
তোমাকে কখনও দেখিনি খবরকাগজ বা বইয়ের পাতার বাইরে,
তবু জানতাম, তুমি আছ —
আমাদের জন্মের সাথে পাওয়া আরও কতো সম্পত্তির মতো।
তথ্যচিত্রে দেখেছি তোমাকে মুক্তিযুদ্ধের অধ্যায়গুলো জুড়ে ভাস্বর…
দেখেছি- কত লম্বা হয়েও গান্ধীর পেছনে অনুগমনে নত তোমাকে,
দেখেছি তোমার সামনে নেহরুও কত খাটো– চেষ্টা করে হাত রাখছেন তোমার কাঁধে.
ছবিতে দেখেছি, তুমি দাঁড়িয়ে আছ সুভাষচন্দ্রের পাশে,
যেন অগ্নির পাশে প্রাচীর– পূর্বের পাশে পশ্চিম …
আবার তার তিন যুগ পরে নেতাজী ভবনে তাঁরই ছবির নীচে দাঁড়িয়ে
গাইতে শুনেছি তোমাকে তাঁরই অসাম্প্রদায়িক দেশপ্রেমের প্রশস্তি!

তোমাকে অসংখ্যবার পেয়েছি আমাদেরই সহযাত্রী হিসেবে…
সেই কোন জন্মকাল থেকে জেনেছি তুমি আছ আমাদের সাথে,
গান্ধি-শতবর্ষে এসেছ সারল্যের প্রতিমূর্তি পুঁটুলিটি হাতে করে,
আবার কংগ্রেসের শতবর্ষে হুইলচেয়ারে বসে অক্লান্ত যাত্রার প্রতীকরূপে।
আমরা জেনেছি শতযুদ্ধের অপরাভূত লড়াকু তুমি,
শতাব্দীর সমবয়সী হয়েও আমাদের সাথে
ভাগ করে নিয়েছ এক পৃথিবীর জল হাওয়া আলো!
আমরা যখন সব মূল্যবোধ ঝেড়ে ফেলে ‘স্বাধীন’ হয়েছি,
সবিস্ময়ে দেখেছি জারী রয়েছে তোমার স্বাধীনতা সংগ্রাম —
কখনও জালালাবাদ, কখনও ইসলামাবাদ– কত নেকড়ের সাথে লড়াই…
জানতাম নিরন্তর জেগে আছে তোমার পাঠান-দার্ঢ্য!
তোমার গুরু তোমাকে নেকড়ের মুখে ছুঁড়ে দিয়েছিলেন…
কিন্তু কোনো বিশ্বাসভঙ্গের অভিমানে স্তব্ধ হয়নি তোমার সংগ্রাম,
নতুন পাখতুনের রাষ্ট্রস্বপ্ন- এই উপমহাদেশের শান্তির প্রেরণা!
বরং অসম্ভবকে সম্ভব করেছ, দুরন্ত পাঠানদের করে তুলেছ অহিংসার ব্রতচারী!

তোমাকে গুরুদেব সংবর্ধনা দিয়েছিলেন আম্রকুঞ্জে,
তোমার গুরুর মতো তোমারও লাইন স্কেচ এঁকেছিলেন মাস্টারমশাই
সেসব দেখেছি, কিন্তু দেখা হয়নি তোমাকে…
এই উপমহাদেশের বুকে দীর্ঘদেহ নিয়ে হেঁটে গেছ ঋজুছন্দে,
তোমার পায়ের কাছে ছড়িয়ে রইলো সম্মান, টাকার তোড়া, ভারতরত্ন
হঠাৎ ঘুমের মধ্যে তুমি নেই মনে পড়ে গিয়ে জেগে উঠলাম,
পারিবারিক বিয়োগের মতোই ব্যথা বাজল বুকে,
আমাদের বিয়োগান্তক মহাকাব্যের শেষ মহানায়ক,
চর্মচক্ষে কখনও তোমাকে দেখা হয়নি বলে
বড় অকিঞ্চিৎকর মনে হল নিজেকে!

[লেখকের অন্য রচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন]