
অনেক দিন ধরেই মেলায় মেলায় কথা বলা পুতুল নিয়ে খেলা দেখায় স্বপন l ওর প্রথমে একটাই পুতুল ছিল l নিজেই তৈরী করেছিল, নাম দিয়েছিল, আপন l আপনজন l নিজের নামের সাথে মিলিয়ে l তা এই আপন যখন বেশ বড় হলো, তখন স্বপনের মনে হলো, বাহ্ রে, আমি তো বেশ বে থা করলাম, সংসারও হলো আর আপন যে সেই কবে থেকে আমাকে এত সাহায্য করে, খেলা দেখায়, ওর জন্যেই না আজ আমার সংসার চলে; তা ওর জন্যে কেন একজন পুতুল জুটি আনি না l যেই ভাবা সেই কাজ l তৈরি হলো আপনের দোসর, আন্নাকালি l নীলিমার শাড়ি কেটে পরানো হলো তাকে l ঝকঝকে জরির শাড়ি আর ব্রকেডের বেলাবুজ l ইয়া লম্বা লাইলনের চুলে বেনি, পরান্ধি l নাকে নথ, কানে মাকড়ি, হাত ভর্তি চুড়ি l যেন ডালিমের লালি দিয়ে আঁকা হলো গাল, চাঁদের ভ্রু ভেঙ্গে পরানো হলো কাঁচ পোকা টিপ তার কপালে আর আলতায় রাঙানো হলো নরম সরম পা দুটি l নীলিমাও খুব উৎসাহিত, এটা সেটা এনে দেয় হাতে হাতে আর স্বপন সাত দিন ধরে ঘরে বসে মনের মতন পিতিমেটি গড়ে l আপন দেখে বসে বসে l কেমন সুন্দর মেয়ে l খুব পছন্দ হয় তার l কি রে, পছন্দ ? জিজ্ঞাসা করে স্বপন l ল্যাগব্যাগে ঘাড় নাড়ে আপনজন l বেশ হাসি হাসি হয়ে থাকে মুখখানি তার l হ্যাঁ হ্যাঁ খুব পছন্দ, মনে মনে তার হয়ে বলে দেয় স্বপন l
প্রথম প্রথম সে ভাবে বুঝি তাকে ফেলে দিয়ে এই পুতুল নিয়ে খেলা দেখাবে স্বপন l মেয়েপুতুল দেখে আশ্বস্ত হয় সে l আর স্বপন তো একচোখো নয়, প্রাণ দিয়ে ভালবাসে আপন-কে l আপন আর সে, দু’জনে হরিহর আত্মা l মাঝে মাঝে যখন মাঝরাতে মদের নেশায় মারধর করে ফেলে নীলিমাকে আর ভোর রাতে ঘুমন্ত নীলিমার মুখটা দেখে ভারী কষ্ট হয়, তখন আপনও বুঝি তার সাথে সাথে চোখের জল ফেলে l ভালবাসা এমনই, কক্ষনো স্বপনকে বলেনা – ‘তুমি ভুল করেছ l’

পুতুল খেলা
সে যাক, নতুন পুতুল নিয়ে খেলা দেখাতে বেরিয়েছে স্বপন ; সাথে নীলিমাও আছে আজ l ডুগ ডুগ ডুগ ডুগ বাজছে ডুগডুগি আর সব্বাই এসে জড়ো হয়েছে পুতুল খেলা দেখবার জন্য l শুধু পুতুল নাচ নয় l এ আবার কথা-বলা পুতুল l ‘আমেরিকা পারিস কলকাতা ঘোরা পুতুল এরা’ – হাঁক পাড়ে স্বপন আর ছেলে বুড়ির দল কাঁড়ি হয়ে এসে জোটে l দারুন রগড় করে স্বপন, হেসে গড়িয়ে পড়ে নীলিমা, নথ ঝিকিয়ে ওঠে, পড়ন্ত সুয্যির আলোয়, আর খেলা চলতে থাকে l খেলার শেষে পয়সা পড়ে চাদরের উপর আর কুড়োতে থাকে কর্তা গিন্নি মিলে l খেলা শেষ l তাই হাত পা ছড়িয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে আপনজন আর আন্নাকালি l জীবননাট্যের রঙ্গকর্মী এরা, সবাই – কেউ পুতুল আর কেউ পুতুল-রূপী মানুষ l

খেলাশেষে
সেদিন রাতে আবার প্রচুর মদ গিলেছে স্বপনদেব আর তখনি মনে পড়েছে কোন্ ছোঁড়া মেলাতে নীলিমাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছিল l ব্যাস আর যায় কোথা l হাতের সুখ l চেলা কাঠ নীলিমার পিঠে পড়ে l সেই রাতেও একই কহানী; ভোর রাতের কান্না, আপনের দুঃখু; তবে আন্নাকালির মুখ গম্ভীর, থমথমে, মনে মনে কী ভাবছে, বোঝা দায় l
পরের দিন মেলাতে নীলিমা যেতে চাইল না l আগের দিনের গায়ের আর মনের ব্যথা ভোলা এত সহজ না l
স্বপন একাই গেছে দুই পুতুল সঙ্গে করে l খেলা চলছে l কথা বলছে, মেলাতে, দুই পুতুলে l কত্তা গিন্নির ভালবাসার ডায়লগ l কিন্তু এ কি! আন্নাকালির পাঠ বলার সময় কে যেন স্বপনের মুখ আটকে দিচ্ছে l এ কি বলছে স্বপন, মানে আন্নার হয়ে স্বপন; কি সব যা তা!
আপন – ‘আন্নাকালি, তুই আজ চুল বান্ধস নাই ক্যান? চুল বাঁধলে তরে কত্ত সোন্দর দেহন যায় …’
আন্নাকালি – ‘কি কইরা বান্ধুম, কাল যে ছিঁড়া ফেলায়লি তুই অত্তগুলা চুল !’
আপন – ‘কখন ???’
অন্নাকালি – ‘অ এহন তর মনে নাই দেহি l মদ গিল্যা মারিস নাই তুই আমারে l’
আপন – ‘ছিঃ আন্না, এ ক্যামন ধারা কথা তর?’
আন্নাকালি – ‘হাড়হাবাতে বুড়া মিনসে, বেশি খাপ খুললে দেখবি কি হয় ?’
আর হাততালি ! সবাই দারুন উপভোগ করে কত্তা গিন্নির এই বাক বিতন্ডা l এমনিই হয়ে থাকে সংসারে, কিন্তু স্বপন তো ওদের দুজনের হয়েই কথা বলে দেয় l আজ যেন কেমন উল্টাপাল্টা l সব কিছু বেতাল ঠেকছে যেন l ভয় পায় স্বপন ; বেশিক্ষণ খেলা না দেখিয়ে বাড়ির পথে পা বাড়ায় স্বপন l আজ যায় না ভাটিতে l কোন এক অদৃশ্য চালিকা শক্তি তাকে ঘরের পানে টেনে নিয়ে যায় l
ও লক্ষ্য করেছে আন্নাকালি খুব নীলিমার নেওটা l রাতে অনেকদিন যখন স্বপন মদ না খেয়ে, মারধর না করে ঘুমায় তখন নীলিমা ওদের ঘরের দাওয়ায় বসে আন্নাকালির চুল বেঁধে দেয়, নতুন রং করে দেয় ঠোঁটে আর কেমন সুন্দর কাজল টেনে দেয় চোখে l চাঁদের আলোতে ভেসে যায় ওদের দাওয়াটুকু আর নীলিমা নিচু গলায় ঘুম পাড়ানি গান গায় l হয়ত ওর চোখ দিয়ে জল ঝরে আর আন্নাকালি সেই দুঃখের স্বাদ পায় l

দৈবী একাত্মতা
স্বপন বুঝতে পারে, কখন কে জানে নীলিমা আর আন্নাকালি মিলেমিশে এক হয়ে গেছে l
ঘুম আসে না কেন … এই দৈবীশক্তিকে সে কি তাহলে ভয় পেতে শুরু করল!!

