
ফটফটে সাদা রঙের একটা বাগান বাড়ির সামনে নিয়ে গিয়ে হাজির হলেন সিদোনির স্বামী l এসেই “কেউ আছেন, কেউ আছেন গো বাড়িতে” বলে, বাইরে থেকেই বিরাট ডাকাডাকি l বিকেল বিকেল ওরা পৌঁছেছে এখানে l মোরাম বিছানো পথ l চারিদিকে অন্ধকার করে এসেছে বাগানের গাছের সমারোহে l বাড়িতে একটা পুরোনো ম্যানশনের ছোঁয়া l সিদোনির মনে হলো হয়তো বা সেই আবছায়া সিঁড়ি বেয়ে যারা দাঁড়িয়ে থাকে কেবলই, এবং শোনে, সেই তারাই বুঝি ওদের ডাকাডাকি চুপ করে শুনছে l ডি লা মেয়র এর কবিতা মনে আসতেই পিঠ বেয়ে এক শীতল স্রোত নেমে আসে l ভয় কি, স্বামী রয়েছেন সঙ্গে আর এ বাড়ির কেউ নিশ্চয় এখনই নেমে আসবে l
“ও কি, তুমি যে ভয় পেয়ে গেলে” বলেই মুখচুম্বন করলেন মসিয়েঁ জোভেনেল l সিদোনেকে খুশি রাখতেই হবে l
“এমন ভয় পেলে চলবে? আচ্ছা আচ্ছা, এই দেখো তো, আমার কোটের পকেটে হাত গলিয়ে কিছু পাও কিনা l” মসিয়েঁর চুমড়োনো গোঁফ কোলেটের নাকে সুড়সুড়ি দিয়ে ততক্ষণে ওকে হাঁচিয়ে ছেড়েছে l “উফ কী যে করো না তুমি” সিদোনির কণ্ঠে আহ্লাদী বিরক্তি l “ওও এ যে একখানা চাবি গো l” স্বামী কিন্তু ততক্ষণে সিদোনিকে বেমক্কা চমকে দিয়ে, সেই বড়ো চাবিখানা দিয়ে দরজা খুলে ফেলেছেন একেবারে l
“এসো এসো” বলে ডেকে নিয়ে গেছেন সিদোনিকে ঘরের মধ্যে l
স্বামীর কিঞ্চিৎ খামখেয়ালিপনার আন্দাজ আছে সিদোনির l কিন্তু তাই বলে অন্য কারো
বাড়িতে এমন ভাবে ঢোকা? “এই নাও, এই তোমার বাড়িঘর” লেখার জায়গা নেই বলো,
হা হা হা হা, তোমার তো আবার এই গাছগাছালি বেশি পছন্দের, তাই না? নাও লেখো, যত্ত খুশি, কেউ বাধা দেবে না l
“মানে? কী বলছো???
এই সত্যি বলছো?”
আমার লেখার জন্যে কিনেছো এই বাড়িঘর? কি সুন্দর !” প্রতিটি ঘর ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকে সিদোনি l

“এই তো এই জানালার পাশে থাকবে আমার লেখার টেবিল, এইখানটিতে সক্কাল সক্কাল বসে লিখবো l আর ওই যে দ্যাখো, ওই বাগানে বার্চ গাছে তলায়, বসে লিখবো দুপুর দুপুর l এক দুপ্পুর লেখা লিখে তবেই শান্তি l তুমি নিশ্চয়ই, তখন বিশ্রাম নেবে l আর সন্ধ্যেবেলা বসবো এই ঘরটাতে l আরাম করে সোফাতে বসে লিখতে দারুন লাগবে l আর তুমি মুখের সামনে ধরবে ধূমায়িত কফি, কেমন ভালো না?” বলেই মুখ টিপে হাসে সিদোনি l স্বামী আগ্রহ নিয়ে বলেন l “হ্যাঁ হ্যাঁ তা নয় তো কি? আমার তো তোমার লেখা নিয়ে কথা l যত লিখবে, তত। ওই দ্যাখো না কত আগে থেকে মিস্ত্রি লাগিয়ে কাজ শুরু করেছি, তোমাকে চমকে দেব বলেই না ?”
“তাহলে ফার্স্ট ড্রাফট কবে জমা দিচ্ছ ডিয়ার?” স্বামীর কণ্ঠে এই অযাচিত আগ্রহ ভালো লাগে না সিদোনির l “বসবো গো, সবে তো নতুন বাড়িতে এলাম l কৃতজ্ঞ তোমার কাছে, একটু দেখে শুনে নিয়ে, সব কিছু গুছিয়ে লিখতে বসবো ঠিক দেখো l”
মুহূর্তের মধ্যে গিরগিটির মতো রঙ বদলায়, মসিয়েঁ জোভেনেল l
গলা সপ্তমে উঠেছে তার l

“তুমি এই মুহূর্তে লিখতে বসবে l”
তড়িৎ গতিতে টেবিলের ওপর লেখার কাগজ কুইল দোয়াত এনে রেখে দিয়ে বলে ওঠে, “রইলো এ সব, লেখা শুরু করো এই মুহূর্তে আর দরজাও বন্ধ থাকবে l শুধু মাঝে মাঝে খাবার পেয়ে যাবে যখন যেমন দরকার l” আর তারপর দরজা বন্ধ হয়ে যায় l জেদি বাঘিনীর মতো সেই দরজায় মাথা কুটে মরতে থাকে সিদোনি l
তবু কা কস্য l ওই বিশাল বাড়িটার প্রতিটি অন্দরে কন্দরে তার আকুল মিনতি খান খান হয়ে ছড়িয়ে পড়তে থাকে l

একটা শব্দও লিখতে পারেনি সিদোনি l রাত জেগে জেগে তাকিয়ে থাকে সে আর অনুভবে বুঝতে পারে রাতে নিশুতিরা গুমরে কাঁদে সেই বাড়ির এটিকে, টারেটের মধ্যে, বাড়ির নিচের গুম ঘরে l আর সেই অশরীরীর দল, চাঁদের আবছা আলোয় সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে অনন্তকাল অপেক্ষা করতে থাকে কার জন্য, কে জানে l তবু সিদোনের মরমী মন কেমন যেন ভেবে নেয়, ওরা ওর সহচর, সমব্যথী l
খাবার দিয়ে গেছে মসিয়েঁ l ছুঁয়েও দেখেনি সিদোনে l কাল যা হবার হবে l
সে লেখক l লিখতে তাকে হবেই l জীবনের যত ব্যথা পুঞ্জীভূত কালো রক্তের ফোঁটা হয়ে নামবে আঙুল বেয়ে l লিখতে থাকবে, যতক্ষণ না ব্যথার কণিকারা মিলিয়ে যায় শরীর থেকে l আবার নতুন ব্যথা জমা হলে, লিখবে আবার l
শব্দ প্রসবের মতো এমন যন্ত্রনা আর নেই l লেখক মাত্রেই জানে, সে ভারী নিভৃত, জারজ যন্ত্রনা, যার থেকে মরণ ছাড়া মুক্তি নেই l তাই পলে পলে অব্যক্ত, অহল্যা শব্দ নিয়ে নিয়ে ভারী হয়ে ওঠে গর্ভবতী সময় l
ঘর মিলেছে সিদোনির, কিন্তু লেখকের সত্ত্বা গেছে হারিয়ে l এ সব লেখা ছাপা হবে মসিয়েঁ জুভেনেলের নামে l যত হাততালি, যত প্রশংসা, যত টাকাকড়ি, সবকিছু মসিয়েঁরই l
সিদোনি একজন গোস্ট রাইটার l
(ফ্রেঞ্চ লেখিকা কোলেটের জীবনী অবলম্বনে)

