
প্রতিমা বড়ুয়া। লোকগীতির রাজকন্যা। শুধু লোকগীতির রাজকন্যাই নন, আক্ষরিক অর্থেও তিনি ছিলেন রাজকন্যা। তাঁর জন্ম হয়েছিল এক রাজপরিবারে। অসম রাজ্যের গৌরীপুরে।
ধুবড়ি জেলার গৌরীপুর। অসমের প্রান্তিক শহর। অনবদ্য, শান্ত, সুন্দর শহর। একদা এই গৌরীপুর ছিল ছোট্ট দেশীয় রাজ্য। প্রায় ৯০০ বর্গমাইল এলাকা জুড়ে তার বিস্তার। মাটিয়াবাগে টিলার উপর রাজবাড়ি। নাম ‘মাটিয়াবাগ প্যালেস’।
গৌরীপুরের রাজবাড়ির ইতিহাস আর সব রাজবাড়ির সঙ্গে মেলে না। এই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আমাদের বিস্ময়ের অন্ত নেই। মহারাজ প্রভাতচন্দ্র ছিলেন একজন দক্ষ শিকারী ও উচুঁ দরের সঙ্গীত বোদ্ধা। তাঁর পাঁচ পুত্র-কন্যা সকলেই নানা সৃজন দক্ষতায় উদ্ভাসিত।

বড় রাজকুমার প্রমথেশ চলচ্চিত্র জগতের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় চরিত্র। বড় রাজকুমারী নীহারবালা বড়ুয়া লোকসংস্কৃতির একজন বিশিষ্ট গবেষিকা, লোকনৃত্য ও লোকগানের দিশারী চরিত্র। ছোট রাজকুমারী নীলিমাবালা ছিলেন একজন চিত্রশিল্পী। কলাভবনে নন্দলাল বসুর ছাত্রী। চতুর্থ রাজকুমার প্রকৃতীশচন্দ্র (লালজী) ছিলেন হাতি বিশেষজ্ঞ ও শিকারী হিসাবে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন। ছোটকুমার প্রণবেশ একজন দক্ষ বাদ্যযন্ত্রী।
এই সৃজনশীল পরিবারেই জন্ম হল আরও এক কন্যার। তিনি হলেন প্রতিমা বড়ুয়া । প্রকৃতীশচন্দ্র ও মাধুরীলতার অতি আদরের কন্যা শ্রীমতি প্রতিমা। গোয়ালপাড়িয়া লোকগীতকে বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠা করে জীবৎকালেই যিনি হয়েছিলেন এক কিংবদন্তী। তাঁর আর এক বোন পার্বতী বড়ুয়াও ছিলেন একজন বিশ্বখ্যাত হস্তী বিশেষজ্ঞ।
গৌরীপুরের রাজকুমারী প্রতিমার জন্ম কিন্তু কলকাতায়। প্রাথমিক শিক্ষাও কলকাতায়। পরে তিনি গৌরীপুর মহিলা বিদ্যালয়ে ভর্তি হন।
রাজপরিবেশে প্রতিমা বড় হয়ে ওঠেন। রাজবড়িতে সাঙ্গীতিক পরিবেশ ছিল। সন্ধ্যাবেলায় গানের আসর বসত। সেই আসরে পিসিমাদের সাথে প্রতিমাও যোগ দিতেন। পিতা প্রকৃতীশচন্দ্র বড়ুয়া কখনই তাঁকে নিরুৎসাহিত করেননি। পিতার উৎসাহেই এক অসীম সাহসী মনের মেয়ে হয়ে উঠতে পেরেছিলেন প্রতিমা।
প্রতিমা বড়ুয়া ছিলেন প্রকৃতপক্ষে এক বিরল ব্যতিক্রম। শরীরে রাজরক্ত প্রবাহিত হওয়া সত্ত্বেও জল -জঙ্গলের ধারে ঘর করা গরিব মানুষগুলোর সাথে আত্মীয়তা গড়ে তুলেছেন। তাদের সুখ-দুঃখের অংশীদার হয়েছেন। ছিলেন রাজকন্যা আর গাইতেন চাষাভুষো, মাঝি আর মাহুতের গান।
গৌরীপুর হল নদী, মাঠ, মানুষ, ইতিকথা আর ঘরবাড়ির মধ্যে মিশে থাকা লোকগান ও লোককথার মায়াময় দেশ। গৌরীপুরের পাশ দিয়ে চলে গেছে সরু ফিতের মত গদাধর নদী আর সেই নদীর ওপাশ থেকে বাতাসের মত হু হু করে ছুটে আসে গান –
‘ও কি ও’ বন্ধু কাজল ভোমরারে,
কোন দিন আসিবেন বন্ধু
কয়া যাও, কয়া যাও রে… ‘

হাতি দেখতে দেখতেই বড় হয়েছেন রাজপুত্র রাজকন্যারা। ছিল হাতি মহল। প্রায় সকলেই হাতি বিশেষজ্ঞ। রাজকুমারদের সকলেরই একটা করে হাতি ছিল।
সবাই কিশোর বয়স না পেরোতেই শিকারে ওস্তাদ। নিখুঁত নিশানা। নিখুঁত টিপ। ঘরের ছেলে-মেয়ে সবাই বন্দুক চালনা, শিকার করা, হাতির পিঠে চড়া, এমনকি দিনের পর দিন জঙ্গলে থাকতেও ওস্তাদ হয়ে উঠেছিলেন।
প্রতিমাও একসময় রাইফেল ধরেছিলেন। নিজের হাতে ছ’টা চিতাবাঘ এবং একটা ডোরাকাটা বাঘ গুলি করে মারেন।
মহারাজ প্রভাতচন্দ্রের অবর্তমানে রাজ্যের ভার প্রকৃতীশচন্দ্রের উপর। কারণ বড় ছেলে প্রমথেশচন্দ্র দায়িত্ব নিতে চাননি। তিনি কলকাতায় চলচ্চিত্র নিয়ে মেতে আছেন।
গদাধর নদীর পাড়, রায়মনা জঙ্গল, রায়ডাক নদীর পাড় বাবার সাথে চষে বেড়িয়েছেন প্রতিমা। গোয়ালপাড়া অঞ্চল ছিল ঘন অরণ্য। সেই অরণ্যে থাকত শয়ে শয়ে হাতি। হাতি ধরতেন তাঁর বাবা প্রকৃতীশচন্দ্র।
বাবার সঙ্গে বনেও যেতেন প্রতিমা। হাতি ধরার জন্য যেখানে তাঁবু খাটানো হত, তার একদিকে থাকত মাহুতদের তাঁবু, আর অন্যদিকের তাঁবুতে বাবার সঙ্গে থাকতেন প্রতিমা । মাহুতরা গান গাইত। সেই গান শুনে শুনে গাইতেন প্রতিমা।
জঙ্গলের নিঃঝুম পরিবেশে পাতা ঝরার শব্দও টের পাওয়া যায় । তাই মাহুতরা নিচু স্কেলেই গাইতেন। সেইজন্য প্রতিমার গানও নিচু স্কেলেই।
নদীর বাঁকে বাঁকে চর অঞ্চলে ছিল মোষের বাথান। চরত মহিষ। মহিষের পিঠে চড়ে মইষাল গাইত। রাজবাড়িতে বুনো মোষ ধরার ফাঁদও ছিল। মইষালদের গান শুনেও প্রতিমা শিখে নিতেন সেইসব গান –
”প্রাণ কাঁদে মোর মইষাল বন্ধু রে-
মইষ চড়ান, মইষাল বন্ধু ঘাটের উজানে…। “
হাতির গান তৈরি হত হাতিকে বশ করার সময়। দোতারার ডাং ও সুর হাতিকে মোহিত করত। গানের মধ্য দিয়ে কথার ফাঁকে ফাঁকে যে সুর নেমে আসে তা হৃদয় নিঙড়োনো। মোষ চড়ার চলনের ছন্দ, হাতির চলনের ছন্দ প্রতিমার গানে অনায়াসে চলে আসত।
শ্রমের গান, দুঃখের গান, প্রেম-ভালোবাসার গান- তার আবার জাতপাত কী? মাহুতের গানেও কোনো জাতপাতের বালাই থাকত না। হিন্দু, মুসলমান একসুরে, একসঙ্গে গাইত ‘আল্লা রসুল’। ছাউনির পরিবেশটাই বদলে যেত। রাতের নিস্তব্ধতাকে ভেঙে দিয়ে ধ্বনিত হত —
“কোন মহালের হাতিরে ভাই
হায় আল্লা রসুল…”
প্রতিমা বলেছেন “আমার জীবনের থিম সং এখান থেকেই গঠিত হয়েছিল। এই ছিল আমার ‘মিউজিকের ‘ইনস্টিটিউশন”। আর প্রেরণা জুগিয়ে ছিলেন তাঁর বাবা প্রকৃতীশচন্দ্র। “বাবার সান্নিধ্যই মোক আজিকার এই পথর পথিক ক’রিল।”
শুধু হাতির গান নয়, ভাওয়াইয়া, চটকা, মইষাল, গাডিয়াল, হাতি, নদী সব ধরনের গান প্রতিমার কণ্ঠে মূর্ত হয়ে উঠত। মানুষ মোহিত হয়ে তাঁর গান শুনত। সুরে ও কথায় তিনি নিয়ে যেতেন গানের এক অন্য ভুবনে। তাঁর গান এনে দিত লোকসঙ্গীতের নতুন স্বাদ। গানের পরতে পরতে ছিল বিস্ময় আর আনন্দ!
রাজবাড়ির অন্দরমহলে লোকসংস্কৃতির চর্চা যেমন ছিল, তেমনি নাগরিক সংস্কৃতিরও চর্চা ছিল। রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুলগীতি, শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের নিয়মিত চর্চা হত।
গৌরীপুরের স্কুলে গানের প্রতিযোগিতায় প্রতিমার পুরস্কার ছিল বাঁধা। কে তাঁকে হারাবে? সেখানে তিনি গাইতেন দু’খানি রবীন্দ্রসঙ্গীত- ‘তোমরা যা বলো তাই বলো/ আমার লাগেনা ভালো’, আর অন্যটি হল ‘আজি বিজন ঘরে নিশীথরাতে /আসবে যদি শূন্য হাতে।’
গোয়ালপাড়িয়া লোকগানেরও প্রতিযোগিতা হত। সেখানেও প্রতিমা প্রথম। গাইতেন দুটি গান। প্রথমটি ‘হস্তীর কন্যা হস্তীর কন্যা, অন্যটি ‘ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে রে। ‘
প্রতিমা বড়ুয়া প্রথম গোয়ালপাড়িয়া গান গেয়েছিলেন কলকাতার নিউ এম্পায়ারে । ছোট পিসিমা নীলিমাবালা বড়ুয়া সঙ্গীতসন্ধ্যার আয়োজন করেছিলেন। প্রতিমার এটিই ছিল প্রথম লোকগান পরিবেশনা। মধুরকণ্ঠী গীতা দত্তও সেই অনুষ্ঠানে গান গেয়েছিলেন। উপস্থিত ছিলেন প্রমথেশ বড়ুয়া। সেদিন শ্রোতারা মন প্রাণ ঢেলে প্রতিমার গানের প্রশংসা করেন।

১৯৫৩ সালে গৌরীপুর থেকে প্রতিমা ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেন। ভালভাবে পাশ করেন। কলেজে ভর্তি হতে আবার কলকাতায় যান। সাউথ ক্যালকাটা গার্লস কলেজে ভর্তি হন। দু বছর পড়েন। পরীক্ষা দেননি।
কলকাতায় পড়াশোনা । গৌরীপুরে বাড়ি। লেখাপড়ার জগত ছেড়ে প্রকৃতি ও গানের ভুবনে পৌঁছে গেলেন প্রতিমা । আর কখনো ফিরে তাকাতে হয়নি।
১৯৫৫ সাল। প্রতিমা তখন একুশ। ভূপেন হাজারিকা এলেন গৌরীপুর। গানের আসর বসল। ভূপেন হাজারিকা গাইলেন তিনটি গান। শেষ গানটি ছিল –
“সাগর সঙ্গমত, কতনা সাতুরিলোঁ/ তথাপিতো হোরা নাই ক্লান্ত…”
ভূপেন হাজারিকার গান শুনে প্রতিমা মুগ্ধ।
সবার অনুরোধে সেই আসরে গাইলেন প্রতিমা। মন প্রাণ ঢেলে গাইলেন –
”হস্তীর কন্যা হস্তীর কন্যা বামোনের নারী।
মাথায় নিয়া তামকলসী ও সখী, হাতে সোনার ঝারি…। “
ভূপেন হাজারিকা বললেন মেয়েটির সুরে একটা বাড়তি গুণ আছে যা কোথাও শুনিনি । নিয়মিত গান গাইলে বড় শিল্পী হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
ভূপেন হাজারিকার প্রশংসায় মন ভরে গেল প্রতিমার। সেদিনই ঠিক করলেন গানের জগতেই দিন কাটাবেন।
১৯৫৬ সাল। ভূপেন হাজারিকা আবার এলেন গৌরীপুরে। সিনেমা করছেন তিনি। এ্যারাবাটোর সুর। ঐরাবতের সুর। এই অসমিয়া ছবিতে দেশি গান দিতে চান। প্রতিমার কথাই মনে পড়ল। তাঁকে দিয়ে গাওয়ালেন –
“”ডাং নোবি ডাং /দড়ি দিয়া বান্ধ
মার এক ডাং/ গুন গুন সরকার…”
আর একটি গান ” ও বিরিকক শিমিলারে /গগনে মেলে ডাল
নারী হয়া ড় রসের যৈবন /রাইকপো কত কাল রে..। “
প্রতিমার নাম ছড়িয়ে পড়ল সব দিকে। প্রশংসার বন্যা বইতে লাগল। কিন্তু পরিবারে মা, জ্যেঠিমা, কাকিমাদের আপত্তি। ভদ্রসমাজের গান নয়। দোতারার সঙ্গে হেথা হোথা গান গেয়ে বেড়ালে মেয়ের বিয়ে হবে কী করে?
এগিয়ে এলেন বাবা প্রকৃতীশচন্দ্র। বললেন, ‘দোতরা বাজিয়ে গান করলে বিয়ে যদি না হয়, নাই বা হোক একজনের। কী আর হবে? সবারই কি বিয়ে হতে হবে?’
অতএব গানের তরী এগিয়ে চলল প্রতিমার। তরতর করে। গান, শুধু গান। তাঁর বর্ণময় জীবন ভরে উঠতে থাকে নদীর ধারে লোককথার দেশে, লোকগানের সুর তুলে তুলে –
“অ মোর গৌরীপুরিয়া মাহুত কান্দেরে
সখী ঘরবাড়ি ছাড়িয়া…”।
শুধু যে গাইতেন তা তো নয়, গান কুড়োতেন। এ তো শুধু ফুল কুড়োনো নয় , কঠিন এই গানের কথামালা সংগ্রহের কাজ। গোয়ালপাড়িয়াই নয় শুধু, লোকগান সে রাজবংশী, কামরূপী যে ভাষাতেই হোক না প্রতিমা তাঁকে শীর্ষে পৌঁছে দিয়ে গেছেন।
ছোটবেলা থেকেই পরিশ্রম করে শ্রমজীবী মানুষের অবসর যাপনের গান অবিকল সুরে ও কথায় নিজের কণ্ঠে তুলে নিয়েছেন প্রতিমা। একটুও কথার বদল করেননি, একটুও সুরের বদল করেননি। অসম্ভব দরদ দিয়ে গেয়েছেন মইষাল জীবনের সুখ দুঃখের গান..
“ধিকো ধিকো ধিকো মইষাল রে/ মইষাল ধিকো গাবরালি
এ হেন সুন্দর নারী ক্যমনে যাইবে ছাড়ি/ মইষাল রে….। “
১৯৫৭ সাল। তাঁর বাবা প্রকৃতীশচন্দ্র তখন বিধায়ক। বিধানসভার অধ্যক্ষ দেবকান্ত বড়ুয়া। সবাই মিলে বিহুর আয়োজন করেছেন শিলং শহরে । বিহুর সেই বিশাল মঞ্চে জনসাধারণের দরবারে প্রথম গাইলেন প্রতিমা। মঞ্চে তাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটল। শুরু হল শিল্পীজীবনের।
ঐ বছরেই অর্থাৎ ১৯৫৭ সালেই ভূপেন হাজারিকা আবার এলেন গৌরীপুরে। আবার ছবি করবেন। এবার চাই মাটির গান। আবার ডাক পড়ল প্রতিমার। সেবার অনেকগুলি গান গাইলেন প্রতিমা। তার মধ্যে ছিল সেই বিখ্যাত গান-
” ও তোমরা গেইলে কি আসিবেন মোর মাহুত বন্ধু রে।’
হস্তী নরাং হস্তী চরাং হস্তীর গলায় দড়ি
ওরে সত্য করিয়া কনরে মাহুত কোন বা দেশে বাড়ি রে…..।”

ড. হাজারিকা গানটি শুনে এতই অভিভূত হলেন যে তাঁর ছবির নাম বদল করে রাখলেন ‘মাহুত বন্ধু রে ‘। আর এই গানটিই হল ছবির টাইটেল সং। শুধু তাই নয়, প্রতিমার সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে নিজেও গাইলেন সেই গান। সেটাই প্রতিমার জীবনের সেরা স্বীকৃতি, মর্যাদা, পুরস্কার।
“মাহুত বন্ধুরে” ছবির শুটিং হয়েছিল গৌরীপুরে এবং সন্নিহিত বনাঞ্চলে। পুরো ইউনিটের দেখাশোনা করার ভার নিপুণভাবে সামলেছেন প্রতিমা।
বড়ুয়া রাজপরিবারের সাংস্কৃতিক অবদানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল ছিলেন বরেণ্য চিত্রপরিচালক ঋত্বিক ঘটক। তাঁর প্রিয় শিল্পী ছিলেন প্রতিমা। তিনি তাঁর ‘বগলার বঙ্গদর্শন’ ছবির জন্য আটটি গান গাইয়ে ছিলেন প্রতিমা বড়ুয়াকে দিয়ে। কিন্তু দুর্ভাগ্য ছবিটি শেষ হয়নি।
‘ঋত্বিক ঘটক আমাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন। বাবাকে বলেছিলেন। বাবা বলেছিলেন বিয়ে যাকে করতে চাইছ, তাকেই গিয়ে প্রস্তাবটা দাও। ঋত্বিকদা বোধহয় সাহসে কুলিয়ে উঠতে পারেননি।’
শুরুতেই ছবিতে গাইতে পেরেছিলেন বলে প্রতিমা কম সময়ে অধিক মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন। ফলে গানের জগতে এগিয়ে যাওয়া তাঁর কাছে আরও সহজ হয়ে গেল। ১৯৬০ সালে অডিশন দিয়ে আকাশবাণীর শিল্পী হলেন। গুয়াহাটি কেন্দ্রে প্রতিমার গান রেকর্ড করা হল। তাঁর প্রথম গানের রেকর্ড -‘
“একবার হরি বল মন রসনা
মানবদেহের গৈরব কোর না…’
তারপর ধীরে ধীরে দেশের প্রায় সকল বেতারকেন্দ্র থেকেই প্রতিমার গান শোনা যেতে লাগল। আকাশবাণীর সম্মেলনে তিনি নিয়মিত আমন্ত্রিত হতেন। বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে তাঁর সাক্ষাৎকার প্রচারিত হয়।
হাজার হাজার শ্রোতার সামনে প্রতিমা বড়ুয়া গান করেছেন। আসামের মাটিতে করেছেন। আসামের বাইরে করেছেন। প্রতিমা নিজেই একটা ঘরানা। নিজের জাত চিনিয়েছেন। যে ঘরে জন্ম আর যে কণ্ঠসম্পদ ছিল তাতে বিদেশেও যেতে পারতেন।
প্রতিমা বড়ুয়া ধীরে ধীরে ভারতীয় সাংস্কৃতিক জীবনের অঙ্গ হয়ে উঠেছেন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, নির্মলেন্দু চৌধুরী, দ্বিজেন মুখোপাধ্যায় ও অন্যান্যরা তাঁর গান ভালোবাসেন। উত্তমকুমার, সৌমিত্র, রুমা গুহঠাকুরতা প্রমুখ শিল্পীরা তাঁকে বাড়িতে আমন্ত্রণ করে নিয়ে গিয়ে তাঁর অপূর্ব কণ্ঠের গান শুনেছেন।
প্রতিমা বড়ুয়া শান্তিনিকেতনেও গান পরিবেশন করেছেন। ‘ বিশিষ্ট শ্রোতারা ছিলেন রামকিঙ্কর বেজ, শান্তিদেব ঘোষ , কণিকা বন্দোপাধ্যায়, সুচিত্রা মিত্র, পূর্ণদাস বাউল, মঞ্জুদাস বাউল। সেখানে গাইলেন-
“আরি ও মোর ভাবের দেওরা
থুইয়া আইসেক মোক, বাপ ভাইয়ের দেশে…।”
গানে গানেই পার হয়ে এলেন জীবনের অর্দ্ধেক পথ। ভাবছিলেন বাকী জীবনটা গান গেয়েই কাটিয়ে দেবেন। কিন্তু হল না। তাঁর জীবনে এল এক যুবক।
১৯৬৯ সালে প্রতিমার বয়স যখন ৩৫ তখন তাঁর বিয়ে হল। পাত্র হলেন গৌরীপুরের প্রমথেশ বড়ুয়া নামাঙ্কিত কলেজের ইংরেজির অধ্যাপক গৌরীশঙ্কর পাণ্ডে। সম্পূর্ণ অজানা, অচেনা এক লোক। গৌরীশঙ্কর পাণ্ডে ছিলেন উত্তরপ্রদেশের রায়বরেলীর রক্ষণশীল পরিবারের ব্রাহ্মণ সন্তান।
রাজকন্যা হলেও বিয়েতে ধুমধাম হল না বিশেষ। মাটিয়াবাগ প্যালেসের পাশেই এক সাদামাটা শিবমন্দিরে বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পন্ন হল। প্রতিমা বড়ুয়া হলেন প্রতিমা পাণ্ডে বড়ুয়া। দুর্ভাগ্যের বিষয় এ বিয়ে সুখের হয়নি।
কেমন ছিল তাদের দাম্পত্য জীবন? প্রতিমা পাণ্ডে বড়ুয়া নিজেই বলেছেন –
“আমাদের সম্পর্ক ছিল most artificial. I am a girl from Gouripur. not a girl, but a woman. He is a man from UP – মেলানোর চেষ্টা করেও মেলাতে পারিনি। এটা সংস্কৃতির পার্থক্য। তিনি ধূমপান বা মদ্যপানের বাইরে থাকেন, নিরামিষ খান, আমি আমিষ খাই। Still I respect him very much. I adore him till now.”
উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া রাজরক্তের কারণে প্রতিমা বড়ুয়া ছিলেন কিছুটা বেপরোয়া স্বভাবের। পরিবারের পুরুষদের চেয়েও তিনি ছিলেন স্বাধীনচেতা।
রাজপরিবারের উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন পদ্ধতি তাঁকেও ছুয়ে গেছে। মদ্যপান ও ধূমপানের নেশা ছাড়তে পারেননি।
প্রতিমা স্বামীর অবদান অস্বীকার করেননি। বলেছেন -‘সমাজে আজ আমার যতটুকু অবদান তা ওঁর জন্যই।.. .খাদ্যাভ্যাস ও চিন্তার পার্থক্য -এ সব আমি মেনে নিতে পারিনি। কিন্তু তাঁকে আমি এই কারণেই ধন্যবাদ দিই আমার মত এরকম একজন আইনকানুন না মানা, বেপরোয়া মানুষের সঙ্গেই জীবনটা কাটিয়ে দিলেন। আমার মতো মানুষকে ট্যাকল করা বড় মুশকিল।’
বিয়ের পর দু’দশক তাঁদের সংসার জীবন মতের নানা অমিল সত্ত্বেও বিচ্ছিন্ন ছিল না। বাবা মারা যাবার পর প্রতিমার মনটা ভেঙে গিয়েছিল। এতদিন বড় মানুষের আশ্রয়ে ছিলেন। আশ্রয়হীন হয়ে বড় বেশি বেসামাল হয়ে পড়েছিলেন।
১৯৮৯ সালে এসে দুজনের সম্পর্ক বদলে গেল। মনের দরজা বন্ধ। কথা হত না দুজনের। পাশাপাশি থেকেও দুজনে ছিলেন দুই ভিন্ন পৃথিবীর মানুষ।
রাজকন্যা হলেও রাজবাড়ির সম্পদে তাঁর কখনও কোন লোভ ছিল না। বলতেন ‘দরকারে গাছতলায় থাকব। রাজবাড়িতে একসময় অনেক মোহর ছড়ানো ছেটানো দেখেছি। থাকল কই?’
“…’টাকা পয়সা ভিটে বাড়ি/ জীবন গেলে সব রইবে পড়ি.. . অ জীবন রে…”
গ্রামের ব্যথা আনন্দে ভরা সুর তুলে ধরার কঠিন সাধনার পুরস্কার তাঁর জীবনে এসেছে বহুবার। পেয়েছেন ‘পদ্মশ্রী’। পেয়েছেন ‘ডি লিট’। গান গেয়ে পাওয়া সমস্ত সম্মানফলক, এমনকি পদ্মশ্রী ফলকও ঘরের কোণে পড়ে থাকে। সেদিকে তাঁর কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই। সেগুলি যত্ন করে তুলে রাখেন তাঁর স্বামী।
রাজপরিবারের মেয়ে হয়েও গানের স্বার্থে, শিল্পের স্বার্থে নিজেকে ভেঙেছেন অবিরত, আর সেই ভেঙে যাওয়া থেকে গড়ে উঠেেছে গানের প্রতিমা, প্রতিমার গান। গার্হস্থ্য নিয়ে ভাবেননি, শৌখিনতা নিয়েও নয়। সাধারণ ভাবে থাকতেন, পোশাকআশাকও সাধারণ। কপালে বড় করে লাল টিপ, কি অসাধারণ সৌন্দর্য, ব্যক্তিত্ব!
প্রিয় জিনিস চুড়ি। দ্বিতীয় প্রিয় জিনিস হাওয়াই চপ্পল। সর্বহারাদের এমন স্বপ্ন থাকতে পারে। কিন্তু রাজকন্যার? রক্তের দিক দিয়ে তিনি রাজকন্যা ছিলেন। কিন্তু মানুষ হিসাবে ছিলেন সাধারণ। প্রতিমার ব্যাগে থাকত চুড়ি, চিরুনি, সিগারেট আর দিয়াশলাই।

প্রতিমা যে বাড়িতে থাকতেন তারও জীর্ণ চেহারা। লোকগানের সম্রাজ্ঞীর সেটাই ঠিকানা। ঘুমোনোর ব্যবস্থা আরো বিচিত্র। একটা বেঞ্চি বলাই ভালো। তাতে একটা মাদুর বিছানো। রাত নামলেই বিষণ্ন হয়ে পড়তেন, স্মৃতিকাতর হয়ে যেতেন। রবি ঠাকুরের ক্ষুধিত পাষাণের মত নিস্তব্ধ, নীরব মায়াপুরীর শূন্যতা তাঁকে গ্রাস করে ফেলত।
দুই কন্যাসন্তানের জননী প্রতিমার মন শেষের দিকে একটা বিষণ্ণতায় ছেয়ে থাকত। স্বামীর সঙ্গে বনিবনা নেই। দেখেছেন রাজবাড়ির জাঁকজমক ধীরে ধীরে কেমন যেন ম্লান হয়ে গেল। তাঁর জীবন ও গান যেন একাকার হয়ে গেল-
‘দিনে দিনে খসিয়া পড়িবে রঙ্গিলা দালানের মাটি
গোঁসাইজী কোন রঙ্গে…।’
শেষ জীবনে তাঁর টাকাপয়সার সত্যিই অভাব ছিল। সরকার থেকে মাসে ১৫০০ টাকা পেনশন পেতেন। তাও নিয়মিত পেতেন না। অগোছালো দৈনন্দিন জীবনে খেই হারিয়ে ফেলতেন। দারিদ্র্যপীড়িত জীবন কাটিয়ে গেছেন।
দুঃখ করে বলেছিলেন -‘আমি নাকি ড. প্রতিমা বড়ুয়া! আমার পরনের শাড়িখানা দেখ,… শিল্পী পেনশনের নামে যেটুকু অর্থ পাই তাতে আমার পেট ভাতেরই জোগাড় হয় না, সংসারই চলে না। তবু আমি গান গেয়ে চলি।… গানকে আমি ভালোবাসি… জাতি ধর্ম নির্বিচারে যেই ডাক দেয়, সেখানেই আমি গান গেয়ে আসি, গেয়ে যাই, গেয়েই যাব জীবনের গান..’
“কচুর পাতের পানি যেমন রে /ও জীবন টলমল টলমল করে
ওই মতন মানুষের দেহা/ কখন ঢলিয়া পড়ে জীবন রে…..।”
স্মৃতি রোমন্থন করতে প্রতিমা ভালোবাসতেন না। বলতেন আমি শিল্পী মানুষ এ বিষয়ে আমার কোন আগ্রহ নেই। বলেছেন-
”ঊনচল্লিশ বছর ধরে আমি গান গাইছি। I believe l have the folk songs of Goalpara. Till my end, I’ll sing these songs.”
আসামের তেজপুর থেকেই বুঝি শেষ ডাকটা এল। শেষের সে দিনের কথা ভূপেন হাজারিকার কলমে-
” তেজপুরে অনুষ্ঠান ছিল। গৌরীপুরের বাড়ি ফিরছিল। রাস্তায়ই অসুস্থ। সব খবরই আসছিল খুব দ্রুত। গুয়াহাটি আসার পর তাঁকে দেখতে গেলাম। গাইতে বলল। এতদিন ধরে যার সঙ্গে গেয়েছি, যাকে দিয়ে গাইয়েছি কত, সে গাইতে বলছে। গলা মেলাচ্ছিল প্রতিমা-
…..সত্য কইরা কননা মোর মাহুত বন্ধু রে…
প্রতিমার গলা বুজে এল…
প্রতিমা মারা গেল ২৭ ডিসেম্বর।(২০০২)”

২৮ ডিসেম্বর সকাল ৮টায় গৌরীপুরে শিল্পীর মৃতদেহ পৌঁছায়। বিকের ৪টায় শ্মশানে তাঁর মুখাগ্নি করেন স্বামী গৌরীশঙ্কর পাণ্ডে। তাঁর নশ্বর দেহ পুড়ে যায়। যখন তাঁর দেহ পুড়ছিল, কয়েকশো মানুষ দোতরায় একসাথে সুর ধরে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছিল-
“অ জীবন রে ছাড়িয়া না যাইছ মোকে
তুই জীবন ছাড়িয়ে গেইলে
আদর কইরবে কাহায় জীবন রে..?”
প্রতিমা ভাসানে গেছে । সময় বয়ে গেছে নিজের খেয়ালে। কিন্তু রয়ে গেছে প্রতিমার গান। গদাধরের দু পাশে হলুদ সর্ষেক্ষেতের উপর দিয়ে বাতাসে এখনো ভেসে আসে রাজকুমারীর জাদুকণ্ঠের গান-
“ও মোর বন্ধুধন রসিয়া
দেখা দাও মোকে একবার আসিয়া…।”
সহায়ক বই : মাহুত বন্ধু রে — শ্যামল চক্রবর্তী।
ছবি : ঐ বই থেকে।
(বিঃ দ্রঃ পাঠকদের অবগতির জন্য জানাই যে সুপ্রাবন্ধিক সুজয় কর্মকারের কিছু মনোজ্ঞ প্রবন্ধ কয়েক বছর আগে রবিচক্রের ফেসবুকের পাতায় বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছিল, যেগুলি আমরা রবিচক্রের আন্তর্জালিক পত্রিকায় মাঝেমাঝে পুনঃপ্রকাশ করে চলেছি। রবিচক্রের এই স্বজন কিছুকাল আগে প্রয়াত হন। তাঁর স্মৃতির প্রতি এটি আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য। – সম্পাদকদ্বয়)

