
সে প্রায় দেড় দশক আগেকার কথা। দু’কাঁধে DSLR ঝুলিয়ে ঘুরে বেড়াতাম গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য অলিখিত আচার-উৎসবের প্রান্তে। চৈত্র-সংক্রান্তিতে সন্ন্যাসীদের গায়ে হলুদ জল ঢেলে পাটা স্নান, বাউল বৈষ্ণবদের অজয়ের পারে মালা চন্দন, গাজনেশ্বরের পালকি চড়ে গ্রামবিহার, নবদ্বীপের ভজন কুটিরে নিকোনো উঠোনে রাস পূর্ণিমায় একাদশীর আলপনা—সবটাই লেন্সে ধরে রাখতাম যাতে ওরা আগামী দিনে বিস্মৃত প্রায় সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতার দলিল হয়ে থাকে। ডার্করুমের সীমিত আলোর সীমাবদ্ধতায় ওরা ফুটে উঠতো যেন যুগ যুগ ধরে বয়ে আসা বিশ্বাসের নীরব স্রোত; অবচেতনের সুঁতোয় গাঁথা শতাব্দীর অন্ধকার, আলো, ভক্তি, ভয়, আনন্দের নিরন্তর বর্ণমালা|
এইরকম এক চিত্র অভিযানে বেরিয়ে পৌঁছে গিয়েছিলাম চুয়ার বিদ্রোহ খ্যাত গড়বেতার অন্তর্গত কাঁকরাশোল গ্রামে। সেখানে শিলাবতী নদীর পারে সর্বমঙ্গলা মন্দিরকে কেন্দ্র করে গাজনের মেলা বসেছে। চারিদিকে মানুষের ঢল – অধিকাংশ শবর কিংবা মুন্ডা। ওদের রোদে পোড়া শরীরের রুক্ষতার মধ্যে এক অজ্ঞাত মাধুর্য আছে। কোথাও কোনো অতিরিক্ততা নেই। প্রতিটি শিরা ফুঁড়ে যেন বেরিয়ে আসছে দীর্ঘদিনের শিকার, জঙ্গল জীবনের ইতিহাস কথন। ঘুরপাক খেতে খেতে ধুলো উড়িয়ে ওরা নাচছে ; ঢাক, মাদলের দ্রিমিদ্রিমি তালে, ইশানেশ্বরের ডাকে, মহুয়ার আবেশে – ওরা রূপান্তরিত হয়ে উঠছে।

অদূরে উড়ছে পুরোনো সাদা-লাল শাড়ি। দুটো বাঁশ ঠেকিয়ে তার সঙ্গে গায়ে-গায়ে টাঙানো অস্থায়ী পর্দা। নদীতে স্নান সেরে ওরই আড়ালে মেয়েরা তড়িঘড়ি বদলে নিচ্ছিল কাপড়। ওদের মধ্যেই একজনের হাতে দেখলাম ছোট্ট কাঠের আয়না। ওতে মুখটা ঠিক মতো দেখা না গেলেও , নিবিড় যত্নে সে সিঁথিতে সিঁদুর টেনে নিচ্ছিল। মেয়েটির বয়েস অল্প, আঁচলে লুকিয়ে আছে তার গড়নের নরম ছায়া। হঠাৎই সে ঘাড় ঘুরিয়ে, সতর্ক চোখে তাকাল আমার দিকে। বললে – ফটোর তোলিও না দাদা… মোর নাগর দেহে ফেললি তোরা–আমাক দুজনকেই পিটাই দিব।”বুঝলাম—মন চাইলেও সমাজের কড়া বেষ্টনীর ঘেরাটোপে মেয়েটি আবদ্ধ। ডিজিটাল সভ্যতার যুগেও আদিবাসী সমাজের এই বেষ্টনী – কঠোর, নিজস্ব বিধি-বিধানের সুতোয় গাঁথা। এই কঠোরতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে তাদের নিরাপত্তা ও প্রথার প্রতি গভীর অনুরাগ। বাইরের চোখে যা ‘ক্রূরতা’ মনে হতে পারে, তাদের কাছে সেটিই গোষ্ঠীর মর্যাদা রক্ষার অবিচল নিয়ম। আর এই অস্তিত্বের প্রাচীর ভাঙার সাহস কেউ দেখালে, সমগ্র সমাজ মুহূর্তে হিংস্রতার রূপ নিয়ে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।

যাই হোক আপাতত ফেরা যাক মেলায় – সেই রোমহর্ষক মুহূর্তে যেখানে মাঝবয়সী বেদে বাঁশি বাজিয়ে তার শতাব্দী প্রাচীন রিচ্যুয়ালাইজড ব্রেভারির ঐতিহ্য মেলে ধরছে। গলায় পুঁথি-ঝোলানো দাঁতের মালা, কোমরে কেবলমাত্র লুঙ্গি, মাথায় পান্ডুর রঙের কাপড় বাঁধা; সামনে পুড়ে যাওয়া লোহার মান্ডা, দু’তিনখানা বাঁশের টোকরি আর ছেঁড়া কাপড়ের লালপুঁটলি। সে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে, ধীরে ধীরে পুঁটলির ধুলো আঙুলে মাখে। সেই ধুলো আদতে জাহেরথান থেকে আনা—পবিত্র উপাসনা স্থলের মাটি। সে মুঠো মুঠো সেই ধুলো ছড়িয়ে দেয় টোকরির চারপাশে যেন এক অদৃশ্য সীমানা টেনে দিচ্ছে। আস্তে আস্তে টোকরির ঢাকনা সরায়। ফণা তুলে ওঠে কালচে-হলুদ হাড়হিম করা গোখরা। এখানে ‘সাপ’বলা হয় না। স্থানীয়দের ভাষায় সে বঙ্গা দেবতার দূত। বেদে ভক্তিভরে তাকায়। বাঁশির সুর ক্রমশ তীব্র চড়ায়ে পৌঁছায়। যেন প্রাচীন কোনো গুহার প্রতিধ্বনি। তারপর আচমকা বাঁহাত আকাশের দিকে তুলে এক অদ্ভুত মুদ্রায় শরীরকে পেঁচিয়ে ঝাঁকুনি দেয়। এ এক প্রাচীন সংকেত। অরণ্যের আত্মাদের সে ডাকছে। গোখরোটি এবার পুরো শরীর তুলে দুলতে থাকে; ফণা নামায়, আবার তোলে— কিন্তু আঘাত করে না। বেদে তার সামনে বুক এবং কপাল নামিয়ে ‘মা বসুন্ধরার’ উদ্দেশে মাটি ছুঁয়ে ধ্যান মুদ্রায় বসে। কিছুক্ষন শান্ত থেকে সে উত্তাল আবেশে দু’হাত তুলে উঠে পড়ে। চক্রাকারে তপোভঙ্গ সন্ন্যাসীর মতো নাচতে থাকে। হাওয়ায় দুলে ওঠে দাঁতের মালা। তার আবেগগ্রস্ত গলা থেকে বের হয় একপ্রাচীন টোটেমিক ধ্বনি—“হো…হো…হোরা—আআআ!”সেই ধ্বনি শুনে গোখরোর শরীরটা হঠাৎ স্থির হয়ে আসে। তারপর ধীরে ধীরে সে তার মাথা নামায়। বেদে সাপটিকে হাত না লাগিয়েই শুধু দৃষ্টি আর সুরের নির্দেশে আবার টোকরির দিকে ফেরায়। রিচুয়ালটির সমাপ্তি হয়।
বেদের এই আচার আসলে শুধু সাপ খেলা বা সাহসিকতার প্রদর্শন নয় — এটি তাদের সমষ্টিগত অস্তিত্ববোধ, পূর্বপুরুষের স্মৃতি এবং অরণ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এক আদিম বিশ্বদৃষ্টির প্রতিফলন। এখানে গোখরো কোনো বিষধর প্রাণী নয়; সে বঙ্গা দেবতার দূত, প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে সেতুবন্ধনকারী এক জীবন্ত প্রতীক। এই আচার আদতে শবর সমাজের টোটেমিক আত্মিক ঐতিহ্যের গভীর সাংস্কৃতিক প্রকাশ।
জার্মান থিয়েটার নির্দেশক বের্টোল্ট ব্রেখট একবার বলেছিলেন, মেলায় যাওয়া আর থিয়েটার দেখতে যাওয়া — এই দুই অভিজ্ঞতার ভেতরে মূলত একই রকম নাটকীয়তা লুকিয়ে থাকে। কারণ দু’জায়গাতেই মানুষ নিজের জীবনকে দূর থেকে দেখার, নতুন আলোয় চিনে নেওয়ার সুযোগ পায়। ব্রেখট বলতেন, নাটক এমন ভাবে সাজানো উচিত যাতে দর্শক গল্পে ডুবে না যায়; বরং যেন ভাবতে শেখে, প্রশ্ন করতে শেখে। গ্রাম্য মেলায়ও ঠিক তাই ঘটে — হঠাৎই কোনো ঘোষক মাইকে বলে ওঠে, “গরু দুধ দিচ্ছে না?—এই তেল গরুর সিঙে লাগান; দুপুরেই বালতি ভরে যাবে!” কিংবা “এক টাকার ওষুধে পাঁচ টাকার সুবিধে—বিশ্বাস না হলে পাশের লোককে জিজ্ঞেস করুন!”; কিংবা আবার, “গলায় লাগাবে, মাথায় লাগাবে, পায়ে লাগাবে—যেখানে লাগান সেখানেই কাজ! দেব-মলম – আশীর্বাদ!”
লোকেরা হাসে, উৎসাহ জোগাতে চেঁচিয়ে ওঠে – মার্ গুরজল আবার ভাবেও — কোনোটাই কি সত্যি, নাকি পুরোটাই কৌশল?

মেলার ভিড় তখন ঢাক মাদলের দোলায় দুলছে | পড়ন্ত বিকেলের শ্রান্ত মুখে কালবোশেখীর আশঙ্কা। তারই মধ্যে লম্বা করে বিছিয়ে রাখা গনগনে পথ | লাল, কমলা আর কালো ছাইয়ের স্তর | উত্তপ্ত অঙ্গারের লেলিহান আহবান | সামনে একদল সন্ন্যাসী—মাথায় টোপর, গলায় গেঁদাফুলের মালা , গঙ্গাজল ছিটোনো শরীরে ভেজা চকচকে ভাব | চোখগুলো গভীর মনোসংযোগে স্থির। হঠাৎই একজন দৌড়ে এসে কিনারায় মুহূর্তের জন্য থামে। তারপর ‘বোল বোম’-এর তালে তাল চূড়ান্ত তুঙ্গে উঠলে শরীরটাকে দীর্ঘায়িত করে ধীরে ধীরে পা ফেলে আগুনে। থামে না , এগিয়ে যায়। পা ডুবে যায় আগুনে। অনমনীয় সে , তারা , সন্ন্যাসীরা হাঁটতে থাকে।যেন পণ করেছে আগুনকে পদতলে দলে , তারা অন্তরের জাগ্রত শিবাইকে জয় করবে। চারিদিকে উপবিষ্ট ছেলেবুড়োর চোখে বিস্ময়, সন্দেহ, ভক্তি—টানটান উত্তেজনা।সবাই তখন এই বিস্ময়কর অগ্নিযাত্রার মন্ত্রমুগ্ধ সাক্ষী। আমিও। তারপর ওরা পার হয়ে গেলে পর ঢাকের তালে শত শার্দুলের বিক্রমে গাজন গর্জে ওঠে। শীর্ণদেহী পুরুত ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে সন্ন্যাসীদের মাথায় জল ছিটিয়ে আশীর্বাদ করেন।ওরা প্রণাম করে দাঁড়িয়ে থাকে—শরীর ক্লান্ত, কিন্তু মুখে অদ্ভুত তৃপ্তির দীপ্তি। ছবি তুলছি দেখে পুরুত ঠাকুর আমার দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বললে – বাবা, দেহের ফোটু তুই তোললি, কিন্তু মনের খবর নিলিনে—ওটাই তো সত্যি জিনিস হে! সত্যিতো – মানুষের মন যে স্থৈর্যের এমন অটল মাস্তুলে আসন নিতে পারে, এবং দুর্নিবার একাগ্রতার বশে নিজেকে সম্পূর্ণ সমর্পণ করতে পারে — তা এই সন্ন্যাসীদের দুঃসাহসিক অগ্নি-আচার প্রত্যক্ষ না করলে অনুধাবন করা দুঃসাধ্য।
মনে পড়ে যায় কুম্ভমেলার সেই বিস্ময়কর দৃশ্য। মাটির গভীর গর্ভে সারাদিন নিজেকে আবদ্ধ রেখে উঠে এসে এক সাধু শান্ত স্বরে উচ্চারণ করেছিলেন, “যথা সিন্ধুঃ স্থিরো নিত্যং, তথা যোগী মনঃ স্থিরম্। মানুষের মন, সাধনার স্পর্শে, সত্যিই সমুদ্রসম স্থির ও অনড় হয়ে উঠতে পারে।
এইসব সাত পাঁচ দেখতে ভাবতে , ভাবতে দেখতে , বোবা ছেলের ভাজা গরম জিলিপিতে কামড় দিতে দিতে, আদুর কচিকাঁচাদের কাঠের আইসক্রিম গাড়িতে হুমড়ি খেয়ে পড়া দেখতে দেখতে , স্থানীয় যুবকদের হাড়িয়া সুধাচক্রে বসেও না বসে, পৌঁছে গেলাম শিলাবতী নদীর তীরে সেই সর্বমঙ্গলা মন্দিরের চত্বরে। শুনলাম সেখানে নাকি এক ত্রিকালদর্শী ভৈরবী মাতার আগমন ঘটেছে। মা নাকি অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারিণী, কঠিন সব ব্যামো নাকি পদস্পর্শে নিমেষে সারিয়ে দেন। এসব ছিটেফোঁটা সোঁদা গ্রাম্য কাহিনী কানে আসতে মনের মধ্যে কৌতূহল জাগলো। ভিড় ঠেলে সামনে এগিয়ে গেলাম।

ধূপ-ধুনোর মোহময়ী গন্ধ এক অদ্ভুত আবেশ তৈরি করেছে চারপাশে। মন্দিরের চাতালের উঁচু আসনে বসে আছেন ভৈরবী মা। দীর্ঘ জটাগুলো অযত্নে ঘনিয়ে উঠে, কখনো কাঁধ, কখনো বুকে নেমে এসেছে । চোখদুটো লাল, কপালে সিঁদুরের মোটা ছড়িয়ে পড়া টিপ, যেন এক তান্ত্রিক রেখাচিত্র। গলায় পরপর মালা—কখনো ফুলের, কখনো রুদ্রাক্ষের। চারপাশে ভক্তদের ভিড়। কেউ হেঁটমুন্ড হয়ে বসে আছে, কেউ কাঁপা গলায় নিজের দুঃখের কথা বলছে, কেউবা শুধু তাকিয়ে আছে—নির্বাক বিস্ময়ে। এক বৃদ্ধা তার পায়ের কাছে বসে কাঁদছেন। ভৈরবী মা কখনো তার মাথায় হাত রাখছেন, কখনো চোখ বুজে কী এক অদ্ভুত মন্ত্র উচ্চারণ করছেন।
হঠাৎ তাঁর দৃষ্টি এসে থামলো আমার উপর।
আমি আরও কয়েক পা এগোতে চোখে পড়লো—কপালের সিঁদুরের নীচে, ভ্রূর খানিকটা ওপর দিয়ে তির্যকভাবে কাটা দাগ। খুব গভীর না, কিন্তু চেনার মতো— একবার দেখলে ভোলা যায় না। স্মৃতির ঝাঁকুনি অনুভব করলাম। এ দাগ… তো আমি আগে দেখেছি। মাথার ভেতর একসঙ্গে অনেকগুলো দরজা খোলার শব্দ অনুভব করলাম । ধূপের গন্ধ মিলিয়ে গিয়ে নাকে ভেসে উঠলো কাঁচা মাটির গন্ধ, গরমে থমথমে আদিবাসী পাড়ার শেষ বিকেল যেখানে আমি নিছকই এক দর্শক : অচেনা গ্রামে হঠাৎ জুটে যাওয়া এক বিচিত্র নাটকের নীরব সাক্ষী।
ধানক্ষেতের ধারে তাকে পাওয়া গিয়েছিল—অর্ধচেতন, এলোমেলো কাপড় আর উপস্থিতি স্বরূপ ফেলে যাওয়া ময়ূরের পালক। দৃশ্যটা এতটাই অস্বাভাবিক যে কেউ কিছু বুঝে উঠতে পারেনি। কে এসেছিলো? কেনই বা সে সেখানে? তাছাড়া ময়ূরের পালক এলো কোথা থেকে ? প্রশ্নের পর প্রশ্ন, কিন্তু উত্তর নেই।

গ্রামের লোকজন তাকে পাঁজা কোলা করে নিয়ে এলো বাগদি মোড়লের খামারে। সবাইকার চোখে কৌতূহল, সন্দেহ, আর এক অদ্ভুত নিষ্ঠুর উত্তেজনা।
মোড়লের আদেশে ডাকা হলো ওঝাকে। বুড়ো মানুষটা ঈশান কোনে ছাই , দক্ষিণ দিকে মাসকলাই , আর পিতলের গ্লাসে মন্ত্রপূত জলের মধ্যে খড় ডুবিয়ে, শুরু হলো প্রশ্ন— একটার পর একটা, ক্রমশ কঠিন, ক্রমশ আক্রমণাত্মক।
“কে? কার সাথে? বল! না বললে এখানেই তোকে একদম পুঁতে…
মেয়েটি নিশ্চুপ । কেবল আকাশের কালো মেঘের দিকে চেয়ে কাঁদছিলো । মুখে শব্দ বলতে একটাই : বাঁশি – বাঁশি – বাঁশি, আর একরকম গুমরে ওঠা দমবন্ধ করা হাহাকার।
ওঝার ধৈর্য একসময়ে ফুরোল। ঝাঁটার বাঁশটা বাগিয়ে নিয়ে সে আঘাত করতে শুরু করলো—প্রথমে হালকা, তারপর ক্রমশ তীব্র, হিংস্র। প্রতিটা আঘাতে তার শরীর কেঁপে উঠছিল, কিন্তু মুখ থেকে অন্য কোনো কথা বেরোল না।
আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম—অক্ষম, লজ্জিত, স্থির। শেষমেশ যখন কিছুই জানা গেল না, তখন গ্রামের বয়োঃজেষ্ঠ মাথারা মোড়লের সঙ্গে কথা বলে রায় দিলো – মেয়েটি আর ঘরে ফিরবে না। তার জন্য ঘরের দরজা চিরকালের জন্য বন্ধ। ও থাকবে রক্ষেকালির থানে। প্রায়শ্চিত্ত করবে | কিন্তু কেন , কিসের জন্য, কতদিন তা কেউ স্পষ্ট করে বলল না।
সেদিন সন্ধ্যায়, যখন তাকে পুকুরে স্নান করিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, সে একবার মাথা তুলেছিল। চোখদুটো লাল, ফোলা, অদ্ভুত এক শূন্যতায় ভরা। ভাবটা এমন যেন সবকিছু শেষ হয়ে গেছে, কিংবা হয়তো সবকিছুর শুরু সেখানেই।

সেই চোখ আজ আমার দিকে তাকিয়ে যেন জিজ্ঞেস করছে – কি চাস ? কেন এসেছিস ? ঢোঁক গিলে আমি থমকে দাঁড়িয়ে গেলাম। তারপর ধীরে ধীরে হাত তুলে বললে , “শেষমেশ তুই এলি।” ওর আগমার্কা চোখে লক্ষ্য করলাম, বহু ঝড় পেরিয়ে এসে জমাট বেঁধে থাকা এক নীরব শক্তি। “বাসন্তী…” শব্দটা নিজে থেকেই বেরিয়ে এলো। “ওই নামটা অনেকদিন কেউ ডাকে না, ওটা মরে গেছে।” অকস্মাতের আবর্তে নির্বাক আমি, ঘুরপাক খেতে থাকলাম।
বাসন্তী কিছুক্ষণ নীরব রইল। পায়ের কাছে পড়ে থাকা বৃদ্ধার শীর্ণ হাতে আস্তে করে কয়েকটি জবা আর বেলপাতা গুঁজে দিয়ে নিচু স্বরে বলল—নাতনির তলপেটে এই ফুলগুলো ছুঁয়ে গিলে নিতে বলবি। তিন মাসের মধ্যে সন্তান আসবেই। তারপরই, ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক রহস্যময় হাসি। গলা তুলে বেশ কয়েক ঢোঁক কাঁচা মদ গিলে নিয়ে আমার দিকে তাকাল। চোখদুটো আরও সরু হয়ে এলো, যেন ভেতর থেকে কিছু দেখতে চাইছে — আমাকে নয়, আমার আড়ালে লুকিয়ে থাকা আরেকটাকে। “আয় … এখানে বোস । কিছু খাবি।“ ওর কথা বলার বেসামাল ভঙ্গি , আচরণের রহস্যাবৃত ছন্দ — সব মিলিয়ে আমার মাথার ভেতর আরও জট পাকাতে লাগল। শেষ পর্যন্ত আর নিজেকে সামলাতে না পেরে, না ভেবেই বলে ফেললাম — “এই কি তাহলে তোমার প্রায়শ্চিত্তর ফল ?” প্রায় টলোমলো অবস্থায়, আচমকাই সে আমার কপালে সিঁদুর লেপে দিল। চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল— “তুই নাগ… ছোবল মারতে এসেছিস। সব জানি আমি…”| কথাগুলো বলার সঙ্গে সঙ্গে কণ্ঠস্বর বদলে যেতে লাগল— ঘন, আবিষ্ট, এক অদ্ভুত ছন্দে দুলতে দুলতে, সে বলতে শুরু করল—
“সেখানে রেখে দিয়েছিল। তারপর চৈত্র অমাবস্যার রাতে আমার শরীরে যখন কোটালের বান ডেকেছে নরহরি কাপালিক আমাকে দেবী সাজিয়ে তন্ত্রমতে পুজো করলেন। পাথরের বেদির ওপর লাল আসন পেতে আমাকে বসানো হলো, কপালে সিঁদুর, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা, হাতে আলতা | তারপর ধীরে ধীরে মন্ত্রপাঠ, একশো আট প্রদীপের আলো, দেয়ালে অশরীরী ছায়াদের খেলা, মণ্ডলের চারদিকে নরহরির অদ্ভুত ভঙ্গিতে ঘোরা। একসময় তিনি আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। দু’হাতে আমার মাথা স্পর্শ করে কিছু মন্ত্র জপতে লাগলেন। শরীর কেঁপে উঠল— যেন বুকের ভেতর কোথাও এক অজানা প্রস্তর খন্ড ভেঙে পড়ছিলো। হঠাৎ তিনি মাটির পাত্রে কারণ নিয়ে আমার কপাল, গলা, আর বুকে স্পর্শ করালেন—অভিষেকের মতো। তারপর গম্ভীর কণ্ঠে বললেন— সেবন কর – আজ থেকে বাসন্তী নয়— তুমি কৃষ্ণা ভৈরবী। তারপর অনুভব করলাম সময় যেন থেমে গেছে | কোনটা আমি, কোনটা তিনি— বোঝা যাচ্ছে না। দুটি স্রোত – ধীরে ধীরে একে অপরকে ছুঁয়ে যাচ্ছে, জড়িয়ে যাচ্ছে, আলাদা করা যাচ্ছে না। ঘূর্ণি। পাক। উঠে যাওয়া। নামা। তারপর থেকেই মন্দিরে দুঃখ, লোভ আর পাপের গল্প নিয়ে মানুষ আসতে শুরু করল। আমি নীরব শ্রোতা হয়ে থাকতাম। একদিন বুঝলাম—ওরা আমাকে যা বানাতে চেয়েছিল, আমি সেটা হয়েই উঠেছি। ত্রিকালদর্শী কৃষ্ণা ভৈরবী |
কথাগুলো শেষ হতেই না হতেই বাসন্তী আবার কাঁচা মদের বোতল ঠোঁটে তুলে নিল—দু-এক ঢোঁক নয়, যেন এক নিঃশ্বাসে অনেকটা গিলে ফেলল। পরমুহূর্তেই শরীরটা হালকা হয়ে লুটিয়ে পড়ল মাটিতে—নিঃশব্দ, নিস্তব্ধ।

তারপর যেন সবকিছু একসঙ্গে ঘটে গেল। আশেপাশের ভক্তরা হুড়মুড়িয়ে এগিয়ে এল, কেউ একজন ভারিক্কি গলায় আমাকে প্রায় ধাক্কা দিয়েই সরিয়ে বললে , “আপনি এখন আসুন… মায়ের ভর হয়েছে!” চারদিক মুহূর্তে ভরে উঠল শঙ্খ আর উলুধ্বনিতে। “মা… মা গো…”—ডাকগুলো একটার পর একটা উঠে এসে আছড়ে পড়লো মন্দিরের চাতালে । আমি নিজেকে ক্রমশ অচেনা, অপ্রাসঙ্গিক মনে করতে লাগলাম | কোনোমতে ভিড় ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এলাম। পা দুটো যেন নিজের ইচ্ছায় চলছিল, মাথার ভেতর এক অদ্ভুত শূন্যতা— না ভয়, না বিস্ময়, না কোনো স্পষ্ট চিন্তা। শুধু একটা ফাঁকা অনুভব, যেন সমস্ত কিছু হঠাৎ করেই অর্থহীন হয়ে গেছে। মনে হলো— মানুষের ভেতরের শূন্যতাই হয়তো এমন দৃশ্যের জন্ম দেয়, আর আমরা তাকে অলৌকিক বলে ব্যাখ্যা করি । কিংবা কৃষ্ণা ভৈরবী হয়তো কোনো অলৌকিক সত্তা নয় ; মানুষের বিশ্বাস, প্রত্যাশা আর পুনরাবৃত্তিই একসময় আমাদের নতুন পরিচয় গড়ে তোলে— যেখানে ব্যক্তি আর প্রতীক আলাদা করে চেনা যায় না।
তারপর মেলাতলায় শুরু হয়েছিল দামাল কালবোশেখীর ভৈরবী নৃত্য। হাপুসুটি ভিজে গভীর রাতে ট্র্যাক্টরে চেপে মেদিনীপুর শহরে পৌঁছেছিলাম | শিলাবতীর পারে গাজনের মেলা তখন দূরতর কোনো স্বপ্নদ্বীপ। হোটেলের আয়নায় দেখলাম কপালে তখনও সিঁদুরের হালকা আভা লেগে আছে। আজও সেই স্মৃতিসিঁদুর চৈত্র সংক্রান্তির রাতে স্পর্শ করে আক্ষেপের সুরে বলি – “বাসন্তী – সেই ধানের ক্ষেতে প্রেম সায়রে শিখিপুচ্ছ শিরে কে সেই গোপন প্রেম তোমায় যোগিনী বানালো আমার জানা হলো না |”


গড়বেতা আমার দেশ বটে । তাই আগ্রহ নিয়ে পড়লাম ।ভালো লাগলো । সর্বমঙ্গলা মন্দিরে অনেকবার গেছি । তবে গাজনের মেলাতে যাওয়া হয় নি । বিনয় ঘোষের পশ্চিমবাংলার সংস্কৃতি বইতে গনগনির ডাঙ্গা এবং এই অঞ্চলের বাগদিদের ইতিহাস নিয়ে অনেক কথা আছে আছে । এ আই প্রযুক্তি ব্যবহার করে হলেও ছবিগুলি অনেকটাই বাস্তবের কাছাকাছি একটা রূপ দেওয়া গেছে , যা এই নিবন্ধের আকর্ষন বাড়িয়েছে ।
ধন্যবাদ সোমেন দা’। আপনার মন্তব্যটি ভাল লাগল।
ধন্যবাদ। বিনয়বাবু বই আমি পড়িনি তেমন ভাবে। আমি বিশেষত আকৃষ্ট হয়েছিলাম ওদের আচারে এবং তার ভিতরে যে nested flow of cultural archetypes সেগুলোর প্রতি। সবটাই মনে হয়েছে more of a metaphor than metaphysical. মতামত জানান দিয়েছেন। আবার ধন্যবাদ। পাঠক জেগে আছে এটাই আমার কাছে তাজমহল।🙏
ছবি তো আপনার কাছে ছিল? সেটা দিলে আরো চিত্তাকর্ষক হত ধারা বিবরণী। হয়ত আমাদের জীব্বদশাতেই DSLR Camera এবং সেই শিকারী শিল্পীরা ইতিহাস হয়ে যাবেন। এত ছবি চারিদিকে যে ‘অপর্নার’ মত হাহাকার করে উঠতে ইচ্ছে হয় ‘ এত রক্ত কেন’? লেখাটি জম্পেশ হয়েছে। তাছাড়া … গড়বেতা ও সর্ব মঙ্গলা মন্দির আশৈশব চিনি। গাজন অবশ্য দেখিনি। এখন ওদিকটা বেশ ইস্তিরি করা সার্ট প্যান্টের মত হয়েছে। ফতুয়া ধুতির মালিন্য আর নেই। পরবর্তিতে আপনি আপনার অ্যালবামের ধুলো ঝেড়ে কিছু মনি মুক্ত পরিবেশন করবেন এই আশা রাখি।
ধন্যবাদ। ছবির সঙ্গে এখন আমার দূরত্ব 1800 কিমি। আমারই হাত কামড়ানোর দশা। তবে তন্ময়বাবুর AI শ্রম বোধহয় কিছু টা objective readingএ সাহায্য করেছে। যাই হোক মতামত জানান দেবার জন্য ধন্যবাদ। পাঠকের মতামত শেকড়ে জল দেয়। গাছ আরও ফুল ফোটানোর আগাম প্রেরণা পায়।
এই ঘটনার পরিবেশ পরিস্থিতি সবই আমার অপরিচিত।কিন্তু আপনার লেখার এক মায়াবী আকর্ষণ সব সময়ই অনুভব করি।লেখাটা তাই আমার কাছে একটা রূপকথার মতই লেগেছে।সবচেয়ে যেটা ভাল লেগেছে,সেটা হল একটা গল্পের আভাস দিয়ে লেখাটা শেষ হয়েছে।
ধন্যবাদ।