শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

চাঁদসোহাগীর প্রলাপ

এই প্রথম সেদিন চাঁদ দেখার সাহস পাইনি l এমন কখনও হয়না আমার, ঝিমধরা হৈমন্তী সন্ধ্যায় বুড়িসুড়ি চাঁদ আমার জানালায় এসে তার নড়বড়ে মাথা দোলায়, আমি দেখেছি l অথবা কোনও কার্তিকী পূর্ণিমায় যখন ছাদ ভেসে যায় জ্যোচ্ছনায়, তখন আমি চুপিচাপি সিঁড়ি বেয়ে চিরসখা চাঁদ দেখতে উঠি l জ্যোৎস্না মাখতে আমি বড় ভালোবাসি l বলেছি কিনা, চাঁদের আলোয় কী কী যেন সব হয় আমার l সেই মেয়েবেলা থেকেই l বিভ্রম l

আমি ছাদময় পার্বতী পিসি আর তার পরী বন্ধুদের নাচ দেখতে থাকি l তাদের মাথায় চাঁদের ফুল ঝরে যায়, সারা গায়ে তারার মালা পরে তারা ইনিয়ে বিনিয়ে এদিকে ওদিকে তা থৈ পা ফেলে ফেলে নেচে যায় l তোমরা ভাববে, মেঘ চাঁদের নুকোচুরি খেলায় আমি ছায়াবাজি দেখছি বুঝি l ওগো তা নয়, এ সেই সেদিনের কথা l যেদিন আমরা জোছনা পোহাতে গিয়ে পার্বতী পিসির সাধের জ্যোছনাসঙ্গমে বাধা হয়ে ছিলাম, সেদিনের কথা l প্রথমে কেঁদেকেটে একসা হয়ে আমাদের বকুনি দিলো পিসি – ‘ওরে তোদের তো সব আছে রে, ঘর বর, সংসার, স্বজন সব সব তবু তোরা আমার একটুকু জোছনে ভাগ বসাতে আসিস কেন যে, মুখপুড়িরা!’ আমরা হতবাক l তুর তুর পায়ে ছাদ থেকে নেমে এসেছি সেই রাতে l আড়াল আবডাল থেকে দেখেছি পার্বতী পিসির একা একা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে, হেসে কেঁদে, হেলিয়ে দুলিয়ে সারা ছাদ জুড়ে নাচের হিল্লোল l যেন এক আলোর সাগর ফেনিয়ে উঠেছে ছাদ জুড়ে l তার আলো ঠিকরে উঠেছে ওর গালে, কপালে, সাদা থানখানি বেয়ে, ঝুমঝুমে কালো চুলের বন্যায় l নাচতে নাচতে কখন ছাদে ঘুরে পড়েছে কে জানে l পরদিন আর পার্বতী পিসির হদিশ মেলেনি l দাদুভাই কেমন জড়ানো গলায় বিড় বিড় করেছে – বলেছে – ‘শেষে উড়ে গেলো পাগলী মেয়েটা, হয়তো পাখা গজিয়েছে l’

ছাদে উঠলে আমার আজও কেমন যেন লাগে, ঠিক ভয় নয় … কারও আসার অপেক্ষায় ছাদটা হুমহুম করে l বিশেষ করে পূর্ণিমায় l মা লক্ষ্মীর সাদা পেঁচাটি আমাকে দেখলেই উড়ে এসে বসে কার্ণিশে l হুট হুট্ হুট্ হুট্ করে একটানা কথা বলে কত্ত l আমি জোছনা পাগলী মেয়ে, ঘুরে ঘুরে আলো মাখি l দিম্মির কথা মনে করে l জ্যোছনা রূপটান নিলে সুন্দর দেখতে হয় … এমন সব কথা মনে ভাসে l আমি দলা দলা জোছনা খাই আইসক্রিমের মতো l চাঁদের আলিঙ্গনে আমি বয়ে যাই l চাঁদ আমাকে ভালোবাসে, তাই পূর্ণিমায়, ও আমার ছাদে, আঙিনায়, বারান্দায়, কার্ণিশে ছেয়ে যায়, অনন্ত আলো ঢেলে দিয়ে যায় ভালোবেসে l বাড়ির সব্বাই ঘুমুলে আমি ছাদে উঠে জোছনা পোহাই l চাঁদসোহাগী মেয়েরা এমনই হয় বুঝি l এসব বড় গোপন কথা, তাই বলি না কাউকেই l

কিন্তু, আজ এমন হল কেন? চাঁদেরও মন খারাপ হয় বুঝি l আজ আকাশে সে ভেসেও ভাসেনি, আমি শতবার ডাকলেও, এসেও আসেনি l চারিদিকের পৃথিবীতে এত অশান্তি, এত বিবাদ, এত মারামারি, হানাহানি, ঝঞ্ঝা, ভূমিকম্প, মৃত্যু!! বেচারা চাঁদ, সে নরম মনের মানুষ, তার এত সইবে কেন? আজ পূর্ণিমাতেও সে মুখ কালো করে ফেলেছে তাই l তবু, শান্ত মানুষেরও বুঝি রাগ আসে l তাই রক্তাভ চাঁদ হয়ে সে ঝুলে রয়েছে আকাশে!

সবাই বলেছে, লাল চাঁদ, অমনই ক্যামেরাবন্দী করে তাক লাগাতে চেয়েছে অন্য মানুষদের l

তাই আজ চাঁদ দেখিনি আমি l অভিমানে l অমন রূপ আমার চাইনে l অঝোরে রুধিরধারা বয়ে চলেছে তার গা বেয়ে l রক্তমাখা চাঁদ l এতদিনের জমে থাকা কালো কালো ছায়া ছায়া ব্যথা আজ শোণিতস্রোত বইয়ে দিয়েছে চাঁদের হৃদয় জুড়ে l সকল প্রাণীর দুঃখে বুঝি দু চোখ বেয়ে রক্তনদী বয়েছে তার l

আহা গো আমার রজনীকান্ত শশী !! তুমি আবার নির্মল হয়ে উঠবে কবে? ঝকঝকে ফটফটে জোছনা ঝরিয়ে সোহাগ জানাবে কবে, হ্যাঁ?

অপেক্ষাতে প্রেম বৃদ্ধি পায় l

হা চাঁদ …

আবারও এক পৌর্ণমাসীর অপেক্ষা!!

[লেখকের অন্য রচনা]

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.