
ইংরেজি শিক্ষাকে বাহন করে আধুনিক মননে আলোকিত বাঙালির জীবনে শেক্সপিয়র যে আজও অনেকটা প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের মতোই ঢুকে পড়েন, সেটা আমরা নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকেই জানি। কিন্তু এই ‘অনুপ্রবেশ’ একটি বাঙালি ছাত্রের শৈশবের কোন্ পর্যায়ে ঘটতে পারে ও তা কতটা গভীরবিস্তারী হতে পারে, তার একটি ধারণা পাওয়া যাবে এই তথ্যটি থেকে যে, উনিশ শতকে কলকাতার এক ন’ বছরের ছাত্র গৃহশিক্ষকের হোমটাস্ক হিসেবে সমগ্র ‘ম্যাকবেথ’ বাঙলা কবিতায় তর্জমা করে ফেলেছিলেন। এই ছাত্রটির নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং ঘটনাটা তাঁর নিজের ভাষাতেই শোনা যেতে পারে।
“আনন্দচন্দ্র বেদান্তবাগীশের পুত্র জ্ঞানচন্দ্র ভট্টাচার্য মহাশয় বাড়িতে আমাদের শিক্ষক ছিলেন। ইস্কুলের পড়ায় যখন তিনি কোনোমতেই আমাকে বাঁধিতে পারিলেন না, তখন হাল ছাড়িয়া দিয়া অন্য পথ ধরিলেন। আমাকে বাংলায় অর্থ করিয়া কুমারসম্ভব পড়াইতে লাগিলেন। তাহা ছাড়া খানিকটা করিয়া ম্যাক্বেথ আমাকে বাংলায় মানে করিয়া বলিতেন এবং যতক্ষণ তাহা বাঙলা ছন্দে আমি তর্জমা না করিতাম ততক্ষণ ঘরে বন্ধ করিয়া রাখিতেন। সমস্ত বইটার অনুবাদ শেষ হইয়া গিয়াছিল।….
“রামসর্বস্ব পণ্ডিত মহাশয়ের প্রতি আমাদের সংস্কৃত অধ্যাপনার ভার ছিল।… তিনি একদিন আমার ম্যাক্বেথের তর্জমা বিদ্যাসাগর মহাশয়কে শুনাইতে হইবে বলিয়া আমাকে তাঁহার কাছে লইয়া গেলেন। তখন তাঁহার কাছে রাজকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় বসিয়া ছিলেন। পুস্তকে-ভরা তাঁহার ঘরের মধ্যে ঢুকিতে আমার বুক দুরুদুরু করিতেছিল। তাঁহার মুখচ্ছবি দেখিয়া যে আমার সাহসবৃদ্ধি হইল তাহা বলিতে পারিনা। ইহার পূর্বে বিদ্যাসাগরের মতো শ্রোতা আমি তো পাই নাই; অতএব এখান হইতে খ্যাতি পাইবার লোভটা মনের মধ্যে খুব প্রবল ছিল। বোধ করি কিছু উৎসাহ সঞ্চয় করিয়া ফিরিয়াছিলাম। মনে আছে, রাজকৃষ্ণবাবু আমাকে উপদেশ দিয়াছিলেন, নাটকের অন্যান্য অংশের অপেক্ষা ডাকিনীর উক্তিগুলির ভাষা ও ছন্দের কিছু অদ্ভুত বিশেষত্ব থাকা উচিত।“ [‘ঘরের পড়া’, জীবনস্মৃতি]

এখানে এই ন’ বছরের এক বালকের [এই বয়সটি নিয়ে যদিও জীবনীকারদের মধ্যে মতভেদ আছে, আমরা রবীন্দ্রনাথের নিজের মন্তব্যটিই অনুসরণ করেছি] সেই শেক্সপিয়র-অনুবাদ কেমন ছিল, সে-ব্যাপারে আমাদের কৌতূহল হতেই পারে। সমগ্র অনুবাদটি হারিয়ে গেছে, এমন একটি তথ্য জীবনস্মৃতিতে রবীন্দ্রনাথ পরিবেশন করলেও সৌভাগ্যবশত নাটকের শুরুতে ডাকিনীদের সংলাপের কিছুটা পাওয়া গেছে, যা ঐ অনুবাদের বহু বছর পরে ‘ভারতী’ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। তার কিছুটা এখানে দেখা যেতে পারে।
দৃশ্যঃ বিজন প্রান্তর। বজ্র বিদ্যুৎ। তিন জন ডাকিনী।
১ম ডা – ঝড় বাদলে আবার কখন
মিল্ব মোরা তিনটি জনে।
২য় ডা – ঝগড়া ঝাঁটি থামবে যখন
হার জিত সব মিট্বে রণে।
৩য় ডা – সাঁঝের আগেই হবে সে ত;
১ম ডা – মিল্ব কোথা বলে দে ত।
২য় ডা – কাঁটা খোঁচা মাঠের মাঝ।
৩য় ডা – ম্যাক্বেথ সেথা আস্চে আজ।
১ম ডা – কটা বেড়াল! যাচ্ছি ওরে!
২য় ডা – ঐ বুঝি ব্যাং ডাক্চে মোরে!
৩য় ডা – চল্ তবে চল্ ত্বরা কোরে।
সকলে – মোদের কাছে ভালই মন্দ।
মন্দ যাহা ভাল যে তাই,
অন্ধকারে কোয়াশাতে
ঘুরে ঘুরে ঘুরে বেড়াই!….
রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘জীবনস্মৃতি’-তে আরও উল্লেখ করেছেন, “তখনকার দিনে আমাদের সাহিত্যদেবতা ছিলেন শেক্সপিয়র, মিল্টন ও বায়রন। ইঁহাদের লেখার ভিতরকার যে-জিনিসটা আমাদিগকে খুব করিয়া নাড়া দিয়াছে, তাহা হৃদয়াবেগের প্রবলতা।… আমাদের বাল্যবয়সের সাহিত্য-শিক্ষাদাতা অক্ষয় চৌধুরী মহাশয় যখন বিভোর হইয়া ইংরেজি কাব্য আওড়াইতেন তখন সেই আবৃত্তির মধ্যে একটা তীব্র নেশার ভাব ছিল। রোমিও-জুলিয়েটের প্রেমোন্মাদ, লিয়রের অক্ষম পরিতাপের বিক্ষোভ, ওথেলোর ঈর্ষানলের প্রলয়দাবদাহ, এই সমস্তেরই মধ্যে যে-একটা প্রবল অতিশয়তা আছে তাহাই তাঁহাদের মনের মধ্যে উত্তেজনার সঞ্চার করিত।”[‘ভগ্নহৃদয়’, ঐ]



বিশেষ করে উল্লিখিত তিনজন সাহিত্য দেবতার মধ্যে প্রথমজনকে তিনি পেয়েছিলেন একেবারে কৈশোরে ভারতের কালিদাস প্রমুখ চিরায়ত সাহিত্যের কবিদের মতোই আপন করে, যখন তাঁর বয়স, আমরা আগেই উল্লেখ করেছি, দশ বারো বছরের বেশি নয়। সেই বয়সে বাংলায় ‘ম্যাকবেথ’ অনুবাদের মধ্য দিয়ে তাঁর শেক্সপিয়র-চর্চার সূত্রপাত, তারপর সারা জীবনে তাঁর সেই অনুশীলনে কোনো ছেদ পড়েনি, বরং তা আরও নিবিড় হয়েছে। মনে রাখতে হবে, পরিণত বয়সে যখন শেক্সপীয়র-উপভোগে রবীন্দ্রনাথ আরও আত্মস্থ হয়েছিলেন, তখন তিনি বিভিন্ন প্রবন্ধে শেক্সপিয়রের সৃষ্টিগুলির বিশেষত্বকে চিহ্নিত করেছিলেন তাঁর নিজস্ব উপলব্ধিতে।
রবীন্দ্রনাথের এই মূল্যায়নগুলির নমুনা হিসেবে আমরা প্রথমে তাঁর ‘সাহিত্যের প্রাণ’ প্রবন্ধটির একটি অংশ উল্লেখ করতে পারি :- “মহৎ রচনার মধ্যে একটি বিশেষ মত, একটি ক্ষুদ্র ঐক্য খুঁজে বার করা দায়; আমরা ক্ষুদ্র সমালোচকেরা নিজের ঘর-গড়া মত দিয়ে যদি তাকে ঘিরতে চেষ্টা করি তা হলে পদে পদে তার মধ্যে স্বতোবিরোধ বেধে যায়। কিন্তু একটা অত্যন্ত দুর্গম কেন্দ্রস্থানে তার একটা বৃহৎ মীমাংসা বিরাজ করছে, সেটি হচ্ছে লেখকের মর্মস্থান—অধিকাংশ স্থলেই লেখকের নিজের পক্ষেও সেটি অনাবিষ্কৃত রাজ্য।” রবীন্দ্রনাথের মতে, শেক্সপিয়রের লেখার ভেতর থেকে তাঁর একটা বিশেষত্ব খুঁজে বার করা কঠিন এইজন্য যে, সেটা তাঁর ‘অত্যন্ত বৃহৎ বিশেষত্ব’। তিনি জীবনের যে মূলতত্ত্বটি আপনার অন্তরের মধ্যে সৃজন করে তুলেছেন, তাকে ‘দুটি-চারটি সুসংলগ্ন মতপাশ’ দিয়ে বদ্ধ করা যায় না।’ এইজন্যে ভ্রম হয় তাঁর রচনার মধ্যে যেন একটি রচয়িতৃ-ঐক্য নেই।”
নিজের বক্তব্যকে পরিষ্কার করার জন্য রবীন্দ্রনাথ এই প্রবন্ধে শেক্সপিয়রের নাটকের বিভিন্ন চরিত্র থেকে উদাহরণ টেনে এনে সেগুলির তুলনা করেন অর্বাচীন সোসাইটি নভেলের সঙ্গে এবং শেক্সপিয়রের নাটকের চিরন্তনী মহিমাকে এইভাবে তুলে ধরেন :- “ফল্স্টাফ ও ডগ্বেরি থেকে আরম্ভ করে লিয়র ও হ্যাম্লেট পর্যন্ত শেক্সপিয়র যে মানবলোক সৃষ্টি করেছেন সেখানে মনুষ্যত্বে চিরস্থায়ী হাসি-অশ্রুর গভীর উৎসগুলি কারো অগোচর নেই। একটা সোসাইটি নভেলের প্রাত্যহিক কথাবার্তা এবং খুচরো হাসিকান্নার চেয়ে আমরা শেক্সপিয়র মধ্যে বেশি সত্য অনুভব করি। যদিচ সোসাইটি নভেলে যা বর্ণিত হয়েছে তা আমাদের প্রতিদিনের জীবনের অবিকল অনুরূপ চিত্র। কিন্তু আমরা জানি আজকের সোসাইটি নভেল কাল মিথ্যা হয়ে যাবে; শেক্সপিয়র কখনো মিথ্যা হবে না। অতএব একটা সোসাইটি নভেল যতই চিত্রবিচিত্র করে রচিত হোক, তার ভাষা এবং রচনাকৌশল যতই সর্বাঙ্গসম্পূর্ণ হোক, শেক্সপিয়রের একটা নিকৃষ্ট নাটকের সঙ্গে তার তুলনা হয় না। সোসাইটি নভেলে বর্ণিত প্রাত্যহিক সংসারের যথাযথ বর্ণনার অপেক্ষা শেক্সপিয়রে বর্ণিত প্রতিদিন-দুর্লভ প্রবল হৃদয়াবেগের বর্ণনাকে আমরা কেন বেশি সত্য মনে করি সেইটে স্থির হলে সাহিত্যের সত্য কাকে বলা যায় পরিষ্কার বোঝা যাবে।”
শেক্সপিয়র-সাহিত্যের চিরন্তন মহিমার ব্যাখ্যানে অতঃপর রবীন্দ্রনাথ নিজের উপলব্ধিকে উপস্থিত করেন এইভাবে :- “… শেক্সপিয়রে আমরা চিরকালের মানুষ এবং আসল মানুষটিকে পাই, কেবল মুখের মানুষটিকে নয়। মানুষকে একেবারে তার শেষ পর্যন্ত আলোড়িত করে শেক্সপীয়র তার সমস্ত মনুষ্যত্বকে অবারিত করে দিয়েছেন। তার অশ্রুজল চোখের প্রান্তে ঈষৎ বিগলিত হয়ে রুমালের প্রান্তে শুষ্ক হচ্ছে না, তার হাসি ওষ্ঠাধরকে ঈষৎ উদ্ভিন্ন করে কেবল মুক্তাদন্তগুলিকে মাত্র বিকাশ করছে না—কিন্তু বিদীর্ণ প্রকৃতির নির্ঝরের মতো অবাধে ঝরে আসছে, উচ্ছ্বসিত প্রকৃতির ক্রীড়াশীল উৎসের মতো প্রমোদে ফেটে পড়ছে। তার মধ্যে একটা উচ্চ দর্শনশিখর আছে, যেখান থেকে মানব প্রকৃতির সবচেয়ে ব্যাপক দৃশ্য দৃষ্টিগোচর হয়।” [‘সাহিত্যের প্রাণ’]

ইউরোপের রেনেসাঁ বা নবজাগরণের যুগের প্রেক্ষাপটে শেক্সপিয়রের নাট্যসাহিত্যকে রবীন্দ্রনাথ কীভাবে দেখেছিলেন তা সুন্দরভাবে পরিস্ফুট হয়েছে ‘জীবনস্মৃতি’-র আরেকটি মন্তব্যে:- “য়ুরোপে যখন একদিন মানুষের হৃদয়প্রবৃত্তিকে অত্যন্ত সংযত ও পীড়িত করিবার দিন ঘুচিয়া গিয়া তাহার প্রবল প্রতিক্রিয়াস্বরূপে রেনেশাঁসের যুগ আসিয়াছিল, শেক্সপীয়রের সমসাময়িক কালের নাট্যসাহিত্য সেই বিপ্লবের দিনেরই নৃত্যলীলা। এ-সাহিত্যে ভালোমন্দ অসুন্দরের বিচারই মুখ্য ছিল না—মানুষ আপনার হৃদয়প্রকৃতিকে তাহার অন্তঃপুরের সমস্ত বাধা মুক্ত করিয়া দিয়া তাহারই উদ্দাম শক্তির যেন চরম মূর্তি দেখিতে চাহিয়াছিল। এইজন্যই এই সাহিত্যে, প্রকাশের অত্যন্ত তীব্রতা প্রাচুর্য ও অসংযম দেখিতে পাওয়া যায়। য়ুরোপীয় সমাজের সেই হোলিখেলার মাতামাতির সুর আমাদের এই অত্যন্ত শিষ্ট সমাজে প্রবেশ করিয়া হঠাৎ আমাদিগকে ঘুম ভাঙাইয়া চঞ্চল করিয়া তুলিয়াছিল।” [ ভগ্নহৃদয়’, জীবনস্মৃতি]
উদীয়মান লেখক হিসেবে তরুণ রবীন্দ্রনাথ যখন সাহিত্য সমালোচনা শুরু করেছেন, আমরা জানি, সে সময় নানা পত্রিকায় বিভিন্ন খ্যাতিমান সাহিত্যিক সম্পর্কেও তিনি অকুতোভয়ে কঠোর সমালোচনা করতে পেছপা হননি। এ প্রসঙ্গে ভারতী পত্রিকায় [ফাল্গুন ১২৮৪] মধুসূদনের মেঘনাদবধ কাব্যের সুতীক্ষ্ণ সমালোচনার কথা সুবিদিত এবং পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ নিজেই জানিয়েছেন যে, ‘অল্প বয়সের স্পর্ধার বেগে’ লেখা এই রচনার অনেক মতই তিনি আর সমর্থন করেন না। কিন্তু এর এক বছর পরে একই পত্রিকায় [ভাদ্র ১২৮৫] প্রকাশিত আরেকটি সমতুল্য সমালোচনার কথা সাধারণ পাঠক ততটা অবহিত নন। বঙ্কিমচন্দ্র যে এককালে কবিতা লিখতেন, একথা আজকের পাঠকেরা অনেকে না জানলেও বা ভুলে গেলেও রবীন্দ্রনাথ বঙ্কিমেরর ‘কবিতা-পুস্তক’ নামক বইটির উৎকর্ষ সম্পর্কে তীব্র নেতিবাচক মন্তব্য করে একে এক ধরনের গুরুত্ব দিয়েছিলেন এবং এই কবিতার সংকলনটিকে আক্রমণ করতে গিয়ে তিনি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন শেক্সপিয়রের সাহিত্যকে। তাঁর তরুণ বয়সের এই মতবাদ পরবর্তীকালেও অক্ষুন্ন ছিল কিনা অথবা বর্তমান কালের পাঠকদের কাছে তা গ্রহণযোগ্য কিনা, এইসব বিতর্ক দূরে সরিয়ে রেখে শেক্সপিয়রের সাহিত্য স্কুল-পালানো রবীন্দ্রনাথ সেই তরুণ বয়সেই কতটা আত্মস্থ করেছিলেন ও নিপুণভাবে তার বিভিন্ন অংশ তুলে ধরে তার সঙ্গে বঙ্কিমের রচনার তুলনা করেছিলেন, আমরা আপাতত সে ব্যাপারটি লক্ষ করতে পারি। ওই কবিতা-পুস্তকে সন্নিবিষ্ট বঙ্কিমচন্দ্রের ‘সাবিত্রী’ কবিতাটি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ লেখেন, “…বঙ্কিমবাবু স্বেচ্ছামতো পুরাণের উৎকর্ষ সাধন করিতে গিয়া একটি অতি সুন্দর কাহিনীর সুন্দরতম অংশটুকু একেবারে মৃত্তিকাসাৎ করিয়াছেন। আমরা স্বীকার করি যে স্বামীর সহিত ইচ্ছাপূর্বক সহমরণে যাওয়া বিশেষ অনুরাগের লক্ষণ। কিন্তু তাহা মহান সতীত্বের পরাকাষ্ঠা নহে;— অসতীর অগ্রগণ্যা ক্লিয়োপেট্রাও আন্টনির মৃত্যুর পর ইচ্ছাপূর্বক জীবন বিসর্জন করিয়াছিলেন—তিনিও মৃত্যুর অব্যবহিত পূর্বে ইরাস্ নামক সহচরীকে সম্বোধন করিয়া বলিয়াছিলেন ‘ত্বরায়— ত্বরায়— রে শান্ত ইরাস্— আর বিলম্ব করিস না— আমি যেন শুনিতে পাইতেছি আমাকে আন্টনি ডাকিতেছেন, আমি যেন দেখিতে পাইতেছি তিনি আমার এই আত্ম-বিসর্জনরূপ মহৎ কার্য দেখিবার জন্য জাগিয়া উঠিতেছেন’। স্বীকার করি যে এ কথাগুলি শেক্সপিয়রের, কিন্তু শেক্সপিয়র ইতিহাসের মূলোচ্ছেদ করিয়া কপোলকল্পিত কতকগুলি প্রলাপ বাক্য কহেন নাই—তিনি ইতিহাসকে অক্ষুন্ন রাখিয়াও কল্পনা-প্রাচুর্য খুবই দেখাইয়াছেন—বঙ্কিমবাবু বিপরীত প্রথা অবলম্বন করিয়া বিপরীত ফল উৎপাদন করিয়াছেন।’ ( ‘কবিতা-পুস্তক’)
শেক্সপিয়র তাঁর নাটকে ইতিহাসকে অক্ষুন্ন রেখেছিলেন, অল্প বয়সে রবীন্দ্রনাথ এরকম মনে করলেও পরিণত বয়সে তিনি শেক্সপিয়রের লেখায় যে কালাতিক্রমণ দোষ আছে, তা স্বীকার করেছিলেন, কিন্ত তা সত্ত্বেও তিনি যে শেক্সপিয়রকে উৎকর্ষের শিরোপা থেকে বঞ্চিত করেননি, সেটা আমরা পরে লক্ষ করব। আপাতত তাঁর অপরিণত বয়সের আরেকটি গ্রন্থ সমালোচনায় (যা রবীন্দ্রনাথের প্রথম প্রকাশিত প্রবন্ধ বলে অনেকে মনে করেছেন) আমরা দেখব, তিনি আবারও কীভাবে শেক্সপিয়রকে অবলম্বন করে সমকালের দুজন লেখকের দেশাত্মবোধক কবিতার ত্রুটিনির্দেশ করেছিলেন। ‘জ্ঞানাঙ্কুর ও প্রতিবিম্ব’ পত্রিকার কার্তিক ১২৮৩ সংখ্যায় প্রকাশিত এই রচনায় তিনটি বইয়ের সমালোচনা করা হয়েছিল। এগুলির মধ্যে নবীনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ‘ভুবনমোহিনীপ্রতিভা’ (মহিলার ছদ্মনামে লেখা) ও রাজকৃষ্ণ রায়ের ‘অবসরসরোজিনী’ এই দুইটি বইয়ের কিছু দেশপ্রেমমূলক কবিতার সমালোচনা প্রসঙ্গে পনেরো ষোলো বছর বয়সী রবীন্দ্রনাথ লেখেন, “ভারতমাতা, যবন, উঠ, জাগো, ভীষ্ম, দ্রোণ প্রভৃতি শুনিয়া শুনিয়া আমাদের হৃদয় এত অসাড় হইয়া পড়িয়াছে যে ও-সকল কথা আর আমাদের হৃদয় স্পর্শ করে না। ক্রমে যতই বালকগণ ‘ভারত ভারত’ চিৎকার বাড়াইবেন ততই আমাদের হাস্য সংবরণ করা দুঃসাধ্য হইবে! এই নিমিত্ত যাঁহারা ভারতবাসীদের দেশহিতৈষিতায় উত্তেজিত করিবার নিমিত্ত আর্যসংগীত লেখেন, তাঁহাদের ক্ষান্ত হইতে উপদেশ দিই, …তাঁহারা বুঝেন না যেমন ক্রন্দন করিলে ক্রমে শোক নষ্ট হইয়া যায় তেমনি সকল বিষয়েই। এই নিমিত্তই শেক্সপিয়র কহিয়াছেন ‘Words to the heat of deed too cold breath give’. [‘ভুবনমোহিনীপ্রতিভা, অবসরসরোজিনী ও দুঃখসঙ্গিনী’]
এখানে উল্লেখ করা যায় যে, হয়তো বা অল্প বয়সের দুঃসাহসের বশেই একই প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ শেক্সপিয়রের গীতিকাব্যেরও সমালোচনা করে মন্তব্য করেছিলেন, “শেক্সপিয়র পরের হৃদয় চিত্র করিয়া দৃশ্যকাব্যে অসাধারণ হইয়াছেন, কিন্তু নিজের হৃদয়চিত্রে অক্ষম হইয়া গীতিকাব্যে উন্নতি লাভ করিতে পারেন নাই। ” – ( ঐ)

এরপর আমরা দৃষ্টিপাত করব শেক্সপীয়র বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের পরিণততর বয়সের কয়েকটি অভিমতের দিকে। ঐতিহাসিক উপন্যাস প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি ১৮৯৮ সালের একটি প্রবন্ধে লিখেছিলেন, ” শেক্সপিয়রের ‘অ্যাণ্টনি এবং ক্লিয়োপাট্রা’ নাটকের যে মূল ব্যাপারটি তাহা সংসারের প্রাত্যহিক পরীক্ষিত ও পরিচিত সত্য। অনেক অখ্যাত অজ্ঞাত সুযোগ্য লোক কুহকিনী-নারীমায়ার জালে আপন ইহকাল-পরকাল বিসর্জন করিয়াছে। এইরূপ ছোটোখাটো মহত্ত্ব ও মনুষ্যত্বের শোচনীয় ভগ্নাবশেষে সংসারের পথ পরিকীর্ণ।
“আমাদের সুপ্রত্যক্ষ নরনারীর বিষামৃতময় প্রণয়লীলাকে কবি একটি সুবিশাল ঐতিহাসিক রঙ্গভূমির মধ্যে স্থাপিত করিয়া তাহাকে বিরাট করিয়া তুলিয়াছেন। হৃদ্বিপ্লবের পশ্চাতে রাষ্ট্রবিপ্লবের মেঘাড়ম্বর, প্রেমদ্বন্দ্বের সঙ্গে একবন্ধনের দ্বারা বদ্ধ রোমের প্রচণ্ড আত্মবিচ্ছেদের সমরায়োজন, ক্লিয়োপাট্রার বিলাসকক্ষে বীণা বাজিতেছে, দূরে সমুদ্রতীর হইতে ভৈরবের সংহারশৃঙ্গধ্বনি তাহার সঙ্গে এক সুরে মন্দ্রিত হইয়া উঠিতেছে। আদি এবং করুণ রসের সহিত কবি ঐতিহাসিক রস মিশ্রিত করিতেই তাহা এমন-একটি চিত্তবিস্ফারক দূরত্ব ও বৃহত্ত্ব প্রাপ্ত হইয়াছে।”
সতেরো বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ শেক্সপিয়রের নাটকের ঐতিহাসিক বিশুদ্ধতা নিয়ে উচ্চধারণা পোষন করলেও এই প্রবন্ধটিতে দেখতে পাই, তিনি ওই বিষয়ে কিছুটা অন্যরকম ধারণা পোষণ করেছেন, যদিও তিনি জোর দিয়েছেন ওই নাটকের অন্যান্য ইতিবাচক গুণাবলীর ওপর :- “ইতিহাসবেত্তা মমসেন পণ্ডিত যদি শেক্সপিয়রের এই নাটকের উপরে প্রমাণের তীক্ষ্ম আলোক নিক্ষেপ করেন তবে সম্ভবত ইহাতে অনেক কালবিরোধ-দোষ (anachronism), অনেক ঐতিহাসিক ভ্রম বাহির হইতে পারে। কিন্তু শেক্সপিয়র পাঠকের মনে যে মোহ উৎপাদন করিয়াছেন, ভ্রান্ত বিকৃত ইতিহাসের দ্বারাও যে-একটি ঐতিহাসিক রসের অবতারণা করিয়াছেন, তাহা ইতিহাসের নূতন তথ্য-আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে নষ্ট হইবে না।” ( ‘ঐতিহাসিক উপন্যাস’/ সাহিত্য)
শেক্সপিয়রের নাটকে মানবচরিত্রের সামগ্রিক উন্মোচন ও রূপায়ণ সত্ত্বেও তার মধ্যে রবীন্দ্রনাথ কেন অশ্লীলতার প্রকাশ দেখতে পাননি, ১৮৯২ সালে লেখা একটি প্রবন্ধে একথা ব্যাখ্যা করে তিনি লিখেছেন :-
“সাহিত্যের মধ্যে শেক্সপিয়রের নাটকে, জর্জ এলিয়টের নভেলে, সুকবিদের কাব্যে সেই প্রচ্ছন্ন মনুষ্যত্ব মুক্তিলাভ করে দেখা দেয়। তারই সংঘাতে আমাদের আগাগোড়া জেগে ওঠে; আমরা আমাদের প্রতিহত হাড়গোড়-ভাঙা ছাইচাপা অঙ্গহীন জীবনকে সম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি করি।
“এইরূপ সুবৃহৎ অনাবরণের মধ্যে অশ্লীলতা নেই। এইজন্যে শেক্সপীয়র অশ্লীল নয়, রামায়ণ মহাভারত অশ্লীল নয়। কিন্তু ভারতচন্দ্র অশ্লীল, জোলা অশ্লীল; কেননা তা কেবল আংশিক অনাবরণ।…” এই প্রবন্ধে তিনি আরো উদাহরণ দিয়ে শেক্সপিয়রের রচনায় অমরত্বের উপাদানগুলোকে চিহ্নিত করেন, ” শেক্সপিয়র এবং প্রাচীন কবিরা মানুষ দেখতে পেতেন এবং তাদের প্রতিকৃতি সহজে দিতে পারতেন।….. সৌন্দর্যপ্রকাশও সাহিত্যের উদ্দেশ্য নয়, উপলক্ষ মাত্র। হ্যাম্লেটের ছবি সৌন্দর্যের ছবি নয়, মানবের ছবি; ওথেলোর অশান্তি সুন্দর নয়, মানবস্বভাবগত।” (‘মানবপ্রকাশ’/ সাহিত্য)
বিশ্বসাহিত্যের নানা কাহিনী বা উপাখ্যানে আমরা এমন কিছু সমতুল্য চরিত্রের সাক্ষাৎ পাই, যারা জন্ম থেকেই জনসমাজের সংস্পর্শরহিত হয়ে কোন নিভৃত অরণ্যে লালিত হয়ে উঠেছে। মহাভারতের ঋষ্যশৃঙ্গ, কালিদাসের শকুন্তলা কিংবা শেক্সপিয়রের মিরান্ডা চরিত্রগুলো এ কারণে নানা সময়ে তুলনামূলক আলোচনার বিষয়বস্তু হয়েছে। রবীন্দ্রনাথও তাঁর ‘শকুন্তলা: প্রবন্ধটিতে শেক্সপিয়রের টেম্পেস্ট্ নাটকের সঙ্গে কালিদাসের শকুন্তলার তুলনা করে এদের ‘বাহ্য সাদৃশ্য এবং আন্তরিক অনৈক্য” লক্ষ করেছেন। এ বিষয়ে তাঁর দীর্ঘ ও চিত্তাকর্ষক তুলনামূলক আলোচনার সামান্য কিছু অংশ এখানে তুলে ধরা যায় :- “নির্জনলালিতা মিরান্দার সহিত রাজকুমার ফার্দিনান্দের প্রণয় তাপসকুমারী শকুন্তলার সহিত দুষ্মন্তের প্রণয়ের অনুরূপ। ঘটনাস্থলটিরও সাদৃশ্য আছে; এক পক্ষে সমুদ্রবেষ্টিত দ্বীপ, অপর পক্ষে তপোবন। ….বন্ধন ও অবন্ধনের সংগমস্থলে স্থাপিত হইয়াই শকুন্তলা নাটকটি একটি বিশেষ অপরূপত্ব লাভ করিয়াছে। তাহার সুখদুঃখ-মিলনবিচ্ছেদ সমস্তই এই উভয়ের ঘাতপ্রতিঘাতে। …টেম্পেস্টে এ ভাবটি নাই। কেনই বা থাকিবে? শকুন্তলাও সুন্দরী, মিরান্দাও সুন্দরী, তাই বলিয়া উভয়ের নাসাচক্ষুর অবিকল সাদৃশ্য কে প্রত্যাশা করিতে পারে? উভয়ের মধ্যে অবস্থার, ঘটনার, প্রকৃতির সম্পূর্ণ প্রভেদ। মিরান্দা যে নির্জনতায় শিশুকাল হইতে পালিত শকুন্তলার সে নির্জনতা ছিল না। মিরান্দা একমাত্র পিতার সাহচর্যে বড়ো হইয়া উঠিয়াছে, সুতরাং তাহার প্রকৃতি স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হইবার আনুকূল্য পায় নাই।… বস্তুত শকুন্তলার সরলতা স্বভাবগত এবং মিরান্দার সরলতা বহির্ঘটনাগত। উভয়ের মধ্যে অবস্থার যে প্রভেদ আছে তাহাতে এইরূপই সংগত। মিরান্দার ন্যায় শকুন্তলার সরলতা অজ্ঞানের দ্বারা চর্তুদিকে পরিরক্ষিত নহে।” (শকুন্তলা/ প্রাচীন সাহিত্য ) মোটের ওপর এই প্রবন্ধে অভিব্যক্ত রবীন্দ্রনাথের অভিমতটি হল, কালিদাস ও শেক্সপিয়রের দুটি কাহিনীর আখ্যানমূলে ঐক্য থাকলেও এ দুটির কাব্যরসের স্বাদ সম্পূর্ণ ভিন্ন।
শেক্সপীয়রের কোনো কোনো কাহিনীতে পটভূমি হিসেবে অরণ্য বা নিসর্গপ্রকৃতির উপস্থিতি থাকলেও সেখানে রূপায়িত মানবচরিত্রগুলিতে সেই অরণ্যের চরিত্র বা প্রকৃতি কোনোরকম প্রভাব বিস্তার করেনি, এরকমই মনে করেছেন রবীন্দ্রনাথ ‘শিক্ষা’ গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত একটি প্রবন্ধে। এখানে তিনি লিখেছেন, ”শেক্সপীয়রের দুই একটি খণ্ডকাব্য আছে নরনারীর আসক্তি তার বর্ণনীয় বিষয়। কিন্তু সেইসকল কাব্যে আসক্তি একেবারে একান্ত, তার চারদিকে আর কিছুরই স্থান নেই; আকাশ নেই, বাতাস নেই, প্রকৃতির যে গীত-গন্ধবর্ণবিচিত্র বিশাল আবরণে বিশ্বের সমস্ত লজ্জা রক্ষা করে আছে তার কোনো সম্পর্ক নেই। এইজন্যে সেসকল কাব্যে প্রবৃত্তির উন্মত্ততা অত্যন্ত দুঃসহরূপে প্রকাশ পাচ্ছে।”এই মন্তব্যটিকে উদাহরণসহ স্পষ্টতর করে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ” শেক্সপিয়রের As you Like It নাটক একটি বনবাসকাহিনী– টেম্পেস্ট্ও তাই, Midsummer Nignt’s Dream ও অরণ্যের কাব্য। কিন্তু সে-সকল কাব্যে মানুষের প্রভুত্ব ও প্রবৃত্তির লীলাই একেবারে একান্ত– অরণ্যের সঙ্গে সৌহার্দ্য দেখতে পাই নে। …মানুষের প্রকৃতি বিশ্বপ্রকৃতিকে ঠেলেঠুলে স্বতন্ত্র হয়ে উঠে আপনার গৌরব প্রকাশ করেছে।” ( তপোবন/ শিক্ষা )
সাহিত্যের ভিতর দিয়ে মানুষের যে ভাবের আকৃতি পাওয়া যায়, তা ভুলতে বেশি সময় লাগে না। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ মনে করেছেন সাহিত্যের মধ্যে মানুষের মূর্তি যেখানে উজ্জ্বল রেখায় ফুটে ওঠে সেখানে ভোলবার পথ থাকে না। এর উদাহরণ হিসেবে রবীন্দ্রনাথ তাঁর একটি প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, ” শেক্সপিয়রের লুক্রিস এবং ভিনস অ্যাণ্ড্ অ্যাডোনিসের কাব্যের স্বাদ আমাদের মুখে আজ রুচিকর না হতে পারে, সে কথা সাহস করে বলি বা না বলি; কিন্তু লেডি ম্যাকবেথ অথবা কিং লীয়র অথবা অ্যাণ্টনি ও ক্লিয়োপেট্রা এদের সম্বন্ধে এমন কথা যদি কেউ বলে তা হলে বলব, তার রসনায় অস্বাস্থ্যকর বিকৃতি ঘটেছে, সে স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। শেক্সপিয়র মানবচরিত্রের চিত্রশালার দ্বারোদঘাটন করে দিয়েছেন, সেখানে যুগে যুগে লোকের ভিড় জমা হবে। …মিডসামার নাইট্স্ ড্রীম নাট্যের মূল্য কমে যেতে পারে, কিন্তু ফলস্টাফের প্রভাব বরাবর থাকবে অবিচলিত।” ( ‘সাহিত্যের মূল্য’, সাহিত্যের স্বরূপ)
নিজের ‘মালিনী’ নাটকের ভূমিকাতেও রবীন্দ্রনাথ কথা প্রসঙ্গে শেক্সপিয়রের কাছে ঋণস্বীকার করেছেন এই বলে :- ” শেক্সপিয়রের নাটক আমাদের কাছে বরাবর নাটকের আদর্শ। তার বহুশাখায়িত বৈচিত্র্য, ব্যাপ্তি ও ঘাতপ্রতিঘাত প্রথম থেকেই আমাদের মনকে অধিকার করেছে।”
কখনো অপরের রচনা সঙ্গে তুলনাপ্রসঙ্গে, কখনো বা সরাসরি কোন তত্ত্বপ্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে শুধু নানা প্রবন্ধেই যে রবীন্দ্রনাথ শেক্সপিয়রের সাহিত্য থেকে উদাহরণ আহরণ করেছেন, তা-ই নয়, চিঠিপত্রে আলোচনার মধ্যেও তাঁর আকর্ষণীয় শেক্সপিয়র-মূল্যায়ন দেখা যায়। এরকম কিছু পত্রাংশ পরে তাঁর ‘সাহিত্য’ গ্রন্থটিতে সংযোজিত হয়েছে। ‘আলোচনা (পত্রোত্তর)’ শিরোনামে সংকলিত এরকম একটি চিঠিতে দেখা যায় রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, “শেক্সপিয়রের অনেকগুলি সাহিত্যসন্তানের মধ্যে এক একটি ব্যক্তিগত স্বাতন্ত্র্য সুপরিস্ফুট হয়েছে বলে যে তাদের মধ্যে শেক্সপিয়রের আত্মপ্রকৃতির কোন অংশ নেই তা আমি স্বীকার করতে পারি নে।… শেক্সপিয়র তাঁর নাটকের পাত্রগণকে নিজের জীবনের মধ্যে সঞ্জীবিত করে তুলেছিলেন অন্তরের নাড়ীর মধ্যে প্রবাহিত প্রতিভার মাতৃরস পান করিয়েছিলেন, তবেই তারা মানুষ হয়ে উঠেছিল, নইলে তারা কেবলমাত্র প্রবন্ধ হত। অতএব এক হিসেবে শেক্সপিয়রের রচনাও আত্মপ্রকাশ কিন্তু খুব সম্মিশ্রিত বৃহৎ এবং বিচিত্র।” (বন্ধু লোকেন্দ্রনাথ পালিতকে লিখিত)
এই চিঠিটিরই পরবর্তী অংশে শেক্সপিয়রের রচনার মধ্যে ব্যক্তিমানুষ শেক্সপিয়রের ভাবশরীরটি খুঁজে পাওয়ার প্রচেষ্টায় রবীন্দ্রনাথ লেখেন,”… যিনি যাই বলুন শেক্সপিয়রের কাব্যের কেন্দ্রস্থলেও একটি অমূর্ত ভাবশরীরী শেক্সপিয়রকে পাওয়া যায় যেখানে থেকে তাঁর জীবনের সমস্ত দর্শন বিজ্ঞান ইতিহাস বিরাগ অনুরাগ বিশ্বাস অভিজ্ঞতা সহজ জ্যোতির মতো চতুর্দিকে বিচিত্র শিখায় বিভিন্ন বর্ণে বিচ্ছুরিত হয়ে পড়ছে; যেখান থেকে ইয়াগোর প্রতি বিদ্বেষ, ওথেলোর প্রতি অনুকম্পা, ডেসডিমোনার প্রতি প্রীতি, ফলস্টাফের প্রতি সকৌতুক সখ্য, লিয়ারের প্রতি সসম্ভ্রম করুণা, কর্ডিলিয়ার প্রতি সুগভীর স্নেহ শেক্সপিয়ররের মানবহৃদয়কে চিরদিনের জন্য ব্যক্ত ও বিকীর্ণ করছে।” ( সংযোজন/ ‘সাহিত্য’ দ্রষ্টব্য — জন্মশতবার্ষিক সংস্করণ রবীন্দ্র রচনাবলী ত্রয়োদশ খণ্ড)
নানা প্রবন্ধে ও চিঠিপত্রে লিপিবদ্ধ শেক্সপিয়র সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের বহুবিচিত্র অভিমত ও মূল্যায়ন আহরণ করে আমরা এতক্ষণ দেখার চেষ্টা করেছি। এর পাশাপাশি উল্লেখ করা যায় , শেক্সপিয়র-সাহিত্য সম্পর্কে মন্তব্য তাঁর রচিত কাহিনীর চরিত্রের মুখেও খুঁজলে পাওয়া যায়। এই সূত্রে তাঁর ‘ললাটের লিখন’ গল্পে পৃথ্বীশ নামক চরিত্রটির মুখে এই সংলাপ মনে পড়ে যায় :-, “ প্রেমে মানুষের মুক্তি। কবিরা যাকে ভালোবাসা বলে সেটা বন্ধন। তাতে একজন মানুষকে আসক্তির দ্বারা বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে তাকেই তীব্র স্বাতন্ত্র্যে অতিকৃত করে তোলে। … এই কথাটাকেই শেক্সপিয়র কৌতুকচ্ছলে দেখিয়েছেন তাঁর ভরাবসন্তের স্বপ্নে। প্রেম জাগ্রত দৃষ্টি, নরনারীর ভালোবাসা স্বপ্নদৃষ্টি নেশার ঘোরে। …” গল্পের এই চরিত্রটির মুখে যে-সংলাপ বসানো হয়েছে, কে বলতে পারে, সেটি তার স্রষ্টার ব্যক্তিগত মতবাদেরই প্রতিধ্বনি নয়!


আমরা দেখেছি অতি তরুণ বয়স থেকে প্রায় সারা জীবন ধরেই রবীন্দ্রনাথ প্রবন্ধ চিঠিপত্র বা অন্যান্য গদ্যে শেক্সপিয়র সম্পর্কে তার আকর্ষণ ও অনুরাগকে অভিব্যক্তি দিয়েছেন। কবিতার মাধ্যমে তাঁর এই সাহিত্যদেবতাকে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদনের সুযোগ তিনি পেয়েছিলেন শেক্সপিয়রের মৃত্যুর ত্রিশতবার্ষিকী উদযাপনের প্রাক্কালে। ১৯১৫ সালে ‘শেক্সপিয়র সোসাইটি’র অনুরোধে ১৯১৫ সালে ‘শেক্সপীয়র সোসাইটি’র অনুরোধে প্রথমে বাংলায় তিনি একটি কবিতা লেখেন, ‘শেক্সপীয়র’ শিরোনামে যা প্রথম প্রকাশিত হয় ‘সবুজপত্রে’র পৌষ, ১৩২২ সংখ্যায়। পরে তা ‘বলাকা’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত হয়। (শেক্সপিয়রের জন্মচতু:শতবার্ষিকী উপলক্ষে বিশ্বভারতী পত্রিকার একটি সংখ্যায় প্রকাশিত যে পান্ডুলিপির ছবিটি আমরা এখানে সংযোজিত করেছি তার শিরোনামে ‘বিশ্বকবি’ লেখা থাকলেও প্রকৃতপক্ষে মূল পাণ্ডুলিপিতে কোন শিরোনাম ছিল না। কবিতাটির মূল পাঠের ওপরে পছন্দমতো একটি শিরোনাম ও নিচে রবীন্দ্রনাথের স্বাক্ষর যোগ করে ওই পত্রিকার পরিচালকেরা একরকম খোদার উপর খোদকারী করেছেন বলা চলে!)
এই সোসাইটি ত্রিশতবার্ষিকী উৎসব উপলক্ষে পৃথিবীর প্রায় সব ভাষার বরেণ্য লেখকদের রচনা নিয়ে এক স্মারকগ্রন্থ প্রকাশের পরিকল্পনা করেছিল। রবীন্দ্রনাথের নিজের ভাষায় :- “প্রফেসর গোলাঙ আমাকে এই স্মৃতি-উৎসব উপলক্ষে কিছু লিখতে অনুরোধ করেন। আমি তাঁকে এই বাঙলা কবিতা পাঠাই। সুদূর দেশের সেই শ্রদ্ধার উপহার সাদরে গৃহীত হয়।” একথা রবীন্দ্রনাথ ১৯২১ সালে তাঁর বলাকা কাব্যগ্রন্থটি প্রসঙ্গে আলোচনার সূত্রে বলেছিলেন, যা লিপিবদ্ধ করেন ক্ষিতিমোহন সেন। [দ্রষ্টব্য ‘বলাকা কাব্য পরিক্রমা’, ৩৯নং কবিতার ব্যাখ্যা, পৃ. ২০৩] আর একটি তথ্যসূত্র অনুসারে রবীন্দ্রনাথ কবিতাটির একটি ইংরেজি তর্জমাও পাঠিয়েছিলেন এবং সেটি সহ মূল কবিতাটি ১৯১৬ সালে ‘A Book Of Homage to Shakespeare’ সংকলনে প্রকাশিত হয়। এখানে উল্লেখ করা যায়, অধ্যাপক ইজরায়েল গোলাঙ্ক (১৮৬৩ – ১৯৩০) ছিলেন বৃটেনের সুপরিচিত শেক্সপিয়র -বিশেষজ্ঞ ও শেক্সপিয়র রচনাবলীর একটি সুলভ সংস্করণের সম্পাদক। শেক্সপিয়রের ত্রিশতবার্ষিকী উপলক্ষে গঠিত উক্ত সংকলনের প্রকাশনা কমিটির তিনি ছিলেন সাম্মানিক সচিব এবং ওই সংকলনটির সম্পাদক।
মূল কবিতাটিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেনঃ-
‘‘যেদিন উদিলে তুমি বিশ্বকবি, দূর সিন্ধুপারে,
ইংলন্ডের দিক্প্রান্ত পেয়েছিল সেদিন তোমারে
আপন বক্ষের কাছে, ভেবেছিল বুঝি তারি তুমি
কেবল আপন ধন; উজ্জ্বল ললাট তব চুমি
রেখেছিল কিছুকাল অরণ্যশাখার বাহুজালে,
ঢেকেছিল কিছুকাল কুয়াশা অঞ্চল-অন্তরালে…..
তারপর ধীরে ধীরে অনন্তের নিঃশব্দ ইঙ্গিতে
দিগন্তের কোল ছাড়ি শতাব্দীর প্রহরে প্রহরে….
নিয়েছ আসন তব সকল দিকের কেন্দ্রদেশে
বিশ্বচিত্ত উদ্ভাসিয়া;………”
রবীন্দ্রনাথের নিজের করা এই কবিতাটির ইংরেজি অনুবাদের কিছু অংশ :-
“When by the far away sea your fiery disc appeared from behind the unseen, O poet, O Sun. England’s horizon felt you near her breast, and took you to be her own.
She kissed your forehead, caught you in the arms of her forest branches, hid you behind her mist mantle and watched you in the green sward where fairies love to play among meadow flowers……”

বিশ্বকবি শেক্সপিয়রকে শ্রদ্ধা নিবেদনের সুযোগ রবীন্দ্রনাথ আবার পান পরের বছর আমেরিকা সফরের সময়। শেক্সপিয়ারের জন্ম চতু:শতবার্ষিকী (১৯৬৪) উপলক্ষে বিশ্বভারতী পত্রিকার একটি সংখ্যায় প্রকাশিত একটি ছবির নিচে মুদ্রিত পরিচিতি থেকে জানা যাচ্ছে, ১৯১৬ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের ক্লিভল্যান্ডে (ওহিও) শেক্সপীয়র গার্ডেনে রোপনের জন্য আমাদের বিশ্বকবি ইংল্যান্ডের বিশ্বকবির স্মৃতিতে একটি আইভিলতা রোপন করেছিলেন (পত্রিকাটি থেকে সেই দুষ্প্রাপ্য ছবিটি আমরা এইসঙ্গে সংযোজিত করলাম)। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত প্রভাত মুখোপাধ্যায়ের রবীন্দ্রজীবনী বা প্রশান্ত পালের রবিজীবনী-তে এই প্রসঙ্গটির সংক্ষিপ্ত উল্লেখ থাকলেও এগুলির মধ্যে বিভ্রান্তিকর অসম্পূর্ণতা ও পরস্পরবিরোধিতা রয়েছে। প্রভাতকুমার একটি মাত্র বাক্যে লিখেছেন রবীন্দ্রনাথকে শেক্সপিয়ার গার্ডেনে ওই বৃক্ষরোপণ করতে ও শেক্সপিয়ারের সম্মানে বক্তৃতা দিতে হয়েছিল। অপরপক্ষে প্রশান্তকুমার একটি স্থানীয় সংবাদপত্রের থেকে সংক্ষিপ্ত ও খণ্ডিত উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছেন যে, ক্লিভল্যান্ড শহরের পক্ষ থেকে রবীন্দ্রনাথকে শেক্সপিয়ার গার্ডেনে ওই বৃক্ষরোপণের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ এরপর কী করলেন, সে ব্যাপারে তিনি সম্পূর্ণ নিশ্চুপ! সুতরাং প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে যে, ছবির ওই আইভি লতাটি রবীন্দ্রনাথ কোথায় রোপন করেছিলেন এবং শেক্সপিয়ার গার্ডেনে তিনি আদৌ গিয়েছিলেন কিনা বা সেখানে কোন বক্তৃতা দিয়েছিলেন কিনা। রবীন্দ্রনাথের সর্বাধুনিক জীবনবৃত্তান্ত ‘রবিজীবন’-এর প্রণেতা শ্রী বিজন ঘোষাল পূর্বোক্ত সংবাদপত্রের প্রতিবেদনের প্রশান্ত পালের বর্জিত অংশটির ভিত্তিতে জানিয়েছেন যে, ওই গার্ডেনের ফরেস্টারের কাছে উক্ত আমন্ত্রণ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের প্রতিনিধি উইলি পিয়ারসন বলেছিলেন যে, রবীন্দ্রনাথ শারীরিকভাবে ক্লান্ত, তিনি ওই হোটেলে তাঁর ঘরের মধ্যে ওই উদ্যানের জন্য কোনো চারাগাছ রোপণ করতে পারলে খুশি হবেন। শেষ পর্যন্ত তিনি ওই গার্ডেনে গিয়েছিলেন বা শেক্সপিয়ারের স্মরণে কোন বক্তৃতা দিয়েছিলেন, এমন কোন তথ্য বিজনবাবু সংবাদপত্রে খুঁজে পাননি। তাঁর মতে শেক্সপিয়ার গার্ডেনে স্থাপনের জন্য রবীন্দ্রনাথ তখন যে হোটেলে ছিলেন, তার বলরুমে বা অন্য কোনো কক্ষে কোনো টবের মধ্যে ওই লতাগাছটি তিনি রোপন করে থাকতে পারেন (যেমন ছবিটিতে দেখা যাচ্ছে)।
এই গ্রীষ্মে মিলিত হয়েছে রবীন্দ্রনাথ ও শেক্সপিয়র দু’জনেরই জন্মদিনের উপলক্ষ। এই দুই বিশ্বকবিকে আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণতি!

