
আনন্দময়ী মায়ের থানে, বুকের আঁচলটাকে বেশ করে বিছিয়ে নিয়ে দুই মেয়েকে কোলের ভাগে বাগিয়ে নিয়ে শুয়েছিল বিলাসী। অকালবিধবা বিলাসী এই সবে তার স্বামীটাকে খেয়েছে। না মানে গ্রামের খুড়ি কাকীরা তাই বলেছে ওকে। সে যাই হোক, বিলাসী জানে সত্যিটা। যেদিন ওর ওই তিন বছরে বিয়া করা স্বামী ট্রাকের সঙ্গে সাইকেলের ধাক্কায়, হঠাৎ মারা গেলো, সেদিন বিলাসী বুঝলো জীবনকে। এখন এই দুই বিটিছেলে আর ও, এদের তিনজনের ভার ওর একার ওপর। তবু কি জানি কেন, বিলাসী জীবনকে ঘুরে দেখে। হাসিটি ওর মুখে লেগেই থাকে। অকারণে চোখের-জল-ফেলা মেয়ে নয় সে। ঘুরে দাঁড়ায় আবারও। আর তাই অ্যাদ্দিন পর এই বাপের বাড়ি আসা।
শ্বশুরঘর থেকে এই হুট্ করে আসাটাকে কেউ ভালো চোখে দেখেনি অবিশ্যি। মা, খুশি হলেও প্রমাদ গনেছিলো। দাদা বৌদিদের মুখ চাওয়াচায়িতে বিলাসী বেশ বুঝেছিলো তার বাপের বাড়ির পাঠ উঠেছে। তবু পুজোর ঢাকে কাঠি পড়তে না পড়তেই, বাপের বাড়ির দরজায় পা রেখেছিলো বিলাসী, অন্য সব বারের মতোই। কোলের মেয়েটাকে কাঁখে নিয়ে, বড়ো মেয়ের হাত ধরে রান্নাঘরের দরোজায় দাঁড়িয়ে বিলাসী সুধিয়েছিলো – ‘ও মা গো, হরিমতীর বাচ্চাগুলো ওই অত বড়োখানা হয়ে উঠেছে গো? কেমন গাপুস গুপুস খায় আর তুড়ুক তুড়ুক নাফাচ্ছে দেকো দিকি।’ বড়বৌদি মেজবৌদির এখন অন্তত হরিমতি ছাগলীদের বাচ্চা নিয়ে আদর সোহাগ করবার সময় নেই মোটে। বড়বৌ মুখঝামটা দিয়ে মেজোকে বলে, ‘বলি অ মেজো, তোর হলো কি? অমন আলসে দিলে চলবে, সক্কাল সক্কাল হাত চালা বাপু, নাকি তুইও ঠাকুরঝির মতো ট্যালা মেরে ছাগলীর নাচ দেখতে লাগবি।’ ছোট বৌ নতুন। ঠাকুরঝি আসায় তার একটু আহ্লাদ হয়েছিল আর কি। আজ মেলার দিন, আনন্দময়ীর হাট বসবে আজ। নতুন জামরঙা শাড়িটি সে তুলে রেখেছে বরের সঙ্গে মেলায় যাবে বলে। বড়দির কথায় সে চমকে ওঠে, এই রে যদি তার মেলায় যাওয়া আটকে দেয় ওরা? সে তাড়াতাড়ি বড়ো জায়ের হাতে হাতে জোগাড় দিতে এগিয়ে যায়। ওদিকে বিলাসীর হাসিটুকু তার ম্লান মুখে লেগেই থাকে। পৌর্ণমাসীর রাত্রিশেষের দুধেলা চাঁদের জোছনার মতোই। সে আড়ালে যায়।
বাবা, একমাত্র বাবাই ভারী খুশি হয়েছে বিলাসীর আগমনে। বিলাসী ওদের একমাত্র কন্যে। তিনছেলের পর ওই মেয়ে। ঠাকুমা বলতেন ওরে, উলু দে, শঙ্খ বাজা স্বয়ং আনন্দময়ীর থান থেকে মা উঠে এসেছেন ঘরেদোরে। মা হাসতেন শুনে, তিন ছেলের পর তবে, ওই মেয়ে, লোকলজ্জার ভয় কি?

আলের পথ বেয়ে হেঁটে আসতিছেন বাবা। কাঁধের ওপর বসা বিলাসী দুই পা মেলে দিয়েছে বাবার বুকের কাছে আর মুঠি করে ধরে রয়েছে বাবার উলুঝুলু চুল, যেন ঘোড়ার লাগাম। রূমঝুম করছে বিলাসীর চুল সারা মুখ জুড়ে, যেন চাঁদের পাশে মেঘ। খুব হাসছে বিলাসী। একশো আটটা প্রশ্নে বাবাকে বিরক্ত করে তুলতে চাইছে। ‘হ্যাঁ বাবা ধবলীর বাছুরগুলো ওদের মাকে হাম্বা বলে ডাকে কেন? হ্যাঁ বাবা পল্টু জ্যাঠাদের পুকুরে মা হাঁস তার বাচ্চাদের কি কি খাওয়ায়? হ্যাঁ বাবা নয়নতারা পিসিকে ওরা ডান বলে কি জন্যি, হ্যাঁ বাবা মা তোমাকে হ্যাঁ গা বলে কেন, তোমার নাম নেই?’ এই সব বেয়াড়া প্রশ্নের জবাব দেন বাবা, সব জবাব। আর হা হা করে হাসতে থাকেন মেয়ের অহেতুকী অনুসন্ধিত্সায়। খুশি হয়ে বলেন, ‘তুই ইস্কুলে যাবি বিলাসী? দাদাদের মতো পড়বি? বই সিলেট সব এনে দেব তুকে।’ আর তখনি বিলাসী বলে, ‘আমি কি পড়বো, আমি কি জানবো বলোতো ? আমি তো সবই জানি।‘ বাবা কিছুটা অবাক হন। ‘তবে তুমি জিজ্ঞেস করো কেন মা ?’ বিলাসী হাসে। ভুবনমোহিনী আনন্দময়ী হাসি। সে বলে ওঠে,’ বিলাস করি বাবা, আমার নাম বিলাসী না? হা হা হা হা হা হি হি হি হি ….’ কাঁধের পাঁচ বছুরে মেয়েটিকে ভারী লাগে বড্ডো বাবার তখন। সন্ধ্যে হয়ে আসছে। ঝিম্ঝিমে চাঁদের আলোয় তারার আলোয় মেয়ের হাসি মিলিয়ে যায় দূরে বহুদূরে। আর সমস্ত প্রকৃতি জুড়ে শুধু এক নিঃসীম ভালোলাগা ফুটে ওঠে। বাবার পায়েতে ছন্দ লাগে। মেয়ের হাসিতে সঙ্গীত। মেয়ে আর বাপ ঘরে ফেরে সুখে।
সেই বাবা আজ বিধবা বিলাসীর দিকে তাকাতে পারেন না। মনে মনে ভাবেন বাবা, সবই যদি জানে ওই মেয়ে তবে এমন এক সম্ভাবনার কথা আগে জানায়নি কেন মেয়ে। অকারণে ঝরঝর চোখের জল পড়ে। ঝাপসা চোখে আলের পথে তাকিয়ে থাকেন বাবা। এক দৌড়ে বিলাসীর ছোটবেলাতে পৌঁছে যান। ইচ্ছে করে আবার ধান রুইয়ে আবার নতুন করে ফসল ফ্লুক ক্ষেতে, ঠিক এমনই ইচ্ছে জাগে।

তা আজ সারা বিকেলে মেলাতে হট্টিচাল্লি করে, ফুলুরি জিলিপি খেয়ে, নাগরদোলা চেপে বিলাসীর মেয়েরা খুব খুশি। সঙ্গে গেছে ছোটমামা, মামী আর মা। বাবার বাড়িতে খুদের জাউ খেয়ে বেড়ে ওঠা দুটি কচি প্রাণ। মেয়েদের খুদটুকু খাইয়ে অনেক সময় তার ফ্যান খেয়ে কাটিয়ে দেয় বিলাসী। ভাঙা ঘরে স্বামীকে মনে পড়ে, সারারাত কেঁদে কেঁদে ভোরের দিকে ঘুমিয়ে পড়ে একটু। ছোট মেয়েটা কচি, বড়ো মেয়েও বোঝে কি বোঝে না। সারাক্ষণ স্বামী হারানোর ক্ষত বুকে নিয়ে এগিয়ে চলা বিলাসী আজ তাই একটু ডানা মেলেছে, আলো আলো লাগছে কেমন জীবনটা। কিন্তু অভুক্ত শরীর আর বুঝি দেয় না। তাই আনন্দময়ীর থানের এক দিকে একটু আঁচল পেতে শুয়ে পড়ে মেয়েদের নিয়ে। শরৎকালের সন্ধ্যে । হয় হয়। আজ এক ঘোঁট জল খেয়ে শুয়ে পড়লেই হবে বাড়ি গিয়ে। এটাওটা খেয়ে পেট ভর্তি। তারপর কখন রাত নেমেছে থানে। ছোট দাদা আর বৌ গেছে বৌয়ের বাড়ি মেলা থেকেই। মনে ভেবেছে বিলাসী বুঝি বাড়ি গেছে আগেভাগেই। বাবা মা তার পথ চেয়ে চঞ্চল হলেও দাদা বৌদিরা বুঝিয়েছে, বিলাসী বুঝি ছোট দাদার শ্বশুরবাড়ি গেছে ওদের সঙ্গে। তাই কেউ তার খোঁজে আসেনি। আর ওই স্বাপদসংকুল এলাকায় বিলাসী একা তার মেয়েদের নিয়ে। ঝুম জোছনা নেমেছে আকাশ বেয়ে। ম ম করছে হাস্নুহানা বাতাস। সর্প-সর্পিনী মেতেছে সঙ্গমে। দূরে কোথাও হায়না ডেকে উঠেছে হা হা হা হা হা।
এমনসময় মন্দিরের দরজা খুলে বেড়িয়েছেন মা নৈশ ভ্রমণে পঞ্চমীর নিশিতে । কথিত আছে পুজোর দিনে মা মন্দিরের শৃঙ্খল ভেঙে বেরিয়ে পড়েন। ঘুরে বেড়ান, নগরে, গ্রামে চত্বরে। রাতে যখন ওঁরা হাঁটাহাঁটি করেন তখন কারও সে পথে এসে পড়া বড়ো বিপদের। আর বিলাসী কিনা সেই মায়ের পথের পাশেই আছে শুয়ে মেয়েদের নিয়ে। মা থমকে থামেন। তাঁর পায়ের মল বেজে ওঠে রমঝম। তাঁর কালো চুল পায়ের গোছ ছাড়িয়েছে। আনন্দময়ী চন্ডী মায়ের মুখ আরক্ত। ঠোঁটের কোন বক্র হাসি। মা ফিরে তাকান। মায়ের বিকটা মূর্তি দেখে ভয় পেয়ে যায় পশুপক্ষীরাও। আর সঙ্গে সঙ্গে বিলাসীও ঘুমের থেকে জেগে ওঠে। সামনেই ওই ভীষণদর্শনাকে দেখে মুহূর্তের বিস্মৃতি সত্ত্বেও বিলাসী বুঝে ফেলে সব ঘটনা। সেই মেলাতে যাওয়া, সেই আনন্দময়ীর থান, সেই পুজো, আর মায়ের পুজোর রাতে গ্রামে গঞ্জে হেঁটে বেড়ানোর গপ্পো, সব মনে পড়ে যায় তার। করজোড়ে প্রার্থনা করে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে বিলাসী। ‘ক্ষমা করো মা, তুমি তো আমার সর্বনাশের কথা জানো। আর যেন কিছু করোনি মা। এই মেয়েদের নিয়ে ভালো থাকতি দাও রে মা।’ কতক্ষণ সে ওই ভাবে শুয়ে ছিল জানা নেই। যখন উঠলো, মনে যেন পুনর্জন্ম হলো তার। কোথায় মা, কোথায় কি, সব ফাঁকি। মেয়েরা তখনও সেইভাবেই ঘুমুচ্ছে। আর হাতে ওটা কি? সেই তিলথুবড়ির কৌটো ? মায়ের গর্ভগৃহে যার থাকার কথা।
কি করবে এখন সে ঐটে নিয়ে ? মনে মনে কথা উঠলো, সঙ্গে রাখ, ভালো হবে। এইসব হয় বিলাসীর। মনে মনে অনেক কথা হয় তার। অনেক কথা ওঠাপড়া করে। বাবা বলেন, ‘মনই গুরু, মন কথা কয়।’ ঐসব কথা কিছু না বলেটলে ভয়ে ভয়ে মায়ের বন্ধ দরজার দিকে তাকায় বিলাসী। দরজা বন্ধ। কেউ ধারেবাড়ে নেই কো। শুধু এক অদ্ভুত ভালোবাসার সুবাস খেলে বেড়ায় ফাঁকা মন্দিরের চারিভিতে। হাতে করে তিলথুবড়ির কৌটোখানা নিয়ে মেয়েদের কাঁখে তুলে, হাট ধরে ঘরের পথ ধরে বিলাসী। কার্তিকের শেষাশেষি হিমহিম ভোরে। মনে প্রত্যয় মায়ের কৌটা ওর হাতের মধ্যে। মায়ের প্রসাদী। কার সাধ্য ওর ক্ষতি করে। এই বিশ্বাসে রক্ত ছলকে ওঠে ওর বুকে। এক নতুন ভালোলাগায় বিলাসী হেসে ওঠে। বাড়ি ফিরতেই সবাই অবাক। ‘ও বিলাসী চলে এলি, ছোটনের শ্বশুরবাড়ি যাস নে?’ বড়বৌদি এগিয়ে আসে। এক গাল হাসে বিলাসী। ‘না না মায়ের থান থেকে হেই এলুম গো। ঐখেনেই ঘুইমে ছিলুম কিনা মা বিটিতে।’ অভিমান অভিযোগ নেই বিলাসীর কারও ওপর। রাতে কেউ তার খোঁজ রাখেনি, তাতেও না। বাবা মা দুঃখু করতে থাকেন বটে। ওমা যদি হায়নায় কোলের মেয়ে টেনে নিতো কি হতো। যদি ওই মায়ের থানার কামিনী গাছের জোড়া শঙ্খচূড় ওদের আকর্ষণ করতো বা …

বিলাসী হাসে, বিলাসী বিলাস করে, বিলাসী শক্ত করে ওই তিলথুবড়ির কৌটো ওর আঁচলে বেঁধে থোয়। মায়ের প্রসাদ! বলা তো যায় না, কি থেকে কী হয়। হায় রে তবু যদি জানতো ওই কৌটোর রহস্য। পুরুতের পাঁচ বছুরে ছেলেটা যে ওই মেলার থেকে কেনা রঙিন সাধের কৌটোখান এই মন্দির চত্বরে ফেলে গেছে গো। আর ঘুমঘোরে সেই কৌটোই মুঠো করে নিয়েছে বিলাসী।
তারপর? তারপর আর কি? বিলাসীর সব হলো, ঘর দোর, জমি জিরেত, দ্বিতীয় বে, আন্ডা বাচ্চা, ঘর গেরস্থালি। এক এক করে সব। তার কারণ? বিলাসীর অঞ্চলে বাঁধা ছিল মায়ের প্রতি বিশ্বাসের, প্রত্যয়ের ওই কৌটোখানা।

