
রত্না এসে ওষুধটা রামকিঙ্করের সামনে রেখে বলল — “খেয়ে নাও এটা”। রামকিঙ্কর অন্য কথা ভাবছিলেন, কারণ তিনি জানেন, অসুখের কথা ভেবে সুখ নেই । অসুখ তাঁর সারবার নয়। তিনি ভাবছিলেন তাঁর আরদ্ধ সেই বিরাট কাজের কথা— যা, তিনি শেষ করে যেতে না পারার আক্ষেপ নিয়েই হয়তো তাঁকে মরতে হবে ।
রামকিঙ্কর ইতিহাসবেত্তা। আরও অনেক ইতিহাসবিদের মতো মাইনে করা গবেষক তিনি নন। ইতিহাসের সত্যকে উদ্ঘাটনের দায়িত্ব তরুণ বয়স থেকেই ব্রত হিসাবে গ্রহণ করেছিলন রামকিঙ্কর। এইজন্য ভালো মাইনের অধ্যাপকের চাকরি ছেড়ে একসময় নিতান্ত কাণ্ডজ্ঞানহীন গোঁয়ারের মতো পুরো সময়ের গবেষক হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। ইতিহাস লেখার নেশায় তারপর পৈত্রিক সম্পত্তি ও জমানো সামান্য সঞ্চয় নিয়ে বেশ কয়েক বছর কোনোরকমে কাটিয়ে দিয়েছেন তিনি, যতদিন না তিনি বুঝতে পেরেছেন যে, দুরারোগ্য ব্যাধি তাঁর জন্য অপেক্ষা করে আছে। অন্যের পছন্দ মতো ‘ইতিহাস’ লিখতে পারলে আজ সরকারের মোটা মাইনের চাকরী পেতেন রামকিঙ্কর। কিন্তু সজ্ঞানে সত্যকে বিকৃত করার চেয়ে অনাহারে মরাও ভাল বলে মনে করেন তিনি এবং অপাততঃ প্রায় সেই কর্মই করতে চলেছেন।
রামকিঙ্কর আদর্শকে এতটা দাম দিলেও আজকের দিনে আর কেউ তা দিতে রাজী নয়। চিন্তা সেই কারণেই। তিনিও যদি আজ সত্যকে আমল না দিয়ে ফরমায়েশী ইতিহাস’ লিখতে পারতেন, তবে হয়তো যোগ্য চিকিৎসার অভাবে তাঁর একমাত্র ছেলেটার অকালমৃত্যু হত না — নিজেও দরকারী বিশ্রাম ও ওষুধ না পেয়ে এভাবে হার্টের ব্যারামটাকে ঘোরালো করে তুলতেন না।
ছেলে অনিমেষকেও নিজের ধাঁচে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন রামকিঙ্কর। স্কুলজীবন থেকেই মেধাবী ছাত্র ছিল সে। তাঁর স্বপ্ন ছিল, তাকেও ইতিহাসের গবেষক হিসেবে গড়ে তুলবেন তিনি। কিন্তু কলেজে ঢুকতেই ধরা পড়েছিল তার লিউকিমিয়ার ব্যাধি। যথাসাধ্য তার চিকিৎসাও করিয়েছিলেন তিনি, মাঝে মাঝে সেজন্য তার পড়াশোনায় ও ছেদ পড়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অনিমেষকে আর ধরে রাখা যায়নি, কলেজের পাঠও সাঙ্গ করার সুযোগটুকুও পায়নি সে।
একমাত্র ছেলের অকালমৃত্যুর শোক ভুলতেই তিনি যেন সংসারকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে আরো বেশি করে আঁকড়ে ধরেছিলেন ইতিহাস গবেষণার কাজকে। কিন্তু নিজের মৃত্যুতে তাঁর দুঃখ নেই— দুঃখ ইতিহাসের জন্য! তাঁর মৃত্যুতেই এই গবেষণা বন্ধ হয়ে যাবে— নিছক সত্যসন্ধানের তাগিদে রোগদারিদ্র্যকে বরণ করতে কি এগিয়ে আসবে আর কোন নিঃস্বার্থ জ্ঞানসাধক! ফলে তাঁর এই গবেষণালব্ধ সত্য থেকে যাৰে লোকচক্ষুর আড়ালে, এই ভয় ইদানিং তাঁকে আরও বেশি করে যেন চেপে ধরছে। এই ভয় থেকে বাঁচার জন্য নিজের কাজকে এখন আরো বেশি করে চেপে ধরতে চান তিনি, কিন্তু শরীর যে আর আগের মত মজবুত নেই, সেটা কাজ করতে গিয়ে তিনি বারবার বুঝতে পারেন।
মৃত্যুও যে তাঁর আর বেশি দূরে নয় — এমনটাও কেন যেন ক্রমশ মনে হচ্ছে রামকিঙ্করের। ডাক্তার সান্ত্বনা দেবার জন্য কয়েকটা ওষুধ দিয়েছেন বটে, তবে তাতে তাঁর নিজেরও খুব একটা বিশ্বাস নেই। তবু রত্না ওষুধটা দিতে বিনাবাক্যব্যয়ে খেয়ে ফেলেন তিনি, নয়তো রত্না কষ্ট পাবে। রত্না ওষুধ খাইয়ে চলে যেতে তাঁর নথিপত্র সব তুলে গুছিয়ে রাখেন রামকিঙ্কর ।
একটু আগেই খোকন এসে তাঁর কাগজপত্র ঘাঁটাঘাটি করে মাটিতে
ছড়িয়ে খেলা করে গেছে। খোকন হচ্ছে তাঁর ভাড়াটে তরুণ দম্পতির দুরন্ত ছেলে। সে রত্নার খুব ন্যাওটা, এ বাড়িতে তার অবাধ গতিবিধি! বাড়ির সব রকম জিনিসপত্রেই তার হাত দেওয়া চাই এবং তাকে কোনরকম শাসন করারও প্রশ্নই ওঠে না, এতটাই তার অধিকার।
গবেষণার কাজে ছড়িয়ে রাখা রামকিঙ্করের মোটা মোটা বইপত্র, দিস্তা দিস্তা লেখার কাগজ, সবকিছু তার ঘাঁটাঘাটি করা চাই।

যদি আর বেশিদিন না বাঁচেন, সেকথা ভেবে রত্নার জন্যও কষ্ট লাগে তাঁর। প্রকাশিত বইগুলির কিছু রয়ালটি আর ভাড়াটের কাছ থেকে পাওয়া সামান্য মাসিক ভাড়া, এই মাত্র সম্বল নিয়ে ভবিষ্যতে রত্নার অবস্থা যে কী হৰে, কে জানে ! কিন্তু তাঁর প্রধান চিন্তা অবশ্যই ইতিহাস— তাঁর খুঁড়ে আনা অমূল্য ইতিহাসের তথ্যরাজির অবলুপ্তি তাঁর কাছে বেশি অসহ্য মনে হয় !
রত্নাও ঐতিহাসিকের যোগ্য স্ত্রী । স্বামীর সত্যনিষ্ঠাকে অন্যে পাগলামি বললেও নিজে এজন্য কোনোদিন এতটুকু অনুযোগ করেনি স্বামীকে । বরঞ্চ তাঁকে সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করেছে। তার বিনিময়ে তাকে রামকিঙ্কর কীই বা দিতে পেরেছেন – একথা ভেবে বিষন্ন হয়ে ওঠেন তিনি। কিন্তু আত্মভোলা সাধককে আবার ইতিহাসের চিন্তা উন্মনা করে দেয় । তাঁর বিরাট পরিশ্রমের সম্ভাব্য ব্যর্থতার চিন্তা তাঁর রোগদুর্বল হৃদয়কে বেদনায় আর্ত করে তোলে।
ইতিহাসের বাইরে অবশ্য রামকিঙ্করের আর একটা জগৎ আছে— ফুলগাছের জগৎ। গবেষণার কাজ ছাড়া মাঝে মাঝে বাইরের ব্যালকনিতে টবে বেড়ে ওঠা ফুলগাছগুলির পরিচর্যা করেন তিনি। কিন্তু তাঁর শরীর খারাপ থাকায় আজ দু’দিন ধরে মনে হয় গাছগুলোতে ঠিকমতো জল পড়েনি। রামকিঙ্কর বুঝতে পারেন, তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর গবেষণা আর ফুলের গাছগুলোর একই দশা হৰে ৷ ভাবতে ভাৰতে হঠাৎ একটা রবীন্দ্রসঙ্গীতের কলি মনে পড়ে যায়— “আমার সকল কাঁটা ধন্য করে ফুটবে গো ফুল ফুটবে/ আমার সকল ব্যথা রঙীন হয়ে গোলাপ হয়ে উঠবে”।

কিন্তু তাঁর সব পরিশ্রম কি ধন্য হবে না? শেষ পর্যন্ত কি তাঁর ইতিহাসের সাধনা ওই ঝরে পড়া গোলাপের মতোই মুছে যাবে ? উঃ, আবার ইতিহাস ! রামকিঙ্করের সব চিন্তাই যেন ইতিহাস থেকে শুরু হয় এবং ইতিহাসে এসেই শেষ হয়। মনে হয় ইতিহাসের চিন্তাতেই পাগল হয়ে বাবেন তিনি! তাঁর মনে হয়— ওই চিন্তা থেকে নিস্তার পেয়ে একটু নিশ্চিন্তে যদি মরতে পারতেন !

হঠাৎ খোলা দরজা দিয়ে বারান্দায় তাকাতেই তিনি দেখতে পেলেন এক দৃশ্য— যাতে তাঁর দুশ্চিন্তার বোঝা অনেকটা যেন হালকা হয়ে গেল! তিনি দেখতে পেলেন, খোকন বারান্দায় খেলছে— একটা মাটির ভাঁড় কোথা থেকে জোগাড় করে তাতে জল এনে এনে খেলার ছলে গোলাপ গাছগুলোর গোড়ায় ঢালছে । এই না তিনি ভাবছিলেন, তাঁর মৃত্যুতেই গাছগুলোও শেষ হয়ে যাবে— তৰে ! রামকিঙ্কর মুগ্ধ চোখে দেখতে থাকেন, টালমাটাল পায়ে খোকন হাঁটছে। তাঁর মনে হয়, জলের ভাঁড় নিয়ে যেন খোকন নয়— হাঁটছে তাঁর ভাবীকাল, হাঁটছে ইতিহাস ! ইতিহাসের ছেদ নেই।

