৎসাহিত করার জন্য নিবন্ধকারকে শ্রদ্ধা জানাই।
নমস্কার নেবেন। অনেক ধন্যবাদ।