
Bliss was it to be alive in that dawn,
But to be young was very heaven!
Wordsworth
মশালের কম্পিত আলোয় একটি বছর পঁইত্রিশ -এর মহিলা হঠাৎ ভূত দেখার মত একজনকে দেখে চমকে গিয়ে প্রাসাদের দেয়ালের সঙ্গে ঠেসে একটি খাঁজের মধ্যে লুকিয়ে পড়ল। দেখে ফেলে নি তো? মহিলার পরনে মাথা থেকে পা পর্যন্ত কালো সিল্কের গাউন, মাথায় কালো বনেট। বুক দুরুদুরু করছে, ভয়ে, আশঙ্কায়। যাকে দেখে লুকিয়ে পড়েছিল মহিলাটি, সে রাষ্ট্রীয় প্রহরী সেনার সেনানায়ক, দেশের সব চেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন যোদ্ধা, মার্কী দ্য লাফায়েত, আর দেয়ালের খাঁজে লুকিয়ে পড়া মহিলাটি ফ্রান্সের রানি, স্বয়ং মারি আঁতোয়ানেত !

কিছুক্ষণ বুকের মধ্যেকার হাতুড়ি পেটানো অনুভূতি সহ্য করে যখন রানি চোখ তুলল, দেখল লাফায়েত ঘোড়ার পিঠে চড়ে প্রাসাদের বড় তোরণ দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। যাক, আপদ বিদায় হয়েছে। এখন তাকে সেনাপতি দেখতে পেলে মারাত্মক কাণ্ড হত। এইবার তাকে প্রাসাদের লোহার গ্রিলের প্রাচীর ছাড়িয়ে বেরোতে হবে। অন্ধকার প্রাঙ্গণ, তার মধ্যে প্রাসাদের দেয়াল ও প্রাচীরে লাগানো নানা মশালের এলোমেলো আলোয় একটা মায়াবী ও রহস্যময় আবহাওয়া সৃষ্টি হয়েছে। জুন মাস, তাই অনেকক্ষণ আলো থেকে শেষে রাত ন’ টা নাগাদ আকাশ পুরো অন্ধকার হয়েছে।
অন্ধকার বটে, তবে এখনো তুইলেরী প্রাসাদের প্রাঙ্গণে অনেক লোক যাতায়াত করছে, অনেকেই প্রাসাদের কর্মী বা চাকর – তাদের বাড়ি ফেরার সময় হয়েছে । মারি ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে তাড়াতাড়ি সেই ভিড়ের মধ্যে মিশে গিয়ে বেরিয়ে এলো। তারপর সোজা গ্রিলের প্রাচীরের গা ঘেঁষে হাঁটতে শুরু করলো। অন্ধকারের মধ্যে মাঝে মাঝে হোঁচট খাচ্ছে, এত জোরে হাঁটার অভ্যাসও নেই, কিন্তু ঠোঁট চেপে সহ্য করছে, আর কিছুদূর গেলেই সে তার স্বামীর সঙ্গে মিলিত হবে।
আরও কিছুক্ষণ হাঁটার পর, আর কিছুটা অন্ধকারে খোঁজার পর, রানি ঘোড়ায় টানা জুড়ি গাড়রটা খুঁজে পেলো তুইলেরি প্রাসাদের কাছেই শঞ্জ-এলীজে রাজপথের এক ধারে একটা গাছতলায় দাঁড়ান অবস্থায়। দুর থেকে দেখেই তার গতি বেড়ে গেল, শেষের পঞ্চাশ পা সে দৌড়ে পেরিয়ে দরজায় ধাক্কা দিল। সঙ্গে সঙ্গে ভেতর থেকে দরজা খুলে দিল কালো কোট আর টুপি পরা একটি বিশাল চেহারার মানুষ – স্বয়ং রাজা ষোড়শ লুই। তাকে এবং সামনের আসনে বসা পুত্র-পুত্রিকে এবং তার বিশ্বস্ত সঙ্গী মাদাম দে তুরজেলকে দেখেই রানি গাড়িতে উঠে জড়িয়ে ধরল – তার মুখে নিশ্চিন্ততার একটা ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল, তারপর মুহূর্তের মধ্যে ম্লান হয়ে গেল। সে জিজ্ঞাসা করলো, লাফায়েত এখানে কি করছিল এত রাত্রে ? আমি তো প্রায় তার মুখোমুখি হয়ে গিয়েছিলাম আর একটু হলেই! রাজা লুই জবাব দিল, “কি আর বলব, আমি ভৃত্যদের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি, এমন সময় লাফায়েত আর তার বন্ধু প্যারিসের পুরসভার প্রধান এসে আমাকে সাধারণ কিছু ব্যাবস্থাপনার প্রশ্ন নিয়ে ব্যতিব্যস্ত করে তুলল – ওদের কোনোরকমে বুঝিয়ে বেরোতে-বেরোতে আমারও দেরি হয়ে গেল। তারপর সামনের আসনে বসা ছেলে-মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল- যাক, ভাল কথা এই যে এবারে আমরা সবাই এক গাড়িতে চলে এসেছি – আর চিন্তা নেই”।
রাজা তখন সহিসকে আদেশ দিল গাড়ি ছাড়তে, তারপর সবাই গভীর অন্ধকারের মধ্যে গভীরতম নিঃশব্দতায় শুধু ঘোড়ার খুরের শব্দ আর চাকার ঘরঘরানি শুনতে শুনতে রাতের মধ্যে এগিয়ে চলল। একটু পরে সেয়েন নদীর সেতু পার করে তারা একটি নির্ধারিত জায়গায় এসে আর একটি এক্কা গাড়ির সঙ্গে মিলিত হল, যার মধ্যে রাজপুত্র-পুত্রিদের পরিচারিকারা অপেক্ষা করছিল। এতক্ষণে পুরো দলটি – পরিবার ও তাদের পরিচারিকারা – দুটি গাড়িতে একত্রিত হয়ে এগোতে পারায় রাজ দম্পতি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল!
আধ ঘণ্টার জায়গায় প্রায় এক ঘণ্টা পর তারা নদীর অন্য পাড়ে প্যারিসের পুর্ব প্রান্তে পোর্ট সঁ মারতাঁর কাছে দাঁড় করান ছয় ঘোড়ার একটি বিশাল কালো “ব্যরলিন” গাড়ি খুঁজে পেল। তার ওপরে দুজন আর পেছনে একজন প্রহরী তাদের হাত ছানি দিয়ে ইশারা করলো পাশে আসতে। তখন দুই সহিস হারিকেনের ইশারায় নিশ্চিত হবার পর, দুটো গাড়ি পাশাপাশি এসে গতি মিলিয়ে সমান সমান চলতে লাগল। তারপর দরজা দুটো খুলে জুড়ি গাড়িটা থেকে বড় ব্যরলিন গাড়িটায় রাজ পরিবারের সকলে একে একে চলে এলো। এত উত্তেজনা প্রতি পদে – এর মধ্যে শিশুদুটির ঘুমোবার সময় হয়ে গেছে, কিন্তু তারাও বিশ্রাম নিতে পারছে না।

তাদের পরিকল্পনা হচ্ছে যে মাদাম দে তুরজেল একজন ব্যারনেস সাজবে, মারি তার বাচ্চাদের গভর্নেস, এবং লুই তার ব্যাবসায়িক প্রতিনিধি। এই ভাবে বিপ্লবের সাম্যবাদের ইচ্ছাকে পরিহাস করে, বিপ্লবীদের চোখে ধুলো দিয়ে, তারা অস্ট্রিয়ার সীমানার মধ্যে পৌঁছে, সেখান থেকে সৈন্য সংগ্রহ করে ফিরে আসবে। তখন সেই বিদেশি শক্তির সাহায্যে আবার অতীতের গৌরবময় রাজ-ব্যাবস্থা ফিরিয়ে এনে লুই ও মারি একটি স্বর্ণ যুগের ফ্রান্সের ওপর রাজত্ব করবে, এই তাদের হৃদয়ের একান্ত ইচ্ছা। তবে কি শুধু রাজ্য লাভ? না, তাদের জীবন, তাদের শিশুদের জীবনের, নিরাপত্তাও তাদের মনের ভিতর কাজ করছে।
কি কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়েই না গেছে গত কয়েক মাস ! সারাদিন বিশাল প্রাসাদের মধ্যে বন্দি, ঘরগুলি প্রায় খালি। আসবাবপত্র ভারসাই-এর প্রাসাদের মত নেই, তাই কথা বললে প্রতিধ্বনিতে গমগম করে ওঠে – নিজের শব্দে নিজেই মাঝে মাঝে চমকে উঠতে হয়।
শুধু কিছু চাকরদের আসা যাওয়া এখনো আছে। তাদের অনেকেই ভাল ব্যাবহার করে, কিন্তু কেউ কেউ আগের মত আর শ্রদ্ধা করে না, বেশি ফরমাশ করলে চোখে মুখে বিরক্তি দেখায়। হাওয়ায় একটা যেন তিক্ত ভাব চারিদিকে। কিছু সময়ে শিশুদের নিয়ে বেরোনোর অনুমতি আছে, কিন্তু সেও প্রহরীর সঙ্গে। তার ওপর মাঝে মাঝেই বিপ্লবের নিয়ত পাল্টানো এলোমেলো ঝড়ের খবর আসে। কখনো মনে হয় এবারে বুঝি ফ্রান্সে পুরপুরি গণতন্ত্র স্থাপিত হবে, আবার কখনো বা মনে হয়, হয়ত ইংল্যান্ড-এর মত সাংবিধানিক রাজতন্ত্র হবে। কখনো শোনা যায় রাজা ষোড়শ লুই মানুষের খুব প্রিয়, তিনি অস্ট্রিয়ার মেয়ে মারির প্রভাবে চলেন, নিজে তিনি নির্দোষ, আবার অন্য সময় রব ওঠে, রাজা রানি দুজনেই বিশ্বাসঘাতক, নিপীড়ক, রাজতন্ত্রের সঙ্গে তাদেরও শেষ করে দেওয়াটাই রাষ্ট্রের পক্ষে ভাল! এরকম করে কতদিন থাকা যায়?
দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার অনেক বছর ধরেই অবনতি হচ্ছে। একের পর এক মন্ত্রীসভা এসেছে, গেছে, কিন্তু কোন সমাধান করতে পারে নি। এদিকে আমেরিকায় ইংল্যান্ডের উপনিবেশ গুলিতে যে বিপ্লব ও স্বাধীনতা সংগ্রাম প্রায় পনের বছর আগে আরম্ভ হয়েছিল, তার সাহায্য করাতে ফ্রান্সের লাভ আছে মনে করে ফরাসী সরকার অনেক টাকা খরচ করেছিল। তাদের ইচ্ছা ছিল ইংল্যান্ডকে এই যুদ্ধে আমেরিকার মাধ্যমে পরাজিত করে জব্দ করার। কিন্তু এই প্রচেষ্টায় যে এত অর্থ ব্যয় হয়ে যাবে, এবং সেটা যে ফ্রান্সের এই অর্থনৈতিক দুর্দিনে অত্যন্ত ক্ষতিকর হবে, এই কথাটা ফরাসী সরকার ঠিক আগে থাকতে অনুমান করতে পারে নি। তার ওপর গত দশকের শেষের দিকে প্রথমে খরা তারপর অসময়ে তুষারপাতে গমের ফসল এত নষ্ট হয়েছে যে প্রায় দুর্ভিক্ষ হবার জোগাড়। রুটির দাম বারো/তেরো সু-তে এসে ঠেকেছে, দিন মজুরদের সারা দিনের রোজগারের সমান!
এই সব সমস্যা একের পর এক দেশের ও মানুষের মাথার ওপর এসে পড়ায় ১৭৮৯ সালের মে মাসে ভারসাই-তে সারা দেশের তিন শ্রেণির প্রতিনিধিরা জমায়েত হল অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান ও খাদ্যের অভাব দুর করার উপায় বের করার জন্যে। নানা তর্ক বিতর্কের মধ্যে সমাধান সহজে বেরোনো দুষ্কর মনে হতে লাগল।
শেষ পর্যন্ত ১৭৮৯ সালের জুলাই মাসে মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গিয়ে জনগণের বিপ্লব শুরু হল। প্রথমেই রাজশক্তির অপব্যাবহারের প্রতীক, নির্যাতনের প্রতীক, বাস্তীল কারাগারের ওপর আক্রমণ হল, তার অধ্যক্ষকে হত্যা করে, শেষ পর্যন্ত কারাগারের বিশাল অবয়বটিকে ধ্বংস করে ফেলা হল। তারপরে ক্রমাগত নানান ঘটনার মধ্যে দিয়ে ফ্রান্সের শাসন ব্যাবস্থা রাজা এবং মন্ত্রী পরিষদের হাতের মুঠো থেকে বেরিয়ে যেতে লাগল। একটি সাংবিধানিক সমিতি গঠিত হল, যার সদস্যেরা ফ্রান্সের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে নির্বাচিত হয়ে নতুন সংবিধান লেখার কাজ শুরু করলো।
তারপর ১৭৮৯ সালের অক্টোবর মাসের এক দিন, যখন মারি ভারসাইয়ের প্রাসাদের পাশেই তার সাজানো গ্রামে কৃষক মহিলা সেজে তার সহচরীদের সঙ্গে বাঁধানো পুকুরে পোষা হাঁসদের খাওয়াচ্ছিল, আর লুই অভ্যাস মত শিকার করতে গিয়েছিল, প্যারিস থেকে বিশাল এক দল মহিলা দোকানি ও কর্মিরা মিলে ভারসাইয়ের দিকে রওনা দিল। তাদের প্রধান দাবি – রুটির দাম কমাতে হবে, পরিবারকে দু বেলা খাওয়াবারও তাদের সামর্থ্য নেই। তার জন্যে যদি রাজা-রানিকে তাদের সঙ্গে প্যারিস নিয়ে আসতে হয়, তাও তারা আনবে। রাষ্ট্রীয় প্রহরী সেনার একটি বড় অংশও তাদের সঙ্গ দিল। বাধ্য হয়ে তাদের নেতা সেনাপতি লাফায়েতকেও তাদের সঙ্গে যেতে হল, অঘটন এড়াবার জন্য। সেইদিন ও পরের দিনের প্রতিবাদের ফলে লুই ও সমগ্র রাজ পরিবারকে ভারসাই ছেড়ে প্যারিসে এসে তুইলিএরি প্রাসাদে থাকতে হল। সেই মুহূর্ত থেকেই তারা বিপ্লবের বন্দি, প্রায় দু বছর হতে চলল!
হয়ত সব চাইতে বড় পরিবর্তন হল দেশের ধর্মীয় ব্যাবস্থায়। বিপ্লবীরা ঘোষণা করলে যে চার্চের নিজস্ব সম্পত্তি থাকবে না, সমস্ত পাদ্রিরা রাষ্ট্রের কর্মচারী হবে, মাসিক বেতন পাবে, আর তাদের রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকবে, সুদূর রোমে অবস্থিত পোপের প্রতি নয়। যদিও অনেক গরিব পাদ্রিদের এই ব্যাবস্থাটা লাভজনক মনে হতে পারত, তারাও অনেকেই এটাকে স্বীকার করতে পারলো না, বিশেষ করে প্রশাসনের বশ্যতা স্বীকার করার প্রশ্নটা। লুই নিজেও এই নতুন নিয়মটি মন থেকে মানতে পারলো না, যদিও সে কথা দিয়েছিল যে সে বিপ্লবীদের দ্বারা রচিত সংবিধানকে শিরোধার্য করে নেবে। এই গোপন আপত্তি থেকেই আজকের এই পলায়নের সূত্রপাত।
অন্ধকার রাত্রে বেরলিন গাড়িতে যেতে যেতে লুই-এর মনে পড়ল এই কিছুদিন আগেকার সেই মর্মান্তিক অপমানের কথা। সে ঠিক করেছিল যে সে ১৭৯১ সালের ইস্টারের “কমুনিয়ন” নেবে এমন এক পাদ্রির কাছে, যে রাষ্ট্রের কাছে বশ্যতা স্বীকার করেনি, তার ক্যাথলিক ব্রতে অটল থেকেছে। যেহেতু সেরকম কাজ প্যারিসে করতে গেলে জনতার মধ্যে ভীষণ আলোড়ন উঠবে, সেই ভয়ে সে প্যারিস থেকে একটু দুরেই সাঁ ক্লু -এর প্রাসাদে গিয়ে ঈস্টার-এর সময়টা কাটাবে ঠিক করেছিল। সে যখন মারি-কে নিয়ে তার রাজকীয় গাড়িতে করে রওনা দিচ্ছিল, তখন প্যারিসের লোক জন জানতে পেরে তাদের প্রাসাদের বিশাল তোরণের ভিতরেই আটকে দিল, এবং লাফায়েতের নির্দেশ স্বত্বেও রাষ্ট্রীয় রক্ষী বাহিনী তাদের সাহায্য করলো না, উল্টে জনতার ভিড়ের সঙ্গে তাদের আটকানোতে সহযোগিতা করলো। শেষ পর্যন্ত দু ঘণ্টা বদ্ধ গাড়ির মধ্যে বসে, প্রচুর লাঞ্ছনা সহ্য করে, রাজ দম্পতিকে প্রাসাদের মধ্যে ফিরে যেতে হল! লুই-এর সে দিনের কথা স্মরণ করতে করতে মনে হল, এমন ঘোরতর অপমান বোধ হয় তাদের বংশে তো বটেই, সারা পৃথিবীর কোন রাজাকে সহ্য করতে হয় নি। সেই দিন তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেল, তুইলেরিতে তারা জনগণের বন্দি, এবং তাদের নিরাপত্তারও কোন ঠিক নেই। আজ তাই ছদ্মবেশে অন্ধাকারে পলায়ন তার কাছে আনন্দের, সম্মানের কথা বলে মনে হচ্ছে। আসার আগে সে এক দীর্ঘ চিঠিতে তার নিজের স্বপক্ষে বিবৃতি দিয়ে এসেহিল, যাতে সে স্পষ্ট করে লিখেছিল যে যদিও সে এর আগে বিপ্লবীদের অনেক দাবি মেনে নিয়েছিল আরে নিজের অধিকার ক্রমশ কমে যেতে দেওয়াতে স্বীকৃতি দিয়েছিল, সে সব বিপ্লবীদের চাপে এসে করেছিল। তার এই বিপ্লবের প্রতি কোন আনুগত্য বা সমর্থন কোনদিনই ছিল না, এবং তার একান্ত কামনা যে বিপ্লব বিফল হোক, এবং সেজন্য সে বিদেশে গিয়ে প্রাণপণ চেষ্টা করবে।
এই সব নানা বিষয়ে ভাবতে ভাবতে তার কখন তন্দ্রা এসে গেল, সে কথা সে জানে না। যখন চোখ খুলল, ডান দিকের জানালা দিয়ে দেখল সূর্য সবে পুর্ব প্রান্তে উঠছে, কিছু গাছ পালার ফাঁক দিয়ে। কি সুন্দর এই সকাল! মুক্তির আভাস নিয়ে আসা, আশার আলো নিয়ে আসা সকাল!
পরিকল্পনা অনুযায়ী রাজ পরিবার ফ্রান্সের পুর্বে প্যারিসের প্রায় দুই শত মাইল দুরে আস্ট্রিয়-নেদারলান্ডের প্রান্তে মঁমেদি পৌছবে, যেখানে ফরাসী সেনাবাহিনীর চারটি জার্মান ও দুটি সুইস দল তাদের সুরক্ষার ভার নিয়ে প্রান্তের ওপারে নিয়ে যাবে।সীমানার অন্য দিকে রানীর ভ্রাতা সম্রাট লিওপোল্ড সৈন্য পাঠিয়ে তাদের সুরক্ষার ভার নেবে, ও অদূর ভবিষ্যতে তাদের আবার ফ্রান্সের সিঙ্ঘাসনে প্রতিষ্ঠিত করার উদ্যোগ করবে। পথে কিছু ছোট গ্রাম বা জনপদে থেমে ঘোড়া বদল করে, একটু বিশ্রাম ও জলপান করে যাত্রা আবার শুরু করা হবে। এই পুরো যাত্রায় ২ থেকে ৩ দিন লাগার কথা।
সেই সব গ্রামের ও জনপদের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে লুই একটু একটু করে ধাতস্থ হতে লাগল, এবং মারি ও বাচ্চাদের সঙ্গে তার অভ্যাস-মত কিছু গ্রাম্য রসিকতাও করতে আরম্ভ করলো। “একবার আমি এই বদ্ধ গাড়ি থেকে বেরিয়ে ঘোড়ার পিঠে পশ্চাদ্দেশ রাখতে পারলেই, আমায় আর দেখে কে – আমি আবার নতুন করে রাজ্য গড়ে তুলব – দেখো তোমরা!” সে ম্যাপ দেখতে ও বানাতে ভালবাসত, এবং তাতে তার বেশ মেধা ছিল। এক একটি জায়গা দিয়ে যাবার সময় সে সেগুলিকে তার জন্য বিশেষ ভাবে ছাপানো ম্যাপে চিহ্নিত করতে বেশ উপভোগই করছিল। সেই সব জায়গার ইতিহাস ও বিশেষত্বও সে মারি আর বাচ্চাদের বোঝাতে লাগল।
নানা জায়গায় ঘোড়া বদল ঠিক সময়-মতই হতে লাগল। একটি ছোট্ট গ্রামে থেমে, সেখানকার এক সরাই খানায় তারা প্রাতরাশ করলো। সরাইখানার মালিক এক কৃষক দম্পতি হয়ত তাদের কিছুটা চিনতে পারলো, কিন্তু তারা সম্ভ্রম মিশ্রিত মৌনতায় তাদের দিকে তাকিয়ে কোন প্রশ্ন করলো না। এই ধরনের ব্যাবহার দেখে রাজ দম্পতি কিছুটা শঙ্কিত হওয়ার সঙ্গে খানিক আশ্বস্তও হল, যে গ্রামের সাধারণ লোকে চিনতে পারলেও তাদের বিরুদ্ধে কিছু করবে না, তারা এমনই রাজভক্ত।

এর পর সেই বিশাল কালো গাড়ি, যার ধারে ধারে হলুদ বর্ডার দেওয়া, একটা ছোটখাটো জাহাজের মত পুর্ব ফ্রান্সের সবুজ ক্ষেতের সমুদ্রের মধ্যে দিয়ে এগোতে লাগল। জনবসতি এলে লোকে কেউ কেউ একটু সন্দেহের চোখে দেখছে – এরকম বিশাল বিলাসবহুল গাড়ি তো আর সচরাচর দেখা যায় না!
এদিকে দুপুর গড়িয়ে আসছে। একটা জায়গায় জোরে গাড়ি ঘোরাতে গিয়ে একটি মাইল পোস্টে চাকার ধাক্কা লেগে ঘোড়া শুদ্ধ গাড়ী উল্টে গেল। ভাগ্যবশত কেউ আহত হল না, সব যাত্রীরা বেরিয়ে এসে ঘোড়াদের তোলা ও গাড়ি সোজা করা দেখতে লাগল, বাচ্চারাও বেশ মজা পেল – এ এক নতুন অভিজ্ঞতা! কিন্তু এই সব করতে গিয়ে আরও আধ ঘণ্টা দেরি হয়ে গেল – আগের রাত্রে বেরোতে-বেরোতে ও গাড়ি খুঁজে পেতেই দুই ঘণ্টা দেরি হয়ে গিয়েছিল।
ফলে পথে পঁ দ্য সম-ভেল বলে জায়গাটিতে দ্যুক দ্য শুয়াজল নামে যে তরুণ অফিসার এক রক্ষী বাহিনী নিয়ে অপেক্ষা করছিল, সে অস্থির হয়ে উঠল। এদিকে গ্রামের লোকেরা ঘোড়ায় চড়া সৈন্য দেখে মনে করলো তারা হয়ত গত বছরের বাকি খাজনা নিতে এসেছে। বিপ্লবের তোড়ে অনেকেই নিজেদের খাজনা দেওয়া থেকে মুক্ত মনে করেছে, কেননা সংবিধান সমিতি মাঝে কিছু ঘোষণা করেছিল যার দ্বারা জমিদারদের প্রতি কৃষকদের দায়বদ্ধতা অনেক সীমিত করা হয়েছিল। কিন্তু যদিও তাতে খাজনা না দেওয়ার কথা ছিল না, গ্রামবাসী গরিব কৃষকরা তাই মনে করেছিল। তাই এই রক্ষী বাহিনীকে দেখে গ্রামবাসীদের দল তেড়ে এসে ইঁট-পাটকেল পাথর যা পারে ছুড়ে মারতে লাগল। তখন বাধ্য হয়ে শুয়াজল তাদের বোঝাল যে তারা একটি মূল্যবান অর্থভাণ্ডার কে সুরক্ষা দিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। এদিকে রাজ পরিবারের আসতে দেরি হচ্ছে দেখে শুয়াজল -এর সঙ্গে অপেক্ষাকারী আর এক ব্যাক্তি-ও অধৈর্য হয়ে উঠল। সে হচ্ছে রানীর বিশ্বস্ত কেশ বিন্যাস কারিগর লেনার্ড। শুয়াজল লেনার্ড-কে অন্য রক্ষী বাহিনীদের নেতাদের কাছে বার্তা দিয়ে পাঠাল যে কিছু একটা গোলমাল হয়েছে, যার কারণে রাজার আসতে দেরি হচ্ছে। এতক্ষণ অপেক্ষা করার পর গ্রামবাসীদের বিরক্ত ভাব দেখে তাকে তার ছোট বাহিনী নিয়ে একটা জঙ্গলের দিকে সরে যেতে হল, যেখানে তারা কিছুক্ষণের মধ্যেই পথ হারাল!
অন্যদিকে লেনার্ড ঘোড়ার পিঠে পরের বিশ্রাম স্থল গুলোয় গিয়ে তাদের সতর্ক করে দিল যে রাজা-রানির আসতে দেরি হবে, কিন্তু এত দেরি হওয়াতে তাদের মধ্যে কেউ কেউ মনে করলো যে আজ আর হয়ত তারা আসবেই না। এদিকে সন্ধ্যা হয়ে এসেছে, কিছু কিছু দলের সৈন্যরা তাদের কাছের গ্রামে গিয়ে রাত্রে বিশ্রাম করার জায়গা খুঁজতে লাগল।
লুই-দের গাড়িটা যখন পরের বিশ্রাম স্থল সাঁত মনু -তে শেষ পর্যন্ত ৮-টার সময় পৌঁছল, তখন ঘোড়া গুলি বেশ ক্লান্ত। এখন ঘোড়া বদলাতেই হবে – সে একটি নির্দিষ্ট ডাক ঘরে গিয়ে। সেখানে নতুন ঘোড়া প্রায় লাগানো হয়ে গেছে, এমন সময় পোস্টমাস্টার ধ্রুয়ে সারা দিন ক্ষেতে কাজ-কর্ম করে ফিরে এসে দেখে এক বিশাল কালো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। কৌতূহলী হয়ে সে যেই গাড়ির জানালার মধ্যে উঁকি দিয়েছে, ২১শে জুনের দীর্ঘতম দিনের পড়ন্ত আলোয় যে মহিলাটিকে কালো পোশাক পরে বসে থাকতে দেখল, তাকে প্রায় তক্ষুনি চিনে ফেলল – ফ্রান্সের রানি মারি আঁতোয়ানেত! তারপর তার পাশে কালো কোট পরা মানুষটিকে যদিও সে সাক্ষাত দেখেনি, তাকে সে চিনতে পারলো – এই কিছুদিন আগে বেরোনো ৫ লীভ্র নোট-এ লুই-এর ছবি থেকে! কিন্তু ধ্রুয়ে কিছু বলার আগেই তেজি ঘোড়াগুলো ব্যরলিন গাড়িটাকে নিয়ে বেরিয়ে গেল।
তাদের চলে যেতে দেখে ধ্রুয়ে সঙ্গে সঙ্গে ডাকঘরের ও গ্রামের লোক জন জড় করে সবাইকে জানাল যে এই সবে বেরিয়ে যাওয়া গাড়িতে সে রাজা-রানি কে যেতে দেখেছে, এবং তারা নিশ্চয়ই দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে! গ্রামের কিছু লোক ইতিমধ্যেই প্যারিস থেকে খবর পেয়েছে যে রাজা-রানি কে তুইলেরি প্রাসাদে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, তাই তাদের প্রধান ধ্রুয়েকে বিশ্বাস করলো, আর তাকে বলল, “তুমিই আমাদের মধ্যে সবচেয়ে ভাল সওয়ার, তুমি সঙ্গে আর একজনকে নিয়ে এখুনি পরের শহর ভারেন-এ চলে যাও, সেখানে লোকজন-কে সতর্ক কর”।
তখন সন্ধ্যা সাঢ়ে-আঠটা বেজে গেছে। পোস্টমাস্টার ধ্রুয়ে তার সঙ্গীকে নিয়ে দ্রুত গতিতে ঘড়ার পিঠে ছুটে গেল। পথে তারা লুই-এর গাড়িটিকে পেরিয়ে গেল, কিন্তু ততক্ষণে নেমে আসে আধো অন্ধকারে খেয়াল করলো না।
এদিকে ভারেনে যে রক্ষী বাহিনীকে লুই-দের সুরক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, তাদের মধ্যে অনেকেই শুতে চলে গেছে। তাদের ১৮ বছর বয়েসের ক্যাপ্টেন যখন তাদের আবার একত্রিত করার আদেশ পেল, সেই রাত্রের সময় আর তাদের খুঁজে জড় করা সম্ভব হল না। ততক্ষণে ধ্রুয়ে ভারেন পৌঁছে গিয়ে সেখানকার জনতাকে সতর্ক করে ফেলায় চারিদিকে এক ভীষণ আলোড়ন উঠেছে। সে তো সোজা গ্রামের একমাত্র ভদ্র সরাইখানায় – যার নাম “সোনালি হাত” – গিয়ে তাদের ডেকে বললে – রাজা-রানির গাড়ী এখানেই আসছে, তোমরা দেশের স্বার্থে, সাধারণ মানুষের স্বার্থে, তাদের আটকাও, কিছুতেই যেতে দিয়ো না!
অন্যদিকে রাজা আর রানির সেই চলন্ত গাড়ির মধ্যে শঙ্কা বেড়ে চলেছে – এত গুলো বিশ্রাম-স্থলের কোনটাতেই তাদের বরাদ্দ রক্ষীরা আসে নি। কিন্তু উপায় নেই, চলতেই হবে। যখন তারা ভারেনে পৌঁছে গেছে প্রায়, তখন লুই সহিসদের বলল, এখনো যেহেতু কোন রক্ষী বাহিনী আসে নি, এখানে না থেমে পাশের একটা ছোট রাস্তা দিয়ে পরের জনপদে গিয়ে ঘোড়া বদল করলে ভাল হয়, কারণ ভারেন-এই তাদের আটকানোর চেষ্টা হতে পারে। কিন্তু সহিসরা একেবারেই শুনতে চাইল না – তাদের ঘোড়া গুলো ভীষণ ক্লান্ত, ঘোড়া এখানেই বদলাতে হবে। যাই হোক, কিছুক্ষণ তর্কা-তর্কির পর লুই ভারেন-এ ঢুকতে রাজি হল। পথে তারা দেখতে পেল যে গ্রামটি হঠাত যেন জেগে উঠেছে – চারিদিকে এক চাঞ্চল্য দেখা যাচ্ছে। কিছু লোক “আগুণ, আগুণ!” বলে চিৎকার করছে। সেই চিৎকার শুনে গাড়ির যাত্রীদের মন ভীষণ দমে গেল – তারা বুঝতে পারলো যে গ্রামের গতিক ভাল নয়!
কিছুক্ষণ চলার পর তারা “সোনালি হাত” সরাই খানায় পৌঁছল। সেখানে এক সরকারি উকিল মঁসিয়ে সস তাদের থামিয়ে তাদের পরিচয়পত্র পরীক্ষা করলে। সে ছদ্মবেশী মাদাম দ্য তুরজেল কে বলল, “মাদাম, আপনাদের কাগজপত্র একপ্রকার যথাযথই লাগছে, আমরা আরও একটু পরীক্ষা করে দেখছি। আপনারা একটু বিশ্রাম করুন”। তারপর সে তার সঙ্গীদের কাছে পরামর্শ করতে গেল। সেখানে সে যখন বলল যে তাদের পরিচয়পত্র গুলো ঠিক লাগছে, তখন ধ্রুয়ে জোর দিয়ে বলল, “আমার পুরো বিশ্বাস এরা রাজা আর রানি, আমি নিজের চোখে রানিকে দেখেছি, আর রাজার মুখ একেবারে নোটের ছবির সঙ্গে মিলে যায়। এদের কিছুতেই যেতে দিয়ো না, মারাত্মক ভুল হয়ে যাবে”। এই নিয়ে কিছুক্ষণ বাদ-বিবাদ হচ্ছে যখন, লুই আর তার দলের সবাইকার অস্থির অবস্থা! উকিল মশায় আবার ফিরে এসে তাদের বলল যে আজকে রাত্রে ঠিক ভাল করে কাগজ গুলি পরীক্ষা করা যাচ্ছে না, তা ছাড়া বাচ্চারাও ক্লান্ত, সামনের পথ বিপদ সংকুল, আপনারা দয়া করে রাতটা আমার বাড়িতে দোতলার শোবার ঘরে কাটিয়ে দিন। তখন লুই-এর ঘর্মাক্ত চেহারায় ভীষণ অধৈর্য ও অসহায়তা এক সঙ্গে ফুটে উঠল। সে অনেক অনুনয় করলো, দয়া করে আজকে আমাদের যেতে দিন, আমাদের ভীষণ তাড়া আছে, কিন্তু ধ্রুয়ের জোরাজুরিতে ও বাইরের ভিড়ের আগ্রহে উকিল মশায় কিছুতেই তাদের যেতে দিলে না। অগত্যা লুই ও মারি তাদের সঙ্গীদের নিয়ে মঁসিয়ে সসের বাড়ি পৌঁছল ও ওপরের ঘরে উঠে আসল। সেখানে ক্লান্ত শিশুদের খাটে শুইয়ে দেওয়া হল।

কিছুক্ষণ আলোচনার পর মঁসিয়ে সস-এর মনে পড়ল যে গ্রামে মঁসিয়ে দেস্তেস বলে একজন বিচারপতি আছে যে আসলে রাজা লুইকে দেখেছে – কারণ বিবাহসূত্রে ভারসাইয়ে তার যাওয়া-আসা আছে। সস তৎক্ষণাৎ ঘোড়ার পিঠে ছুটে গিয়ে দেস্তেস-কে নিয়ে এলো। দেস্তেস ওপরের ঘরে উঠে এসে যেই লুইকে দেখল, অমনি হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে বললে, “মহারাজ! আজ্ঞা করুন!” এই কথা শুনে লুই আর থাকতে না পেরে দাঁড়িয়ে উঠে একবার চারিদিকে দাঁড়ান লোকজনের দিকে তাকিয়ে নিয়ে বললে, “হাঁ, আমি তোমাদের রাজা, আমি প্যারিস ছেড়ে তোমাদের মধ্যে থাকতে এসেছি”। এই বলে সে একে একে সেখানে জড় হওয়া মানুষজনকে আলিঙ্গন করলো, এবং তাদের কাছে নিজের ও পরিবারের গত কয়েক মাসের গ্লানি ও সঙ্কটের কথা বোঝাতে লাগল। তার বক্তব্য, তাদের পরিবারকে দিবা রাত্রি প্রহরার মধ্যে থাকতে হয়, সশস্ত্র প্রহরীদের দ্বারা বেষ্টিত হয়ে। তাদের সমস্ত অধিকার ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। লুই গ্রামের প্রমুখদের বলল, দেখ, আমি তোমাদের শিশু-বতসল পিতার মত, আমি তোমাদের ভীষণ ভালবাসি। আমি প্যারিসের বদ্ধ পরিবেশ থেক মুক্ত হয়ে গ্রামের বিশুদ্ধ হাওয়ার মধ্যে থাকতে চাই। কিন্তু এখন এখানে থাকলে আমাদের জীবন বিপন্ন হবে – তোমরা কি সেটা চাও? আমি রাজা হয়ে মিনতি করছি, তোমরা দয়া করে আজকে আমাদের যেতে দাও, আমি তোমাদের এই উপকারের কথা চিরকাল মনে রাখব। চিন্তা কোরো না, আমি আমার দেশ ও দেশের মানুষ কে এতটা ভাল বাসি যে আমি কখনওই এমন কোন কাজ করব না যাতে তোমাদের কোন বিপদ বা ক্ষতি হয়। এই কথা শুনে গ্রামের প্রধানরা প্রায় ওদের যেতে দিতে রাজি হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলল যে না, এদের এখন যেতে দিলে আমাদের বিপদ হতে পারে, কাল সকাল অবধি অপেক্ষা করে দেখা যাক প্যারিস থেকে কোন নির্দেশ আসে কিনা। তখন বাধ্য হয়ে লুই ও তার পরিবার সেই শোবার ঘরে এক মুহূর্তের জন্যেও চোখের পাতা না বন্ধ করে সারা রাত জেগে কাটালো। বাইরে হঠাত করে গির্জার ঘণ্টা বাজতে শুরু করলো, আর চারিদিক থেকে লোক লাঠি, বল্লম, মাস্কেট, কাস্তে, হাতের কাছে যে কোন অস্ত্র পেল, সেই সব নিয়ে সেই বাড়ির সামনের রাস্তায় জড় হতে লাগল। শেষে ভোর ছয়টা নাগাদ প্যারিস থেকে দুই বার্তা-বাহক এলো – তারা সেনাপতি লাফায়েতের কাছ থেকে আদেশ নিয়ে এসেছে- রাজা এবং রানিকে যেখানেই পাওয়া যাবে – আটকাতে হবে, ও প্যারিসে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে হবে। সেই বার্তা লেখা কাগজটি যখন মারি আঁতোয়ানেত-এর হাতে এলো, সে তখন ঘৃণা ভরা মুখে বলল,”এত বড় স্পর্ধা! আমি এদের কাছ থেকে আদেশ নেব!” এই বলে সে কাগজটিকে অবজ্ঞায় মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে দিল। লুই কিন্তু একদম শান্ত মুখে, ক্লান্তি ও দুঃখের সঙ্গে দাঁড়িয়ে বললে, “ আজ থেকে আর ফ্রান্সের কোন রাজা নেই!”
তখন তারা বাচ্চাদের ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলে, ধীরে ধীরে সিঁড়ী দিয়ে নেমে এলো। নিচে নেমে, বাড়ি থেকে বেরিয়েই তারা দেখে যে রাস্তাটি লোকে লোকারণ্য হয়ে আছে। সেই ভীড়ের মধ্য বেশির ভাগ মুখেই সহানুভূতির চেয়ে আক্রোশই বেশি। রাজার দেহরক্ষীরা কোনওরকমে ভীড় ঠেলে তাদের ব্যরলিন গাড়িতে নিয়ে ওঠাল। চারিদিকে “ভীভ ল্য ফ্রাঁস” এর জয়ধ্বনি-র মধ্যে গাড়ি অন্ত্যন্ত ধীরে ধীরে চলতে শুরু করলো। চারিদিকের মানুষ জনের ভিড়ে রাস্তায় ধুলো উঠছে, জুন মাসের গরমে জানালা বন্ধ করেল কষ্ট হচ্ছে। ওপরে ও পেছনে বসা রক্ষীদের দিকে, গাড়ির জানালার দিকে, গ্রামবাসীরা অনেক মৌখিক লাঞ্ছনার সঙ্গে কাদা, গোবর ইত্যাদিও ছুড়ে মারছে। একবার একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারের যুবক ঘোড়ার পিঠে চড়ে গাড়িটির কাছে এসে “ভিভ ল্য রোয়া” বলে রাজার প্রতি সম্মান জানাতে গেছে, তখন গ্রামবাসীরা তাকে ধরে নামিয়ে তলওয়ার, ছুরি, লাঠি ইত্যাদি অস্ত্র দিয়ে মেরে হত্যা করে ফেলল। এই সব দেখে, ক্লান্তিতে, আশঙ্কায়, লুই ও মারির দুজনেরই অজ্ঞান হওয়ার উপক্রম হল।
মাঝ পথে এক জাইগায় প্যারিস থেকে আসা সংবিধান সমিতির তিন জন প্রতিনিধি গাড়িতে উঠে বসল। তাদের মধ্যে একজন, বার্নাভ, যে তখন এই সমিতিতে বিশেষ স্থান অধিকার করে ছিল, রানির পাশে জায়গা নিলো। সে রানিকে বোঝাতে লাগল যে রাজা-রানি যদি তার কথা মত সংবিধানকে মেনে নেয়, জনগণের নির্বাচিত সংসদকে স্বীকার করে, তাহলে সে চেষ্টা করবে যাতে রাজপরিবারের কোন বিপদ বা ক্ষতি না হয়। মারি-কে স্বীকার সূচক ইশারা করতে দেখে বার্নাভ কিছুটা আশ্বস্ত হল, কিন্তু সে ঠিক বুঝল না যে মারির আসল ইচ্ছা কি! সে মনে করলো মারির মত বুদ্ধিমতী মহিলার সঙ্গে কাজ করা যায়।
এর পর চতুর্থ দিন গাড়িটি প্যারিস গিয়ে পৌঁছল। সেখানেও রাস্তার দুদিক ভিড়ে ঠাসা। লুই আর মারি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখতে পেল কাতারে কাতারে লোক দাঁড়িয়ে আছে দু পাশে। পুরুষদের মাথা থেকে একটি টুপিও সরল না, মেয়েরা একটুও হাঁটু ভাঁজ করলো না, শুধু নিঃশব্দ হয়ে মানুষ গুলি তাদের গাড়ির দিকে কৌতূহল ও ঘৃণা নিয়ে চেয়ে রইল।

সেই গম্ভীর জনারণ্যের মধ্যে দিয়ে শঙ্কিত চিত্তে লুই আর মারি আবার তুইলেরি প্রাসাদে এসে উপস্থিত হল। প্রাসাদের বিশাল তোরণ প্রহরীরা খুলে দিল, হাজার হাজার মানুষের অপ্রিয় দৃষ্টির মধ্যে দিয়ে তারা আবার সেই গরাদের প্রাচীরের মধ্যে তাদের ব্যরলিন গাড়ি প্রবেশ করলো, আর পেছনে লোহার কপাট ধাতব শব্দে বন্ধ হয়ে গেল।
এই ঘটনার পর লুই ও মারি কে প্রথমে তুইলেরি প্রাসাদে আরও কড়া প্রহরায় রাখা হল। তার কিছুদিন পরে, জুলাই ১৭৯১-তে শঁ দ্য মার্স -এর একটি প্রতিবাদ সভায় লুই-কে সাংবিধানিক রাজার পদবি দেওয়ার বিরুদ্ধে হস্তাক্ষর নেওয়া হচ্ছিল। লাফায়েতের নেতৃত্বে সেই প্রতিবাদ দমনের চেষ্টায় প্রায় ৫০ জন প্রাণ হারায় ও তারও বেশি আহত হয়। এর পর তুইলেরি প্রাসাদের ওপর জনতার আক্রমণ হওয়ায় রাষ্ট্রীয় রক্ষী বাহিনী ও জনগণের অনেকে নিহত হওয়াতে, রাজপরিবার কে টেম্পেল কারাগারে বন্দি করা হয়। ২১-শে সেপ্টেম্বর ১৭৯২ -তে ফ্রান্সে গণতন্ত্র ঘোষিত হবার পর ডিসেম্বর মাসে লুই দেশদ্রোহের অভিযোগে দোষী প্রমাণিত হওয়াতে তাকে প্রাণদণ্ড দেওয়া হয়। শেষে ২১শে জানুয়ারি ১৭৯৩-তে লুই প্লাস দ্য লা কঙ্কর্ড-এ গিলোটিন-এ মৃত্যু বরণ করে, এবং সেই বছরেরই অক্টোবার মাসে মারি আঁতোয়ানেত-কেও গিলোটিন দ্বারা মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তাদের ছেলে লুই চার্ল ১৭৯৫ সালে টেম্পেল কারাগারে যক্ষ্মা ও আনুষঙ্গিক রোগে মারা যায়। লুই ও মারি আঁতোয়ানেতের পুত্রী মারি থেরেস তাদের একমাত্র সন্তান যে বিপ্লবের কবল থেকে রক্ষা পায়, ও প্রাপ্ত বয়স্ক হয়ে “ডাচেস” উপধি পায়, পরে “ডফাঁ” অর্থাৎ যুবরাজের স্ত্রী হয়, এবং ১৮৫১ সালে ৭২ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়। তুইলেরি প্রাসাদকে প্যারিস কম্যুন ১৮৭১ খখ্রিষ্টাব্দে আগুনে পুড়িয়ে দেয় ও ১৮৮৩ সালে এটিকে পুরপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হয়।

