শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

সত্তরের দশকের প্রথম ভাগ। কলকাতার গোয়েঙ্কা কলেজ অফ কমার্সের নবীন বরণ উৎসবের প্রভাতী আসর বসেছে মহাজাতি সদন প্রেক্ষাগৃহে। অধিকাংশ দর্শকই তরুণ, অনেকেই সদ্য বিদ্যালয়ের সীমানা পেরোনো নবীন, উদ্দীপনায় ভরপুর। প্রথম বর্ষের ছাত্র হিসেবে উপস্থিত আমি। আমার উৎসাহের কারণ জীবনে প্রথম বার সামনে বসে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গান শুনব। অনুষ্ঠানের শেষ ও প্রধান শিল্পী তিনিই। তখনও তাঁর সঙ্গীত জীবনের মধ্যাহ্নসূর্য পশ্চিম দিগন্তে হেলে পড়েনি। বিপুল জনপ্রিয়তা অব্যাহত।

মহাজাতি সদন

প্রথম পর্বে নবীন শিল্পীদের রমরমা। হল জুড়ে তাঁদের হিন্দী বাংলা নানা ঘরানার চটুল গানের তালে তালে শ্রোতাদের বৃহদাংশের তুমুল দাপাদাপি, উদ্দাম নৃত্য ও হট্টমেলা। দীর্ঘ সময় ধরে চলল সেই আবহ। তারই মধ্যে আমরা কতিপয় সংখ্যালঘু শেষ পর্বটির জন্যে অপেক্ষমাণ।

দ্বিতীয় পর্বে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গান। আমাদের মতো হেমন্ত বাবুর গানের একনিষ্ঠ কিছু ভক্ত শ্রোতা, যারা প্রথম পর্বের হৈ-হুল্লোড়ের নীরব দর্শকমাত্র ছিলাম, তারা কিছুটা শঙ্কা ও অনেকটা উদ্দীপনা নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম। আমাদের শঙ্কার কারণ প্রেক্ষাগৃহের অরাজক পরিস্থিতি। যত্রতত্র ইতস্তত গালগল্পে মত্ত নবীন ছাত্রদল, উচ্চগ্রাম ও উচ্চকিত কণ্ঠস্বর, কেউ কেউ অতি উৎসাহে দর্শকাসনের ওপরেও দাঁড়িয়ে। এরকম একটা পরিবেশে প্রশ্ন একাধিক। এই পরিবেশ দেখে কী প্রতিক্রিয়া হতে পারে তাঁর? গাইবেন তো তিনি শেষ পর্যন্ত? পারবেন তো গাইতে?

অতঃপর মঞ্চে এসে তিনি দাঁড়ালেন। হাতা গোটানো সাদা শার্ট ও ধুতিতে দীর্ঘকায় সম্ভ্রম জাগানো ব্যক্তিত্ব! নীরবে জরিপ করলেন হলের পরিবেশ ও দর্শকদের অবস্থান। তারপর মন্দ্র স্বরে বললেন, এসেছিলাম পছন্দের কিছু গান শোনাব বলে। কিন্তু পরিবেশ খুব সহায়ক বলে মনে হচ্ছে না। কোনো গোলযোগ বা অনাকাঙ্খিত আওয়াজ হলে গান না গেয়েই হয়তো ফিরে যেতে হবে।

হেমন্ত মুখোপাধ্যায়

সচকিত বিস্ময়ে লক্ষ্য করলাম, মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল পরিবেশ। কেমন যেন শান্ত সুবোধ হয়ে গেল দুর্দমনীয় ছাত্রের দল। গুটিগুটি পায়ে আসন গ্রহণ করল তারা। প্রায় শব্দহীন হল প্রেক্ষাগৃহ। গান শুরু করলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। অসামান্য জলদগম্ভীর সুরেলা কণ্ঠস্বরে একটি রবীন্দ্রনাথের গান দিয়ে শুরু করে চলে গেলেন তাঁর জনপ্রিয় সব গানে, একে একে ‘রানার’, গাঁয়ের বধূ’, ‘দুরন্ত ঘুর্ণীর এই লেগেছে পাক’ হয়ে হিন্দী, বাংলা ছায়াছবির গান, বেসিক ডিস্কের গান একের পর এক আমাদের ভাসিয়ে নিয়ে যেতে লাগল। কিছুক্ষণ আগের সেই দাপুটে ছেলেরা অনেকেই তাদের পছন্দের গানের চিরকূট জমা দিতে লাগল মঞ্চে উপবিষ্ট গায়কের কাছে। তিনিও আবদার রাখতে লাগলেন। শেষ গান ‘দিনের শেষে ঘুমের দেশে ঘোমটা পরা ওই ছায়া’… অর্থাৎ, রবীন্দ্রনাথের গানে শুরু ও সমাপ্তি। নিখুঁতভাবে যেন পরিকল্পিত পরিবেশনা। প্রায় তেইশ/চব্বিশটি গানে আমাদের আবিষ্ট করে হেমন্ত বাবু যখন থামলেন তখন বেলা দ্বিপ্রহর, আমরা অনেকেই একটা ঘোরের মধ্যে। সুরের মায়াজালে ঘেরা নানা রঙের গানের মাধুরীতে তো বটেই, অভিজাত ব্যক্তিত্বের দীপ্তি ও গাম্ভীর্য দিয়ে এক নিপাট বাঙালি গায়কের যে মঞ্চশাসন সেদিন দেখেছিলাম, তা তুলনাহীন।

এরপর মাঝে মাঝেই তাঁর অনুষ্ঠানে হাজির হই। তবে সত্তরের দশকের শেষভাগের একটি ঘটনা বলি । আমি তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। রবীন্দ্রসদন প্রেক্ষাগৃহে তাঁর আর একটি আসরে গান শুনতে হাজির হয়েছি। অনুষ্ঠানশেষে তাঁর সঙ্গে একটা ছবি তোলার ও স্বাক্ষর সংগ্রহের ঝোঁক চাপল মাথায়। কোনোক্রমে ওখানে উপস্থিত এক পরিচিত চিত্রগ্রাহককে ছবি তুলতে রাজি করিয়ে মঞ্চে গিয়ে দাঁড়ালাম আমার প্রিয় গায়কের মুখোমুখি। উনি তখন সবেমাত্র গান শেষ করে উঠে উইংসের দিকে পা বাড়িয়েছেন। অপরিচয়ের জড়তা কাটিয়ে সপ্রতিভতা নিয়েই আবদার পেশ করলাম। মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করলেন, “ছবি যে তুলবে, ফটোগ্রাফার কই তোমার?” আমি দেখিয়ে দিতেই হেসে বললেন, “ও, সব ব্যবস্থা করে এসেছ!” এরপর দর্শকাসনের দিকে মুখ করে আমার পাশে এসে দাঁড়িয়ে তাঁর বাঁ হাতটি আমার ডান কাঁধে রেখে চিত্রগ্রাহককে বললেন, “নাও, ভাল করে আমাদের একটা ছবি তুলে দাও হে!”… সেদিনের এই অপরিচিত তরুণের মনে চিরকালীন একটা দাগ রেখে গেল বাংলা গানের তদানীন্তন মহীরুহের এই দ্বিধাহীন সারল্য ও সংবেদনশীলতা! বলা বাহুল্য, সেই ছবিও সম্পদ হয়ে রয়ে গেল আমার হেফাজতে।

হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে

এই মানুষটিকেই ভিন্ন এক চেহারায় দেখেছিলাম আশির দশকের গোড়ায়। তখনও পুরোদমে অনুষ্ঠান করে চলেছেন তিনি, যদিও বয়সের ভার কণ্ঠকে কিছুটা নিষ্প্রভ করেছে। তবু তখনও তিনি বাংলার সঙ্গীত জগতের জীবন্ত বিগ্রহ ! বরাহনগর অঞ্চলের একটি প্রেক্ষাগৃহে প্রভাতী অনুষ্ঠানে এসেছেন তিনি। গানে গানে আসর জমিয়ে দিলেন। অনুষ্ঠানশেষে সাজঘরে শিল্পীর আপ্যায়নের ব্যবস্থা করেছেন উদ্যোক্তারা পর্যাপ্ত মিষ্টান্ন সহযোগে। হেমন্ত বাবুর খাওয়ার ধরণটি দেখে তাঁকে যথেষ্ট ক্ষুধার্ত মনে হল। তাঁর খাওয়ার শেষ পর্বে সেখানে উপস্থিত হলেন স্থানীয় এক পরিচিত কণ্ঠশিল্পী।

হেসে বললেন, “এ কী হেমন্ত দা’, আপনি মিষ্টি খাচ্ছেন! বৌদি জানলে কিন্তু খুব রাগারাগি করবেন।”

রাশভারি মানুষটি এই আকস্মিক আক্রমণে বিপর্যস্তপ্রায়। শিশুসুলভ করুণ মিনতি করে বললেন, “বাড়িতে বলিসনি ভাই। বড্ড খিদে পেয়েছিল। খেয়ে ফেললাম।”…ডায়াবিটিসে আক্রান্ত হেমন্ত বাবুর মিষ্টান্নের প্রতি অমোঘ আকর্ষণের কারণটি জানা ছিল না আয়োজক মানুষজনের। “বলিসনি ভাই” করুণ মিনতিটি ভারি আমোদিত করেছিল উপস্থিতজনেদের। মুহূর্তের জন্যে যেন শিশু হয়ে গিয়েছিলেন মানুষটা।

এরপরের যোগাযোগ প্রায় দশ বছর পরে। ১৯৮৮ সাল। তিনি তখন গানের আসর থেকে প্রায় বিদায় নিয়েছেন অসুস্থতার কারণে। কণ্ঠও আর সেভাবে সহযোগিতা করছে না। ওয়েবেল অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন প্রথম বার্ষিকী অনুষ্ঠানের উদ্বোধনে তাঁর গান গাওয়ার আর্জি নিয়ে পৌঁছলাম দক্ষিণ কলকাতায় রবীন্দ্র সরোবরের কাছে মেনকা সিনেমার বিপরীতে তাঁর গৃহে। শুনেই হাত দুটো উল্টে বললেন, “যে বাঁশি ভেঙে গেছে তারে কেন গাইতে বল”! একটু থেমে মাথাটা নিচু করে বললেন, “আমি আর গান গাইছি না, শরীরটা বেশ খারাপ। আর সাহায্য করছে না। তোমরা অন্য কাউকে নিয়ে নাও।”

আমি বললাম, “আমাদের প্রথম বছরের অনুষ্ঠান। বড় আশা নিয়ে এসেছি। তেমন অসুবিধে হলে আপনি একটি মাত্র গান, অর্থাৎ উদ্বোধনী সঙ্গীতটি গেয়ে চলে আসবেন। তারপর তো ফিরোজা বেগম ও মমতাশঙ্করের অনুষ্ঠান থাকবে। আমাদের অসুবিধে হবে না। কিন্তু আপনাকে নিয়েই আমরা শুরু করতে চাই।”

উনি হেসে বললেন, “একটা গান? তাই কি হয় নাকি?”

আমি মরিয়া হয়ে বললাম,”তাতেই হবে। উদ্বোধনী গানে তো আমরা হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে পাব! এটাই হবে আমাদের পরম প্রাপ্তি।”

উনি তখনও আমাদের নিরস্ত করবার জন্যে হেসে বললেন, “কিন্তু আমার তো একটা দক্ষিণা আছে। একখানা গান গাইলে তার কি হবে?”

কথাটা লুফে নিয়ে বললাম, “একটা গান হোক বা কয়েকটা, আপনাকে আমরা পুরো সম্মানদক্ষিণা দিয়েই নিয়ে যাব।”

অবশেষে আমাদের নাছোড়বান্দা ভাবের কাছে ভেঙে পড়ল তাঁর প্রতিরোধ। পাশে দাঁড়িয়েছিলেন ওঁর স্ত্রী বেলা মুখোপাধ্যায়। তাঁর দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে কিছুটা যেন অসহায়ভাবেই বললেন, “এরা আমাকে না নিয়ে যাবে না!”

জিজ্ঞেস করলাম, “তাহলে কটা নাগাদ আপনাকে নিতে আসব আমরা? আমাদের অনুষ্ঠান শুরু ঠিক সন্ধ্যা ছ’টায়।”

বললেন, “তোমাদের আসতে হবেনা। হলে আমি নিজেই পৌঁছে যাব ঠিক সময়ে।”

কথা রেখেছিলেন নিখুঁত সময়ানুবর্তিতায়। ঠিক ৫টা বেজে ৩০ মিনিটে তাঁর হারমোনিয়াম বাহক ও দুই বাদ্যযন্ত্রীকে নিয়ে শ্লথ গতিতে তিনি হলে ঢুকলেন। সামনের সারিতে বিশিষ্ট অতিথিদের পাশে সামান্য একটু সময় বসে ধীরে ধীরে মঞ্চে উঠে এলেন তিনি।

প্রখ্যাত শিল্পীদের নিয়ে বেশ ভারি অনুষ্ঠানসূচী। সঙ্গীতে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও ফিরোজা বেগম এবং নৃত্যনাট্যে মমতা শঙ্কর । পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহ। ঘড়ি ধরে সন্ধ্যা ঠিক ছটায় পর্দা উঠল। উদ্বোধন করলেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। পনেরো মিনিটের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের শেষে বসলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। ওঁর স্বাস্থ্যের কথা ভেবে মঞ্চের ব্যবস্থাপক ও সঞ্চালক হিসেবে ওঁর জন্যে দুটি থেকে তিনটি মাত্র গানের সময় রেখেছিলাম। শুরুতেই তা জানিয়েছিলামও ওঁকে। শুনে মলিন একটা স্মিত হাসি হেসেছিলেন।

শুরু করলেন রবি ঠাকুরের গান ‘এ মণিহার আমায় নাহি সাজে’ দিয়ে। একটু বেসামাল লাগল তাঁকে। সুরে ও স্বরে যেন ক্লান্তির ছাপ, দমেও যেন ঘাটতি। তবু প্রথম গান শেষ করেই ধরলেন, ‘কেন তোমরা আমায় ডাকো’ । দ্বিতীয় গানে সুরে ফিরলেন তিনি। অনেকটা স্ববশেও। শ্রোতারাও নিমগ্ন। উইংসের পাশে দাঁড়িয়ে ভাবছি, আর কি গাইবেন তিনি? না, তৃতীয় গানও ধরলেন… ‘আমার গানের স্বরলিপি লেখা রবে’।… তাহলে এটাই ওঁর আজকের শেষ গান! কিন্তু থামলেন কই?… ক্রমে ক্রমে যেন হারানো সুরের গমক ফিরছে কণ্ঠে । আর কি করেই বা থামবেন তিনি? হলোই বা শরীর অশক্ত, অসহায়! কিন্তু তিনই যে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়! কবে, কোথায়ই বা দু’তিনটে গান গেয়ে উঠে গেছেন তিনি! তৃতীয় গান শেষ হতেই ধরে নিলেন, ‘অলির কথা শুনে বকুল হাসে’। সুতরাং এভাবেই এল চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম গান… আটখানি গান গেয়ে প্রায় আধ ঘন্টা পার করে তিনি যখন উঠলেন, আশাতীত প্রাপ্তি আমাদের, যদিও আমাদের সময়ের হিসেব কিছুটা ওলট পালট! শ্রোতারা অবশ্য ক্ষণকালের জন্যে হারানো প্রাপ্তি ফিরে পাবার সাক্ষী থাকার আনন্দে তৃপ্ত।

হেমন্তের আলোয়

উইংসের পাশে মুগ্ধ কিন্তু চিন্তিত হয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম, প্রথম অনুষ্ঠানটিতে হিসেবের বাড়তি সময় চলে গেল, বাকি অনুষ্ঠানের সময় সারণী সামলাব কি করে! কড়া অনুশাসনের হলের যে পর্দা নেমে আসবে সুনির্দিষ্ট সময়েই।

এমন সময় মুখোমুখি হলাম হেমন্ত বাবুর। হেসে বললেন, “তোমাদের কি একটু ডুবিয়ে দিয়ে যাচ্ছি?” তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় জবাব দিলাম, “আপনার কাছ থেকে আজ আমাদের যা প্রাপ্তি, তা আশাতীত ছিল। এভাবে যে ডুবেও আনন্দ!”

অসুস্থ শরীরেও নিজের পেশাদারিত্ব ও সঙ্গীতের প্রতি এই প্রবাদপ্রতিম শিল্পীর সেদিন যে দায়বদ্ধতা দেখেছিলাম, তা অবিস্মরণীয়।

এই সন্ধ্যার কিঞ্চিদধিক একটি বছর পরেই চিরবিদায় নিয়েছিলেন সুভদ্র অভিজাত মননের বাঙালির চিরন্তন প্রতিনিধি, চিরকালীন বাংলা আধুনিক গানের অবিস্মরণীয় যাদুকর হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। আগামীকাল ১৬ জুন তাঁর ১০৭-তম জন্মদিন। তাঁকে প্রণাম।

[লেখকের অন্য রচনা]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x