দূর থেকে মোক্ষ ভবনের গেটটা চোখে পড়ল হরিতের। বহু দূর থেকে আসছে হরিতপ্রসাদ মাকে নিয়ে এই মোক্ষ ভবনে। রয়টারের খবর, বারাণসীর এই ঐতিহ্যবাহী মোক্ষ ভবন, এ যাবৎ ১৪,৫৭৮ বৃদ্ধ বৃদ্ধা মুমূর্ষুকে গঙ্গালাভ করিয়ে ছেড়েছে। সব আয়োজন আছে এখানেই, এই বাড়িটিতে । তবে শর্তও আছে, এখানে এসে দিন কুড়ির মধ্যে পঞ্চত্বপ্রাপ্তি না ঘটলে ফিরে যেতে হবে। তা ফিরে কি আর যায় গো কেউ? ওই পুণ্যসলিলা গঙ্গার যে কোনো ঘাটে আশ্রয় নেয়। বাড়ির লোকজন অনেকসময় ফেলে চলেও যায়। তাদের বুঝি আর কাজকম্ম নেই ? বুড়ো বুড়িগুলো শুদুমুদু বসে থাকে। ঘাটে বড়লোক শেঠ শেঠানি বস্ত্র বিলোয়, খাবার দেয়, তাই খেয়েই দিনযাপন। অনেকের জীবনের মোড় ঘুরে যায় এইভাবেই আর কি । তা হরিত এই আশাতেই মোক্ষদাকে এনেছে যে মা নিশ্চয়ই দিন কুড়ির মধ্যেই গত হবেন। মায়েরও প্রবল ইচ্ছে সেটাই। হরিতের বাবাও গিয়েছিলেন এই ভাবেই। প্রাচীন কালের গঙ্গাযাত্রা আর কি। সেকালে, গঙ্গাযাত্রার সময়ে, গঙ্গার কূলে অর্ধমৃত দেহটির অর্ধেক ভাগ প্রায় চুবিয়ে রাখা হত গঙ্গার সলিলে আর কানের কাছে অষ্টপ্রহর খালি হরিনাম সংকীর্তন হত । তাতে আপসে রোগী নিমোনিয়া আর হার্ট অ্যাটাকে চলে যায়। এ’খেনে ও’সব নেই। মরবার ইচ্ছে হলে, মুমূর্ষু হলে, এসো, থাকো, মায় আত্মীয়স্বজন পর্যন্ত নিয়ে। তবে ওই, ২০ দিনের মধ্যে যদি না মরেছ, তো পথ দেখো।

মোক্ষদাকে কোনমতে, রিক্সা থেকে নামিয়েই, হেঁচড়াতে হেঁচড়াতে সামনের ঘরের একটা ছোট্ট তক্তপোষে তোলে হরিত। মোক্ষভবনের মালিকের দেখিয়ে দেওয়া। মা বুকের ব্যথায় আছাড়িপিছাড়ি। এই মরে বুঝি। তার সঙ্গে সঙ্গে নাভিশ্বাস । ভবনের মালিক নাকি দেখেই বোঝেন, এর কদ্দিন মেয়াদ। এই হলো অভিজ্ঞতা। তিনি বলে ওঠেন, “আজ রাত কাটলে হয়। যোগাড়যন্তর করতে থাকেন গো কত্তা, কাঠ, ঘিউ, মনিকর্ণিকাতে দাহ, অত্ত কি সহজ, ওদের পুরোহিতদের অনেক খাঁই।” আর তারপরই পাকা ব্যবসাদারের মতন গলাটুক নামিয়ে কন, কাছে ঘেঁষে হরিতের। যদি আমাকে বলেন, “ভালো লোক দেব, কমে করে দেবে। রাজি?” হরিত রাজি হয়। কি আর করা, মায়ের শখ। শেষ ইচ্ছাটুকু পূরণ হোক তবে।
মোক্ষদার ঠিক পাশের খাটেই এক বৃদ্ধ, সঙ্গে বোধ হলো, মেয়ে আর নাতি। সে নড়েও না, চড়েও না। দেখে বোঝা যায় যেন মরেই রয়েছে। তবু মেয়ে কেন যে মাঝে মাঝে মুখে চামচ করে গঙ্গাজল দেয়। মোক্ষদা ভবনের মালিককে জিজ্ঞাসা করেই ফেলে হরিত, “হ্যাঁ গো, ইনিও তো মরতে এয়েছেন, তা কবে ইনার?” মালিক ‘না’ সূচক ঘাড় নাড়ে। অত্যন্ত হেলায় ছেদ্দায় বলে, “কে জানে কবে, পরশু কুড়ি দিন হয়, তাপ্পর নিয়ে যাবে। আমি কি জানি? না মরতে পারলে।” মানুষকে যমের বাড়ি পাঠানোর এই মহৎ কার্যকে অবশ্যই সেই মালিক অত্যন্ত সুকর্ম হিসেবে দেখেন এবং যারপরনাই আত্মতৃপ্তিতে ডগোমগো হয়ে থাকেন। তাই বেড বেশি দিন ধরে আটকে রাখলে তার ব্যবসার ক্ষতি। বুড়ো মানুষটি কিন্তু মাঝে মাঝে ফ্যাস ফ্য়াসে গলায় বলছেন, “মা, মা গো, দয়া কর মা আমার, হে রাধা মাধব মঙ্গল কর।” অর্ধ জড়ানো কন্ঠস্বর। হরিতের মা তার কাতরানির মাঝে ওই বুড়ো মানুষটির দিকে নজর রাখছেন। এক চোখ খুলে দেখে আবার চোখ বুঝে ফেলছেন। এখানে যেন স্বর্গদ্বারে পৌছবার এক নিরন্তর প্রতিযোগিতা লেগে রয়েছে, যেন ‘আগে কেবা প্রাণ করিবেক দান।’ জীবনের সবথেকে গহীন রহস্য যেন চোখের সামনে বারংবার ফুটে উঠছে আর গঙ্গার বুকে অজস্র ঢেউয়ের মত মিলিয়ে যাচ্ছে, কারণ কেউই তার আন্দাজ পাচ্ছে না।

এমন হতে হতেই, কোনো এক অদ্ভুত ঐন্দ্রজালিক মুহূর্তে সেই সব্বোনাশটি ঘটেই গেল। অবিশ্বাস্য! মোক্ষদা ও হরিচরণের চারি চক্ষুর মিলন হয়ে গেল আর কেমন এক অলিখিত নিয়তির টানে। দুজনের ঝাপসা দৃষ্টিতে দেখা দিল সেই পুকুর পারে নেবুর তলে, প্রথম মিলন দৃশ্যটি। সেই হরিতকি গ্রাম, সেই মোক্ষদার সঙ্গে আম চুরি, সেই পেছনের বাগানের হাসাহাসি, মোক্ষদাকে বাড়ি থেকে জোর করে বিবাহ দিয়ে দেওয়া, আরও কত কি। মাঝে মধ্যে এক আধবার দেখা গ্রামের সূত্রেই। তখন দু’জনেই ঘোর সংসারী। হরিচরণ কাঁপা গলাতে বলে উঠলেন – “মোক্ষ তুমি এ’খেনে?” বলেই ঝর ঝর করে কেঁদে ফেললেন দুজনেই। বৃদ্ধ নাতি ও কন্যাকে সরিয়ে দিয়ে, হাঁচড়পাঁচড় করে উঠে এসেছেন মোক্ষকে আলিঙ্গন করতে। মোক্ষ তাঁর বুকের মাঝে। একটি বিরাট প্রাগৈতিহাসিক পদহীন, ডানাওয়ালা প্রাণীর মত দুই হাতের উপর ভর করে এগিয়ে এলেন তিনি। কারো বারণ শুনলেন না। মোক্ষদা ভাবলেশহীন চোখে ড্যাব ড্যাব করে চেয়ে রইলেন একদা হারিয়ে যাওয়া হরিদার দিকে। কেউ কিছু ভাবছেন না, ভাবতে পারছেন না। শুধু এক লহমার জন্য জীবনকে অনুভব করছেন হয়ত।

মরণোন্মুখ দুটি মানুষ কি অদৃশ্য জাদুবলে জীবনের টানে বাঁধা পড়তে চলেছেন। এই নাকি মুমূর্ষু ! আচ্ছা, ভালোবাসা কি মরণের থেকেও বেশি শক্তিশালী? ভালোবাসা মরণের মুখ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে জীবনদান করতে পারে? উত্তর এ অধমের জানা নেই, তবে বাকিটা তো ইতিহাস।
মোক্ষ ভবনের মালিকের সব ভাবনা, আশা আকাঙ্খাকে জলাঞ্জলি দিয়ে তাঁরা মরলেন না। ছেলে মেয়েরা অগত্যা যে যার পথে চলে গেলেন ওঁদের ফেলে। কারণ মৃত্যু যখন তাদের ত্যাগই করলো, বৃদ্ধ হরিচরণ ও তাঁর ছেলেবেলার বন্ধুনী মোক্ষদা ঠিক করে নিলেন শেষ জীবনটা কাশীবাসী হয়ে থাকবেন। অসুস্থ, জরাভারাতুর দুজনকে, ছেলেমেয়েরা বসিয়ে রেখে গেল, দশাশ্বমেধ ঘাটে। ধীরে ধীরে কিভাবে কমনে, কোন জাদুর নির্দেশে ওই অশীতিপর, নব্বইয়ে পা রাখা মানুষ দুটি কূল পেয়ে গেল। সাথী যখন জুটেই গেল, মন্দ কি? মৃত্যু তাঁদের ছাড়পত্র দিয়েছে আরও কিছু বছর, থাক না হয়, দুজনায় গান গেয়ে, মিলেমিশে, পথেঘাটে। জীবন আবার সব রঙ রূপ রস গন্ধ দিয়ে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরল তাঁদের।
সংসার তো সারা জন্ম ধরে করলেন, এই পথেই বুঝি মোক্ষ এলো তবে।
[চিত্রঋণ- আন্তর্জাল]
ভালবাসায় ঘাটের মরাও হাসে! জীবন হাসুক অট্টহাসে! বাঁচামরা শুনেছি ঈশ্বরের হাতে। বাঁচুন হেসে-খেলে! মৃত্যু আসলে চলে যাবেন হাসতে হাসতে। জয় জীবনের জয়!
বড় ভাল লাগল পড়ে