শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

-কমিশনারের কাছে যেতে হবে দেখছি! কেউ কোনো কম্মের নও হে তোমরা!
থানার অফিসার ইনচার্জের ঘরের দরজায় বাজখাঁই গলার আওয়াজে আশেপাশের ঘর থেকে ছুটে এলো মেজ, ন, সেজ, ছোট অফিসারেরা।
-স্যর আপনি! আমরা তো দেখছি। খবর পেলেই জানিয়ে দেব স্যর।
প্রায় হাতজোড় করা খাকি উর্দিধারীদের পাত্তা দিলেন না বিনয় সেন। গটগট করে ঢুকে বড়বাবুর সামনের চেয়ারে বসে ইশারায় একজনকে ডাকলেন।

-একটা চা, চিনি ছাড়া।


ওসি নবারুণ শর্মা দুপুরের খাওয়া সারছিলেন। বেশ কঠিন চোখে সেনের দিকে তাকিয়ে রইলেন খানিকক্ষণ। উভয় উভয়ের দিকে চেয়ে রইলেন বলা ভালো। মেপে নেওয়ার চাউনি। দরজার কাছে ছোটখাটো ভিড়টা উদগ্রীব। কি হয় কি হয় ভাব!
মুখ খুললেন ওসি।

-আপনার জুতোয় কত হীরে লুকিয়েছেন? নাকি পাউডার?

-উল্টো চাপ! হ্যাঁ? উল্টো চাপ? আপনি বোধহয় চেনেন না আমাকে!

-বিলক্ষণ চিনি! আপনার চারটে চালের আড়ত, তিনটে কোল্ডস্টোরেজ, দুটো পেট্রল পাম্প, কোটিটাকার শেয়ার, আপনার কথায় মন্ত্রী থেকে সান্ত্রী সবাই ওঠেন বসেন। এই তো?

-একটা ফোন করলে কোন্‌ গণ্ডগ্রামে পোস্টিং হবে আপনার, ভেবেছেন
পোস্টিংএর কথায় শর্মা একটু নড়ে বসলেন। ব্যথার জায়গায় হাত পড়লে যা হয় আর কি! খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। হাত ধুতে উঠলেন। চোখের ইশারায় সেকেন্ড অফিসারকে বললেন কিছু। সেইই দায়িত্ব নিল।


-মিঃ সেন, আমরা কথা দিচ্ছি, আপনার জুতো আমরা খুঁজে দেব। দু’দিন সময় দিন।

-তুমি তো বেশ ভালো হে ছোকরা! হ্যাঁ, দ্যাখো। ওই জুতোয় আমার জীবন। বুঝলে? বহু পুরনো চাকরের মতো কত সুখদুঃখের সাথী ছিল। এই দালালেরা কি বুঝবে!
শেষের কথাটা ওসির গমনপথের দিকে চেয়ে, বলাই বাহুল্য।
এইসময়, চায়ের দোকানের ছোট ছেলেটা দৌড়তে দৌড়তে হাজির। সাথে চিৎকার।

-পেয়েছি! পেয়েছি! লালু চেবাচ্ছিল, নোংরার ঢিবির পেছনে।

ছেলেটার হাতে দুপাটি জুতো। বেগুণী রঙ জ্বলে গেছে কবে! দড়ি দিয়ে বাঁধা পিছন দিকে। এক পাটি ফেটে গেছে।
সেই যেবার ট্রেন উল্টালো এলাহাবাদে, ছেলে মেয়ে বৌ সর্বস্ব খুইয়ে ফিরে এসেছিলেন হাইস্কুলের ইংরাজির শিক্ষক বিনয় সেন। মাথাটা আর ফেরে নি। সারাদিন ঘুরঘুর করেন স্টেশনে। ট্রেন এলে জানালায় জানালায় উঁকি মারে্ন।
প্রায় রোজকার কৌতুকের পালা শেষ করে যে যার কাজে ফিরে যায়। একা বিনয় সেন জুতোজোড়া নিয়ে পরম মমতায় হাত বোলান, খানিকক্ষণ চোখের জল ফেলেন। তারপর ধড়ফড় করে থানা থেকে বেরিয়ে স্টেশনের দিকে রওনা দেন। বারাণসী এক্সপ্রেস আসার সময় হয়ে গেল। সঙ্গী ময়লা, জরাজীর্ণ পুরনো বিবর্ণ একজোড়া জুতো। ঠিক বিনয় সেনের মতো।

[লেখকের পূর্ব রচনা]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
2 Comments
Oldest
Newest Most Voted
শৌভিক দে
শৌভিক দে
3 months ago

অভাবিত চমক শেষে। প্রথমে ভাবলাম গতানুগতিক খল নায়ক ও সৎ পুলিশের দ্বন্দ্ব। মাঝে মনে হল – না – বোধহয় হাসতে পাবো। শেষে ঘচ করে বুকে শেল বিঁধে গেল। আসলে আমি সত্যি একজন কে জানি ঝাড়গ্রামে মুম্বাইগামী জ্ঞানেশ্বরী এক্সপ্রেস ট্রেন দুর্ঘটনায় তার সম্পুর্ন পরিবার চলে গেছল, শুধু সে ছাড়া। এই গল্পটি ভালো বলা যাবে কি না – আমি বলতে পারবো না। তবে লেখার মুনশিয়ানা তারিফ যোগ্য।

Chandan Sen Gupta
Chandan Sen Gupta
2 months ago

অপূর্ব।এই রকম অনুগল্প পড়ার অপেক্ষায়ই তো থাকি সবসময়।