শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

চিত্তপ্রয়াণ – একটি জাতির শোকাশ্রু

দার্জিলিঙে ১৯২৫ সালের ১৬ই জুন আকস্মিকভাবে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের জীবনাবসান হয়েছিল। তখন তাঁর বয়স ৫৫ বছরও পূর্ণ হয়নি।

‘স্টেপ অ্যাসাইড’ — দার্জিলিংয়ের এই বাড়িতে কেটেছিল দেশবন্ধু জীবনের শেষ কয়েক মাস।

মৃত্যুর আগের দু সপ্তাহের ও অব্যবহিত পরের মুহূর্তগুলির স্মৃতিচারণ করে ইতিহাসবিদ রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, দেশবন্ধুজায়া বাসন্তী দেবীর নাকি ইচ্ছা ছিল যে দার্জিলিংয়েই তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হোক। কিন্তু তাঁর অগণিত অনুরাগীদের মনোভাব ছিল অন্যরকম :- “এই পাহাড়ে দেশটিতে আমাদের বাঙ্গালী দেশবন্ধুকে রেখে যাব এটা কোনমতেই পছন্দ হলো না। অনেক বাদানুবাদের পরে এবং কলকাতা থেকে দেশবন্ধুর প্রিয় বন্ধু ও ভক্তদের টেলিগ্রাম এসে পৌঁছানোর পর শ্রীমতি বাসন্তী দেবী দেশবন্ধুর দেহ কলকাতায় নিয়ে যেতে অনুমতি দিলেন।” মাসিক বসুমতী-র দেশবন্ধু সংখ্যায় প্রকাশিত এই স্মৃতিচারণের শেষ অংশটি এরকম :- “যখন ফিরে এলুম তখন অন্ধকারের সঙ্গে সঙ্গে একটা জমাট বাধা নিস্তব্ধতা হিমালয়ের কোলের সেই দেশটাকে অধিকার করে বসেছে। তা ভেঙ্গে দিয়ে পাহাড়ের রমণীদের ক্রন্দনের করুণ ধ্বনি যেন আকাশ ভেদ করে উঠছে। তারা কেন কাঁদে, তারা দেশবন্ধুকে কতটা চেনে, তা তারাই জানে।” [‘দেশবন্ধুর সঙ্গে শেষ সপ্তাহ’]

দার্জিলিংয়ের রাস্তায় রুগ্ন দেশবন্ধুর সঙ্গে হাঁটছেন গান্ধী, মহাদেব দেশাই ও অন্যান্যরা ১৯২৫।

দেশবন্ধুর কন্যা অপর্না দেবী পরবর্তীকালে তাঁর স্মৃতিকাহিনীতে লিখেছেন :- “মহাত্মা গান্ধী এসময় পূর্ববঙ্গ পরিভ্রমণ করছিলেন। তিনি এ সংবাদ পেয়ে তৎক্ষণাৎ কলিকাতা চলে এলেন। আমি কলিকাতায় একা রয়েছি জেনে তিনি আমাদের বাড়ী এসে উঠলেন। … ১৮ই জুন ভোরবেলা মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে আমার স্বামী ও আমি এবং কাকাসাহেব সতীশরঞ্জন দাশ পিতৃদেবের দেহ আনতে ব্যারাকপুর গিয়েছিলাম । আমাদের বাড়ী থেকে আরম্ভ করে ব্যারাকপুর পর্য্যন্ত শোকমগ্ন-জনতার দৃশ্য এখনো চক্ষের সামনে ভাসে। দেশকে তিনি কতখানি ভালবেসেছিলেন, তা বুঝতে পারলাম। … বুঝতে পারলাম সেদিন যে
একা আমরা ভাইবোনরাই পিতৃহীন হইনি— আমাদের সঙ্গে সেদিন সমগ্র দেশই পিতৃহীন হয়েছিল ।…

“ব্যারাকপুরে এসে দেখি দার্জিলিং-মেল আসতে অনেক দেরী হয়ে গেছে। শুনলাম দার্জিলিং থেকে আরম্ভ করে প্রতি-ষ্টেশনে দেশবাসী তাদের প্রিয়-নেতা ও বন্ধুকে শেষ-দর্শন ও শ্রদ্ধা অৰ্পণ করবার জন্যই ধীরে মন্থর গতিতে মেল আসছে।”

অপর্ণা দেবী ঠিকই লিখেছেন, বাংলার অবিসংবাদী এই নেতার মরদেহ যখন ট্রেনে করে কলকাতায় নিয়ে আসা হচ্ছে, প্রত্যেক স্টেশনে তখন জনতার ঢল নেমেছিল শ্রদ্ধা নিবেদনের! ১৭ই জুন নৈহাটি স্টেশনে শবাধারে ফুলের মালার সঙ্গে অর্পিত হল কাগজে লেখা একটি গান, রচয়িতা দেশবন্ধুর পরিচালিত আন্দোলনের এক নবীন সৈনিক কাজী নজরুল ইসলাম। সদ্যরচিত এই গানটির কিছু অংশ :- ‘’হায় চিরভোলা! হিমালয় হতে অমৃত আনিতে গিয়া/ ফিরিয়া এলে যে নীলকণ্ঠের মৃত্যু গরল পিয়া!’ [‘অর্ঘ্য’]

এরপরের ঘটনাবলী অপর্ণা দেবীর কলমে :- ” মেল যখন ষ্টেশনে প্রবেশ করল তখন ‘হরিবোল’ ও ‘বন্দেমাতরম্’ ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়ে উঠল, সেদিন প্রতিজনের স্নেহ ও শ্রদ্ধাপূর্ণ-আচরণ আমার চিরদিনই মনে থাকবে ।… আমাদের গাড়ী ধীরে মন্থর গতিতে শিয়ালদহ এসে পৌঁছাল। এ রকম শোকাহত-আকুল-জনতা আর কখনো দেখিনি। ধনীদরিদ্রেব একত্র-সমাবেশ এভাবে কখনো হয়েছে কি না জানি না । ট্রেন উপস্থিত হলে শত-সহস্র-বেদনাতুর-কণ্ঠে ধ্বনিত হোল “বন্দেমাতরম্ ।” মহাত্মা ধীরকণ্ঠে জনতাকে শান্ত হতে বল্লেন। সেই বিরাট-জনসঙ্ঘ মন্ত্রমুগ্ধের মত স্তব্ধ হয়ে রইল। মনে হচ্ছিল আমাদেরই মত ঐ বিশাল জনসমুদ্র আজ শোকাৰ্ত, মূক।…

কলকাতায় দেশবন্ধুর মরদেহের সামনে গান্ধীজী ও খান আব্দুল গফফার খান।
দেশবন্ধুর মরদেহের ছবির ওপর রবীন্দ্রনাথের স্বহস্তলিখিত কবিতিকা ।

“পিতৃদেবের শব-বহনের জন্য ভোম্বল, আমার স্বামী, আচার্য্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় ও শ্যামসুন্দর চক্রবর্ত্তী শবাধার থেকে শব এনে ষ্টেশনে রক্ষিত-পালঙ্কে স্থাপিত করলেন। শত-সহস্র হিন্দুমুসলমান, শিখ, খৃষ্টান, বৌদ্ধ, জৈন, সকলের ভক্তি অর্ঘ্য-কুসুমদানে পিতৃদেব সজ্জিত হলেন ।” [দ্রষ্টব্য ‘মানুষ চিত্তরঞ্জন’]

বাংলার আবালবৃদ্ধ কয়েক লক্ষ জনতার সঙ্গে সেদিন দেশবন্ধুর শবানুগমন করেছিলেন বিপিন পাল, গান্ধী, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, খান আব্দুল গফফার খান প্রমুখ বিশিষ্টজন। মাসিক বসুমতীর বিবরণ অনুযায়ী শোকযাত্রায় ৫০/৬০ হাজার লোক যোগদান করেছিল। কেওড়াতলা শ্মশানে সমবেত হয়েছিল প্রায় দু লক্ষ লোক। বিকেলবেলা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় অল্পঅল্প বৃষ্টি পড়ছিল। সেখানে একটি বেঞ্চিতে বসেছিলেন মহাত্মা গান্ধী। সেখানে মরদেহ পৌঁছবার আগে থেকেই তিনি অপেক্ষা করছিলেন ও পত্রপত্রিকার জন্য শোকনিবন্ধ লিখছিলেন। তাঁর সামনে বসে তাঁর একটি মাটির মূর্তি তৈরি করছিলেন কৃষ্ণনগরের বিখ্যাত ভাস্কর গোপেশ্বর পাল।

কেওড়াতলা শ্মশানে দেশবন্ধুর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় উপস্থিত গান্ধীজি পত্রিকার জন্য শোকনিবন্ধ লিখছেন।

১লা জুলাই দেশবন্ধুর রসা রোডের বাসভবনে তাঁর শ্রাদ্ধকার্য সম্পাদন করেছিলেন পুত্র চিররঞ্জন। শ্রাদ্ধসভায় শোভা পাচ্ছিল গোপেশ্বর পাল নির্মিত দেশবন্ধুর একটি মাল্যভূষিত আবক্ষ মূর্তি। শ্রাদ্ধমন্ডপের প্রবেশপথে জনতার ভিড় সামলাচ্ছিল কংগ্রেস স্বেচ্ছাসেবীরা। মাসিক বসুমতী, বঙ্গবাণী, সার্ভেন্ট, ফরোয়ার্ড ইত্যাদি বহু পত্রিকা প্রকাশ করেছিল বিশেষ দেশবন্ধু-সংখ্যা। একটি মৃত্যুর প্রতিক্রিয়ায় সারা বাংলা জুড়ে সেদিন যা ঘটে চলেছিল তাকে আক্ষরিক অর্থেই বীরবন্দনা বলা চলে।

কবিকুলের দেশবন্ধু-বন্দনা

নবীন অথবা প্রবীণ, হিন্দু কিম্বা মুসলিম — বাংলার কবিকুলের কেউই তখন এই মহামৃত্যুকে স্মরণ করে কবিতার্ঘ্য নিবেদনে পিছিয়ে থাকেন নি। দেশবন্ধু-জায়া বাসন্তী দেবীকে উদ্দেশ করে প্রবীণা কবি কামিনী রায় লিখেছিলেন, “সে নহে তোমারি শুধু। তারে ভালবাসি/ লয়েছে আপন করি তব দেশবাসী;/ তোমারেও করিয়াছে তাই আপনার,/ বাটিয়া লয়েছে তব বেদনার ভার।/ তাহাদের দুঃখদৈন্য লও বুকে তুলে/ আজ হতে মৃত্যুশোক যাও তুমি ভুলে।/ কার মৃত্যু? লক্ষ বক্ষে যে পেয়েছে ঠাই/ সে কি মরে দেহনাশে? মৃত্যু তার নাই।/ তুমি যার ছিলে জায়া সখি ও সচিব/ বঙ্গের হৃদয়-গেহে সে যে চিরঞ্জীব [‘শোকে আশীর্বাদ’/ মাসিক বসুমতী দেশবন্ধু সংখ্যা] প্রবীণ নাট্যকার অমৃতলাল বসুও কীর্তনের ছন্দে বাসন্তী দেবীর উদ্দেশে লেখেন, “… দেখ, কোটি কোটি লোকে,/ জলভরা চোখে/ ডাকে, মা মা ব’লে তোকে;/ বাসন্তী মা,/ তারা সন্তান বলিয়া/ এসেছে সান্তনা দিতে পদপ্রান্তে বসি।…” [‘হারাধন অন্বেষণ’, ঐ]

চিত্ত-প্রয়াণের সপ্তাহখানেক পরে লেখা নজরুলেরই ‘ইন্দ্রপতন’ নামে একটি দীর্ঘ কবিতা প্রকাশিত হয় আত্মশক্তি পত্রিকায় (১২ আষাঢ় ১৩৩২)। সুপরিচিত এই কবিতাটির একটি অংশে ছিল:- “পয়গম্বর ও অবতার-যুগে জন্মিনি মোরা কেহ,/ দেখিনি ক মোরা তাঁদের, দেখিনি দেবের জ্যোতির্দেহ।/ কিন্তু যখনি বসিতে পেয়েছি তোমার চরণ-তলে,/ না জানিতে কিছু না বুঝিতে কিছু নয়ন ভরেছে জলে।/ …বুদ্ধের ত্যাগ শুনেছি মহান, দেখিনি ক চোখে তাহে/ নাহি আফসোস, দেখেছি আমরা ত্যাগের শাহানশাহে।…’ ইত্যাদি। শ্রদ্ধা ও শোকের আগে আবেগ কতটা গভীর ও তীব্র হলে একজন মুসলিমের পক্ষে এক মর্ত্যমানুষকে খোদ পয়গম্বরের সঙ্গে তুলনা করা (যা নিয়ে তখন মুসলিমসমাজে বিতর্কসৃষ্টি হয়) সম্ভব হতে পারে, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। শুধু এ দুটিই নয়, চিত্তরঞ্জনের অকালপ্রয়াণের প্রতিক্রিয়ায় নজরুল লেখেন ‘সান্ত্বনা’, ‘রাজভিখারী’ ইত্যাদি বেশ কয়েকটি কবিতা ও গান, যেগুলি সংকলন করে নজরুলের ‘চিত্তনামা’ (১৩৩২) কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছিল।

জীবনানন্দ দাশগুপ্ত নামে তখন উদীয়মান এক কবি ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকার চিত্তরঞ্জন সংখ্যায় [শ্রাবণ ১৩৩২] ‘দেশবন্ধু প্রয়াণে’ শীর্ষক এক কবিতায় লেখেন, যার অংশ:- “বাংলার অঙ্গনেতে বাজায়েছ নটেশের রঙ্গমল্লী গাথা/অশান্ত সন্তান ওগো, বিপ্লবিনী পদ্মা ছিল তব নদীমাতা।/ কালবৈশাখীর দোলা অনিবার দুলাইত রক্তপুঞ্জ তব/ উত্তাল ঊর্মির তালে – বক্ষে তব লক্ষ কোটি পন্নগ-উৎসব/ উদ্যত ফণার নৃত্যে আস্ফালিত ধূর্জটির কন্ঠ-নাগ জিনি,/ ত্র্যম্বক-পিনাকে তব শঙ্কাকুল ছিল সদা শত্রু-অক্ষৌহিণী।…” (পরবর্তীকালে ‘ঝরা পালক’ কাব্যগ্রন্থভুক্ত) নজরুলের মতোই সেই মহামৃত্যুর অভিঘাতে একগুচ্ছ কবিতা লিখেছিলেন কবিশেখর কালিদাস রায়। ‘চিত্ত-চিতা’ নামে সংকলিত সেই কবিতাগুলির একটিতে তিনি লিখেছিলেন, “কাঁদো বঙ্গবাসী আজ দগ্ধ চিতা কাষ্ঠ বুকে ধরি/ কাঁদো মাতা তারই ভস্ম মাখি অঙ্গে মুষ্টি মুষ্টি করি/ শব তার বক্ষে চাপি কেঁদে গলে যাও শৈলরাজ,/ ভীষ্মেরে হারায়ে পুন: মা জাহ্নবী কাঁদো কাঁদো আজ।…” ইত্যাদি।

দার্জিলিং-এ দেশবন্ধুর শবযাত্রার ছবি ও কলকাতার সংবাদপত্রে সেই সংক্রান্ত খবর।

কালিদাস রায়ের মতো কবি গোলাম মোস্তফাও লিখলেন, “… কাঁদো কাঁদো আজি জননী ভগিনী/ কাঁদো কাঁদো আজি তরুণ দল/ অশ্রু জলের উৎসব আজি/ চাই শুধু আজি অশ্রু জল।’ একই কবিতার আরেকটি অংশ :- “চেয়ে দেখো আজই নয়ন মেলিয়া হে আমার চির অভাগা দেশ-/ তোমার লাগিয়া কে মহাপুরুষ নিজের জীবন করেছে শেষ!/ সুখসম্পদ বিলায়ে গিয়াছে/ দিয়াছে অর্থ দিয়াছে মান,/ বাকি যাহা ছিল তাও দিল আজি,/ দিল যে আনিয়া আপন প্রাণ!” [অশ্রু উৎসব’, মাসিক বসুমতী দেশবন্ধু সংখ্যা”] ওই সংখ্যায় গল্পলেখিকা অনুরূপা দেবীর স্মৃতিচারণার শেষে ছিল কবিতায় লেখা কয়েকটি ছত্র :- “মৃত্যু নহে এই যে নিদ্রা তব জাগরণ/ পুনঃ সঞ্চারিতে নবীন জীবন/ আরো উচ্চ লক্ষ্য ধ্যান তরে/ প্রদানিতে বিরাম পঙ্কজ আঁখিযুগে/ তোমার তরে প্রতীক্ষায় আছে সর্বজন। …”

দেশবন্ধু মৃত্যুর পর তাঁর বাসভবনকে দেশবাসীর উদ্দেশে উৎসর্গ করে ‘চিত্তরঞ্জন সেবাসদন’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হলে জনসাধারণের কাছে থেকে অর্থসংগ্রহের এক পরিকল্পনা করা হয়। সেই উপলক্ষে প্রচারপুস্তিকায় ছাপানোর জন্য তাঁর মরদেহের একটি ছবির ওপর দুই ছত্র দেবার অনুরোধ নিয়ে বিধানচন্দ্র রায় রবীন্দ্রনাথের কাছে গেলে তিনি লিখে দেন সেই বিখ্যাত পঙক্তি মালা :- ”এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ/ মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান।”

পত্রপত্রিকার শোকজ্ঞাপন ও মূল্যায়ন

কবিতায় কালিদাস রায় যে কথা বলেছিলেন, নিজের সম্পাদিত সার্ভেন্ট পত্রিকায় প্রায় সেকথাই লিখলেন দেশবন্ধুর রাজনৈতিক সহযোগী ও শেষের দিকে কাউন্সিল প্রবেশ নীতি নিয়ে মতবিরোধের কারণে তাঁর সমালোচক শ্যামসুন্দর চক্রবর্তী:- ” দেশবন্ধু দাশ আর নেই। বাংলা, যদি চোখে তোমার জল থাকে, তবে কাঁদো। এই আঘাতের বিহ্বলতা প্রকাশের ভাষা নেই।… রাজপুত্র দেশবাসীর জন্য ভিখারি সেজেছিলেন। মৃত্যু তাঁর কাছে পরাজিত…।” উল্লেখ্য যে, অতীতে যারা
দেশবন্ধুর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা বিরোধী ছিলেন (যেমন সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি, বিপিনচন্দ্র পাল কিম্বা গান্ধী), তাঁরা কেউই এই মৃত্যুতে যথোচিত শোকপ্রকাশে কোন কার্পণ্য করেননি। গান্ধী ইয়ং ইন্ডিয়া পত্রিকায় লেখা একটি প্রবন্ধে কাউন্সিল প্রবেশ ও অন্যান্য কিছু প্রশ্নে চিত্তরঞ্জনের সঙ্গে তাঁর বিবাদ ও মতভেদেকে বিদ্বেষহীন বলে উল্লেখ করেছিলেন ও এর তুলনা করেছিলেন দুই প্রণয়ীর মধ্যে কলহের সঙ্গে।

রাজনীতিতে চিত্তরঞ্জনের এক অসামান্য অবদান বলে যা কীর্তিত সেই বেঙ্গল প্যাক্টের দৌলতে বাংলার মুসলিমসমাজে দেশবন্ধু এমন এক আস্থার আসন অর্জন করেছিলেন, যা অবিভক্ত ভারতের আর কোন নেতার পক্ষে সম্ভব হয়নি। সে কারণে মোহাম্মদ আলী, মওলানা আজাদ, জিন্না ও সুরাবরদি প্রমুখ দলমতনির্বিশেষে দেশের সব মুসলিম নেতাই দেশবন্ধুর মহত্ত্ব ও গুরুত্বের কথা স্বীকার করেছিলেন। একই কারণে মুসলমান, মোহাম্মদী, মুসলিম আউটলুক, জমিন্দার, ইত্যাদি মুসলিম পত্রপত্রিকাও আবেগদীপ্ত ভাষায় প্রয়াত নেতাকে শ্রদ্ধা জানিয়েছিল। ‘মুসলমান’ পত্রিকাটির মনে হয়েছিল, চিত্তরঞ্জন অকপট দেশপ্রেমিক, ‘হিন্দু মুসলিম ঐক্যের অন্যতম অগ্রদূত’, আর মোহাম্মদী-র মতে দেশবন্ধুর মৃত্যু ছিল দেশবাসীর প্রতি খোদার চরম দণ্ড, যার কঠোরতা অসহ্য ও কল্পনাতীত। তার চোখে চিত্তরঞ্জন ‘ভারতের প্রাণপুত্তলি’, ‘একটা মানুষের মতো মানুষ’… ‘মহাপ্রাণ’.… ‘ত্যাগবীর’!

ভারতের রাজনীতিতে সেই ইন্দ্রপতনে বাংলার বাইরের অন্যান্য সংবাদপত্রগুলোও পিছিয়ে ছিল না স্বভাবতই। কিন্তু স্বদেশের মুক্তি অর্জনের সংগ্রামে যারা তাঁর ঘোষিত শত্রুপক্ষ, সেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের প্রতিনিধি ও সমর্থক যেসব মানুষ ও সংবাদপত্র চিত্তরঞ্জনের প্রয়াণে আনুষ্ঠানিক শোক প্রকাশ করেছিলেন তাদের মধ্যে ছিলেন ভাইসরয় লর্ড আরউইন, লর্ড রিডিং, লর্ড বার্কেনহেড, জে এল গারভিন প্রমুখ বিশিষ্টজন, ছিল স্টেটসম্যান, ডেলি এক্সপ্রেস ডেইলি নিউজ, ডেইলি হেরাাল্ড, অবজারভার, টাইম, ডেইলি গ্রাফিক ইত্যাদি সাহেবি সংবাদপত্র। ব্রিটিশ স্বার্থের ধজাধারী যে-স্টেটসম্যান একদা তাঁকে ‘ধ্বংসের সেবক’ ও ‘দুষ্ট প্রতিভা’ (‘evil genius’) বলে আখ্যায়িত করেছিল, সেই কাগজই তাঁর শোকবার্তায় লিখেছিল, “With dramatic and awful suddenness death has called the tribune of Bengal. To friend and foe alike, the news of Mr Das’s premature passing will come as a stunning blow….” নজরুল তাঁর সেই ‘ইন্দ্রপতন’ কবিতাটিতে যে বলেছিলেন ”হে অরিন্দম, মৃত্যুর তীরে করেছ শত্রু জয়,/ প্রেমিক, তোমার মৃত্যু-শ্মশান আজিকে মিত্রময়”, আমরা দেখেছি এতক্ষণ উৎকলিত সমাজের নানা স্তর থেকে উৎসারিত শোকলিখনগুলি থেকে তার সার্থকতাই প্রতিপাদিত হয়। শতবর্ষ পূর্বের সেই প্রয়াণটিতে ভারতের সমাজ-সংস্কৃতি-রাজনীতির অঙ্গন শোকোচ্ছ্বাসের যে অভূতপূর্ব আলোড়নে মথিত হয়েছিল, তার কিছু ক্ষুদ্র কণিকা আমরা এখানে আহরণ করলাম শুধু এ ব্যাপারটির আভাস দেবার জন্য যে, সেটি নিতান্ত যে কোনো একজন রাজনৈতিক নেতার প্রয়াণমাত্র ছিল না।

দেশবন্ধু স্মৃতিসংখ্যা মাসিক বসুমতী পত্রিকার পৃষ্ঠা। … (১)

বিশিষ্ট ব্যক্তিদের কলমে সদ্যপ্রয়াত চিত্তরঞ্জনের ছবি

দেশবন্ধুর মৃত্যুর পর যেসব পত্রপত্রিকা বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছিল, সেগুলির মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য মাসিক বসুমতীর আষাঢ় ১৩৩২ সংখ্যাটি। প্রচুর মূল্যবান ছবি সহ বাংলাদেশের নানা অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অভিমত এই সংখ্যাটিতে সযত্নে সংকলিত হয়েছিল। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় চিত্তরঞ্জনের রাজনৈতিক জীবনের বিশ্লেষণ করে এই বিশেষ সংখ্যায় লিখেছিলেন যে, তাঁর কংগ্রেসে যোগদান ও কার্যকাল উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, আনন্দমোহন বসু, রমেশচন্দ্র দত্ত বা অশ্বিনীকুমার দত্তের মতো নেতাদের তুলনায় অনেক কম ছিল। তাঁর ভাষায় “চিত্তরঞ্জনের কংগ্রেস জীবন বয়সে নবীন হইলেও কর্মে প্রবীণ ছিল এবং অতি অল্প সময়ের ভিতরই ভারতের রাজনীতি ক্ষেত্রে তিনি নেতৃত্ব লাভ করিয়াছিলেন।” নওরোজি বা গোখলের মতো অর্থনৈতিক জ্ঞান বা বিশ্লেষণ ও তর্কবিতর্কের ক্ষমতা চিত্তরঞ্জনের না থাকা সত্ত্বেও তিনি যে ভারতের রাজনীতির ক্ষেত্রে শীর্ষস্থান অধিকার করতে পেরেছিলেন “বঙ্গবাসীর এমন কি সমগ্র ভারতবর্ষের হৃদয় রাজ্য” তিনি অধিকার করেছিলেন, তার কারণ নির্দেশ করে প্রফুল্লচন্দ্র লেখেন, ”প্রথমত তিনি সম্যক উপলব্ধি করিয়াছিলেন যে স্বরাজ লাভ না হইলে ভারতের নিস্তার নাই এবং অর্থনৈতিক মুক্তি ও হইবে না এই সমস্ত হৃদয়ঙ্গম করিয়া যখন তিনি রাজনীতি ক্ষেত্রে ঝাঁপ দিলেন তখন সর্বতাগী হইয়াই তাহা করিলেন। …দেশবন্ধু একেবারে তথ্যানুসঙ্গী বস্তুতান্ত্রিক ছিলেন না। তিনি ছিলেন কবি। আদর্শবাদ ও ভাবুকতার দ্বারাই তিনি বাঙ্গালার তরুণ মনকে জয় করিয়াছিলেন।”

সমকালের বর্ষীয়ান রাজনীতিক বিপিনচন্দ্র পালও চিত্তরঞ্জনের কবিস্বভাবকে লক্ষ করে লিখেছিলেন,”চিত্তরঞ্জন কোন কাজই আধখানা করিয়া ক্ষান্ত থাকিতে পারতেন না ইহাতে তাহারই প্রমাণ পাওয়া যায়। সকল বিষয়ের সামঞ্জস্য করিয়া লইবার শক্তি এবং সাধনা তাঁহার ছিল না।… এই শক্তি জগতের কবিদের মধ্যে প্রায় দেখাও যায় না।” (‘চিত্তরঞ্জনের কথা’) আরেকজন রাজনীতিক নলিনীরঞ্জন সরকারও প্রফুল্লচন্দ্রের মত চিত্তরঞ্জনের সঙ্গে ভারতের অন্যান্য নেতাদের তুলনা করেছিলেন। তাঁর মতে দেশবন্ধুর পূর্বে যে সব রাষ্ট্রনেতারা ছিলেন, তাঁদের সমগ্র প্রচেষ্টা শুধুমাত্র বক্তৃতা, প্রস্তাব গ্রহণ আর কনফারেন্স প্রভৃতির অধিবেশনে পর্যবসিত হয়েছিল, দেশবাসীকে কোন নির্দিষ্ট সুস্পষ্ট পথপ্রদর্শন যে তাঁরা করতে পারেননি। তার কারণ রাজনীতিতে তাঁরা কেউই “সর্বত্যাগী চিত্তরঞ্জনের মত মন প্রাণ দিয়া আত্মনিয়োগ করিতে পারেন নাই।” (‘দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন’)

আরেক নেতা শ্যামসুন্দর চক্রবর্তীর সাহিত্যসুরভিত চিত্তরঞ্জন-মূল্যায়নের কিছু অংশ :- “ভাগ্যধর চিত্তরঞ্জন প্রাণ দিয়া, ধন দিয়া, বুদ্ধি দিয়া, মান দিয়া সব দলটাকে ভালো করিয়া চিনাইয়া গেল। আজ চিত্তরঞ্জনের চন্দ্রিকায় দেশ আলো। চিত্তরঞ্জন তুষের আগুনের মতো জ্বলিয়া জ্বলিয়া শেষকালে আগ্নেয়গিরির মতো ফাটিয়া উঠিয়া দেশটাকে কাঁপাইয়া গেলেন।… দেশই ছিল তাঁহার অন্ন, দেশই ছিল তাহার জল, দেশই ছিল তাঁহার বায়ু। … দেখি সাত কোটি ভূজে বল আসিয়া দেশমাতৃকার উদ্ধার সাধন হয় কিনা।” [অশ্রুধারা] আবার আইনব্যবসায় ও রাজনীতিতে দেশবন্ধুর সহযোগী দেবীপ্রসাদ খৈতান নিজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে লিখেছিলেন :- “‘তাঁহার একটা মহৎ গুণ দেখিয়াছি, যে কোন কাজই করিতেন সামাজিক বা রাজনৈতিক যে কোন প্রশ্ন তাঁহার সম্মুখে উত্থাপিত হইত, তিনি বিশেষভাবে না বুঝিয়া তাহাতে মত দিতেন না, সকল বিষয়েই তলাইয়া দেখিতেন।… তাঁহার প্রকৃতি খুব artistic ছিল। …নিজে কষ্টে পড়িয়া অন্যের উপকার করিতেন।” (‘চিত্তরঞ্জন স্মরণে’)

দেশবন্ধু স্মৃতিসংখ্যা মাসিক বসুমতী পত্রিকার পৃষ্ঠা। … (২)

মাসিক বসুমতীর এই স্মরণসংখ্যাটি দেখলে মনে হয়, মানুষ অথবা নেতা – চিত্তরঞ্জনের সব ভূমিকার মধ্যেই তাঁর বাঙালিত্বের স্পষ্ট অভিজ্ঞান অনেকেই লক্ষ করেছিলেন, যেমন স্বরাজ্য দলের আরেকজন নেতা সাতকড়িপতি রায় :- “সমস্ত পৃথিবী আজ তাঁহার অনন্য সাধারণ বুদ্ধিমত্তার, তাঁহার অভূতপূর্ব দৃঢ় সংকল্পের, তাঁহার অভাবনীয় দেশভক্তির কথা কীর্তন করিতেছে কিন্তু বাঙালির হৃদয় আকৃষ্ট হইয়াছিল দেশবন্ধুর বাঙ্গালিত্বে। দেশবন্ধু কায়মনোবাক্যে খাঁটি বাঙ্গালী ছিলেন। তিনি ভাবিতেন বাঙ্গালীর মত, কাজ করিতেন বাঙ্গালীর মত, তাঁহার আহার উপবেশন শয়ন সবই ছিল বাঙ্গালীর। …, তিনি ভারতবর্ষের রাজনীতি ক্ষেত্রে একজন প্রধান যোদ্ধা হইতে পারেন, কিন্তু তিনি বাঙ্গালার সর্বস্ব।” [‘নেতার বিয়োগে কর্মী’] আবার সাংবাদিক হেমেন্দ্রনাথ দাশগুপ্তও মনে করেছিলেন বাঙালিত্বই চিত্তরঞ্জনের সর্বপ্রধান পরিচয়:- ”একা চিত্তরঞ্জন আজ বাঙ্গালার গৌরব উন্নত গিরিশিখরে প্রতিষ্ঠা করিয়াছেন। বাঙালার ইতিহাস গঠন করিয়া অনন্তশয্যায় শয়ন করিয়াছেন। সপ্ত কোটি নরনারীর দাসত্বশৃংখল একা মুক্ত করতে গিয়া নিজে দেহপাত করিয়াছেন। [‘বাঙ্গালার চিত্তরঞ্জন’]

আরেকজন সাংবাদিক লেখক সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার লিখেছিলেন :– “তাঁহার পতাকা তাঁহার বর্মচর্ম তাঁহার বিজয়-মহিমান্বিত তরবারি ও অস্ত্রশস্ত্রের উত্তরাধিকারী বাঙ্গালী আমরা তাঁহার পুণ্যস্মৃতি শ্রদ্ধানতশিরে বহন করিয়া এই বিঘ্নবহুল সংগ্রামে প্রবৃত্ত হইব।” (‘দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন) একদা ভারতী পত্রিকার সম্পাদিকা ও দেশনেত্রী সরলা দেবী লিখেছিলেন, “ভারতের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা সুপ্ত নহেন। তিনি জাগ্রত। সুভাষ ও সত্যেন্দ্র সহচরদ্বয়কে ব্রিটিশসিংহ দেশের বুক হইতে ছিনাইয়া লইয়া গিয়াছে। কিন্তু তাঁহাদের অধিনায়ক প্রবলপ্রতাপ দেশবন্ধুকে, যিনি মৃগাণা‍ং মৃগেন্দ্র, তিনি নিজের ব্যক্ত আননে গ্রহণ করিলেন। …দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের প্রাণতরী আজ অনন্ত সাগরে ভাসমান। তরী ভাসিবার পূর্বে তাঁহার জীবনের ক্ষণিকতাকে পূর্ণতায় ভরিয়া সকলের জন্য তিনি আদর্শ রাখিয়া গেলেন।” (সহজাত যজ্ঞ)

দেশবন্ধু রাজনীতির যাঁরা সমর্থক ছিলেন না, তাঁরাও যে তাঁর প্রয়াণকালে যথাযোগ্য অভিবাদন জানাতে কুণ্ঠিত হননি, সেটিও মাসিক বসুমতীর এই সংখ্যাটির রচনাগুলো থেকে বোঝা যায়। বিশিষ্ট শিল্পপতি রাজেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের (স্যার রাজেন) নিজের হস্তাক্ষরে যে-বাণী এতে ছাপা হয়েছিল, তাতে দেখা যায় যে, চিত্তরঞ্জন ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য’ যে প্রণালী অবলম্বন করেছিলেন তা তিনি যুক্তিযুক্ত মনে করেন নি। তাঁর মতে দেশবন্ধুও শেষজীবনে বুঝেছিলেন যে, “তাঁহার প্রণালী অনুসারে চলিলে স্বরাজ লাভের আশু সম্ভাবনা নাই। তিনি ভারতের রাজনৈতিক আকাশে যে ঝড় তুলিয়াছিলেন সেই ঝড়ের রেশ দেখিয়া শেষ জীবনে তিনি নিজেই ভয় পাইয়াছিলেন। … আজ লক্ষ লক্ষ নরনারী যে তাঁহার জন্য কাঁদিতেছে সে তাঁহার অসাধারণ ধীশক্তির জন্য নহে, তাঁহার রাজনৈতিক যুদ্ধে নেতৃত্বের জন্য নহে, তাঁহার উদার হৃদয়ের জন্য, তাঁহার ত্যাগ স্বীকারের জন্য।…” (‘চিত্তরঞ্জন’)

দেশবন্ধু স্মৃতিসংখ্যা মাসিক বসুমতী পত্রিকার পৃষ্ঠা। … (৩)

শিক্ষাবিদ ও বিচারপতি দেবপ্রসাদ সর্বাধিকারীও চিত্তরঞ্জনের রাজনৈতিক পন্থার সুফল কত দিনে পাওয়া যাবে, সে ব্যাপারে সন্দিহান ছিলেন। তবুও তিনি মনে করেছেন, “দেশসেবা উপলক্ষে চিত্তরঞ্জনের শক্তি ও প্রথার ক্রমবিকাশ দেশভক্তমাত্রেরই ঐকান্তিক অনুধাবনের যোগ্য বিষয়। নতুন পথে মাতৃসেবার তিনি আয়োজন করিতেছিলেন এবং যে জন্য তাঁহার ভক্তগণের মধ্যে অনেকের মনে বিরাগ সৃষ্টি করিতেও তিনি পশ্চাৎপদ হয়েন নাই, …কিন্তু তাঁহার এ কল্পনা অঙ্কুরেই বিনাশ পাইল, দেশের পক্ষে রাজা-প্রজার পক্ষে তাহা দারুণ ক্ষতি। সহজে সহসা ও শীঘ্র যে সে ক্ষতিপূরণ হইবে তাহার সম্ভাবনা নাই।” (‘চিত্তরঞ্জন)

মাসিক বসুমতী পত্রিকার পরের সংখ্যাটিও (অর্থাৎ শ্রাবণ ১৩১২) পূর্ববর্তী সংখ্যার মতোই দেশবন্ধু সম্পর্কিত রচনা ও ছবি দিয়ে সাজানো হয়েছিল। যে সমস্ত রাষ্ট্রনেতা ও বিশিষ্ট ব্যক্তি এই সংখ্যায় লিখেছিলেন, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, হেমন্তকুমার সরকার, শ্রমিকনেতা সি এফ এন্ড্রুজ, নাট্যকার অমৃতলাল বসু প্রমুখ। যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত দেশবন্ধুর স্মৃতিচারণ করে লিখেছিলেন, “দরিদ্রের প্রিয়তম বন্ধু চিত্তরঞ্জন, বাঙ্গালার স্বরাজ-সূর্য চিত্তরঞ্জন, ভারতের মুক্তিসাধনার মহান সাধক চিত্তরঞ্জন আজ আর নাই। বাঙ্গালীর তাই আজ বড় দুঃখ, বড় ব্যথা। বাঙ্গালী তাই আজ বড় নিঃসহায়।” [‘দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন’ ] বঙ্গরাজনীতির আরেক নেতা কিরণশঙ্কর রায়ের মূল্যায়ন ছিল :- “মহাত্মাজি ভারতবর্ষের ব্রাহ্মণ এবং দেশবন্ধু ক্ষত্রিয়। এই ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়ের সাধনাযোগে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আসিত। কিন্তু হায় রে ভারতবর্ষ! সে গুরুযোগ ভারতের অদৃষ্টে বেশী দিন রহিল না।” [ ‘ক্ষত্রিয় চিত্তরঞ্জন’]

দেশবন্ধুর অনুগামী আরেক নেতা নির্মলচন্দ্র চন্দ্রের মূল্যায়ন ও কম আকর্ষণীয় নয় :- “জন্মগত সংস্কার বশেই চিত্তরঞ্জন জননায়ক ছিলেন। একবার দেশের লোক তাঁহার নেতৃত্ব অস্বীকার করিয়াই বুঝিয়াছিল যে, এই অহিংস রণে মহাত্মা তন্ত্রধারক ছিলেন, কিন্তু পৌরোহিত্যের ভার ছিল দেশবন্ধুর উপর। বিদেশী আমলাতন্ত্রকে উপর্যুপরি বিধ্বস্ত করিবার শক্তি ছিল মাত্র তাঁহাতেই।”[ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন] বাসন্তী দেবীকে এক চিঠিতে কংগ্রেস নেত্রী সরোজিনী নাইডু লিখেছিলেন, “বাসন্তী, আমার বাল্যকালের খেলার সাথী, আমার প্রিয় সখী, তোমার নিকট আমি বহুবার পত্র লিখিবার চেষ্টা করিয়াছি কিন্তু পারি নাই।… আজ ভারতবাসী মাত্রই তোমার পতির মৃত্যুতে শোকার্ত।… তুমি রানী — দেশবাসীর শোক তোমার মুকুটস্বরূপ হইবে। দেশবাসী যে তাহাদের রাজার মৃত্যুতে শোকাবনত, দেশবন্ধুর কথা মনে হইলে আমার ওই এক কথাই মনে পড়ে।” [ মাসিক বসুমতী, শ্রাবণ ১৩৩২]

শোকসভায় উৎসারিত স্মরণ-শ্রদ্ধার্ঘ্য

দেশবন্ধুর প্রয়াণে কলকাতা তথা ভারতের নানাস্থানে অসংখ্য স্মরণ সভা আয়োজিত হয়েছিল, সেখানে যোগদান করে শ্রদ্ধানিবেদন করেছিলেন খ্যাত অখ্যাত নানা স্তরের মানুষ। টাউন হলে এক শোকসভায় সভাপতি ছিলেন মহারাজ স্যার বিজয়চন্দ্র মহতাব।

অসুস্থতাবশত সভায় যোগদান করিতে না পারায় রবীন্দ্রনাথ যে-সংক্ষিপ্ত বাণীটি পাঠান, তাতেও তাঁর রাষ্ট্রনেতার গুণাবলীর চেয়ে ত্যাগকেই বড় দান হিসেবে দেখতে চাওয়া হয়েছে :- “চিত্তরঞ্জন তাঁহার যে-সৰ্বশ্ৰেষ্ঠ দান তাঁহার দেশবাসীকে উৎসর্গ করিয়াছেন তাহা কোনো বিশেষ সামাজিক বা রাষ্ট্রিক কর্তব্যপালনের আদর্শমাত্র নহে, তাহা সেই সৃষ্টির শক্তিশালী মহাতপস্যা, যাহা তাঁহার ত্যাগসাধনের মধ্যে অমৃতরূপ ধারণ করিয়াছে।” [১-৭-১৯২৫] রবীন্দ্রনাথ সংবাদপত্রের জন্য এই বাণীর একটি ইংরেজি অনুবাদও করে দিয়েছিলেন।

দেশবন্ধু একদা-কর্মক্ষেত্র কলকাতা কর্পোরেশনের সামনে দিয়ে তাঁর অন্তিম যাত্রার দৃশ্য।
কলকাতার রাজপথে দেশবন্ধুর শবযাত্রার ছবি।

সভাপতি বিজয়চন্দ্র মহতাব বলেছিলেন, “আমরা আজ দেশবন্ধুর রাজনৈতিক মত ও পথের কথা ভুলে তাঁর ব্যক্তিত্ব, চরিত্র, স্বার্থত্যাগ ইত্যাদির জন্য তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করব।” বিপিনচন্দ্র পাল বলেন, দেশবন্ধু সঙ্গে অনেকেই একযোগে কাজ করেছেন, আবার অনেকে তাঁকে মাঝপথে পরিত্যাগ করে গেছে। তাঁর মৃত্যুতে যে শোকোচ্ছ্বাস উত্থিত হয়েছে, তার স্রোতে বর্তমানে সকল মতবিরোধ, সকল বিবাদ-বিসম্বাদের অবসান হয়েছে। এ ছাড়াও এই সভায় বক্তৃতা করেন শ্যামসুন্দর চক্রবর্তী, যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত, ব্যোমকেশ চক্রবর্তী, স্যার প্রভাসচন্দ্র মিত্র, হীরেন্দ্রনাথ দত্ত, মুসলিম পত্রিকার সম্পাদক মৌলভী মুজিবর রহমান, ড. প্রাণকৃষ্ণ আচার্য প্রমুখ অনেকে।

গড়ের মাঠে আয়োজিত আর এক বিশাল শোকসভায় গান্ধী সভাপতিত্ব করেন ও অন্যান্য বক্তাদের মধ্যে ছিলেন ললিতমোহন দাস, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ প্রমুখ অনেক বিশিষ্টজন। মাদারীপুরের কংগ্রেস কর্মী সুরেন্দ্রনাথ বিশ্বাস ললিতবাবুর শোকপ্রস্তাব সমর্থন করে বক্তৃতা প্রসঙ্গে বলেন, “ভাই চিররঞ্জন, তুমি শুধু পিতৃহীন হও নাই, আমরা সকলেই পিতৃহীন হইয়াছি। মা বাসন্তী দেবী, তুমি শুধু স্বামীহীন হও নাই, সকলেই স্বামী হারাইয়াছে” ইত্যাদি। মৌলানা আজাদ সেদিন বলেছিলেন, “দেশবন্ধুর পুণ্যস্মৃতি স্মরণ করে আজ আমাদের সকলের হৃদয়ই বিদীর্ণ হয়ে যাচ্ছে। তাঁর অসাধারণ নিষ্কলঙ্ক কোরবানি, প্রগাঢ় স্বদেশপ্রেম, তাঁর আদর্শ বদান্যতা তাঁকে চিরকাল মহিমান্বিত করে রাখবে।” সবশেষে মহাত্মাজি বলেছিলেন, “দেশবন্ধুর স্তুতি নিরর্থক।… ভারতবর্ষে এমন বীরপুরুষ জন্মগ্রহণ করেছিলেন, যাঁর জন্য কেবল ভারতবর্ষ নয়, সমস্ত পৃথিবী শোকার্ত।”

চিত্তরঞ্জনের শ্রাদ্ধদিবসেই কলকাতার ইউনিভার্সিটি ইন্সটিটিউটে মহিলাদের এক বিরাট সভায় মহাত্মা গান্ধী ও আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র প্রমুখ মান্যজনেরা বক্তৃতা করেছিলেন। সেখানে রবীন্দ্রনাথ রচিত গান গাওয়ার পর কামিনী রায়ের কবিতা পাঠ করা হয়। সবশেষে হিন্দিতে ভাষণ দেন গান্ধী, যা জ্যোতির্ময়ী গাঙ্গুলী বাংলায় অনুবাদ করে শোনান।

মাসিক বসুমতীর সূত্রে জানা যাচ্ছে যে, কলকাতা ছাড়াও ভারতের বিভিন্ন প্রধান শহরেও দেশবন্ধুর স্মৃতিতর্পণ করা হয়েছিল। মাদ্রাজের ট্রিপ্লিকেন বিচের তিলক ঘাটে সব রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে আয়োজিত এক সভায় প্রয়াত নেতার আত্মার শান্তি কামনা করা হয়েছিল। স্বরাজ্য দলের নেতা শ্রীনিবাস আয়েঙ্গার সভাপতিত্ব করেছিলেন। বোম্বাইয়ের সেরিফের আহ্বানে সেখানকার টাউন হলেও দিনশা পেটিটের সভাপতিত্বে এক স্মরণসভা আয়োজিত হয়। সেখানে বক্তৃতা করেছিলেন ভি জে প্যাটেল, সরোজিনী নাইডু, যমুনাদাস দ্বারকাদাস, কে এফ নারীমান প্রমুখ জাতীয় নেতা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। [দ্রষ্টব্য মাসিক বসুমতী, শ্রাবণ ১৩৩২] কাজেই একথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, শতবর্ষ পূর্বের সেই মহামরণকে অভিবাদন জানাতে আক্ষরিকভাবেই সেদিন ‘এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে’ সমবেত হয়েছিল নিখিল ভারতের আপামর জনমানুষ!

কলকাতার রাজপথ দিয়ে দেশবন্ধুর শবযাত্রার ছবি।

রাজনৈতিক শিষ্যদের অশ্রু-অর্ঘ্য

দেশবন্ধুর মহাপ্রয়াণের সময় তাঁর প্রিয়তম শিষ্য সুভাষচন্দ্র সহ আরো কয়েকজন রাজনৈতিক অনুগামী বন্দী ছিলেন সুদূর ব্রহ্মদেশে। সেই নির্বাসনে গুরুর এই অকালবিয়োগ তাঁদের কতটা বেদনাবিদ্ধ করেছিল, সেটা বুঝতে পারা যায়, জেলখানা থেকে লেখা তাঁদের চিঠিপত্রে। কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা মাসিক বসুমতীর দেশবন্ধু সংখ্যাটি পাঠ করার পর সুভাষ তাঁকে একটি চিঠিতে লেখেন, “সময়ে সময়ে আমি মনে না করে পারি না যে, দেশবন্ধুর অকালমৃত্যু ও দেহত্যাগের জন্য তাঁর দেশবাসীরা ও তাঁর অনুচরবর্গও কতকটা দায়ী। তাঁরা যদি তাঁর কাজের বোঝা কতকটা লাঘব করতেন, তা’হলে বোধ হয়
তাঁকে এতটা পরিশ্রম করে আয়ু শেষ করতে হত না।”

এরপর গুরুর সঙ্গে নিজের ব্যক্তিগত সম্পর্কটি উন্মোচন করে সুভাষচন্দ্র লিখেছেন, “অনেকে মনে করে যে, আমরা অন্ধের মত তাঁকে অনুসরণ করতুম। কিন্তু তাঁর প্রধান চেলাদের সঙ্গে ছিল তাঁর সবচেয়ে ঝগড়া। নিজের কথা বলিতে পারি যে, অসংখ্য বিষয়ে তাঁর সঙ্গে ঝগড়া হ’ত। কিন্তু আমি জানতুম যে, যত ঝগড়া করিনা কেন — আমার ভক্তি ও নিষ্ঠা অটুট থাকবে— আর তাঁর ভালবাসা থেকে আমি কখনও বঞ্চিত হ’ব না। তিনিও বিশ্বাস করতেন যে, যত ঝড় ঝঞ্ঝা আসুকনা কেন তিনি আমাকে পাবেন তাঁর পদতলে। আমাদের সকল ঝগড়ার মিটমাট হ’তো মা’র (বাসন্তী দেবীর) মধ্যস্থতায়। কিন্তু হায় “রাগ করিবার, অভিমান করিবার জায়গাও আজ আমাদের ঘুচে গেছে।” দেশবন্ধুর বিরহকল্পনায় তাঁর প্রিয়তম শিষ্যটি এতই কাতর হয়ে পড়েছিলেন যে কারামুক্তির সম্ভাবনাতেও তিনি কোন উৎসাহ পাচ্ছিলেন না! সেজন্য এই চিঠিতেই সুভাষচন্দ্র লিখছেন, “আমি বোধ হয় খুব বেশী দিন এখানে থাকব না। কিন্তু খালাস হবার তেমন আকাঙ্ক্ষা এখন আর নাই। বাহিরে গেলেই যে শ্মশানের শূন্যতা আমাকে ঘিরে বসবে– তার কল্পনা করলেই যেন হৃদয়টা সঙ্কুচিত হ’য়ে পড়ে।

মান্দালয় জেলে আটক রাজবন্দীদের পক্ষ থেকে বাসন্তী দেবীকে যে শোকবার্তাটি পাঠানো হয়েছিল তার কিছু অংশ ছিল এরকম :- “শ্রীচরণেষু মা, আজ আপনার এই ঘোর বিপদের দিনে আমরা কয়েকজন প্রবাসী কারারুদ্ধ বাঙ্গালী আপনার নিকট সান্ত্বনার বাণী প্রেরণ করিতেছি, যে বিপদ আজ আপনাকে অভিভূত করিয়াছে তদপেক্ষা মহান বিপদ কোন মহিলার জীবনে ঘটিতে পারে না।…
যিনি গিয়াছেন তিনি আমাদেরও খুব আপনার জন ছিলেন। আজ আবালবৃদ্ধ-বনিতা সকল ভারতবাসীই কাঁদিতেছে—কিন্তু সব চেয়ে বেশী কাঁদিতেছে বাংলার তরুণ সম্প্রদায়। …সাহিত্য ও কলাজগতের মহারথীরা—এমন কি সকল ক্ষেত্রের ভাবুক সম্প্রদায়-আজ তাঁহার জন্য অশ্রুপাত করিতেছেন।….

“দেশবন্ধু গিয়াছেন। যশোরশ্মিমণ্ডিত পূর্ণরবির ন্যায় তিনি জীবন -মধ্যাহ্নেই অস্ত গিয়াছেন। সিদ্ধিদাতার বরপুত্র তিনি বিজয় মুকুট পরিয়াই ভারতের বিশাল কর্ম্মক্ষেত্র হইতে দিব্যলোকে যাত্ৰা করিয়াছেন।”

দেশবন্ধুর কারাবরণের পরবর্তী সময়ে বাসন্তী দেবীর প্রেরণাদায়িনী বরাভয়মূর্তি স্মরণ করে এই শোকাহত রাজনৈতিক কর্মীরা আবেগসিক্ত ভাষায় লিখেছিলেন, “আজও বাঙ্গালীর হৃদয়ে আপনার সেই সিংহাসন অটুট রহিয়াছে। সেদিন হইতে আপনি শুধু চিররঞ্জন-মাতা নন, — আপনি বঙ্গমাতা।… তাই বলি আমাদের এই বিপদের দিনে আপনিই আমাদের শক্তি সাহস ও সান্ত্বনা দিন…।” ইত্যাদি। [৬-৭- ১৯২৫] চিঠিটির শেষে ‘আপনার সেবকবৃন্দ’ লিখে নীচে স্বাক্ষর করেছিলেন সত্যেন্দ্রচন্দ্র মিত্র, বিপিনবিহারী গাঙ্গুলী, জ্যোতিষচন্দ্র ঘোষ, জীবনলাল চট্টোপাধ্যায়, মদনমোহন ভৌমিক, সুরেন্দ্রমোহন ঘোষ, সতীশচন্দ্র চক্রবর্ত্তী, সুভাষচন্দ্র বসু ও হরিকুমার চক্রবর্ত্তী।

এই চিঠিটি লেখার কয়েকদিন পরেই [১০-৭-১৯২৫ ] দেশবন্ধু-জায়াকে একটি মর্মস্পর্শী চিঠি লেখেন সুভাষচন্দ্র। নিজের ব্যক্তিগত বিয়োগবেদনার কথা জানিয়ে গুরুপত্নীকে তিনি লিখছেন, “এতদিন পত্র দিবার চেষ্টা করি নাই, কলমে ভাষা আসছিল না- হাত অবশ হয়ে যাচ্ছিল। বিশ্বাস করিতে পারি নাই। …

“প্রথম কথা মনে হ’ল— আজ আমি যে সুদূর ব্রহ্মদেশে! হৃদয়ের প্রেরণা অনুযায়ী কাজ করবাব সুযোগ হইতে বঞ্চিত। এ দুঃখ আমার পক্ষে ভোলবার নয় । কারাগৃহ—কারার লৌহকপাট—কারার অসংখ্য গারদগুলি ইহার পূর্ব্বে কখনও এত বিষময় বলিয়া বোধ হয় নাই।” সান্ত্বনা দেবার শক্তি যে তাঁর নেই, বরং তাঁর নিজেরই সান্ত্বনার প্রয়োজন, এ কথা জানিয়ে মাতৃসমা বাসন্তী দেবীকে সুভাষ লিখছেন :- “আমি বাহিরে থাকলে আমার সেবার কোনও ফল হত কিনা জানিনা। আমার সেবার প্রয়োজন হ’ত কিনা—তা’ও জানিনা। কিন্তু সেবার সুযোগ যে থাকত সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নাই৷ আজ যে সেবার সুযোগ আমার নাই— এই কথা যেন ঘুরে ফিরে মনের মধ্যে উদয় হচ্ছে। এবং ব্যর্থ বাসনা ও ততোধিক ব্যর্থ প্রয়াস যেন বারেবারে বদ্ধ দুয়ারের গায়ে আঘাত খেয়ে ফিরে আসছে। যেখানে মানুষ সামর্থ্যহীন— সেখানে ইচ্ছায় হউক অনিচ্ছায় হউক ভগবানের শরণাপন্ন হয় ৷ তাই আমি আবার প্রার্থনা করি তিনিই আপনাকে সান্ত্বনাও শক্তি দিন।” নিজের রাজনৈতিক পথপ্রদর্শকের মৃত্যুতে পৃথিবীর নানাদেশের রাষ্ট্রনেতা ও কর্মীদের শোকলিখন বিরল নয়, কিন্তু হৃদয়রক্তে লেখনী ডুবিয়ে এমন প্রাণঢালা বিলাপলিপি ক’জন রাজনীতিকের কলম থেকে নির্গত হয়েছে আমাদের জানা নেই।

[লেখকের পূর্ববর্তী রচনা]

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.