শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

দুটি অনুগল্প : নূরজাহান ও জন্মদিনের জলছবি

নূরজাহান

সে বাউলী হোক বা মেহুলী, মানবজনম হলো তার। মানবসমাজে কোলকাঁখ পেয়ে আস্তে আস্তে মাথা চাড়া দিয়ে জল মাটি আবহাওয়া ছুঁয়ে দেখতে শিখলো, আর, সেই মানুষটার কোনো পাপ থাকবে না? আশ্চর্য্য তো! সে তুমি দুই হাত তুলে নেচে নেচে প্রেমের গান গেয়ে গালচিবুক ভাসাও, বা আকাশে উড়ে যেতে যেতে খরার দেশ, কষ্টের দেশ এক ঝাঁক বৃষ্টিধারায় ধুইয়ে দিয়ে যাও। পাপ তোমার থাকবেই। ওই দিনের পর দিন বেঁচে থাকার অনন্ত পাপ।

নুরজাহান জ্ঞান হওয়া থেকেই খুব আবেগী, মনের সুরধারায় ডুবে থাকা মানুষ। গান তার স্নায়ুতে তুলে দিয়েই পাঠানো হয়েছিলো, আর তাতে জার দেওয়া হয়েছিলো আনজনে’র ব্যথা বোঝার বোধ। এই দুই দিনগত সেবায় নিয়োজিত প্রাণ ছিলো তার। এদের জন্যে সে পারতো না এমন কাজ ছিলো না কিছু। কিন্তু এ পারা’য় কোনো ঘোরপ্যাঁচের চাহিদা ছিলো না তার। যে কেউ দুঃখে ভেঙে প’ড়ে তার বুক চাইলে, দিয়ে দিতে উদগ্রীব হ’য়ে পড়তো সে। বিলিয়ে দেওয়ার মামলায় সে যেন তার প্রেরকের সেবাদাসী হয়ে থাকতো। তাও দিনের পর দিন তার পাপের বোঝা যেন বেড়েই উঠছিলো সমাজে। সকালে কেউ কোলে মাথা রেখে বা সারা শরীর দিয়ে জড়িয়ে তার আদরে ডুব দিয়ে হাজারো মনখারাপ মিটিয়ে গেলো; আবার বিকেলের থম মারা মরা হাওয়া যখন সারা চত্বরের আকাশে লাখো মনখারাপ উদলে দিচ্ছে, নূর দুই হাত তুলে প্রকৃতির সাথে মনপ্রকৃতির মিলনের গান গাইছে তখন, গাইতে গাইতে আনন্দে ধুলো মাখছে গায়ে। ই কি রে, তবু একে এক-পা ঢুকতে দিবি না ঘরে? সমাজের কপাল যেন সারাক্ষণ কুঁচকেই থাকে,– সকাল বিকেলের এই এতো পাপ, আরো-একটা আরো-একটা পাপ ক’রে ক’রে, দিনগত পাপ করেই যেতে হয়। পূণ্য পাওয়ার বোধ দিয়ে তো তাকে পাঠানো হয় নি।

যে পাঠিয়েছিলো, তারও বোধহয় এতো সেবা নেওয়ার সহনক্ষমতা ছিলো না। একদিন টুপ ক’রে রাত পোহালে, সারা সমাজ ভিড় ক’রে দেখতে এলো পেছন থেকে কে ছুরি মেরে ফেলে রেখে গেছে নূরকে। শেষ আলোটুকু কাকে ছুঁইয়ে গেলো সে দেখার পূণ্য হয় নি কারো। এও বোঝা গেলো না জগৎ আলোকিত হলো, নাকি, জগতের সব আলো সঙ্গে ক’রে ফিরে গেলো নূরজাহান।

জন্মদিনের জলছবি

মুনাই এর সাথে জাঙ্গলবুক-এর সেই মোগলি’র একটা বেশ গভীর বন্ধুত্ব আছে। মানে ওই আপন মনে কল্পনায় বেড়াতে যাওয়া হয় মাঝে মাঝে। মুনাই নানারকম ছবিও আঁকে জঙ্গলের মধ্যে মোগলি, আরও কার কার সব নাম ব’লে ব’লে… শের খান, বালু, রাকসা, কালু, কালা, জাকালা, মাশা, দর্জি, গজিনী, রিকি-টিকি-টাভি কতো সে নাম তাদের, সব মনেও থাকে না আমার। মাঝে মাঝে পাতা উল্টে দেখি। বেশ ভালো আঁকে কিন্তু মেয়েটা। এ’সব দেখতে দেখতে একদিন মাথায় এলো, মুনাই এর দশ বছরের জন্মদিনে ওকে একটা চমক দেওয়া যেতে পারে। আমার এক শিল্পী বন্ধু শঙ্করের ছিলো ড্রাই লেটার ট্রান্সফার, জলছবি, স্টিকার এসব ছাপার একটা ছোট্টো ওয়র্কশপ। একদিন মুনাই এর মামাবাড়ি যাওয়ার সুযোগ নিয়ে ওর একটা ড্রইং খাতা দিয়ে এলাম বন্ধুকে। সে দুদিন রাখলো তার কাছে খাতাটা, জঙ্গলের চরিত্রগুলো সব এঁকে নিলো, এঁকে নিলো জঙ্গলটা কেমন কল্পনা করে মুনাই। সে’সব থেকে একটা পুরো ছবি আঁকা হয়ে ছাপিয়ে নিয়ে তৈরী হবে জন্মদিনের জলছবি।

তারপর মাসখানেক পরে একটা মেঘলা ছুটির দিনে মুনাই এর জন্মদিন এলো। সেদিন সকালে ও স্নানটান সেরে, একটু সাজুগুজু করে, বাড়ির মানুষদের আশীর্বাদ আর আদর নিয়ে, পায়েসটায়েস খেয়ে একটু থিতু হয়ে বসতেই আমি বড়ো জামবাটির এক বাটি জল নিয়ে বসলাম ওর পাশে,

— একটা সারপ্রাইজ আছে মুনাই।

চোখ নাচিয়ে দুষ্টু হেসে জিজ্ঞেস করলো,

— কি? এক বাটি জল মাথায় ঢেলে বার্থ’ডে বাম্প দেবে আমায়?

— উঁহু।

পকেটে হাত ঢোকাচ্ছি দেখে বললো,

— তা’হলে? ছোটো ছোটো রঙিন মাছ এনেছো নাকি?

— উঁহু।

পকেট থেকে এবার শঙ্করের তৈরী জলছবিটা বার ক’রে ভাসিয়ে দিলাম বাটির জলে। ছবিটা দেখে সে মেয়ে তো আহলাদে চৌষট্টি’খানা। জিজ্ঞেস করলো,

— জলে কেন জলে কেন? কি হবে এটা দিয়ে? বললাম,

— একটু জলে থাক, দেখাচ্ছি।

ছবিটা একটু ভেজা ভেজা হয়ে এলে, মুনাইকে বললাম,

— বাঁ’হাতটা এগিয়ে দে তো একটু।

ছোট্টো মুঠো ক’রে এগিয়ে ধরলো হাত,

— এবার?

— এবার মুঠোটা উল্টে ধর।

— এই নাও।

হাতের কনুই হালকা ক’রে ধ’রে কবজি থেকে কনুই এর মাঝখানের জায়গাটায় সেই জলে ভেজা ছবি দুই আঙুলে সাবধানে তুলে জঙ্গলের বন্ধুদের জানানো ‘হ্যাপি বি’ডে অন ইউর টেন্থ’ লেখা সেই ছবি বসিয়ে দিয়ে বললাম,

— একটু থাক এখন?

— থাক।

তারপর একটু শুকিয়ে গেলে ওপরের কাগজটায় হালকা আঙুল বুলিয়ে তুলে নিলাম। বললাম,

— একটু পাখার তলায় বোস, জলছবি পুরো শুকিয়ে গেলে উঠিস। ঘাড় নেড়ে লক্ষ্মী মেয়ের মতো ব’সে বললো,

— একে জলছবি বলে বুঝি, ট্যাটু’র মতো, না?

হেসে বললাম,

— হ্যাঁ, কি দরকার ওসব টাট্টু ঠাট্টু ছুটিয়ে বেড়ানোর? এই না’হয় থাক জন্মদিনের জলছাপ? পছন্দ হয়েছে কথাটা, বললো,

— আমার এই ভালো। শুকিয়েছে?

— হ্যাঁ, এবার যা।

খুশীর উত্তেজনায় ঘুরে ঘুরে সারা বাড়ি দেখাতে গেলো বন্ধুদের পাঠানো গিফট। তারপর দুপুরে ফিশফ্রাই, মুরগীর ঠ্যাঙ আর জলপাইয়ের চাটনী খেয়ে তার ফূর্তি আর ধরে না। খেয়ে এসে শুলো আমার পাশে, আজ আমায় ছাড়বে না, কতরকম রঙবেরঙের গপ্পো বলছে জঙ্গলমহলের। দু একটা প্রশ্ন মাঝে মাঝে জুড়ে দিচ্ছি, তখন গপ্পো তিনগুণ চৌগুণ হয়ে ফিরে আসছে… হঠাৎ বেশ ঠান্ডা ঠান্ডা হাওয়া দিলো, দুজনেই জানলা দিয়ে দেখলাম ঘন হয়ে এসেছে মেঘ। তিড়িং ক’রে লাফিয়ে উঠলো মুনাই, হাত ধ’রে জোরসে টান লাগিয়ে বললো,

— বৃষ্টি হবে, চলো চলো বাগানে যাই।

— কি বলছিস রে, কতদিন ঘাস, আগাছা, গাছের ডাল ছাঁটা হয় নি, বাগান যে জঙ্গল হয়ে আছে।

— ওইজন্যই তো।

— আরে সাপ থাকলে?

— ও কিছু করবে না আমায়।

ছুট ছুট… আমিও ছুটলাম পেছনে।

— শোন, বৃষ্টিতে ভিজলে শরীর খারাপ হবে।

— ভালো তো, শরীর খারাপ হলে ছুটি পাবো দু’দিন।

— শোন, ভিজলে জলছবি খারাপ হয়ে যাবে, রঙ ধুয়ে যাবে। তোর বন্ধুরা হারিয়ে যাবে সব।

— কে বলেছে বলো তো তোমায় ওসব কথা?

— কেউ না। এমনিই বলছি তোকে।

— তুমি জানো না। আমি জঙ্গলের মধ্যে ঢুকলেই ওরা সব ছবি থেকে লাফিয়ে নেমে আসবে আমার কাছে, সবাই মিলে ভিজে ভিজে গপ্পো ক’রে, এই গাছে ওই ঝোপে লুকোচুরি খেলে, নেচে, আছাড় খেয়ে, মাটিতে গড়াগড়ি খেয়ে বৃষ্টির জলছবি হয়ে যাবো আমরা।

বলে কি ওইটুকু মেয়ে, বৃষ্টির জলছবি! আমাকে এক্কেবারে চুপ থামিয়ে বাগানে নেমে গেলো মুনাই।

একটু দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে আমার চমকে তখন অন্য ধমক লেগেছে, ভাবছি, এই এক জলছবির ঠেলায় সর্দিজ্বর বাঁধিয়ে বসলে ওর মা কি ছাড়বে আমায়?

যাগগে যাক, যা হবার হবে। জন্মদিনে একটু প্রাণখুলে নিজের মতো ক’রে আনন্দ করুক তো মেয়েটা। হয়তো এর স্মৃতি সারাজীবন জলছবি’র মতো ভেসে থাকবে। মনে পড়লেই খুশীতে ভরে উঠবে মুনাই।

[লেখকের অন্য রচনা]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x