
কবি জীবনানন্দ দাশ স্মরণে
কার্তিকের জ্যোৎস্নার ভিতরে তিনি আজ। কুয়াশার বুকে বেজে চলেছে একটানা কোমল গান্ধার। এখন সন্ধে। অনেক বাদামি পাতা ঘাসের ভিতরে ক্লান্তিকে পাশে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে কোনোদিন ফিরবে না বলে তার নিজস্ব নির্মাণে। এই আলো অন্ধকারে তিনি এসে দাঁড়ালেন।
আজ তিনি একান্তই নিজের সঙ্গে, একা। কী এক ইশারা মনে রেখে অনেক নিঃশব্দ কথোপকথনে হেঁটে চলেছেন রাসবিহারী মোড়ের দিকে, ওপারে দেশপ্রিয় পার্ক। যদিও অনেক দেখেছেন তিনি হেঁটে হেঁটে হেঁটে ট্রাম-বাস সব ঠিক চলে। দূর থেকে ঘণ্টাধ্বনির মতো অবিরত সংকেত নক্ষত্রের মিহি সংগীতের মতো তাঁর স্নায়ুতে ছড়িয়ে পড়ছিল ।
বহুকাল ঘুম নেই চোখে। দিনগুলি তার সব ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে কীর্তিনাশার দিকে উড়ে চলে যায়। রাত্রিগুলি নৈঃশব্দের ঝরে পড়া অক্ষরসমূহ যেখান থেকে তিনি কুড়িয়ে নিয়ে গড়ে তোলেন তাঁর অন্তর্গত মূর্তিগুলি, ভেঙে ফেলেন আবার গড়েন, একবার, দুইবার, তিনবার, চারবার, বারবার। এই নিয়ে হাজার বছর পরিক্রমা তাঁর …
দূর থেকে ট্রামের অবিরাম ঘণ্টাধ্বনি তাঁকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল অতিদূর সন্ধের মন্দিরের দিকে। ঘুম এসে জড়িয়ে ধরে তাঁকে সবচেয়ে রূপসী মৎস্যনারীর মতো, গায়ে তার ক্ষান্ত সমুদ্রের ঘ্রাণ । তার কঠিন গ্ৰন্থীতে গ্ৰন্থীতে তিনি জড়িয়ে যাচ্ছেন, ঢুকে পড়ছেন পরীদের মতো সুন্দরী ট্রামের ক্যাচারে, ঘুম, কী নিশ্চিন্ত ঘুম, হাজার ব্যস্ত বছরের পর। কেউ এসে তাঁর নাড়ীতে হাত রাখে, স্পন্দন পায়, কিন্তু কিছুতেই খুঁজে পায় না তাঁর বেদনার জায়গাটি। তিনি এখন হাসপাতালে, শোনা গেল লাশকাটা ঘরে নিয়ে গেছে তারে; তাঁর ভাঙচুর দেহ, ক্লান্ত মাথার খুলি। চাঁদ ডুবে গেলে – অদ্ভুত আঁধারে, কালপুরুষ সবার অলক্ষ্যে নেমে এসে দু হাত পেতে কুড়িয়ে নিচ্ছিল কার্তিকের জ্যোৎস্নার ভিতরে উড়তে থাকা তাঁর অমুদ্রিত অক্ষরগুলি ।
তিনি তখন ফিনিক্স পাখির মতো উড়ে চলেছেন ভাবীকালের দিকে।
[লেখকের অন্য রচনা]
এমন এক কবির সন্দর্ভে রচনা যার যেকোন একটি পদ্য পংক্তি অবলম্বন করে সৃষ্টি হতে পারে আরেকটি নবীন পদ্য। কবি জীবনানন্দের গহন অধ্যয়ন করেছেন আজকের কবি। আমি চন্দ্রাহত।
খুবই হৃদয়স্পর্শী মন ছুয়ে যাওয়া একটি লেখা