
আমার শিশু দেখা এবং বারবার দেখার অভ্যেসটা আমাকে ভরাট করেছে সারাজীবন ৷ হ্যাঁ – এ বিষয়ে মোটামুটি নিঃসন্দেহ আমি ৷ কবে থেকে নিজের সম্বন্ধে এমন নিঃসন্দেহ হওয়ার শুরু আমি জানি না ৷ তবে শিশুরা যখনই মিশেছে আমার সঙ্গে – গল্প তৈরি করে গেছে ৷ একটি সুতোর টানে মালা হয়ে কণ্ঠে ঝোলে গল্পগুলো ৷ মালাটাকে যখন নাড়িচাড়ি নিজেকে কৃষ্ণ লাগে ৷
সেবার প্রচণ্ড গরমে গেছি ফতেপুর সিকরি দেখতে ৷ ভারতের শ্রেষ্ঠ মুঘল সম্রাটের অতি প্রজ্ঞা ও বৈভবে বানানো সিকরির একটি ঘরের মেঝেতেও তাপে পা রাখা যাচ্ছে না — এত গরম তখন ৷ চারদিকে মুঘল ইতিহাস বিশেষজ্ঞ গাইড ঘুরছেন ৷ নিজেরাই নিজেদের বিশেষজ্ঞ বলছেন এবং স্থানে স্থানে পছন্দমতো টুরিস্ট জুটিয়ে বিশেষ ইতিহাস বকে যাচ্ছেন ৷ সবার বর্ণিত ইতিহাস একরকম ৷ বেচারী বিদেশি টুরিস্টরা বুঝতেও পারছেন না চারদিকের হাওয়ায় একই ইতিহাস চলছে ৷ সবাই ভাবছেন — তিনিই সেরা ও সঠিকটা শুনছেন ৷
ভুল ও রোদের অনন্ত প্রবাহে তখন ক্লান্ত আমি ৷ দুপুর এসে গেছে ৷ তখনো কিছু দেখিনি ৷ রোদ বাঁচাবার জন্য মাথায় ঘোমটা টেনে বসে আছি ৷ সেদিন পরেছি তাঁতের জরিপাড় শাড়ি ৷ চোখ বুজে আসছে গরমে মাথাখানি সামান্য ঠাণ্ডা রাখতে পেরে ৷ হঠাৎ কোলে ধপাস ৷ দেখি সাদা চুসত পাজামা পাঞ্জাবি আর চুমকি টুপি পরে এক খোকা আমার গলা জড়িয়ে ধরেছে ৷ প্রশ্ন না করে আমার জ্যান্ত তাকিয়া আরো টেনে নিলাম ৷ আমার চোখের পাতার একদম কাছেই তার ছোট্ট চোখ – হাঁ করে আমারই দিকে তাকিয়ে ৷ চোখে সুর্মার ব্যাপক মোটকা লাইন ৷ বললাম — একী সাজ রে ! উর্দু সিনেমায় নামবি নাকি? গম্ভীর প্রজাতির পাখির গলায় সে বলল –না উর্দু বলব ৷ আমি ভালো শিখেছি ৷ আমি বললাম –কী? উর্দু না ভুল ইতিহাস ৷ সে আরো গম্ভীর ৷ বলল –দুটোই ৷ চল ৷ কোথায় তা কে জানে ! জিজ্ঞেসও করিনি ৷ আমার হাতের মধ্যে তার হাত ঢুকে এসেছে কখন ৷ নাম দিলাম –উর্দু খোকা ।

ভাবের ঠিক পরপর উর্দু খোকার চোখ গেল আমার ঘোমটার দিকে ৷ দুদিকে মাথা নাড়ল ৷ তারপর জরিপাড়ের ঘোমটাটিকে কানের দুপাশ দিয়ে চুলের ওপর ভালো করে পেতে দিল ৷ এবার ঘোমটার ওপর বসিয়ে দিল তিন চারটে ফুলের ঝুড়ি ৷ ওই যে ঝুড়িগুলো করে সেলিম চিস্তির দরগায় পুজো দিয়ে থাকি ৷ আমার শাড়িটা নিচু করে নামিয়ে দিল মাটি অব্দি যাতে কেউ পা দেখতে না পায় ৷ পাকামি দেখে বকতে যাচ্ছিলাম ৷ দেখি কোথা থেকে দুটো পুরুষ হাওয়াই চটি আমার পায়ে গলিয়ে দিল ৷ তারপর hebby সন্তুষ্ট গলায় উর্দুতে বলল — আর গরম লাগবে না ৷ কখন যে তাকে গরম লাগার কথা বললাম মনে পড়ল না ৷ তবে আমার সঙ্গে কথোপকথনে ওই তার প্রথম উর্দু বাক্য ৷ একদম নিখুঁত ৷
কী তার ধ্বনি,প্যাটার্ন, intonation ৷ মুগ্ধ হয়ে গেলাম ৷ প্রশ্ন করে জানলাম –তার দিদার কথায় স্কুলের মাস্টারমশায়ের কাছে অনেক যত্নে সে এই ভাষাটি শিখছে ৷ বাড়িতে চর্চার লোক পায় না বলেই সে ফতেপুরের প্রাসাদে টুরিস্ট জুটিয়ে ঠিক উর্দুতে অনর্গল ভুল ইতিহাস বকে যায় ৷ সন্ধেবেলা গলা যখন ব্যথা হয় সে বোঝে উর্দু তাকে ছুটি দিয়েছে এবং সে দিদার কাছে যায় ৷ বুঝলাম –সে তার প্রিয় ভাষাটিকে একটি প্রাণময় মানুষ বানিয়ে ফেলেছে ৷ সারাদিন তার হাতখানি ধরে কখনো তার মাংসল গাল বাহু ইত্যাদি মন দিয়ে চটকে ফতেপুর দেখা শেষ করলাম ৷ একটি কক্ষে নিয়ে গিয়ে সে মুঘল স্থাপত্যের কারিকুরি বোঝাচ্ছিল যখন –যখন বোঝাচ্ছিল কীভাবে জাফরির বিশেষ ফাঁক দিয়ে সকালের প্রথম রোদ কিংবা বাদলের প্রথম মেঘ দেখা যায় –মনে আছে আমি মেঝেতে উপুড় হয়ে কচ্ছপের মতো হয়ে গিয়েছিলাম ৷ বারবার বলছিলাম –আমার পিঠে বসে আরেকবার তোর ভাষায় বোঝা তো দেখি ব্যাপারটা ৷ গাম্ভীর্য আর হতভম্ব ভাবটা পুরো চেপে উর্দু খোকা যতদূর সম্ভব স্বাভাবিকভাবে আমার পিঠে আসনপিঁড়ি হয়ে বসেছিল ৷

সন্ধে এল ৷ ধুলোঝড় নামল ৷ আমি আর আমার খোকা পরস্পরকে জাপটে ধরে কাঁপাকাঁপি করলাম ৷ যত না ঝড় – জড়িয়ে থাকার ইচ্ছে তার দ্বিগুণ ৷ যাওয়ার কালে নিলে না সে কোনো পয়সা ৷ বললে –সে শুধু উর্দু বলতেই আসে ৷ পয়সা নিলে গাইড দাদাদের ভাত মারা যাবে ৷ তার গাইড দাদারা খুব গরিব ৷ এক ঠোঙা উত্তরভারতীয় মশলা দেয়া মুড়ি কিনে দিলাম ৷ ফতেপুরের সিঁড়ি দিয়ে লাফাতে লাফাতে চলে গেল ৷ একবারও পিছু ফিরল না শয়তানটা ৷ আমিও ডাকিনি পিছু — চারপাশের ভুল ইতিহাসের ঝড়বাতাসে একাই থাকলাম ৷
–ওর আবার একটা মা জুটে যাবে ঠিক ৷

