শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

বঙ্গজীবনের পাঁচালি : চোদ্দ শতক (৫)

চল্লিশের দশক বাংলায় আগত যখন
আরো কিছু কথা তার শুন সভাজন।।
শিক্ষায় নবীন নেতার হইল অভ্যুদয়–
কর্মক্ষেত্র কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়।।
উপাচার্য পদে যাঁর বিশাল অবদান,
শ্যামাপ্রসাদ, আশুতোষের তিনি সুসন্তান।।

রবীন্দ্রনাথ, শ্যামাপ্রসাদ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়

বিশ্ববিদ্যাচর্চাকেন্দ্র করিতে স্থাপন
নব নব বিভাগের করিলেন পত্তন —
ফলিত পদার্থবিদ্যা ও তথ্যপ্রযুক্তি
চৈনিক, তিব্বতীয় ভাষা, ইসলামিক সংস্কৃতি।।
প্রতিষ্ঠা লভিলেন এবার বঙ্গসরস্বতী —
বাংলায় গবেষণাপত্র পেল অনুমতি।।
শ্যামাপ্রসাদ রবীন্দ্রনাথকে জানান আহ্বান
বাংলায় দীক্ষান্ত ভাষণ করিতে প্রদান।।
এ ছাড়াও শ্যামাপ্রসাদ নিলেন উদ্যোগ —
কবিকে করিতে বাংলার বিশেষ অধ্যাপক।।
[ ধুয়া:- বেশ , বেশ বেশ! আহা বেশ বেশ বেশ!]

★★★    ★★★    ★★★

এরপর ক্রমে ক্রমে রাজনীতি জগতে
শ্যামাপ্রসাদের উত্থান হিন্দুত্বের পথে।।
চারের দশকে এই উত্থান দ্রুতগতি —
হিন্দু মহাসভার তিনি হইলেন সভাপতি।।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আগেই অবশ্য
বঙ্গীয় আইনসভার তিনি ছিলেন সদস্য।।

সমকালেই উদিত হন আরেক নায়ক —
পূর্ব বাংলার সন্তান তিনি, ফজলুল হক।।
মুসলিম লীগে পাকিস্তান প্রস্তাবের উত্থাপক
যদিও ছিলেন একদা এই ফজলুল হক,
সেই লীগের সব সংসর্গ ছাড়িয়া তখন
কৃষক প্রজা পার্টি তিনি করেছেন গঠন।।
বঙ্গীয় আইনসভার নির্বাচনে সেবার
কোন দলই পায় নাই সরকার গড়ার
নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতা। বাংলায় তখন
প্রগতিশীল কোয়ালিশনের হইল গঠন।।
বঙ্গে নূতন শাসনবিধি করিতে রূপায়িত
হকের সঙ্গে শ্যামাপ্রসাদ হইলেন মিলিত।।
গড়ে ওঠে মন্ত্রিসভা, তার দুই নায়ক —
শ্যামাপ্রসাদ অর্থমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী হক।।

শ্যামাপ্রসাদ ও ফজলুল হক

ফজলুল কৃষকবন্ধু, সরল, উদার,
ধর্মীয় বিদ্বেষহীন খোলা মন তাঁর।।
অখণ্ড বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রীরূপে
দেননি প্রজাস্বার্থ বলি রাজনীতির যূপে।।
মুসলিম লীগের সঙ্গে না করিয়া রফা
কল্যাণকর্মসূচি হক নিলেন কয়েক দফা।।
তাঁর লক্ষ্য ছিল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি,
কৃষকশ্রেণীর কর হ্রাস আর প্রজাস্বত্ব নীতি
সংশোধন ও প্রাথমিক শিক্ষার প্রসার।
এই ব্রত নিয়েছিল শ্যামা-হক সরকার।।
শ্যামাপ্রসাদ এই ব্রতে যে হকের সহায়
হিন্দু মুসলিম সুসম্পর্কের প্রেরণা যোগায়।।
[ধুয়া- আগে কহ আর, আহা, আগে কহ আর!]

তেরোশত আটচল্লিশের বাইশে শ্রাবণ
বঙ্গবাণীর আকাশ হতে নক্ষত্রপতন!
রাখিয়া অতুল কীর্তি সারা ভূমন্ডলে
বাংলার কবীন্দ্র রবি গেলেন অস্তাচলে।।

রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণ

কাঁদে রবিহারা সারা বাংলার প্রাণ,
রেডিওতে শোনা গেল নজরুলের গান।।

[● নজরুল রচিত ‘সালাম অস্ত-রবি’ সঙ্গীত:]

“ঘুমাইতে দাও শ্রান্ত রবিরে
জাগায়ো না জাগায়ো না,
সারা জীবন যে আলো দিল
ডেকে তার ঘুম ভাঙায়ো না।।
যে সহস্র করে রূপরস দিয়া
জননীর কোলে পড়িল ঢলিয়া
তাঁহারে শান্তি-চন্দন দাও
ক্রন্দনে রাঙায়ো না।।
যে তেজ শৌর্য-শক্তি দিলেন,
আপনারে করি ক্ষয়,
তাই হাত পেতে নাও।
বিদেহ রবি ও ইন্দ্র মোদের
নিত্য দেবেন জয় —
কবিরে ঘুমাতে দাও।।
অন্তরে হের হারানো রবির জ্যোতি
সেইখানে তারে নিত্য কর প্রণতি,
আর কেঁদে তাঁরে কাঁদায়ো না।।“

কিন্তু বঙ্গসরস্বতীর কাঁদিবার ক্ষণ
কে জানিত তখনও হয়নি সমাপন।।
রচি শোকগাথা যিনি ছন্দের বন্ধনে
বাণী দেন বাঙালির প্রাণের ক্রন্দনে
মূক হলেন মস্তিষ্ক-রোগে সেই নজরুল,
বঙ্গবাণী-কুঞ্জে হল স্তব্ধ বুলবুল।।
[ধূয়া:- মরি হায় হায় রে, মরি হায় হায় হায়!]

★★★   ★★★    ★★★

ভারতে তখন চলে আগস্ট আন্দোলন,

ব্রিটিশ ভারত ছাড়ো — হাঁকে নেতৃগণ।।
বোম্বাই-কংগ্রেস মঞ্চ থেকে আসে এ হুঙ্কার
প্রধান নেতাগণ অচিরেই হইলেন গ্রেফতার।।
দিশাহারা জনগণ – কে দেবে নেতৃত্ব-
পাঞ্জাবের এক বঙ্গবালা — অতুল তাঁর বীরত্ব।।
সাধারণ কংগ্রেসকর্মী অরুণা নাম তার
তুলে নেন সেই অধিবেশন চালনার ভার।।
বিপ্লবোন্মুখ জনগণে সাহস জোগাতে
কংগ্রেসের পতাকা তিনি তোলেন নিজ হাতে।।

অগাস্ট আন্দোলনের একটি দৃশ্য

পুলিশ চালায় গুলি সেই সমাবেশে
তড়িৎ-বেগে আন্দোলন ছড়ায় সারা দেশে।।
কংগ্রেসের নেতারা জেলে, কাজেই জনগণ
প্রত্যেকেই নেতা যেন এক এক জন।।
কেউ উপড়ায় রেল, দখল করে থানা —
কীভাবে ইংরেজ যাবে, নেই কারো জানা।।
জার্মানির বেতারে ভেসে আসে সুভাষের
কণ্ঠস্বর
— প্রশংসা তিনি করেন বিদ্রোহের।।
এ বিপ্লবে তমলুকের বীর জনগণ
তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার করিল গঠন।।

তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার — ভারতের ডাকটিকিটে

বিদ্যুৎ বাহিনী গড়ে ওঠে গ্রামে গঞ্জে,
স্বরাজের স্বপ্নে মগ্ন সকলেরই মন যে।।
সুশীল-সতীশ-অজয় আদি নেতাগণ
দু’ বছর চালান এক স্বাধীন প্ৰশাসন।।
অন্যদিকে ব্রিটিশের নির্বিবেক দমনে
গুলি ও লাঠিতে হতাহত বহুজনে।।
নিরস্ত্র বিক্ষোভের সেই অমর কাহিনী —
ঝান্ডা হাতে শহীদ হন বৃদ্ধা মাতঙ্গিনী।।
ব্রিটিশ চালায় পীড়ণ সারা দেশ জুড়ে,

বিশেষ চণ্ডনীতি দেখাল মেদিনীপুরে।।
আন্দোলনকারীদের দমন করিবারে
ধরপাকড়, নির্যাতন চলে নির্বিচারে।।

কাঁথির ঘূর্ণিঝড়ে গেল কত প্রাণ,
সেথায় পৌঁছেনা কোনো সরকারি ত্রাণ!
বাংলার ছোটলাট হারবার্ট তখন
গুটিকয় আমলা নিয়ে চালায় প্রশাসন।।
খরায় ও বন্যায় শস্যহানির ব্যাপারে
জেনেশুনে সরকারকে সে রাখে অন্ধকারে।।
দেখিয়া নমুনা পীড়ণ ও অবিচারের
অবশেষে খোলে চোখ শ্যামাপ্রসাদের।।
বুঝিলেন তিনি এই দুর্যোগের ক্ষণে
স্বায়ত্ত শাসন পরিণত প্রহসনে।।
ছোটলাটের এ নীতির করি প্রতিবাদ
ইস্তফা দিলেন মন্ত্রীত্বে শ্যামাপ্রসাদ।।

★★★   ★★★    ★★★

বিশ্বযুদ্ধে ইংরেজপক্ষ বিব্রত তখন,
ভয় — জাপান করে যদি ভারত আক্রমণ!
ধ্বংস করি গ্রামে গঞ্জে যত যানবাহন,
সেনাদের জন্য করে খাদ্য সংরক্ষণ।।
ফলে সৃষ্টি হয় কৃত্রিম অন্নাভাব দেশে,
নিরন্নেরা গ্রাম হতে শহরের উদ্দেশে
ধায় সবে। কিন্তু চাল — সে যে অগ্নিমূল্য,
পথেঘাটে মরে তারা পতঙ্গের তুল্য।।
তেরোশো পঞ্চাশের এই মহামন্বন্তরে
কলিকাতা পরিপূর্ণ; ফ্যান দাও স্বরে।।
সরকার নির্বিকার — কলঙ্ক শতাব্দীর,
প্রাণ গেল হায় ত্রিশ লক্ষ বাঙালির।।
[ ধুয়া– মরি হায় হায় রে, মরি হায় হায় হায়!]

সংবাদপত্রের পাতায় বাংলার দুর্ভিক্ষ ও চিত্তপ্রসাদ ভট্টাচার্যের স্কেচ

দেখে ভূখা মিছিলের এই বিভীষিকা
কবি, চিত্রী তুলে নেন লেখনী, তুলিকা।।
কালির টানে ফুটাইল জঠরের জ্বালা –
জয়নুল ও চিত্তপ্রসাদের চিত্রমালা!
শোনো এ প্রসঙ্গে দিনেশ দাসের কবিতা,
মনুষ্যত্বের মরণের মর্মান্তিক ছবি তা!

পঞ্চাশের মন্বন্তর- জয়নুল আবেদিনের স্কেচ

(দিনেশ দাসের কবিতা ‘ডাস্টবিন’-)
“মানুষ এবং কুত্তাতে
আজ সকলে অন্ন চাটি একসাথে,
আজকে মহা দুর্দিনে
আমরা বৃথা খাদ্য খুঁজি ডাস্টবিনে।
এই যে খুনে সভ্যতা,
অনেকজনের অন্ন মেরে কয়েকজনের ভব্যতা
এগোয় নাকো পিছোয় নাকো অচল গতি ত্রিশঙ্কুর —
হোটেলখানার পাশেই এরা বানিয়ে চলে আস্তাকুঁড়।
আজ যে পথে আবর্জনার স্বৈরিতা,
মহাপ্রভু! বণিক প্রভু! সবই তোমার তৈরি তা!
দেখছি বসে দূরবীনে
তোমায় শেষে আসতে হবে তোমার গড়া ডাস্টবিনে।
“●

যদিও বাংলায় ছিল নামেই এক সরকার,
মৃত্যুর ফসলে ভরে কালের ভান্ডার।।
মরেনি বাঙালি শুধু দুর্ভিক্ষের ফলে
মরেছে সে ব্রিটিশের চতুর কৌশলে।।
দুর্বলচিত্ত প্রধানমন্ত্রী ফজলুল হক
হারবার্টের হাতে অসহায় ক্রীড়নক।।
ছলেবলে ছোটলাট হককে সরাইয়া

বঙ্গে লীগের সরকার এক দিল বসাইয়া।।
নাজিমউদ্দিনকে করে প্রধানমন্ত্রী তার,
সোরাওয়ার্দির হাতে সরবরাহের ভার।।

এ দুটিই অপদার্থ, মনুষ্যত্বহীন —
পরিস্থিতি করে তোলে আরও সঙ্গীন।।
( ধুয়া:- ধিক, ধিক, ধিক! ধিক, শত ধিক!)

শ্যামাপ্রসাদ এ সময় দুই ভূমিকায়
অবতীর্ণ– একদিকে আইনসভায়
অকর্মণ্য সরকারের প্রতি চালান আক্রমণ,
করেন অন্যদিকে ত্রাণকার্য সংগঠন।।
আক্রমণের লক্ষ্য লিগ ও ছোটলাট একযোগে,
বাংলায় আবার গড়ে ওঠে তাঁহারই উদ্যোগে
বঙ্গীয় দুর্ভিক্ষত্রাণ কমিটি তখন–
তাঁর সব প্রযত্নের কেন্দ্রে বাংলার জনগণ।।

★★★    ★★★    ★★★

দুর্ভিক্ষের ত্রাণকার্য পরিচালনায় শ্যামাপ্রসাদ

অন্যদিকে যুদ্ধে জিতে আসিছে জাপান –
সেখানে সক্রিয় বাংলার আরেক সুসন্তান।।
রাসবিহারী বসু সেথা বহু বর্ষ ধরে
সংগঠন ও ফৌজ গড়ি আজাদির তরে
অপেক্ষায় ছিলেন উপযুক্ত মুহূর্তের,
তাঁরই ডাকে এশিয়ায় আগমন সুভাষের।।

নেতাজি সুভাষ ও আজাদ হিন্দ আন্দোলন

ইউরোপ হতে রোমাঞ্চকর সাবমেরিন যাত্রায়
অদম্য সুভাষ আসেন পূর্ব এশিয়ায়।।
ভেঙে পড়া ফৌজ পেল নব প্রাণ দ্রুত,
সঞ্জীবনী মন্ত্র দেন নেতাজি বস্তুত।।
গড়িলেন অচিরেই আজাদ হিন্দ্ সরকার,
সুভাষচন্দ্র স্বয়ং রাষ্ট্রপ্রধান তাহার।।
মন্ত্রিসভায় আরো দুই পুত্র বাংলা-মা’র —
অনিলচন্দ্র চ্যাটার্জি ও অনাদি সরকার।।

রাসবিহারী এ সরকারের পরামর্শদাতা,
আর সুভাষ জয় হিন্দ্ মন্ত্রের উদ্গাতা।।
তাঁর ডাকে কটিবদ্ধ ভারতীয় যত
ধনপ্রাণ ঢালি দিতে প্রস্তুত সতত।।
কেহ দেয় জীবনের সঞ্চয় তাহার,
নারীগণ খুলে দেয় রত্ন অলংকার।
তুমি দাও খুন, আমি দেব স্বাধীনতা! —
নেতাজির এই আহ্বানে উদ্বুদ্ধ জনতা।।
পূর্ব এশিয়া জুড়ে জাগে উন্মাদনা —
সেনাদলে যোগ দিতে সে কি উত্তেজনা।।
ঝাঁসির রানীর নামে গড়ি সেনাদল
নারীরাও দেখায় তারা নহে হীনবল।।

রানী ঝাঁসি রেজিমেন্ট আজাদ হিন্দ ফৌজ

জাপানের অস্ত্র বলে হয়ে বলীয়ান
আজাদ হিন্দ্ ফৌজ করে ভারত অভিযান।।
ইঙ্গ-মার্কিনদের বিরুদ্ধে ঘোষিয়া সমর
দিল্লি চলো’ ধ্বনি দিয়া হইল অগ্রসর
ভারতের অভিমুখে আজাদ হিন্দ্ বাহিনী–
নেতাজির প্রেরণার ভাস্বর সে কাহিনী !
যৎসামান্য খাদ্য অস্ত্র করিয়া সম্বল
চলে তারা ভেদ করি দুর্গম জঙ্গল।।
তেরঙা পতাকা ওড়ে মুক্ত মনিপুরে।

কিন্তু শেষ লক্ষ্য দিল্লী — সে যে আরো দূরে।।
আজাদী সেনারা দেশপ্রেমে আগুয়ান,
কিন্তু বিশ্বযুদ্ধে পর্যুদস্ত যে জাপান।।
অমিত শৌর্যেতে রচি নব ইতিহাস
নিরুদ্দেশে অন্তর্ধান করিলেন সুভাষ।।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে হানি চরম আঘাত
নেতাজি রচিলেন আজাদীর বুনিয়াদ।।

কিন্তু তাঁরে না পাইয়া মুক্তির প্রহরে
আজও কাঁদে বঙ্গমাতা দুলালের তরে।।

[ধুয়া – মরি হায় হায় রে, মরি হায় হায়!]

★★★    ★★★    ★★★

[লেখকের অন্য রচনা]

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.