শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

বঙ্গজীবনের পাঁচালি : চোদ্দ শতক (৯)

এতরকম দুর্বিপাকের মধ্যেও সতত
নানান অনুশীলনে ছিল বাঙালি নিরত।।
বিষ্ণুচরণ ঘোষ হঠযোগী ব্যায়ামবিদ বাংলার,
স্বদেশে বিদেশে খ্যাত যোগচর্চা তাঁর।।
শরীরনির্মাণের ব্রতে ছিল অপূর্ব তাঁর নিষ্ঠা —
কলিকাতাতে যোগ শিক্ষালয় করিলেন প্রতিষ্ঠা।।
বুকের ওপর তুলে হেলায় হাতি কিংবা গাড়ি
বিখ্যাত সেই রেবা রক্ষিত ছাত্রী ছিলেন তাঁরই।
এছাড়াও শরীরচর্চায় হয়েছিলেন কৃতী
নীলমণি দাস, মনোহর আইচ, মনোতোষ রায় প্রভৃতি।।

বুকের ওপর হাতি তুলে বিখ্যাত ব্যায়ামবিদ রেবা রক্ষিত

★★★★★★★★

ক্ষমতা হস্তান্তর শেষে দিল্লিতে তখন
নূতন কেন্দ্ৰীয় সরকার হয়েছিল গঠন।।
প্রধানমন্ত্রী নেহরু গড়েন যে-মন্ত্রীমন্ডল,
সেখানে বাঙালি মন্ত্রী শ্যামাপ্রসাদ কেবল।।
শিল্প ও সরবরাহ দপ্তর হাতে ছিল তাঁর,
ছিলেন তিনি নানা প্রশ্নে সতত সোচ্চার।।
পাকিস্তানে সংখ্যালঘু যেসব হিন্দুগণ,
তাদের ওপর হত নানা অবিচার আর পীড়ন।।
পূর্ববঙ্গে যেসব হিন্দু ছিল নির্যাতিত,
তাদের জন্য ছিলেন তিনি সবিশেষ চিন্তিত।।
এ সমস্যার সমাধানে দিল্লিতে তখন
নেহরু-লিয়াকত আলি চুক্তি হল সম্পাদন।।
যে হিন্দুরা বসবাসকারী ছিল পূব বাংলার
তারা কিন্তু এ চুক্তিতে পায়নি সুবিচার।।
বাঙালিদের এই বঞ্চনার করে প্রতিবাদ
মন্ত্রিত্ব হতে ইস্তফা দিলেন শ্যামাপ্রসাদ।।

অন্যতম অঙ্গরাজ্যরূপে ভারতের
জন্ম হল নূতন প্রদেশ পশ্চিমবঙ্গের।।
রাজ্যের জন্য আইনসভার হইলে গঠন
প্রথম মন্ত্রিসভা করে শপথ গ্রহণ।।
কংগ্রেসের প্রফুল্ল ঘোষ হন সরকারের প্রধান,
কয়েক মাসেই কার্যকাল তাঁর হল অবসান।।
দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রী ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়
যত্নশীল হন আত্মনির্ভর করিতে বাংলায়।।
খাদ্য, আবাসন সমস্যার করতে সমাধান
করেন তিনি নানা উপনগরীর নির্মাণ।।
লক্ষ্য ছিল তাঁর কৃষি ও শিল্পের উন্নয়ন,
তাই বিভিন্ন কলকারখানার করিলেন পত্তন।।
অনাবাদী পতিত জমি করিয়া উদ্ধার
পাট চাষের ব্যবস্থা তিনি করেন চমৎকার।।
দুর্গাপুর, কল্যাণী, দীঘা চিত্তরঞ্জন,
হরিণঘাটা, সল্টলেক সিটি — কীর্তি অগণন।।
কর্মসংস্থানের উপায় করতে বিধান রায়
রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থা গড়েন কলকাতায়।।
রোগীর চিকিৎসাও তিনি এত কাজের সঙ্গে
চালিয়ে গেছেন — ছিলেন মহীরুহপ্রতিম বঙ্গে।।
তিনিই প্রথম ভারতরত্ন-ভূষিত এই বাংলার,
নবীন পশ্চিমবঙ্গের তিনি ছিলেন রূপকার।।

দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানায় মার্চেন্ট মিলের উদ্বোধনে বিধানচন্দ্র রায়, ১৯৬২ ইনসেটে – রাজাগোপালাচারীর কাছে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী পদে প্রথমবার শপথ গ্রহণ করছেন বিধানচন্দ্র, ১৯৫২

ইতিমধ্যে শ্যামাপ্রসাদ গান্ধী-হত্যার পরে
হিন্দু মহাসভা থেকে ক্রমে আসেন সরে।।
জাতিবিদ্বেষ-মুক্ত ছিল তাঁর স্বাতন্ত্র্যবোধ,
মহাসভার নেতাদের সঙ্গে হয় তাই মতবিরোধ।।
এর ফলে সেই দল ত্যাগ করে শ্যামাপ্রসাদ তখন
ভারতীয় জনসংঘ নামে দল করেন গঠন।।
লোকসভায় বিরোধী নেতারূপে তাঁর উদয়
সংসদীয় ইতিহাসে ভুলে যাবার নয়।।
শ্যামাপ্রসাদ দৃপ্তকন্ঠে করেন প্রতিবাদ
নানা অন্যায়ের আর সরকার গণে শুধু প্রমাদ।।
৩৭০ ধারায় কিছু বিশেষ অধিকার
কেন পাবে কাশ্মীর রাজ্য — প্রশ্ন ছিল তাঁর।
রক্ষা করতে দেশের সার্বভৌমত্বের সম্মান
কাশ্মীর নীতির প্রতিবাদে হন তিনি আগুয়ান।।
কাশ্মীরের পারমিট প্রথার বিরোধিতা করিতে
প্রবেশ করেন সেই রাজ্যে তিনি অশঙ্কিত চিতে।।
তাঁকে বন্দী করে রাখে কাশ্মীরের সরকার,
রহস্যের মাঝে সেখানে হায় মৃত্যু হল তাঁর।।
(ধুয়া :- “মরি হায়, হায় রে! মরি হয় হয় রে!”)

কাশ্মীরে শ্যামাপ্রসাদের আকস্মিক মৃত্যুর সংবাদ

★★★★★★★★

দুঃসাহসিক অভিযানের বিভিন্ন বিভাগে
পশ্চিমবাংলার কত তরুণ ছিল পুরোভাগে।।
ষাট দশকে পর্বতপ্রেমী তরুণ কতিপয়
হিমালয়ের নন্দাঘুন্টি শিখর করে জয়।।
দুই সাঁতারু মিহির সেন এবং আরতি সাহা
কত সাগর উপসাগর পার হইলেন, আহা।।
পঙ্কজ আর অম্বর রায় দুইজন ক্রিকেটের গুণী
ফুটবল খেলায় ভারতখ্যাত পি কে আর চুনি।।
চুনি যখন ভারতীয় দলের অধিনায়ক
এশীয় ক্রীড়াতে তাঁর দল পায় স্বর্ণপদক।।
এছাড়াও তিনি ছিলেন দক্ষ ক্রিকেটার
দেশবিদেশে নানারকম রেকর্ড ছিল তাঁর।।
(ধুয়া :- ” আহা, বেশ বেশ! বেশ বেশ বেশ বেশ”!)

ফুটবলে ভারতখ্যাত চুনি গোস্বামী ও পি কে ব্যানার্জি

চলচ্চিত্রে প্রতিভার স্বাক্ষর এই পশ্চিমবাংলায়
রাখিলেন ছয়ের দশকে সত্যজিৎ রায়।।
নির্মাণ করে ছায়াছবি ‘পথের পাঁচালী’
দেখান তিনি সিনেমায় বিশ্বে অগ্রণী বাঙালি।।
ক্রমে আসেন আরো কৃতী চলচ্চিত্রকার —
ঋত্বিক, মৃণাল, তপন সিংহ, তরুণ মজুমদার।।
চিদানন্দ দাশগুপ্তরাজেন তরফদার,
অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় — কত বলি আর।।
আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের প্রতিযোগিতায়
বিদেশে এঁদের নানা সৃষ্টি পুরস্কার পায়।।
ইতিমধ্যে সত্যজিৎ ও চিদানন্দ দুইজন
ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটির করেছেন পত্তন।।
ভারত তথা পশ্চিমবঙ্গে এ পথ ধরেই হয়
নান্দনিক সিনেমায় ক্রমে নবযুগের উদয়।।

তিন খ্যাতনামা চিত্রপরিচালক মৃণাল সেন, সত্যজিৎ রায় ও ঋত্বিক ঘটক
ঋত্বিক, সত্যজিৎ ও মৃণালের পরিচালিত তিনটি বিখ্যাত সিনেমার প্রচারচিত্র

★★★★★★★★

বাংলাদেশ খণ্ডিত হল নিয়তির মারে,
চলো দেখি কী ঘটিল সীমান্তের ওপারে।।
পূর্ববঙ্গ হল বটে পাকিস্তানের প্রদেশ —
স্বাধিকারের লড়াই তাহার হয় না তবু শেষ।।
পাকিস্তানভুক্তির পরবর্তী ছয় সাত বৎসর
নানা সরকার গঠিত হয়, শীর্ষে গভর্নর।।
গভর্ণরগণ বাঙালি নন, পশ্চিম পাকিস্তানী,
এদেরই দখলে ছিল শাসনদণ্ডখানি।।
গভর্নরদের অধীনে ছিলেন মুখ্যমন্ত্রীগণ
কয়েক বৎসর চালান পূর্ববঙ্গের প্রশাসন।।
নাজিমুদ্দিন, নুরুল আমিন আর ফজলুল হক
মুখ্যমন্ত্রী পদে কয় বছর ছিলেন প্রশাসক।।
পরে রাজ্যের নাম বদলে হয় পূর্ব পাকিস্তান
পশ্চিমা শাসকরা যদিও ধর্মে মুসলমান,
ভাষা, রুচি ও সংস্কৃতির ছিল না কোন মিল —
খাড়া হয় দুই প্রান্তের মধ্যে বিভেদের পাঁচিল।।
অর্থনৈতিক শোষণ ছিল, বৈষম্য অশেষ —
পূর্ব প্রান্ত ছিল কার্যত পশ্চিমের উপনিবেশ।।
পাকিস্তানে বাঙালিদের খর্ব অধিকার —
সেনাবাহিনীতেও তারা বঞ্চনার শিকার।।
জনসংখ্যায় পূর্ব পাকিস্তান হলেও গরিষ্ঠ,
তাদের দাবিয়ে রাখাই ছিল পশ্চিমের অভীষ্ট।।
পূর্ব বাঙলার দু একজন নেতা জিতে নির্বাচনে
বসেছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর আসনে।।
খাজা নাজিমউদ্দিন, বগুড়ার মোহম্মদ আলী
এবং সোহরাওয়ার্দী ছিলেন এমন তিন বাঙালি।।
কিন্তু পশ্চিম প্রান্তের চক্রী প্রশাসকগণ দ্রুত
নানা অজুহাতে এঁদের করত পদচ্যুত।।
এসব কাজে সহায় ছিল পাক সামরিক বাহিনী
বাংলাকে বঞ্চনার তা এক লজ্জাকর কাহিনী।।
(ধুয়া :- “ধিক ধিক ধিক, ওরে, ধিক শত ধিক!’)

পাকিস্তানের তিন পূর্ববঙ্গীয় প্রধানমন্ত্রী – সোহরাওয়ার্দী, খাজা নাজিম উদ্দিন ও মোহাম্মদ আলী বগুড়া

চাকরি, বৈদেশিক সাহায্য বা আমদানির আয় –
দেখা যেত এর সিংহভাগ পশ্চিম প্রান্তই পায়।।
রাজস্বে তার ন্যায্য ভাগও পূর্ববঙ্গ পেত না,
এর ফলে জন্ম নেয় ক্রমে স্বাধিকার-চেতনা।
প্রথমে মুসলিম লীগ সরকার গড়ে পূববাংলায়,
বৈষম্য নীতির জন্য পরে সমর্থন হারায়।।
দেখে এই দলের শাসনে বাংলার স্বার্থের হানি
আওয়ামী মুসলিম লীগ গড়েন মৌলানা ভাসানী।।
এই প্রচেষ্টায় আরো কয় নেতা করিলেন যোগদান –
সোহরাওয়ার্দী, সামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান।।
সাপ্তাহিক ইত্তেফাক ছিল মুখপত্র দলের
সম্পাদনার দায়ভার ছিল তোফাজ্জল হোসেনের।।

একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ভাষা শহীদদের মাজারে শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন মাওলানা ভাসানী ও শেখ মুজিব

পাঁচ দশকের শেষে যখন আসন্ন নির্বাচন
ফজলুল হক করিলেন কৃষক শ্রমিক দল গঠন।।
আব্দুল লতিফ বিশ্বাস হন এর সাধারণ সম্পাদক
সভাপতি পদে বসেন স্বয়ং ফজলুল হক।।
অবিভক্ত বাংলার তিনি জননায়ক একজন —
শের এ বাংলা‘ বলে তাঁকে ডাকত মানুষজন।।
গ্রামীণ বাংলার খেটে খাওয়া মজুর আর কৃষক–
এরাই ছিল হক সাহেবের প্রকৃত সমর্থক।।
লাহোরে পাকিস্তান প্রস্তাব এনেছিলেন তিনি,
লীগের সভাপতিও ছিলেন — অতীত সে কাহিনী।।
স্বাধীনতার আগে পরে ছিলেন নানা দলে,
অ্যাটর্নি জেনারেলও ছিলেন পাকিস্তান আমলে।।
(ধুয়া:- ” আগে কহ আর, আহা আগে কহ আর!”)

দেড় হাজার মাইল দূরের পাকিস্তানী শাসকগণ
চেয়েছিল বাংলার শিক্ষাও করতে নিয়ন্ত্রণ।।
ঢাকায় একবার জিন্না এসে করেন এই ঘোষণা :-
একমাত্র উর্দু ভাষাতেই চলবে পড়াশোনা।।
উর্দু হবে রাষ্ট্রভাষা তামাম পাকিস্তানের —
এর ফলে সৃষ্টি হয় বাংলা জুড়ে বিক্ষোভের।।
রাষ্ট্রভাষা বাংলার জন্য আন্দোলন হয় শুরু,
বাংলা যাদের মাতৃভাষা, তারাই সংখ্যাগুরু —
এই চেতনা থেকেই জন্মায় ভাষা আন্দোলন
উর্দুশাহীর বিরোধিতায় আগুয়ান ছাত্রগণ।।
এদের সাহস দেখে শঙ্কিত পাকিস্তান প্রশাসন
নেমে পড়ে দমন করতে তাদের আন্দোলন।।
নিষিদ্ধ হয় সব সমাবেশ, মিছিল করাও মানা —
এইসব নিষেধাজ্ঞায় বিক্ষোভ আরো বাঁধে দানা।।
ঢাকার রাজপথে সে এক রক্ত ঝরা দিন —
প্রাদেশিক প্রধানমন্ত্রী ছিলেন নুরুল আমিন।।
গভর্নরের পদে সেদিন স্যার ফিরোজ খান নুন
তেরো শো আটান্ন সনের আটুই ফাল্গুন
(ইংরেজি তারিখ ছিল একুশে ফেব্রুয়ারি)
হয়েছিল ঢাকায় একশো চুয়াল্লিশ ধারা জারি ।।
এই নিষেধ অমান্য করে মিছিল শুরু হয় —
বহু ছাত্র ও রাজনৈতিক কর্মী কতিপয়
মিছিল করে অগ্রসর হয়, মনে নেই ভয়ডর –
পুলিশ করে গুলিবর্ষণ তাহাদের উপর।।
সেদিন যেসব ছাত্র তরুণ হয়েছিল নিহত —
সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউর, আরো কত।।
প্রথম দুদিন গুলিতে প্রাণ দেয় আরও বহুজন —
সারাদেশে ঝড়ের বেগে ছড়ায় আন্দোলন।।
চলে ব্যাপক ধরপাকড় আর সেই সঙ্গে হরতাল –
ইতিহাসে রক্তাক্ষরে লেখা এ দ্রোহকাল।।


পূর্ববঙ্গে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলনের দুটি দৃশ্য

পূর্ববঙ্গের রাষ্ট্রভাষা রূপে বাংলার ভিত
রক্ত দিয়ে শক্ত করে এইসব শহীদ।।
ডাক্তারি ছাত্ররা গড়ে এক শহীদ মিনার,
পাক বাহিনী সেটি ভেঙে করে চুরমার।।
ঢাকা কলেজে গড়া হয় আরেকটি মিনার –
সরকারের নির্দেশে একই পরিণতি হয় তার।।
নির্ভীক এই আত্মবলিকে করতে মহীয়ান
আব্দুল গাফফার চৌধুরী বাঁধেন কালজয়ী গান।।

[ আব্দুল গাফফার চৌধুরী রচিত একুশের গান -এর অংশ :-
আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো, একুশে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি।।
ছেলেহারা শত মায়ের অশ্রু
গড়ায়ে ফেব্রুয়ারি।।
আমি কি ভুলিতে পারি।।
আমার সোনার দেশের
রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি।।
আমি কি ভুলিতে পারি।।

জাগো নাগিনীরা জাগো নাগিনীরা, জাগো কালবোশেখীরা
শিশুহত্যার বিক্ষোভে আজ কাঁপুক বসুন্ধরা,
দেশের সোনার ছেলে খুন করে রোখে মানুষের দাবী
দিন বদলের ক্রান্তিলগ্নে তবু তোরা পার পাবি?
না, না, না, না খুন রাঙা ইতিহাসে শেষ রায় দেওয়া তারই
একুশে ফেব্রুয়ারি ! একুশে ফেব্রুয়ারি।

সেদিনও এমনি নীল গগনের বসনে শীতের শেষে
রাত জাগা চাঁদ চুমো খেয়েছিল হেসে;
পথে পথে ফোটে রজনীগন্ধা অলকনন্দা যেন,
এমন সময় ঝড় এলো এক,ঝড় এলো খ্যাপা বুনো।।
সেই আঁধারের পশুদের মুখ চেনা,
তাহাদের তরে মায়ের, বোনের, ভায়ের চরম ঘৃণা!
ওরা গুলি ছোঁড়ে এদেশের প্রাণে, দেশের দাবীকে রোখে
ওদের ঘৃণ্য পদাঘাত এই সারা বাংলার বুকে
ওরা এদেশের নয়,
দেশের ভাগ্য ওরা করে বিক্রয়
ওরা মানুষের অন্ন, বস্ত্র, শান্তি নিয়েছে কাড়ি
একুশে ফেব্রুয়ারি! একুশে ফেব্রুয়ারি।।….”]

এই একুশের চেতনা ছড়ায় দূর থেকে আরো দূরে
মতভেদ ভুলে সব বাঙালি দাবি তোলে এক সুরে।।
ফজলুল হক, ভাসানী ও মুজিব আদি নেতাগণ
সবাই জানান আন্দোলনের দাবিতে সমর্থন।।
প্রাদেশিক আইনসভায় দেখে প্রতিবাদের এই রূপ
সোচ্চার সবাই, শুধু মুসলিম লীগ থাকে নিশ্চুপ।।
(ধূয়া :- ‘ ধিক ধিক ধিক! ওরে, ধিক, শত ধিক!”)

আন্দোলনকারীরা এবার নেয় এক নূতন পথ–
সব দল নিয়ে গঠিত হয় এক কর্মপরিষদ।।
সেই পরিষদ অচিরেই এই নির্দেশ করে জারি —
শহীদ দিবস পালিত হবে একুশে ফেব্রুয়ারি।।
পরের বছর এই দিনটিতে যোগ্য মর্যাদায়
শহীদ দিবস পালিত হয় সারা পূব বাংলায়।।
তার পরের বছরে তীব্র রূপ নেয় আন্দোলন,
ক্ষমতাশীন লীগ সরকার তা করতে চায় দমন।।
শহীদ দিবস কাছে এলে প্রাদেশিক সরকার
কিছু রাজনৈতিক কর্মীকে করে নেয় গ্রেফতার।।
তবু সেই দিবসটিতে সাধারণ মানুষজন
শহীদদের মাজারে করে শ্রদ্ধা নিবেদন।।
নগ্নপদে এগিয়ে যায় প্রভাতী মিছিল –
ভাসানী, মুজিব সকলে হন তাতে শামিল।।
এমন করেই হয়ে ওঠে একুশের চেতনা
বাঙালি জাতীয়তাবাদের অমর প্রেরণা।।

[লেখকের পূর্ববর্তী রচনা]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
2 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
তন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়
তন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়
20 days ago

পাঁচালির আঙ্গিকে বাঙালির উজ্বল সময়ের এত এত ব্যাক্তিত্বের এমন অনুপুঙ্খ ছবি আঁকা বড় সহজ কথা নয়। প্রবীণ পাঁচালিকার অসামান্য নিষ্ঠার সঙ্গে এই কাজটা ধারাবাহিকভাবে করে চলেছেন। আমরা তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ।

Shankhadeep Karmakar
Shankhadeep Karmakar
19 days ago

একদিকে লক্ষী পাঁচালি। অন্য দিকে বঙ্গ জীবনের পাঁচালি। একদিকে বঙ্গ পুরান তো আর একদিকে প্রাক ও স্বাধীনতা উত্তর বাংলার ইতিহাস আখ্যান।
সাবলীল শব্দ চয়ন ও প্রাঞ্জল বিবরণ তাই বারবারেই পড়তে চায় এই মন।
আন্তরিক ধন্যবাদ শ্রদ্ধেয় লেখককে।

2
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x