শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

নেতাজী-জয়ন্তীতে কলকাতায় একদিন : স্মৃতির সরণি বেয়ে

“… হে রাজতপস্বী বীর, তোমার সে উদার ভাবনা
বিধির ভাণ্ডারে
সঞ্চিত হইয়া গেছে, কাল কভু তার এক কণা
পারে হরিবারে?
তোমার সে প্রাণোৎসর্গ, স্বদেশলক্ষ্মীর পূজাঘরে
সে সত্যসাধন,
কে জানিত, হয়ে গেছে চিরযুগযুগান্তর-তরে
ভারতের ধন।…”

বিগত সাতের দশকে একটি সংবাদপত্রে দেখেছিলাম ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির পুত্র ডঃ সর্বপল্লি গোপাল তাঁর লেখা নেহরু-জীবনীতে মন্তব্য প্রকাশ করেছেন যে, সুভাষচন্দ্র এমন একজন মানুষ, যিনি নাকি হেরে যাবার জন্যই জন্মেছিলেন। এ প্রসঙ্গে সেই সংবাদপত্রেই এক ভদ্রলোক লিখেছেন, এই দৃষ্টিতে যদি ইতিহাস লিখতে হয়, তাহলে বলতে হয়, মহাত্মা গান্ধী বা সীমান্ত গান্ধী গাফ্ফার খানের চেয়ে বেশি হেরে যাওয়া মানুষ আর কেউ নেই। কিন্তু আমার সেদিন যে কথা মনে হয়েছিল, তা হচ্ছে এই যে, সুভাষচন্দ্র সত্যিই কি হেরে যাওয়া মানুষ? এ-সম্পর্কে মাইকেল এডওয়ার্ডস, একজন ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ সুভাষ সম্পর্কে লিখেছেন, “ভারত আর কারও কাছে ততটা ঋণী নয়, যতটা তাঁর কাছে।” মনে পড়েছিল ব্রিটিশ লেখক হিউ টোয়ের মন্তব্য :- “নিঃসন্দেহে আই এন এ ভারতে ব্রিটিশ রাজ্যের অবসান ত্বরান্বিত করেছে।” ভারতের ডঃ গোপালের মতের পাশাপাশি ভেসে উঠলো বর্মী নেতা ডঃ বা ম’-এর মূল্যায়ন – “প্রকৃতপক্ষে বসু হারেন নি।… কেবল যা ঘটেছে তা হল, একজন ফসল ফলিয়েছে, অন্যেরা তা ভোগ করেছে।”

ডঃ গোপালের গ্রন্থকে সাহিত্য একাডেমির পুরস্কারে ভূষিত করার খবর যখন পেয়েছিলাম, তখন আবার মনে হয়েছিল, একজন হেরে যাওয়া মানুষকে কেন্দ্র করে দেশ বিদেশের মানুষের এত কৌতূহল, গবেষণা ও শ্রদ্ধার উৎসার কেমন করে সম্ভব, যেমনটা দেখেছিলাম তার কয়েকবছর আগে দু’বার (১৯৭৩ ও ১৯৭৬ সালে) কলকাতায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক নেতাজী আলোচনাচক্রে। এরমধ্যে শেষোক্তটির কথা এখানে কিছু বলা যাক।

কলকাতার রাজপথে নেতাজি জয়ন্তী
জন্মদিনের প্রভাতফেরী – কলকাতায় নেতাজি ভবনের সামনে

সেটা ছিল সুভাষচন্দ্রের ৭৯তম জন্মবার্ষিকী। কলকাতায় এই বিশেষ দিনটিতে উপস্থিত থাকার জন্য আমি জামশেদপুরে থেকে এসে উপস্থিত হয়েছিলাম টালিগঞ্জে আমার পিসিমার বাড়িতে। ভোরবেলায় উঠে রাস্তায় বেরিয়ে প্রভাতফেরী,পতাকা উত্তোলন ইত্যাদি দেখতে দেখতে অভ্যাসমতো এলাম খবর-কাগজের স্টলে। পত্রপত্রিকার নেতাজী বিষয়ক ক্রোড়পত্রগুলি সংগ্রহ করে রাখার অভ্যাস আমার একেবারে ছেলেবেলা থেকেই ছিল। এই প্রচেষ্টায় টালিগঞ্জ ফাঁড়ি থেকে পত্রিকা খুঁজতে খুঁজতে চলে যেতে হল রাসবিহারী-মোড় পর্যন্ত ও কয়েকটি কাগজ সংগ্রহ হল। সেগুলির পাতা উল্টে দেখতে পেলাম, দু’টি কাগজে (দৈনিক বসুমতী ও সত্যযুগ) আমার নেতাজি বিষয়ক লেখা বের হয়েছে।

সত্যযুগ পত্রিকার নেতাজি জয়ন্তী বিশেষ ক্রোড়পত্রে প্রকাশিত লেখকের রচিত প্রবন্ধ ও রেখাচিত্র

এরপর সকাল নটা নাগাদ এলাম ভবানীপুরে নেতাজি ভবনের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। এবারের অনুষ্ঠানের বিশেষ আকর্ষণ ছিল দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নেতাজী আলোচনাচক্র। নেতাজীর এই জন্মদিবসে এই আলোচনাচক্রের উদ্বোধন হল লালা লাজপৎ রায় সরনীর (এলগিন রোড) নেতাজী ভবনে। অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করলেন বিখ্যাত দিলীপকুমার রায়। প্রথমে দেখে চিনতে পারিনি, পত্রপত্রিকায় দেখা তাঁর তরুণ বয়সের ছবির তুলনায় চেহারা অনেক বদলেছে — দীর্ঘ শ্মশ্রু, পরনে গেরুয়া, সঙ্গে তাঁর হরিকৃষ্ণ আশ্রমের (পুনা) পীতবাস লোকজন। সর্বপ্রথমে দিলীপকুমার গাইলেন প্রসিদ্ধ সেই গান, তাঁর পিতার রচনা – “বঙ্গ আমার জননী আমার”। গলার সে ঐশ্বর্য এ বয়সে আর নেই, তাল কেটে যাচ্ছে, লয় হারিয়ে যাচ্ছে,স্মৃতিও বড় বঞ্চনাময়ী, গানের পদেও ভুল হচ্ছে। তারপর একহাতে খঞ্জনী, একহাতে হারমোনিয়াম — দুটোতে তাল রাখতে গিয়ে দুটোই থেমে যাচ্ছে- সঙ্গে শিষ্যা রয়েছেন সুর ধরতে। ইনিই তাঁর কন্যাশিষ্যা বলে সুপরিচিতা ইন্দিরা। একক কণ্ঠে বৃদ্ধ গাইলেন ঐতিহাসিক সেই গান ও তার স্বকৃত ইংরেজি অনুবাদ। পরে একই সুরে শিষ্যশিষ্যাদের সঙ্গে সমবেত ভাবে গাইলেন একটি সুভাষ-বন্দনা। বাংলার বর্ণময় ইতিহাসের একটা পাতা স্বচক্ষে উল্টে যেতে দেখে বড় দুঃখ হল।

উদ্বোধনী সংগীত গাইছেন নেতাজির বন্ধু দিলীপকুমার রায়

এরপর ভাষণ দিলেন পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল ও মুখ্যমন্ত্রী (যথাক্রমে এ এল ডায়াস ও সিদ্ধার্থশংকর রায়)। শেষোক্তজন নেতাজি সম্পর্কে বলতে গিয়ে শ্রোতাদের সামনে কয়েকটি প্রশ্ন উত্থাপন করলেন। তাঁর প্রশ্নগুলির কিছু নমুনা তুলে দিচ্ছি। একটি প্রশ্ন ছিল- নেতাজি যদি আজাদ হিন্দ বাহিনী নিয়ে অভিযান না করতেন, তাহলে কি ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হত! তাঁর অপর প্রশ্নটি অবশ্য এত সাদাসিধে ছিল না– নেতাজি যদি বন্দী আজাদ হিন্দ সেনানীদের সঙ্গে লালকেল্লায় এসে উপস্থিত হতেন, তাহলে তার ফল কী হত? সিদ্ধার্থবাবু শ্রোতাদের কাছ প্রশ্নটি স্পষ্টতর করে দেবার উদ্দেশ্যে পুনরায় বললেন, “নেতাজির বিজয়ী হয়ে ভারতে আসার কথা আমি বলছি না, কারণ তার অন্যরকম ফল হত। আমার প্রশ্ন — নেতাজিকে যদি বন্দী অবস্থায় ভারতে নিয়ে আসা হত, তাহলে তার ফল কী হতে পারত!”

নেতাজি ভবনের অনুষ্ঠানে মঞ্চে উপবিষ্ট গবেষক লেনার্ড গর্ডন, পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল ডায়াস ও মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ রায় প্রমুখ

নেতাজী রিসার্চ ব্যুরোর অধিকর্তা ডঃ শিশিরকুমার বসু এরপর আজকের প্রধান বক্তা সম্পর্কে বললেন, “আজকের শ্রোতাদের মধ্যে ক’জন সুভাষচন্দ্র বসু ও দিলীপকুমার রায়কে একসঙ্গে দেখেছেন জানিনা, তবে যারা দেখেছেন, তাদের কাছে সেই দৃশ্য ভোলবার নয়।” এরপর দিলীপকুমার দিলেন তাঁর নেতাজী-বক্তৃতা এবং বিস্মিত আনন্দে লক্ষ করলাম যে, বক্তা দিলীপকুমারকে এখনও জরা স্পর্শ করেনি। বক্তব্য স্পষ্ট এবং তাঁর স্বভাবসিদ্ধ রসিকতার ছোঁয়ায় মাঝেমাঝেই প্রাণবন্ত, যেমন একবার কথাপ্রসঙ্গে বললেন, “বিশ্বাস করুন, এখন আমার চেহারা যেমনই হোক, সে-সময় আমি দেখতে ভালোই ছিলাম।” তিনি স্মৃতিচারণ করলেন প্রধানত তাঁর ছাত্রজীবনের, যেসব কথা তাঁর স্মৃতিকথাগুলোতে (‘দি সুভাষ আই নিউ’, ‘নেতাজি, দি ম্যান : রেমিনিসেনসেস’, ‘স্মৃতিচারণ’) পূর্বেই লিখেছেন। কথাপ্রসঙ্গে তিনি বললেন, বিলেতে ছাত্র থাকাকালে তাঁরা ছুটি পেলেই সিনেমা থিয়েটার দেখতে প্যারিসে ছুটতেন, কিন্তু সুভাষ যেতেন আয়ারল্যান্ডে – তিনি তখন থেকেই আইরিশ বিপ্লবকর্ম অনুধাবন করতেন।

ইংল্যান্ডের একটি গ্রামে ছাত্রাবস্থায় সুভাষচন্দ্র ও দিলীপকুমার রায়, ১৯১৯ – ২০
ইংল্যান্ডে সুভাষচন্দ্র ও দিলীপকুমার রায় — একটি গ্রুপ-ছবির অংশ

এদিনের পরবর্তী অধিবেশন শুরু হল বেলা আড়াইটায়। সভানেত্রী ভারত ও জাপান বিষয়ে মার্কিন গবেষিকা ডঃ জয়েস লেব্রা (আজাদ হিন্দ আন্দোলন সম্পর্কে ‘ ‘দি জাঙ্গল অ্যালায়েন্স’ নামে একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের প্রনেত্রী)। প্রথম লেখাটি পড়লেন জাপানের তেরুও হাচাইয়া। শিরোনাম – ‘নেতাজীকে যেমন জানতাম’। হাচাইয়া ছিলেন আজাদ হিন্দ সরকারে প্রেরিত জাপান সরকারের রাষ্ট্রদূত এবং জাপ সরকার ও আজাদ হিন্দ ফৌজের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষাকারী সংগঠন হিকারী কিকানের প্রধান। তিনি যখন প্রথম দিন নেতাজীর সঙ্গে দেখা করতে যান, রাষ্ট্রদূত হিসেবে আনুষ্ঠানিক পরিচয়পত্র সঙ্গে না নেওয়ায় নেতাজী তাঁর সঙ্গে দেখা না করে তাঁকে ফিরিয়ে দেন। নিজের প্রবন্ধে হাচাইয়া সেসব পুরানো কথার উল্লেখ করেছেন, বিশেষ করে নেতাজীর অপূর্ব ব্যক্তিত্ব, দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি, পূর্ব রণাঙ্গনে যুদ্ধের শেষ দিনগুলোর কথা ও লালকেল্লায় আজাদী সেনানীদের বিচারের সময় সাক্ষীরূপে তাঁর নিজের উপস্থিতির কথা।

গবেষিকা ড. জয়েস লেব্রা ও তাঁর রচিত আই এন এ বিষয়ক কয়েকটি গ্রন্থ

হাচাইয়াকে একজন শ্রোতা প্রশ্ন করেন, জাপান আজাদ হিন্দ সরকারকে কী ধরনের স্বীকৃতি দিয়েছিল, আর কেনই বা সেদিন হাচাইয়া পরিচয়পত্র সঙ্গে আনেননি। হাচাইয়া প্রথমে বললেন, “আমি ইংরিজি ভালো বুঝিনা”। তাঁকে প্রশ্নটা আবার বুঝিয়ে বলা হলে কিছুটা আমতা আমতা করে বললেন, পরিচয়পত্রের ব্যাপারে একটা ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল, আর তিনিও ব্যাপারটাকে খুব বেশী গুরুত্ব দেননি, কারণ আজাদ হিন্দ সরকার ছিল অস্থায়ী!
এরপর আজাদ হিন্দ ফৌজের অন্যতম সেনানায়ক কর্নেল প্রেম কুমার সেগল বললেন নেতাজীর রণকৌশল সম্পর্কে। তিনি সামরিক ঐতিহ্যের মানুষ, চলনে-বলনেও যাকে বলে সোজাসুজি স্পষ্ট পন্থার পথিক। তিনি পরিষ্কারভাবে দৃঢ়তার সঙ্গে বললেন তাঁর বক্তব্য — প্রমাণ করলেন সামরিক বিষয়ে শুধু নয়, রাজনৈতিক ব্যাপারের বিশ্লেষণেও নিজের ক্ষমতা। তাঁর বক্তব্য ছিল, পরশাসনের শৃঙ্খলমুক্তির জন্য যে কোনো জাতির দরকার তিনটি জিনিস – বিশ্ব-জনমতকে অনুকূলে আনার জন্য প্রচার, দেশের অভ্যন্তরে বৈপ্লবিক পরিস্থিরর সৃষ্টি ও শাসকশক্তির সৈন্যবলকে ধ্বংস করা। পূর্ব এশিয়ায় ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু করার সময়ই এই তিনটি রণকৌশল নেতাজী স্পষ্ট বুঝেছিলেন। ১৯৪২ সালে পূর্ব এশিয়ায় প্রথম আই.এন.এ-কে মোহন সিং গড়ে তুলেছিলেন ব্যক্তিগত আনুগত্যের ভিত্তিতে, এসব রণকৌশল সম্পর্কে তাঁর কোনো জ্ঞান ছিলনা। তিনি জাপানীদের কাছে প্রতিশ্রুতি চেয়েছিলেন। নিজের যুদ্ধ জয় সম্পর্কে তাঁর যতটা বিশ্বাস ছিল, জাপানীদের প্রতিশ্রুতিপালনে বাধ্য করার মতো শক্তি ততটা ছিল না। ফলে সেই প্রথম আই.এন. এ. ভেঙে যায়।

লেফটনান্ট কর্ণেল প্রেম কুমার সেগল – (বিভিন্ন বয়সের তিনটি ছবি)

কিন্তু দূরদৃষ্টি ও ইতিহাসের শিক্ষা থেকে নেতাজী বুঝেছিলেন, সে শক্তি আসতে পারে সত্যিকারের একটি জাতীয় সেনাদল থেকে, যা গড়ে উঠবে শুধু যুদ্ধবন্দী সেনাদের নিয়ে নয়, নতুন সৈনিক নিতে হবে, সংগঠনকে ছড়িয়ে দিতে হবে পূর্ব এশিয়ার বিরাটসংখ্যক ভারতীয়দের মধ্যে ব্যাপকভাবে। এই ভাবেই গড়ে উঠেছিল নতুন আজাদ হিন্দ ফৌজ, আজাদ হিন্দ সরকার, তার নারীবাহিনী ও প্রচার বিভাগ। নেতাজী জাপানী প্রতিশ্রুতির চেয়ে স্বাধীনতা-যুদ্ধে নিজেদের আত্মত্যাগ ও প্রচেষ্টার ওপরই বেশি জোর দিয়েছেন। তিনি বলেছিলেন, “বিপ্লব হবে দেশের ভেতরে, শুধু জনসাধারণের মধ্যেই নয়, ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে। এভাবে ব্রিটিশ আক্রান্ত হবে ভেতরে-বাইরে দুদিক থেকে। আমার এই পরিকল্পনা অনুসারে অক্ষশক্তির মনোভাব নিয়ে মাথা ঘামানো সম্পূর্ণ নিষ্প্রয়োজন।”
লে.ক. সেগল আরো বললেন, “আমরা জানি আজাদ হিন্দ সরকারের বেতারপ্রচার নিরপেক্ষ দেশগুলোকে ও আমেরিকাকে কতটা প্রভাবিত করেছিল। পূর্ব সীমান্তে যেসব ব্রিটিশ ভারতীয় সেনার সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ হয়েছিল, তারা বলেছে ওসব বেতার প্রচারে তাদেও আগ্রহের কথা। এমন কি ব্রিটিশ বাহিনীর আরও উচ্চতর অংশেও তা ছড়িয়েছিল। সেদিন আমরা যদি ইম্ফল অধিকার করতে পারতাম, তবে তখনই ভারাতব্যাপী বিপ্লব হত। কিন্তু ইম্ফল জয় হয়নি বলে নেতাজীর পরিকল্পনা মাত্রও ব্যর্থ হয়ে যায়নি। অক্ষশক্তির পরাজয়ের পরও নেতাজীর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল ভারতের স্বাধীনতালাভ সম্পর্কে। ১৯৪৬ সলে লালকেল্লায় বন্দী আজাদী সৈন্যদের বিচারের সময় বহির্ভারতের ভারতীয় সেনাদের ১০০ শতাংশ ও অভ্যন্তরের সেনাদের ৯০ শতাংশ চাইত বন্দী আজাদী সেনাদের মুক্তি ও ভারতীয় সেনাবাহিনীতে পুনর্বাসন। ওই বিচারের পরেই ভারতব্যাপী বিক্ষোভ এবং নৌ ও বিমান বাহিনীতে বিদ্রোহ ব্রিটিশকে ভারতত্যাগে বাধ্য করে। সুতরাং নেতাজীর বিশ্লেষণ ও রণকৌশল সম্পূর্ণ সফল হয়েছিল। লে.ক. সেগলের মতে ভারতের ওপর জাপানী প্রভুত্বের সম্ভাবনা আছে, একথা নেতাজী মনে করেন নি। জাপানীদের সঙ্গে তাঁদের হৃদ্য সম্পর্কের আরও প্রমাণ পেলাম, যখন হাচাইয়ার সঙ্গে দেখা হতেই আজাদ হিন্দ ফৌজের ধীলন, সেগলরা তাঁর সঙ্গে আলিঙ্গনাবদ্ধ হলেন।

মার্কিন গবেষক ড. লেনার্ড গর্ডন ও বসু-ভাইদের জীবন নিয়ে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ

আজকের বৈঠকের আর একটি গবেষণাপত্র ছিল আমেরিকার তরুণ অধ্যাপক লেনার্ড গর্ডনের “ব্রিটিশরাজের বিরুদ্ধে বসু ভ্ৰাতৃদ্বয় (১৯৩৬-৪৭)”। [তাঁর “বাংলার জাতীয়তাবাদী আন্দোলন : ১৮৭৬ – ১৯৪০” বিষয়ক গ্রন্থের একটি অংশে লেখক প্রধানত এই সব প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করেছেন। আরও বহু বছর পরে রচিত তাঁর ‘ব্রাদার্স এগেনস্ট দি রাজ’ নামে শরৎ ও সুভাষের যৌথ জীবনী আজও নেতাজি-গবেষকদের কাছে একটি অপরিহার্য গ্রন্থ হিসেবে গণ্য হয়]। বাংলার কংগ্রেসকে সুভাষ ও শরৎ বসু ভ্ৰাতৃদ্বয় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, ১৯৩৮ সলে প্রথমবার কংগ্রেস সভাপতি হবার সময় পর্যন্তও বামপন্থীরা সুভাষের সঙ্গে ছিলেন, কিন্তু ত্রিপুরী কংগ্রেসের সঙ্কটকালে তাঁরা সুভাষচন্দ্রকে সম্মিলিত সমর্থন দিলেন না কেন? ত্রিশের দশকে গড়ে ওঠা সুভাষচন্দ্রের মতবাদকে ‘সমাজতান্ত্রিক’ বা ফ্যাসিস্ট আখ্যা দেওয়া কতদূর যথার্থ? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে সুভাষ যখন বিদেশে ব্রিটিশবিরোধী যুদ্ধ চালাচ্ছেন, তখন শরৎচন্দ্র বাংলায় অন্যান্য দলের সঙ্গে মিলে মন্ত্রীসভা গঠনের চেষ্টা চালাচ্ছেন, অথচ সুভাষ বরাবরই মন্ত্রিত্ব গ্রহণের বিরোধী ছিলেন — তা হলে দু’ ভাইয়ের মতবাদে কি কোনো পার্থক্য ছিল? যুদ্ধকালে ব্রিটিশকে সমর্থনের ব্যাপারে বামপন্থীদের অবস্থানই বা এসময় এত বিভিন্ন কেন? বসু-ভাইদের মতবাদ ও বাংলার রাজনীতিতে তাঁদের বাস্তব কর্মপন্থার মধ্যে কি কোনো ফারাক ছিল?
এরকম আরও কয়েকটি প্রশ্ন নিয়ে ডঃ গর্ডন তাঁর এই পেপারটিতে আলোচনা করেছেন, যেমন যুদ্ধকালে জার্মানিতে নেতাজীর প্রচেষ্টার তুলনায় পূর্ব এশিয়ার প্রচেষ্টা বেশি সফল কেন হয়েছিল, কিংবা শরৎ বসু যখন ‘সংযুক্ত স্বাধীন বাংলা’ গঠনের প্রকল্প নিয়ে প্রয়াস শুরু করেন, তখন তিনি কংগ্রেসের বামপন্থী অংশের সর্মথন নিজের পক্ষে সংহত করতে পারেন নি কেন ইত্যাদি। এই গবেষণাপত্র প্রসঙ্গে শ্রোতারা নানা প্রশ্ন তোলেন, যেমন শরৎ বসুর সমাজতন্ত্র সম্পর্কে ধারণা, তিনি রাজনীতিতে ‘Back Bencher’ ছিলেন কিনা, তাঁর ও সুভাষচন্দ্রের আন্দোলন কতটা গণ আন্দোলন ছিল ইত্যাদি।


বিগত প্রথম আন্তর্জাতিক আলোচনাচক্রের (১৯৭৩) তুলনায় এবারকার আলোচনাচক্রের বৈশিষ্ট্য ছিল তরুণদের যোগদান। অনেক ছাত্রই প্রশ্ন করেছিলেন এবং তাতে পশ্চিম বাঙলার শিক্ষিত সমাজের স্বাভাবিক বামপন্থী প্রবণতার গন্ধও পাওয়া যাচ্ছিল। এ রকমই একটি প্রশ্ন ছিল , আজাদ হিন্দ বাহিনী কতদূর গণবাহিনী ছিল। লে. ক. সেগল এর জবাবে বললেন, তাঁর রেজিমেন্টের নব্বই শতাংশ লোকই নেওয়া হয়েছিল সাধারণ শ্রেণীর মানুষদের মধ্য থেকে। শ্রীমতী কৃষ্ণা বসু বললেন, ট্রাকচালক থেকে গোয়ালা — সবরকম পরিবারের লোকই আই.এন.এ তে ছিলেন। ভারতীয় সৈন্যদের আনুগত্য, জাপান ও আই.এন.এ-র উদ্দেশ্য, বার্মায় ফ্যাসিবিরোধী আন্দোলন ইত্যাদি নানা বিষযে প্রশ্ন ওঠে। এসবের জবাবে লে. কর্নেল সেগল দৃঢ়ভাবে বলেন, “আমরা যদি আং সাং-এর (বার্মার ফ্যাসিবিরোধী আন্দোলনের নেতা, যিনি জাপানি সহায়তায় ডঃ বা ম’-র পরিচালিত জাতীয় আন্দোলনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও জাপান সরকারের নীতির বিরোধিতা করেন) পথ নিতাম, আমাদের বিশ্বাসঘাতক বলে গণ্য করা হত।”

সেদিন বিকেলেও নানারকম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল নেতাজির জন্মদিন উপলক্ষে। খুঁজে বের করলাম নেতাজি ভবনের কাছেই উডবার্ন পার্কে শরৎ বসুর বাড়ী। এখানে ‘শরৎ-বিভা মণ্ডপে’ আয়োজিত হয়েছে ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে সম্পর্কিত ছবি ও বইযের এক প্রদর্শনী। নেতাজী ও গান্ধীজির জীবনের নানাসময়ের ছবি ছাড়াও রয়েছে প্রবাসী ভারতীয় বিপ্লবীদের ও সে-সক্রান্ত কিছু দলিলপত্রের ছবি – যাঁদের অনেকের নাম শুনেছি, কিন্তু চেহারা সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না। এদের মধ্যে কয়েকটি উজ্জ্বল নাম – কৃষ্ণবর্মা, মওলানা বরকতুল্লা, সর্দার সিংজি রানা, মানবেন্দ্রনাথ রায়। রয়েছে জার্মানির স্টুটগার্টে সমাজতান্ত্রিক সম্মেলনে জাতীয় পতাকা হাতে মাদাম কামার সেই বিখ্যাত ছবিটিও। কিন্তু ছবির ভুল পরিচিতি (যেমন শহীদ মদনলাল ধিংড়ার ছবির তলায় অন্য নাম) এবং এরকম ওলট পালট আরও কিছু ব্যাপার পীড়াদায়ক।

মুক্তিপথের অগ্রদূত — কাফী খাঁর কার্টুনমালায় সুভাষ-জীবন

ভালো লাগল খ্যাতনামা ব্যঙ্গচিত্রী কাফী খাঁর আঁকা কয়েকটি ছবি, যাতে নেতাজীর জীবনের বিভিন্ন ঘটনাকে সমন্বিত করা হয়েছে শরৎচন্দ্রের ‘পথের দাবী’র সেই বিখ্যাত শেষ পংক্তির সঙ্গে :- “তুমি তো আমাদের মতো সোজা মানুষ নও, তুমি দেশের জন্য সমস্ত দিয়াছ, তাই দেশের খেয়াতরী তোমাকে বহিতে পারেনা ( সঙ্গে নেতাজীর সাবমেরিন যাত্রার ছবি) …. তাইতো দেশের রাজপথ তোমার কাছে রুদ্ধ (জিয়াউদ্দিনের ছদ্মবেশে পুলিশের চোখের সামনে দিয়ে সুভাষ বেরিয়ে যাচ্ছেন), দুর্গম পাহাড় পর্বত তোমাকে ডিঙাইয়া চলিতে হয় (হিন্দুকুশ পার হচ্ছেন), কোনো বিস্মৃত অতীতে তোমারই জন্য প্রথম শৃঙ্খল রচিত হইয়াছিল, কারাগার তো শুধু তোমাকে মনে করিয়াই প্রথম নির্মিত হইয়াছিল (জেলখানার গরাদ ও শেকলের ছবি), সেই তো তোমার গৌরব। তোমাকে অবহেলা করিবে সাধ্য কার ? (ক্রুদ্ধ ব্রিটিশ প্রভু বিদেশ থেকে প্রচারিত নেতাজির বেতার ভাষণ শুনছেন) … দুঃখের দুঃসহ গুরুভার বহিতে পার বলিয়াই তো ভগবান এত বড় বোঝা তোমারই স্কন্ধে অর্পণ করিয়াছেন। (যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্যদের সঙ্গে দূরবীন হাতে নেতাজি) মুক্তি পথের অগ্রদূত (কোহিমাতে তেরঙা পতাকা হাতে নেতাজি ডাক দিচ্ছেন,’চলো দিল্লি’), পরাধীন দেশের হে রাজবিদ্রোহী! তোমাকে শতকোটি নমস্কার।” (বক্তৃতারত নেতাজি) ইত্যাদি। [‘কাফী খাঁ সমগ্র’ থেকে সংগ্রহ করে সেই অসাধারণ ছবিটি এখানে দেওয়া হল।]

বইয়ের প্রদর্শনীতে কিছু বই (অনেক পুরানো বইও) দেখা গেল, যা সংখ্যার দিক দিয়ে বেশী হলেও নেতাজী বিষয়ক সাম্প্রতিক গ্রন্থের মধ্যে অনেক উল্লেখ্যোগ্য বাংলা বইয়ের অনুপস্থিতি পীড়াদায়ক। ছবি দেখতে দেখতে দুজন বিহারী সিপাহীর মধ্যে এরকম আলোচনা হচ্ছিল — নেতা বোসের বাড়িটা কলকাতার কোথায়, তাঁর আত্মীয়স্বজন কেউ আছে কিনা,শাদি করেছিলেন কিনা ইত্যাদি। বই-প্রদর্শনীর প্রহরী নিজের জ্ঞানবুদ্ধি অনুযায়ী তাদের কৌতূহল মেটাচ্ছিল।

ফেরার সময় পায়ে হেঁটে এলাম ভবানীপুর থেকে টালিগঞ্জ উৎসবময়ী সন্ধ্যার কলকাতাকে দেখার জন্য। রাস্তায় রাস্তায় পতাকা-ফুলসাজ গত তিন দশক ধরে অনুপস্থিত একটি মানুষের স্মরণে – পশ্চিমবাংলায় এ একটি দেখার মতো দৃশ্য! যতীন দাস পার্কে রাজ্যের শাসকদলটির কোনো শাখা আয়োজিত নেতাজী জয়ন্তীর অনুষ্ঠানে বক্তার ‘সুদীপ্ত’ কন্ঠ ভেসে এল — “বাংলাদেশে কি হয়েছে! ন’ বছরের ছেলে রাসেলকেও রেহাই দেয়নি ওরা, গুলি করে খুন করেছে। আমাদের দেশেও তা-ই হত, যদি মহান নেত্রী জরুরী অবস্থা ঘোষণা করে লক্ষ লক্ষ রাসেলের প্রাণ না বাঁচাতেন। এরপরই নেতাজীর ও সঙ্গে সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর জয়ধ্বনি। এরপর এই বক্তাকে পিঠ চাপড়িয়ে থামিয়ে দিয়ে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী উঠে এসে বক্তৃতা শুরু করেছেন — প্রধানমন্ত্রীর বিশ দফা কর্মসূচী বিষয়ে বলছেন। তিনি বলে চলেছেন, ” বিশ দফায় কী আছে? আছে – গ্রামের উন্নতি করো, নেতাজিও তো সে কথাই বলেছিলেন।” তাঁর উচ্চকণ্ঠের কল্যাণে অনেক দূর পর্যন্ত এসব শুনতে শুনতে আবার হাঁটতে লাগলাম। মনে হল, সত্যি, “তোমাকে অবহেলা করিবে সাধ্য কার।”‘

● লেখকের ১৯৭৬ সালের দিনলিপি ও নোট অবলম্বনে মূল রচনা — জানুয়ারি ১৯৭৭।
● পরিমার্জনা ও তথ্য সংযোজন — ডিসেম্বর ২০২৪।
● কলকাতায় নেতাজির জন্মজয়ন্তীর শোভাযাত্রার ও নেতাজি ভবনের আলোকচিত্র লেখকের তোলা।
● নেতাজি ভবনের অনুষ্ঠানের ছবির সূত্র :- নেতাজি রিসার্চ ব্যুরো প্রকাশিত ‘Netaji Subhas Chandra Bose 80th Birth Anniversary : Official Souvenir। অন্যান্য ছবি আন্তর্জাল সূত্রে সংগৃহীত।
● সংবাদপত্রে ছাপা লেখকের প্রবন্ধের সঙ্গে নেতাজির রেখাচিত্রটিও লেখক অঙ্কিত]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x