
সত্তরের দশকের প্রথম দিকে টাটা-বাবার গাঁয়ে সে এক শীতার্ত সান্ধ্য প্রহর। কিছু পণ্ডিত, কিছু পণ্ডিতম্মন্য আর কিছু নির্ভেজাল সংস্কৃতি প্রেমিক শ্রোতা জড় হয়েছেন একটি ইশকুলের নাতি বৃহৎ সভাগারে। নিতান্ত বালক দুখিরামও রয়েছে তার বাবার পাশটিতে, লেজুড় হয়ে । কথা হচ্ছে সেই মনোরম শীত সন্ধ্যায় ব্যাডমিন্টন ইত্যাদি না খেলে, মুড়ি পাটালি না খেয়ে, ‘কুমোর পাড়ার গরুর গাড়ি’ মুখস্থ না করে, বাবার পাঞ্জাবির ঝুল আঁকড়ে সে বসেই বা আছে কেন? আসলে ছোটবেলা থেকেই সে পিতার অনুপ্রেরণায় একটি নেশা করে। শুদ্ধ মাতৃ ভাষা শ্রবণের নেশা। সে শুঁড়ির জুড়ি নেই।
যাদের পশ্চিম বঙ্গেই জন্ম মৃত্যু লেখা থাকে, অর্থাৎ বাংলায় ডুবু ডুবু জীবন, তারা হয়ত এই প্রলাপের অর্থ নাও বুঝতে পারেন। দুখিরামের বেড়ে ওঠার শহর মূলত ইস্পাত ও অন্যান্য শিল্পের আঁতুড় ঘর। ঘরে ঘরে যন্ত্রবৎ কারিগর। তাদের নিক্তি মাপা জীবন হুটারের শব্দে জাগে, ঘুমায়। বহু ভাষাভাষী মানুষের সমাগমে সে এক ভারতবর্ষের ক্ষুদ্র প্রতিরূপ। কথ্য ভাষায় তার সুস্পষ্ট ছাপ পড়ে। বিবিধ রসনায় রঞ্জিত হয়ে সে জন ‘ ঝাল নুনে মাখা যেন খাস্তা চানাচুর’। হয়ত ভাষার ‘সোয়াদ’ বাড়ে, বোধগম্য হয় । কিন্তু তার নাব্যতা কম, ঝঙ্কার বেশী। স্বাদ ও গন্ধের মধ্যে যদি মনু-বাদী বর্ণাশ্রমের ঠাঁই হত তবে খাঁটি ঘি এবং ডালডা নিশ্চয়ই একাসন দাবী করতে পারত না। সুতরাং বুঝতে হবে এই ভেজালহীন ভাষা কানে নেওয়ার এক মদির মৌতাত আছে।
সেই শহরের অল্প কিছু মধু সন্ধানী একলা পাগল নিরন্তর রক্তকরবীর খোঁজে থাকতেন। নিজেরা চর্চা করতেন, সেই চর্চা চারিয়ে দিতেন চরাচরে। বাঙালির স্বাভাবিক অপ্রণয় প্রবণতায় সংস্কৃতি চর্চারও দুটি তিনটি শিবির ছিল সেখানে। কেউ এক পাত্র চা হাতে , কেউ বা সফেন সুরার সুমুদ্দুরে নিজের মত বোধি বিকাশের কাজে লাগতেন। দুখিরামের পিতা ছিলেন প্রথম ভাগের একজন পুরোধা । দশটা পাঁচটার বাইরে – হয় পঠন-পাঠন, নইলে কৃষ্টি ও সৃষ্টির কাজে নিরত থাকতেন। অতি ব্যায় সঙ্কোচে ধুঁকে ধুঁকে পথ চলা তাদের। সংসার থেকে চুরি করে দু’ দশ টাকার তবিলদারি। সেখান থেকেই শুধু গাড়ি ভাড়াটুকু দিয়ে – মূলত কলকাতা থেকেই – মাঝে মধ্যেই নিয়ে আসা হত কিছু কিছু কিম্বদন্তী বিজ্ঞ, প্রাজ্ঞ দিশা দর্শকে। তাদের মঞ্জুভাষে মুগ্ধ হত সাহিত্য শ্রমিকেরা। দুখিরাম থাকত সে সভার দুয়ার দেশে’। উপরোক্ত সভাটি তেমনি এক প্রবল প্রতিভার সঙ্গ-সুখ।
সেদিনের সভার মুখবন্ধে তেমন কিছু মুখ খোলার ব্যাপার দেখা গেল না। কিছুক্ষণ বিশেষণ বিনিময়ের পরে দুখিরামের পিতা সবিনয়ে অনুরোধ রাখলেন – ‘ তাহলে কিছু কবিতা পাঠ হোক’ । দুখিরাম বুঝল তাহলে ইনি কোনো বিশিষ্ট কবি। কিন্তু না।
কাঁচা পাকা চুলে একবার হাত বুলিয়ে শ্রী শম্ভু মিত্র হাওয়ায় ভাসিয়ে দিলেন একটি শব্দ ‘ভো-ও- র’।

বিদ্যুৎ তরঙ্গ খেলে গেল দুখিরামের সারা শরীরে। মাত্র দুটি স্বর স্পর্শ করে যেন তিনি নির্যাস তুলে আনলেন রাগ ভৈরবীর। কাছাকাছি স্বরলিপি হবে ষড়জে শুরু করে – কোমল রেখাব ছুঁয়ে – ষড়জে ফেরত। তার পর বললেনঃ
আকাশের রং ঘাসফড়িঙের দেহের মতো কোমল নীল:
চারিদিকের পেয়ারা ও নোনার গাছ টিয়ার পালকের মতো সবুজ।
একটি তারা এখনও আকাশে রয়েছে:
পাড়াগাঁর বাসরঘরে সব চেয়ে গোধূলি-মদির মেয়েটির মতো;
পরে দুখিরাম জেনেছিল কবিতার নাম ‘শিকার’ এবং কবি জীবনানন্দ দাশ। সেই মুগ্ধতার প্রথম প্রহরের আশ্লেষ আর বাকি জীবনে কাটানো গেল না। প্রকৃত অর্থেই জীবনানন্দ শিকার করে ফেললেন দুখিরামকে । জীবন ভোর মজে রইল সেই ‘ ভো-ও-র’ উচ্চারণের রাক্ষসী মায়ায়। বাচিক শিল্পে নিজের মত নিমগ্ন হল সে। বাসভূমে পিতা শেখালেন উচ্চারণ। মনোভূমে কিম্বদন্তী মিত্র মশাই রইলেন একটি তারার মত – একলব্যের দ্রোণাচার্য হয়ে।
শ্রী জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪)। অখণ্ড ও পরাধীন ভারতবর্ষের বরিশালে মা কুসুম কুমারী দেবীর কোলে আসা থেকে স্বাধীন ভারতের কলকাতায় ট্রামে চাপা পড়া পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছিল মোট ছটি কাব্য গ্রন্থ । ঝরা পালক (১৯২৭), ধূসর পাণ্ডুলিপি (১৯৩৬), বনলতা সেন (১৯৪২), মহা-পৃথিবী (১৯৪৪), সাতটি তারার তিমির (১৯৪৮), রূপসী বাংলা ( ১৯৫৭)।লোকান্তরের পর কবিতার কথা (১৯৫৫) নামে একটি প্রবন্ধ সঙ্কলন ও বেলা অবেলা কালবেলা (১৯৬১) কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে তাঁর । গল্প, উপন্যাস, ডায়েরির ছেঁড়া পাতা প্রুফ রিডারের স্পর্শ পেয়েছে অনেক পরে। তাঁর কেতাবি শিক্ষা মূলত ইংরেজি ভাষায়, পেশাগত জীবনে অধ্যাপনা ওই একই বিষয়ে। কোথাও নাড়া বাঁধতে পারেন নি। সুন্দরী বধূ , ফুল্ল বালিকা পাশে থাকলেও তাঁর ব্যক্তি জীবন ছিল গভীর নির্জন পথ। তিনি মহা-পৃথিবীর অনুসন্ধান করতে গিয়ে এই পৃথিবীর হালে পানি পাননি। তাঁকে লিখতে হয়েছে ‘হাল ভেঙে যে নাবিক হারায়েছে দিশা’। সমকালীন কবিদের থেকে যোজন খানেক এগিয়ে থাকা তার ভাব প্রকাশের প্রথা। অদ্ভুত উপমার সমাবেশ এবং তা প্রচুর পরিমাণে। সজনীকান্ত দাস ‘শনিবারের চিঠিতে ‘ তাকে অভিমন্যুর মত বধ করতেন বহু-রথীকে দিয়ে। বলতেন একটি পাতায় চব্বিশটি ‘মতো’ অর্থাৎ উনিও একজন কবির ‘মতো’ । এমনকি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ – তাঁর এই ‘ সকলের মাঝে বসে, নিজেরই মুদ্রা দোষে’ আলাদা হবার অভিঘাত অনুধাবন করতে পারেন নি। ‘চিত্র রূপময়তার কবি’ অভিধা দিয়ে পাশ কাটিয়েছেন। তাঁকে বুঝতেন বাংলা কবিদের ‘রাজা সলোমন’ বুদ্ধদেব বসু, যিনি ‘কবিতা’ বলে একটি পত্রিকা ভাসাতেন নিয়মিত, অখ্যাত বা স্বল্প-খ্যাত কবিদের মহা-পৃথিবী আবিষ্কারের আনন্দে। বুঝতেন সঞ্জয় ভট্টাচার্য এবং মুষ্টিমেয় কয়েকজন । কিন্তু মাত্র সেটুকু সম্বল দিয়ে মন বা পেট কিছুই ভরে নি। জীবদ্দশায় আনন্দে থাকাও তাই দাশ-বাবুর কপালে জোটেনি।

অধ্যাপক সঞ্জয় ভট্টাচার্য, অম্বুজ বসু থেকে শুরু করে এখনো বহু নিবিষ্ট গবেষক জীবনানন্দের কাব্য কণ্ডূয়ন করে থাকেন। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় ইঙ্গিত দিয়েছিলেন তেমনি । জীবনানন্দ বারবার আলোচিত এবং ব্যাখ্যাত হবেন তাঁর রোম্যান্টিক মনন, আত্মমগ্নতা, বিশিষ্ট ভাষা রীতি , ছন্দ-স্বাতন্ত্র্য … চিত্র কল্পের প্রয়োগ ইত্যাদির জন্যে। অনেক চিন্তা নিয়োজিত হবে, অনেক প্রদীপ্ত ভাষ্যকার আসবেন। তুচ্ছ দুখিরামের সেই দুশ্চেষ্টা করবে না। তার মানস সরোবরে তত বাঁও মেলে না – যার বলে এত বড় জাহাজ নামানোর অনুমতি দেওয়া যায়। সে নেহাতই একটি ছোট খাটো খাল, টুকটাক ডিঙি চলে সেখানে। তাই বলে সে কি তার প্রিয়তম কবি সম্বন্ধে দু কথা বলতে পাবে না? কুঁজো বলে চিত হবে না। একটা স্বল্প চর্চিত দৃষ্টিকোণ তো রয়েছে সামনেই। যে প্রতিমার সাজ সজ্জায় পাণ্ডিত্যের মনি-রত্ন খুব একটা লাগে না। কানে শোনা সোনা দিয়ে সে গড়তেই পারে বাচিক বিম্ব। প্রসঙ্গ বেছে নিল – জীবনানন্দের কবিতার আবৃত্তি যোগ্যতা।
এরকম প্রসঙ্গ উল্লেখ মাত্রই যে খর বায়ু বেগে বইতে শুরু করবে এবং হাঁইয়ো হাঁইয়ো রবে বহু বাচিক শিল্পী ছুটে আসবেন তাতে কিছু মাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই। শব্দের তাঁতিরা প্রত্যেকেই তাঁর কবিতা বয়ন করে থাকেন। নির্জন একাকীত্বে হোক কিম্বা শ্রোতার সাগর সঙ্গমে। প্রথম পঙক্তি থেকেই জনার্দন বুঁদ হয়ে যান খাঁটি দেশজ গন্ধমাখা রসাস্বাদনে। এই রণ রক্ত সফলতার উপল ব্যথিত পথ ছেড়ে পরা-বাস্তবতার বন জ্যোৎস্নায় খুঁজে পান বনলতা সেনকে। রুঢ় বাস্তবের সচেতনতা এড়িয়ে আশ্রয় নেন সুচেতনার কাছে। কৃত কৌশলী বাচিক শিল্পীরা এই স্বোপার্জিত মোহাবিষ্টদের অলীক মরীচিকার দেশে নিয়ে যান। সে এক আশ্চর্য ভ্রমণ। তাছাড়া শ্রদ্ধাস্পদ আবৃত্তিকার প্রদীপ ঘোষ তো বলেইছেন সব কবিতাই আবৃত্তি যোগ্য। তাহলে দুখিরাম কোন দুরাচার যে সংশয় প্রকাশ করে?
ঠিক সংশয় নয়। প্রগাঢ় পণ্ডিত অম্লান কুসুম দত্তকে তার এক গুণগ্রাহী অবসরের পর প্রশ্ন করেছিল ‘ আপনি কি করেন এখন’? তিনি বলেছিলেন, ‘চিন্তা করি’। দুখিরাম খুব সাধারণ কিন্তু এই কথাটি তার হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। যদিও দূরদর্শনের পর্দায় – লঙ্কা থেকে লেনিন কিম্বা গুপী গাইন থেকে একুশে আইন – কোনো মত প্রকাশের জন্যেই তাকে ডাকা হয় না। সচরাচর ‘উত্তরে থাকো মৌন’ এই তার সম্বল , নচেৎ ইদানীং কম্বল ধোলাইয়ের ব্যবস্থা। সব ঠিক। তা হলেও সে ভেবে দেখতে চায় যে আপাত দৃষ্টিতে যে রকম কবিতারা পাঠ বা আবৃত্তির জন্যে বাছা হয়ে থাকে – সেই মাপদন্ডের অনেকটা বাইরেই থাকে দাস মশাইয়ের অধিকাংশ পদ্য। তবু কেন আপামর শ্রুতি সঙ্গী ……। একটু এগিয়ে দেখা যাক। তার আগে অল্প ইতিহাস চারণ ।
আবৃত্তি যে একটি স্বতন্ত্র শিল্প মাধ্যম, এমন কি অনেকের ক্ষুন্নি বৃত্তির সাধন – সেটি কিন্তু চিরকাল ছিল না। একটা সময় মূলত যারা নাট্য কর্মী এবং বেশ ওজনদার গলার মালিক – তারা কোনো অনুষ্ঠানের শূন্য স্থান পূর্ণ করার তাগিদে এক আধটি কবিতা বলতেন। পছন্দের পুরোভাগে থাকতেন শেক্ষপীর, মিল্টন, মাইকেল কিম্বা গিরীশ চন্দ্র। ( ব্যতিক্রম রবীন্দ্রনাথ, কিন্তু তিনিও নিজস্ব রচনাই পড়তেন। জর্মনীতে ফোনোলজি পড়ানোর কাজে তাঁর কণ্ঠস্বর ব্যবহার করা হত , বলেছেন ‘আলি সাহেব’। এই ‘শোন-পাংশুর’ বাচিক শিল্প বিষয়ক রচনায় ওই ঠাকুরকে আমরা সভয়ে একটু এড়িয়ে থাকবো।) শিশির ভাদুড়ি থেকে উৎপল দত্ত পরে ইংরেজি থেকে বাংলায় এলেন। বাংলাকেই সম্বল করে মাঠে নামলেন দানী বাবু থেকে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় – নামাবলী দীর্ঘ করে লাভ নেই। পরম শ্রদ্ধা ভরে শুধু স্মরণে থাকলেন ‘ঘোষ’ , ‘কুণ্ডু’ থেকে ‘বন্দ্যোপাধ্যায়’ পর্যন্ত বাংলা বাচিক শিল্পের স্বর্নীম গরিমারা।

কিন্তু আবৃত্তিকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে সর্বজনীন করার প্রথম শ্রেয় বোধহয় কাজী সব্যসাচী এবং যার কথা দিয়ে এই রচনার আরম্ভ – তাদের দেওয়া যায়। আধুনিক শিল্প মনস্ক জমায়েত বুঝল এটি ভোজ বাড়ির প্রথমে আসা ল্যাজ ওয়ালা বেগুন ভাজা নয় – মাংসের বালতি এলেই যে কৌলীন্য হারায়। এটি অন্য ধাতুতে গড়া এবং প্রচুর নাটকীয়তা ছাড়াও শ্রোতার মনে বসত করার ক্ষমতা রাখে। আবৃত্তিকারের ঝুলিতে মাইকেল ভারে কাটেন, সত্যেন্দ্রনাথ কাটেন ছন্দে। জয় গোঁসাই কাটেন সংবেদী স্নায়ুতে আঘাত দিয়ে, নীরেন্দ্রনাথ কাটেন ‘শাণিত কথার ঝলকানি লাগা সতেজ ভাষণ’ দিয়ে। কণ্ঠ কলার দরবারে আবৃত্তি – ভিড়ের মাঝে নীরার মতন আলাদা মনস্কতার দাবী রাখে।
মনে রাখা দরকার আবৃত্তির কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। গানের মত স্বাভাবিক চিত্ত-হ্লাদিনী সুরের সরল পথ তার নেই । একজন মোটামুটি সুরেলা শিল্পীও যদি তার গানে তিন চারটি পর্দা সঠিক লাগিয়ে দিতে পারেন, ধাঁ করে উঠে যেতে পারেন তার সপ্তকে আবার গোঁত্তা খেয়ে নেমে আসতে পারেন মন্দ্র ষড়জে – তাহলে কোলাহল রত জনতা চুপ করে যায়। একবার মান্না দের শেষ মুহূর্তের অনুপস্থিতিতে উত্তাল জনতা নেতাজি নামাঙ্কিত অন্তর অঙ্গনের চেয়ার ইত্যাদি ভাঙতে উদ্যত – ঠিক সেই সময় হেমন্ত বাবু গেয়ে উঠলেন ‘ ও আকাশ সোনা সোনা, ও মাটি সবুজ সবুজ …’ । কালিয় নাগের মাথায় পড়ল নারায়ণের পা, শব্দহীন শৃঙ্খলা ফিরে এলো সভাগারে। সংগীত সাধকের এই সক্ষমতা থাকে। সুরের স্বয়ংসিদ্ধা পাগলকে বশ করতে পারে। আবৃত্তির হাত তত লম্বা নয়। বাচন বয়ন শিল্পীর বেদনার এই শুরু।
একজন বাচিক শিল্পীকে ধীরে ধীরে গড়ে নিতে হয় আবহ। তার সারঙ্গ-দেব নেই, স্বরলিপি নেই। নেই কেন্দ্র শাসিত সংস্থার সুনির্দিষ্ট পথ নির্দেশ, চুনের দাগে দাগিয়ে দেওয়া। পা যেন সেই দাগ ছেড়ে না দাগা দেয়। গমক, গিটকিরি , মুড়কি, পুকার নেই। নেই শুদ্ধ থেকে কোমল স্বরে গিয়ে শ্রোতার হৃদয় মুচড়ে দেওয়ার ক্ষমতা। তার ভরসা থাকুক কণ্ঠস্বর আর স্বর ক্ষেপণে, আবেগের তারে তাদের যতটা খেলিয়ে নেওয়া যায়। তবে উচ্চারণ হবে যথাযথ, অস্ফুট আলাপ হলেও স্পষ্টত বুঝবেন শ্রোতারা। শব্দের ওজন, মধ্যবর্তী যতি , দীর্ঘশ্বাসের সংযত ব্যবহারের সঙ্গে কোনো সমঝোতা নয়।কাজেই ‘বুঝ লোক যে জানো সন্ধান’। বচন দিয়ে জন চিত্ত তোষণ – তেমন সহজ নয়।
সারা পৃথিবীর কাছে ক্ষমা চাইতে হলেও দুখিরাম বলবে – ভালো কবিতা মাত্রই আবৃত্তি যোগ্য নয়। তাই কবিতার নির্বাচন খুব জরুরী হয়ে পড়ে । সাধারণ শিল্পীর প্রথম পছন্দ – ছন্দের ঘনপিনব্ধ প্রকাশ। ধরুন সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত – ‘ ছিপ খান তিন দাঁড় তিন জন মাল্লা, চৌপর দিন ভর দেয় দূর পাল্লা’ । ধরুন নজরুল ‘ ওই জেগেছে পাগলি মায়ের দামাল ছেলে কামাল ভাই, কামাল তুনে কামাল কিয়া ভাই’। যেমন ধরুন অন্নদাশঙ্কর – তেলের শিশি ভাঙ্গল বলে খুকুর পরে রাগ করো, তোমরা যে সব বুড়ো খোকা ভারত ভেঙ্গে ভাগ করো, তার বেলা’?
পরের স্তরে দেখতে হয় মান যতই উচ্চকোটির হোক – অল্প সময়ে গল্প বুঝতে যেন খুব বেশী অসুবিধে না হয় আপামর শ্রোতাদের। ‘দেবতার গ্রাস’ শুরু থেকেই জন-মন গ্রাস করে থাকে। ছন্দের মধ্যে যদি মাঝে মধ্যে ‘ইরম্মদ’ গর্জন হয় – উফ ( দত্ত-কুলোদ্ভব কবির যে কোন পদ্য বা পদ্যাংশ)! একটু কাহিনীর ছোঁয়া থাকলে আরো চমৎকার ( দুই বিঘা জমি, কে যেন রচয়িতা? ) । রচনায় যদি একটু ‘ রম্যাণি বীক্ষ্য ‘ থাকে – সুনীল আকাশ, ছোট নদী কিম্বা শ্যামল বন থাকে – বাঃ( নিমন্ত্রণ, জসিমুদ্দিন) । কোনো ঘটনার বর্ণনার বুনট ও ব্যাখ্যা থাকে – বাঃ বাঃ ( কলকাতার যীশু, নীরেন্দ্রনাথ)। করুন রাগে অস্ফুট বেদনা বয়ে যায় বাঃ বাঃ বাঃ ( অন্ধ বধূ, যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত)। একই রসে প্রথম থেকে শেষ বয়ে না গিয়ে মাঝে মধ্যেই যদি থাকে অন্য রসাভাষ কেয়া বাত। প্রসঙ্গত যদি শুনে নেওয়া যায় জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রর ‘মধু বংশীর গলি’ তর্কের প্রয়োজন হবে না। অত দীর্ঘ পদ্য, কিন্তু বলতে জানলে শ্রোতার চেয়ারে গঁদের আঠা লেগে যায়। এ হল মোটের ওপর কাঠামো নির্মাণ। কিন্তু এর মধ্যেই যদি দাশ-কবিকে এসে দাঁড়াতে হয় তবে তিনি কতটা খড় মাটি পাবেন?
জীবনানন্দের অধিকাংশ কবিতার ছন্দ ঢিলে ঢালা। কখনো তারা নেহাতই গদ্য, যদিও অন্তর্লীন একটি ছন্দ অনুভব করা যায়। ভাষায় কথ্য ও সাধু ভাষার মিশেল, পদ্যে অবশ্য তেমন প্রয়োগ দোষনীয় নয়। আবেগের প্রকাশ সীমিত, অধিকাংশ সময়েই তিনি যেন এক নির্মোহ ভাষ্যকার। ভাবের উচ্চা-বচ তেমন নেই। উপমা বোঝা শ্রমসাধ্য প্রয়াস ( ‘উটের গ্রীবার মত অন্ধকার’ এই উপমা বুঝতে দুখিরামকে শুদ্ধসত্ত্ব বসুর ব্যাখ্যা পড়তে হয়েছিল)। তাঁর বিখ্যাত-তম পদ্য শুরু হচ্ছে ‘ শোনা গেল নিয়ে গেছে তারে, লাশ কাটা ঘরে’। এ বিষয়ে গদ্য লেখাই যায় দিস্তা দিস্তা , কিন্তু পদ্য? – ‘রক্ত ক্লেদ বসা থেকে রৌদ্রে ফের উড়ে যায় মাছি’ বহু সন্ধান করেও এর কোনো নান্দনিকতা খুঁজে পাবেন না কেউ। রূপসী বাংলা যেন তাঁর ইচ্ছাপত্র, পরিচ্ছেদের পরে পরিচ্ছেদ। একটির পরে আরেকটি ঠিক উত্তরাধিকার মেনে আসছে না। ‘ঝরা পালক’ এর কবি স্পষ্টত রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, প্রেমেন্দ্র মিত্রের বন্ধন কাটিয়ে উঠতে পারেননি। শেষ বই ‘ বেলা অবেলা কাল বেলা’ যে একই কবির লেখা – বোঝাই দুষ্কর। ভালোবাসা / প্রেমের কবিতায় মন-রণ-জয় কিছুটা সহজ হয় কিন্তু দাস কবি কি লিখেছেন ? ‘মহিলা’ নাম্নী একটি কবিতায় তেরো পঙক্তির পরে দাঁড়ি পড়ে। মধ্যে রয়েছে পাঁচটি ‘;’ , পাঁচটি ‘ – ‘ দুটি ‘ , ‘ চিহ্ন। এই কবিতারই দ্বিতীয় পর্যায় আরেকটু এগিয়ে গেছে । দাঁড়ি পড়েছে একেবারে শেষে ছত্রিশ পঙক্তির পর। এহ বাহ্য। মহিলার তুলনা টেনে এনেছেন ‘বমার বিমান’ এর সঙ্গে। এ পদ্য কাব্যে পরীক্ষা নিরীক্ষার নিরিখে হয়ত বিশ্বজয়ী হতেই পারে কিন্তু আবৃত্তিকারের পক্ষে রাতের দুঃস্বপ্ন ছাড়া আর কিছু হতে পারে না। তাহলে কেন তিনি বাচিক শিল্পীদের নয়নমণি?
দুখিরাম বলে, জীবনে সমস্ত অনুসন্ধিৎসার তর্কাতিত সমাপন হয় না। কেন একজন বৈজ্ঞানিক বেহালা বাজান, কেন একজন আমলা অবসর নিয়ে পুরো দস্তুর রবীন্দ্র গানে নিজেকে নিয়োজিত করেন, কেন একজন ডাক্তার / রসায়নবিদ হাতে তুলে নেন সাহিত্য সাধনার কলম, কেন একজন খেলোয়াড় খেলা ছেড়ে ধরে পড়েন তানপুরা, একজন সফল ব্যবহারজীবী এড়াতে পারেন না চলচ্চিত্রে অভিনয়ের অমোঘ টান, একজন ভুবন কাঁপানো পণ্ডিত ও তার্কিক, নিঃশর্তে আত্মসমর্পণ করেন মাত্র নাম সই করতে জানা সংসারী সাধকের চরণ তলে , কেন জোনাথন কো, তার লেখা ‘দ্য রটার্স ক্লাব’ উপন্যাসে দীর্ঘতম ইংরেজি বাক্যে লেখেন যার জন্যে খরচ হয় ৩৩ পৃষ্ঠা, ১৩৯৫৫ শব্দ, কেন … ।
আপনারা যদি এটি পড়ছেন তাহলে হয়ত খেয়াল করেছেন একটি মাত্র বাক্যে ৮৫ টি শব্দ রয়েছে, ৫টি কেন। প্রয়োজনে আরো বাড়ানো যেত। এমন কি বিধাতাও স্থির করে দিতে পারেন না কেন এমন করা হচ্ছে। সাহিত্যিকের এই জীবনে পূর্ণ স্বরাজ । তেমনি দুখিরামেরও একটি অভিনব মত প্রকাশের স্বাধীনতা আছে।
তার মত শোনার আগে যদি আর একবার পাঠকরা শ্রী শম্ভু মিত্রের মধুক্ষরা কণ্ঠে শুনে নেন ‘দু এক মুহূর্ত শুধু রৌদ্রের সিন্ধুর কোলে তুমি আর আমি হে সিন্ধু সারস’। কিম্বা ‘শোনা গেল লাশ কাটা ঘরে নিয়ে গেছে তারে ‘। কিম্বা একবার হাঁটতে যান বনলতা সেনের সঙ্গে। সুরঞ্জনাকে বারণ করেন ওই যুবকের সঙ্গে কথা না বলতে। তাহলে … আর কোনো সংশয় থাকবে না। জীবনানন্দ দাশকে বাচিক শিল্পে প্রতিষ্ঠা দেওয়ার অভিজ্ঞান এই অগ্রপথিককেই দিতে হবে।
তিনিই প্রথম দেখিয়েছিলেন – কবি ও পাঠকের এড়িয়ে যাবার প্রবণতা সত্ত্বেও – জীবনানন্দীয় অতীন্দ্রিয়বাদ কি ভাবে কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিয়ে দেওয়া যায়। আমরা খুঁজতে চাইলাম ‘ অর্থ নয়, কীর্তি নয় সচ্ছলতা নয় – আরো কোনো বিপন্ন বিস্ময়’ এর ঠিকানা।
কি ভাবে মনন মজিয়ে দেওয়া যায় রূপসী বাঙলার ধারাবিবরণীর জোয়ারে, আমরা যেন আমাদের নিগূঢ় অন্তরাত্মাকেকে মনে করিয়ে দিচ্ছিঃ
‘বাঙলার রূপ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর’।

গদগদ প্রেমের স্পষ্ট উচ্চারণে নয়, নারীর নান্দনিকতার অতিশয়োক্তির বাইরে – নির্মোহ স্বীকারোক্তি দিয়েও ভালোবাসা আঁকা যায়। এ রকম পরস্পর বিরোধী কথা মালা – যেন নিজেই দুটি সত্ত্বায় দ্বিখণ্ডিত হয়ে প্রশ্ন করছেন একে অপরকে। আমাদের স্বাভাবিক শোভন মুখোস ছিঁড়ে ফেলে ময়না তদন্ত করছেন চিরকালীন লাবণ্যকে ।
ভালোবেসে দেখিয়াছি মেয়ে মানুষেরে,
অবহেলা করে আমি দেখিয়াছি মেয়ে মানুষেরে,
ঘৃণা করে দেখিয়াছি মেয়েমানুষেরে;
আমারে সে ভালবাসিয়াছে,
আসিয়াছে কাছে,
উপেক্ষা সে করেছে আমারে,
মিত্র মশাই নিয়ে যাচ্ছেন ঘর্মস্রাবী জীবনের ওপারে পরাবাস্তবের সৌন্দর্য্য সম্ভাবনায় । বলছেন –
জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি-কুড়ি বছরের পার—
তখন আবার যদি দেখা হয় তোমার আমার!
জেনে কার প্রয়োজন বছর কুড়ি পরে যার সঙ্গে দেখা হবে সে লোল চর্ম কি না? হয়ত স্বামী পুত্র পরিবার নিয়ে সে এখন গলদঘর্ম সংসারী। মিত্র মশাই আমাদের নিদাঘ গ্রীষ্মের প্রহর শীতল করে,ঝরঝর ধারায় বৃষ্টি ভেজার পর এক কাপ গরম চায়ের মত মনে করিয়ে দেন
কি কথা তাহার সাথে? – তার সাথে,
আকাশের আড়ালে আকাশ
মৃত্তিকার মত তুমি আজ;
তার প্রেম ঘাস হয়ে আসে।

এই স্মৃতি বিলাস, নিত্য নৈমিত্তিকতার বেড়া ভেঙে আস্বাদন করা প্রথম শীতের খেজুর রস – কবিতার আশ্রয়ে যাওয়া বোধহয় একেই বলে। সে স্বাদের ব্যাকরণ যদি নাই বা জানা থাকে, যে পদ্যের ‘ আধেক ধরা পড়েছে গো – আধেক আছে বাকি’ সেই দিক শূন্য-পুরের ঠিকানায় আমাদের প্রথম নিয়ে গেলেন মিত্র মশাই। পর্বতারোহী ‘এরিক শিপ্টনের’ মত যে পথে সবাই যায় সে পথ না ধরে – দুখিরামদের মুগ্ধ হতে বাধ্য করলেন। জীবনানন্দ চিরস্থায়ী হলেন বাঙালি সংস্কৃতির অন্দর মহলে।
একজন কবিকে প্রতিটি পাঠক নিজের মত করে বুঝে মুগ্ধ হন। সে তার স্বাধীনতা। দুখিরামও নিজের মত করে বুঝেছে সেই অন্ধকারে প্রকাশিত অনন্ত নক্ষত্র বীথিকে। আপনাদের সঙ্গে তার মতামত মিলতে হবে এমন কিছু পাণিনির দিব্যি নেই। তবে এই সুত্রে যদি আবার শুনতে চান মিত্র – দাশের যুগলবন্দী – তাহাতে এ জগতে ক্ষতি কার?


এই সব ‘ শীতল পানীয়’ বুদবুদ পম রচনা পত্রিকার ভার বাড়ায় – ধার বাড়ায় না। সম্পাদক দ্বয়ের দৃষ্টি আকর্ষন করি।
যে কবির কাব্যভাষা বুঝবার জন্য মাথা খাটাতে হয়,কোথায় লুকিয়ে আছে অলিখিত যতি, খুঁজবার জন্য একমনে ভাবতে হয়,সে ভাষায় প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে শ্রোতার মনোযোগ কেড়ে নেবার ক্ষমতা এই বাংলায় ক’জনের ছিল বা আছে,সেটার সন্ধান পাওয়াটাই কঠিন কাজ।ব্যক্তিগত অনুভবের আয়নায় লেখকের বিস্তারিত আলোচনা মনোরম,সুখপাঠ্য।আমার হায়দরাবাদ বাসকালে একটা নামকরা ক্যাসেটের দোকানে জীবনানন্দের কবিতার আবৃত্তির ক্যাসেট খুঁজে পেয়ে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম।সাথে সাথেই কিনে ফেলেছিলাম।প্রায়ই শুনে কান সার্থক করতাম।সব প্রোথিতযশা আবৃত্তিকারের আবৃত্তির সংকলন ছিল সেটা।এই আলোচনাটি সেই স্মৃতি ফিরিয়ে দিল।
অপূর্ব। প্রিয় বাংলা ভাষার মিষ্টি ও সুস্বাদু রচনা, প্রণম্য কবিদের ও ভাষ্যকারকে জানাই অজস্র প্রণাম। কবি জীবনানন্দ, প্রণাম।