
ফাঁসির আগে কানাইলালের ওপর আসন্ন মৃত্যুর কেমন প্রতিক্রিয়া হয়েছিল, তার কিছু বর্ণনা মতিলাল রায়ের বিবরণে পাওয়া যায়। জেলের এক আইরিশ ওয়ার্ডারের থেকে তিনি জেনেছিলেন যে, নরেন গোঁসাই হত্যার দিন কানাইলালের ১০৫ ডিগ্রি জ্বর ছিল। সেসময় ডাক্তার তাঁকে কুইনাইন দিতে চাইলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। সেসময় জেলে তাঁর ছোট সেলটিতে তিনি সিংহের মতো পদচারণা করতেন। পরে তাঁর এই ম্যালেরিয়া সেরে যায় ও ফাঁসির হুকুম শোনার পর তাঁর ওজনও বেড়ে যায়। তাঁর এই সময়কার হাসিমুখ দেখে ওয়ার্ডারটি তাঁকে বলত যে, ফাঁসির সময়েও তাঁর এই হাসি থাকবে কিনা, তা দেখার জন্য সে অপেক্ষা করবে। কানাইলাল নাকি বলতেন, “মৃত্যুকে আমি ভয় করিনা। আমার কর্ম সুসম্পন্ন হয়েছে, আমি হাসতে হাসতে ফাঁসির দড়ি গলায় পড়ব।”
এরপর বারীন্দ্রকুমার ঘোষের বিবরণীর কিছুটা দেখা যেতে পারে :- “মরিবার দিন প্রাতে চারটার সময় তাহাকে বধমঞ্চে লইতে আসিলে সকলে দেখিল সে অকাতরে ঘুমাইতেছে। একটি ঘুম হইতে তার জাগরণ আর একটি দীর্ঘতর, নিবিড়তর ঘুমের জন্য। তার পূর্বদিন সন্ধ্যার সময় উঠানে বেড়াইতে বাহির হইয়া সে আমার ও অনেকের কুঠুরির সামনে দাঁড়াইয়া স্মিতহাস্যে বিদায় নমস্কার জানাইয়াছিল। … সে সহাস্য, প্রসন্ন, জ্যোতির্ময় রূপ আমি জীবনে ভুলিব না।… কানাই তখন মহাতাপস, প্রকৃত সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী। পথ ভুল হউক আর সত্য হউক, তাহার সে মরণের মহত্ত্ব যাইবার নয়।” [‘বারীন্দ্রের আত্মকাহিনী’]
১০ই নভেম্বর [১৯০৮] কানাইলালের ফাঁসির দিন ধার্য হয়েছিল। সেদিন ভোরবেলা থেকেই আলিপুর জেলের সামনে ভিড় জমতে শুরু করে। কোনরকম শোক বা বিক্ষোভের সম্ভাব্য প্রদর্শনকে সামাল দিতে মোতায়েন করা হয়েছিল ফোর্ট উইলিয়ম থেকে আনা তিনশো সশস্ত্র পুলিশ। ভোর ছ’টার সময় তেইশ বছরের বন্দী একটি মিছিলের সঙ্গে উৎফুল্লভাবে হেঁটে চলেন ফাঁসিমঞ্চের দিকে, যার পুরোভাগে ছিলেন পুলিশ কমিশনার হ্যালিডে আর জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল এফ সি ড্যালির রিপোর্ট অনুসারে কানাইলাল ‘নির্ভীক ভাবে’ তাঁর বধ্যস্থলে যান। ‘বেঙ্গলী’ পত্রিকার বর্ণনা অনুযায়ী যখন তাঁর গলায় ফাঁসটি পরানো হচ্ছিল, কানাইলাল দৃঢ় ও সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন, “শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত তাঁর ঠোঁটে লেগে ছিল এক প্রশান্ত হাসি।”

কানাইলালের সহবন্দী উপেন্দ্রনাথ লিখেছেন, “ফাঁসির সময় তাহার নির্ভীক, প্রশান্ত ও হাস্যময় মুখশ্রী দেখিয়া জেলের কর্তৃপক্ষরা বেশ একটু ভ্যাবাচ্যাকা হইয়া গেলেন। একজন ইয়োরোপীয় প্রহরী আসিয়া চুপিচুপি বারীনকে জিজ্ঞাসা করিল- ‘তোমাদের হাতে এ রকম ছেলে আর কতগুলি আছে?’…” ফাঁসির মঞ্চে ওঠার পর যখন তাঁর চোখ আচ্ছাদিত করা হচ্ছে, তখন সেই আইরিশ ওয়ার্ডারটিকে কানাইলাল নাকি হাসতে হাসতে জিজ্ঞাসা করেন, “এখন তুমি আমায় কি রকম দেখছ?”
কানাইলালের অন্ত্যেষ্টি সৎকার যে বিপুল সমারোহে হয়েছিল আর সে উপলক্ষে কলকাতায় যে তুমুল আবেগোচ্ছ্বাস আর গণ-উন্মাদনার সৃষ্টি হয়েছিল, সে কথা হেমচন্দ্র, মতিলাল প্রমুখ অনেকেই উল্লেখ করেছেন। সেই শোকযাত্রার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে মতিলাল জানিয়েছেন, কয়েকজন আত্মীয়ের সঙ্গে লালপেড়ে দেশী ধুতি, চাদর, ফুলের মালা ইত্যাদি কিনে, ধুতিচাদর সযত্নে কুঁচিয়ে ফাঁসির দিন ভোর না হতেই পথে বের হয়ে রাস্তায় খবরকাগজের হকারের মুখে তাঁরা শুনতে পেলেন সেই কুখ্যাত দারোগা নন্দলাল ব্যানার্জির হত্যার সংবাদ, যা তাঁদের কাছে অন্ত্যেষ্টিযাত্রার সময় শুভলক্ষণ বলেই মনে হয়েছিল। জেল-ফটকে পৌঁছতেই দেখা গেল, উৎসাহী তরুণের দল কাতারে কাতারে অপেক্ষা করছে। কানাইলালের আত্মীয়েরা এসেছেন বুঝতে পেরেই তারা জলদ্মন্দ্রে ধ্বনি দিল – ‘বন্দেমাতরম্’।

মতিলালের এই বিবরণের পাশাপাশি সমসাময়িক দেশী ও সাহেবি সংবাদপত্রগুলিতেও কানাইলালের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া উপলক্ষে অভূতপূর্ব গণ-আবেগের উল্লেখ মেলে। বেঙ্গলী, সন্ধ্যা, ইংলিশম্যান ইত্যাদি কাগজ, ‘বন্দেমাতরম’ পত্রিকার সাংবাদিক হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘোষের ডায়েরি ও পুলিশ-কর্তা ড্যালির রিপোর্ট ইত্যাদি থেকে জানা যায়, হাজার হাজার নগ্নপদ শোকার্ত মানুষ মিছিলে যোগ দেয়, যা ছিল কলকাতার ইতিহাসে সম্ভবত বৃহত্তম ও নিশ্চিতভাবেই স্মরণীয়তম শোভাযাত্রা। বাড়ির ছাদগুলিতে সমবেত নারীরা বিলাপ করছিল আর রাজপথে দর্শক ও পদযাত্রীরা ধ্বনি দিচ্ছিল ‘জয় কানাই’ ও ‘বন্দে মাতরম্’! কালীঘাট মন্দিরে দেবীকে বিশেষ পূজা নিবেদিত হয়েছিল। শ্মশানে অগণিত শোকার্তেরা অপেক্ষা করছিল। এদের মধ্যে ছিল শতশত উচ্চবর্ণের মহিলা, যারা পর্দার গোপনীয়তা বর্জন করে উপস্থিত হয়েছিল। এদের কেউ কানাইয়ের অঙ্গে চন্দন ও সিঁদুর লেপন করছিল, কেউ বা মুখে দিচ্ছিল কালীর চরণামৃত। তাঁর শরীর ফুলের স্তূপের নীচে সম্পূর্ণ ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। গীতা ও অন্যান্য ধর্মগ্রন্থ তাঁর বুকের ওপর রাখা হয়েছিল। তাঁর চুল কেটে নেওয়া হচ্ছিল তা স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে রাখার জন্য। শোকার্তেরা দেশাত্মবোধক গান গাইছিল আর ‘বন্দে মাতরম্’ ধ্বনি দিচ্ছিল। অবশেষে কানাইয়ের দেহ চন্দনকাঠের চিতায় রক্ষিত হল। তাঁর দাদা মুখাগ্নি করার পর চিতায় অগ্নিসংযোগ করার জন্য হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। দেহ ভস্মীভূত হয়ে গেলে শ’য়ে শ’য়ে লোক একমুঠো চিতাভস্ম ও অস্থি সংগ্রহের জন্য এগিয়ে এল। চিতাভস্মে এত ঘট ভর্তি করা হল যে, গঙ্গায় ফেলার জন্য আর কিছুই থাকল না।” এই বিবরণ অনুসারে পরের কয়েক দিন পর্যন্ত শহরের দেশীমহল ছিল বিষাদে আচ্ছন্ন। ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছিলেন, “দ্বাপরে কানাই ছিল নন্দের নন্দন/ কলিতে তাঁতির কুলে দিল দরশন।/ তাহারে ছলিয়াছিল অক্রুর গোসাঁই,/ গোসাঁইকে কানাই দিল বৃন্দাবনে ঠাঁই।।/ গোঁসাই হল গুলিখোর, কানাই নিল ফাঁসি–/ কোন চোখে বা কাঁদি বলো কোন চোখে বা হাসি!”
“সত্যেন ধন্য করিল দেশ!”
রাজসাক্ষী নরেন গোঁসাইয়ের স্বীকারোক্তিতে উদ্ঘাটিত সংবাদ যাতে আইনসিদ্ধ না হতে পারে, সেই উদ্দেশ্যে তাকে জেলের ভেতরেই হত্যা করার পরিকল্পনাটি যে সত্যেন্দ্রনাথ বসুর মাথা থেকে এসেছিল ও তার রূপায়নের প্রস্তুতিতেও যে তাঁরই প্রধান ভূমিকা ছিল, সেটা আমরা আগেই দেখেছি। মৃত্যুদণ্ডের পর প্রাণভিক্ষার আবেদন করতে সত্যেন্দ্রনাথ প্রথমে রাজি হননি, হেমচন্দ্রের দাবি, তিনিই তাঁকে রাজি করান। প্রিভি কাউন্সিলে আপীলের জন্য শ্রমিক নেতা প্রেমতোষ বসু ও আনন্দমোহন পালের উদ্যোগে চাঁদা তোলা হয়েছিল ও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ভালো সাড়া পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু বড়লাট লর্ড মর্লি জানিয়েছিলেন যে, ‘আপীলের জন্য ফাঁসি স্থগিত থাকতে পারেনা’।
আপীল খারিজ হয়ে যাবার পর জেলে নিজের মা ও শিবনাথ শাস্ত্রীর সঙ্গে সত্যেন্দ্রনাথের সাক্ষাৎকারের কাহিনী জানিয়ে এস সি রায় নামে কানাইয়ের এক পরিচিত ব্যক্তি জানিয়েছেন, সত্যেনের শর্ত ছিল, মা যদি দেখা করতে এসে কান্নাকাটি না করেন, তা হলেই তিনি দেখা করবেন। “তাহাই হইয়াছিল। তাহার দৃঢ়া জননী একফোঁটা অশ্রু পরিত্যাগ করেন নাই। তাহার মৃত্যুর পূর্বে প্রার্থনা করিবার জন্য আমিই পণ্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রীকে ঠিক করিয়া দিই। …নরেন্দ্র গোস্বামীর হত্যায় তাহার অংশ ছিল কি-না, জিজ্ঞাসা করায় সে ইশারায় জানাইয়াছিল, ‘হ্যাঁ।’ …খুব সহাস্যবদনে … সে আমাদের সহিত প্রায় এক ঘন্টা ধরিয়া স্বদেশী কথাবার্তা বলিয়াছিল।… সে বলিয়াছিল, ‘আমার বা কানাইয়ের মৃত্যু কি ছার। আমাদের মত সহস্র সহস্র মরিলে তবে দেশ উদ্ধার হইবে। তবে দেশে জাগরণ আসিবে।’…” সে সময় নানা স্থানে ছেলেমেয়েরা কানাইলাল ও সত্যেন্দ্রনাথের মূর্তি গড়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছিল, জেলখানায় তাঁকে এই কথা জানালে তাঁর মুখ খুব ‘উৎফুল্ল’ হয়েছিল। [‘বাংলায় বিপ্লবপ্রচেষ্টা’]
সত্যেন্দ্রনাথের ফাঁসি হয়েছিল ২১শে নভেম্বর (১৯০৮)। ম্যাজিস্ট্রেট কয়েকটা শর্তে দাহ করবার অনুমতি দিয়েছিলেন। সেগুলো হল — জেলের বাইরে দাহ নিষেধ, কোন আড়ম্বর ও আন্দোলন নিষেধ, কোন স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে যাওয়া নিষেধ, জেলের মধ্যে কর্তৃপক্ষের সামনে দাহ করতে হবে এবং লোকসংখ্যা চোদ্দ-পনেরো জনের বেশি হবে না। এস সি রায়ের ভাষায় “ইহার পূর্বে কানাইয়ের মৃতদেহ লইয়া কালীঘাট শ্মশানে খুব রাজনৈতিক উৎসব হইয়াছিল। তাহার পুনরাবৃত্তি কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত ছিল না।”

ফাঁসির দিন ভোর বেলায় আলিপুর জেলের ফটকে রায় তাঁর লোকজনদের নিয়ে উপস্থিত হলেন, কিন্তু ফাঁসির মতো ‘নির্দয় ব্যাপার’ দেখতে তাঁরা কেউ প্রস্তুত ছিলেন না বলে সত্যেনের ফাঁসির বিবরণ তাঁরা শুনলেন পুলিশের লোকের কাছে :- “…একজন চর্মবর্ম পরিহিত শ্বেত পুলিশ সুপারিন্টেন্ডেন্ট আমার সমীপবর্তী হইয়া বলিলেন – ‘You can go now. The thing is over. Satyendra died bravely. Kanai was brave, but it seems Satyendra was braver.’ তদ্দন্ডেই একজন সার্জেন্ট বলিতে লাগিল, ‘When I went to his cell to get him to the gallows, he was wide awake. When I said, Satyendra, be ready, he answered, Well, I am quite ready, and smiled. He walked steadily to the gallows. He mounted it bravely and bore it cheerfully. A brave lad!” জেলের ভেতরে পুলিশি পাহারায় সত্যেন্দ্রনাথের অন্তিম সৎকার প্রসঙ্গে রায় লিখেছেন যে, জেলের সুপারইন্টেন্ডেন্ট ইমার্সন “দাহকালে …প্রথম হইতে শেষ পর্যন্ত একটা কেদারায় বসিয়া ঐ মহৎকার্য পর্যবেক্ষণ করিয়াছিলেন। আমরা কোনই স্মৃতি-চিহ্ন আনিতে পারি নাই।” [ঐ]
কানাইলাল ও সত্যেন্দ্রনাথের এই কীর্তি দেশের সাধারণ মানুষই শুধু নয়, বিশিষ্ট মানুষদের চিত্তকেও বিচলিত করেছিল। কানাইলাল তাঁর মৃত্যুদণ্ডের পর প্রাণভিক্ষার আবেদনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন, “There shall be no appeal”। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছিলেন, “কানাই শিখিয়ে গেল হে!… এর পর থেকে shall আর will–এর ব্যবহার করতে লোকে আর ভুল করবে না।” ফাঁসির আগে ব্রাহ্মসমাজভুক্ত সত্যেন বসুর ইচ্ছেমতো তাঁকে আশীর্বাদ করতে জেলে এসেছিলেন আচার্য শিবনাথ শাস্ত্রী। পরে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, সত্যেনের মতো কানাইলালকেও তিনি আশীর্বাদ করে এলেন না কেন! জবাবে তিনি নাকি বলেছিলেন, “সে পিঞ্জরাবদ্ধ সিংহ। বহু তপস্যা করলে তবে যদি কেউ তাকে আশীর্বাদ করার যোগ্যতা লাভ করতে পারে!” [বিপ্লবী জীবনের স্মৃতি/ যাদুগোপাল মুখোপাধ্যায়]
বোমার বাঙলার শহিদদের নিয়ে সাধারণ জনমানুষের এই আবেগের সমর্থন পাওয়া যায় লোকমুখে প্রচলিত একটি গানের মধ্যে :- “ক্ষুদিরাম গেল হাসিতে হাসিতে ফাঁসিতে করিতে জীবন শেষ/ পাপিষ্ঠ নরেনে বধিল কানাই, সত্যেন ধন্য করিল দেশ!” [মৃত্যুহীন প্রাণ/ সাহানা দেবী]
বিভীষণনিধন : একজন ‘স্বপক্ষত্যাগী দেশপ্রেমিক’ ও এক প্রতিবন্ধী বিপ্লবী
আলিপুর ষড়যন্ত্র মামলায় সরকার মুরারিপুকুর গুপ্তসমিতির প্রায় পুরো দলটিকে গ্রেপ্তার করে এবং কয়েকজন বিপ্লবী যুবককে প্রাণদণ্ড দিলেও বাংলার বিপ্লবপ্রচেষ্টাকে দমন করতে যে তার প্রমাণ মেলে ওই মামলার বিচারপর্ব চলাকালীন ও রায়দান শেষ হয়ে যাবার পরেও। বিপ্লবীদের গ্রেপ্তারের মাসকয়েক পরেই কুখ্যাত পুলিশ নন্দলাল ব্যানার্জির কলকাতার রাস্তায় প্রাণনাশের কথা আমরা আগেই উল্লেখ করেছি। এ সময় বেশ কয়েকবার হিউম নামে এক কুখ্যাত ব্যারিস্টারকেও হত্যার ব্যর্থ চেষ্টা করা হয়। অরবিন্দ-বারীন্দ্রের পরবর্তী পর্যায়ে এই বিপ্লবপ্রচেষ্টার নেতা ছিলেন সুদক্ষ সংগঠক ও বিপ্লবীনায়ক যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ওরফে বাঘা যতীন। তাঁর পরিকল্পনায় ওই একই সময়ে (৭ই নভেম্বর ১৯০৮) জিতেন্দ্রনাথ রায়চৌধুরী নামে এক ছাত্র কলকাতায় ছোটলাট ফ্রেজারকে গুলি করে হত্যার ব্যর্থ চেষ্টা করে ধরা পড়েন ও তাঁর ফাঁসি হয়।
এই বাঘা যতীনের আরেক শিষ্য চারুচন্দ্র বসুর পিস্তলের গুলিতে আলিপুর মামলার প্রধান সরকারি উকিল আশুতোষ বিশ্বাসের নিধন অগ্নিযুগের ইতিহাসের আরেকটি সুপরিচিত ঘটনা। ব্রিটিশ সমর্থক ‘এম্প্রেস’ পত্রিকার ফেব্রুয়ারি [১৯০৯] সংখ্যা থেকে থেকে সেই বিবরণ আমরা এখানে কিছুটা তুলে দিচ্ছি :– “বাবু আশুতোষ বিশ্বাস, গভর্নমেন্ট প্লিডার ও পাবলিক প্রোসিকিউটার, যিনি মিঃ বীচক্রফটের এজলাসে মামলার পরিচালনায় সক্রিয় ভূমিকা নিচ্ছিলেন, গত ১০ই ফেব্রুয়ারি, ৩-৪০ মিনিটের সময় আলিপুর সুবার্বন ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের প্রাঙ্গণে জনৈক বাঙালি তরুণের গুলিতে নিহত হয়েছেন।”

এরপর পত্রিকাটি আশুতোষ বিশ্বাসের যে-জীবনপঞ্জী পরিবেশন করেছে, তা থেকে জানা যায় যে, এক সম্ভ্রান্ত কায়স্থ পরিবারের এই জাতক ছিলেন সুশিক্ষিত, ‘সৎ ও উদারচেতা’, ভারতীয় ও ইয়োরোপীয় মহলে প্রিয় ও সম্মানিত। আরও জানা যাচ্ছে যে, এক সময় তাঁর রাজনীতিতে উৎসাহ ছিল ও দেশনেতা সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জির সঙ্গী হয়ে তিনি যুক্তপ্রদেশে সফর করেছেন, এমন কি, ‘বেঙ্গলী’ পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক হিসেবেও কাজ করেছেন ইত্যাদি। এমন একটি বিচিত্র কিন্তু অনুপেক্ষণীয় চরিত্রের নিধনে তাই দেশী ও বিদেশী নানা মহলে বিচিত্র ও বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া চোখে পড়ে। আশুতোষের মৃত্যুতে কংগ্রেসের পক্ষ থেকে শোকপ্রকাশের জন্য কলকাতার টাউন হলে দ্বারভাঙ্গার মহারাজার সভাপতিত্বে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ও সেখানে ‘আশুতোষ বিশ্বাস মেমোরিয়াল ফান্ড’ খোলা হয়েছিল। বেশ কয়েকমাস পরে লন্ডনের ‘দি টাইমস’ পত্রিকায় চিঠি লিখে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ও ‘নৈরাজ্যবাদী অপরাধে’ তাঁর অসমর্থনের কথা জানাতে গিয়ে উল্লেখ করেছিলেন, আশুতোষ হত্যার পর কলকাতায় তাঁর উদ্যোগে দু’টি শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আরেকজন ভারতখ্যাত নেতা বিপিনচন্দ্র পালের ‘স্বরাজ’ পত্রিকায় ঐ হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে মন্তব্য করা হয় :- “ইয়োরোপের বৈপ্লবিক প্রচারণার এই ভয়ানক পন্থা যদি আমরা অনুকরণ করি, তবে আমাদের সেই জাতীয় উদ্দেশ্য গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সেই বর্বর প্রবৃত্তিগুলির দ্বারা, যেগুলিকে তা জাগিয়ে তুলবে।”

অন্যদিকে আবার স্বদেশী বিপ্লবপন্থীদের মধ্যে এই হত্যাকাণ্ড স্বভাবতই এক ইতিবাচক কীর্তি হিসেবে গণ্য হয়েছিল। আশুতোষের হত্যা ও হন্তারক চারুচন্দ্র সম্পর্কে মতিলাল রায়ের প্রতিক্রিয়ার চেহারাটি দেখা যেতে পারে :- “যে তরুণ বিপ্লবী এই দুঃসাহসিক কার্যে প্রবৃত্ত হয়, তাহার একটী হস্ত অকেজো ছিল। সেই হস্তে রিভলবার বাঁধিয়া অন্য হস্তের দ্বারা আশুতোষকে সে গুলিবিদ্ধ করে। পলায়নের দুর্ভাবনা এই বিপ্লবী করে নাই। আলিপুর বোমার আসামীদের দণ্ড দেওয়ার প্রতিবাদে এই মরণপণ কর্মে সে অগ্রসর হইয়াছিল।“ হত্যাকাণ্ডের অন্য বিবরণ থেকে জানা যায় চারুচন্দ্র আশুতোষকে তিনটি গুলি করেছিলেন যার একটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।
চরমপন্থী বিপিন পাল আর নরমপন্থী সুরেন্দ্রনাথ- এই দুই স্বদেশী নেতাই যেমন এই হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করেছেন, তেমনই আবার বিদেশিনী হয়েও নিবেদিতা কিন্তু এই হত্যা সম্পর্কে অন্যরকম মনোভাব পোষণ করেছেন। পরবর্তীকালে একটি চিঠিতে তিনি লিখেছেন, ”বাদীপক্ষে আশুতোষ বিশ্বাসই ছিল আসল শক্তি এবং তার অপসারণ এ-যাবৎ যা ঘটেছে, তার মধ্যে সবচেয়ে সুযোগসম্মত ব্যাপার বলে মনে হচ্ছে।“ [১.৯-১৯০৯] নিবেদিতার এই প্রতিক্রিয়া থেকে বোমার মামলায় শুধু তাঁর আগ্রহই নয়, আশু-হত্যায় এক ধরনের প্রসন্নতাও ফুটে উঠেছে।

দেশের সাধারণ মানুষও যে নিবেদিতার এই মনোভাবের শরিক ছিল, সেটা বোঝাবার জন্য আমরা সে সময় প্রচারিত ‘হত্যা নয় যজ্ঞ’ নামে একটি পুস্তিকার অনামা লেখকের বক্তব্যের মর্ম তুলে ধরছি :- “কিছু মনুষ্যদেহধারী দেশী শয়তান, ভারতের কলঙ্ক পুলিশ কর্মচারী অর্থের লোভে বারীন ঘোষ ও অন্যান্য মহৎ ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করেছে, যাঁরা নিজেদের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে আর বোমা তৈরি করে পবিত্র যজ্ঞের অনুষ্ঠানে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে তাঁদের স্বদেশের মুক্তিতে ব্রতী হয়েছেন। সবচেয়ে বড়ো মনুষ্যদেহধারী শয়তান আশুতোষ বিশ্বাস এই বীরদের ফাঁসিতে চড়াবার রাস্তা নির্মাণ শুরু করেছিল। সাবাশ চারু! সমস্ত গৌরব তোমাদের পিতামাতার। তাঁদের গৌরবান্বিত করতে ও সাহসের সর্বোচ্চ মাত্রা কী হতে পারে, তা দেখাতে জীবনের স্বল্প মেয়াদকে অগ্রাহ্য করে তোমরাই সেই দানবের মূর্তিকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিয়েছ। …” [ ভ্যালেন্টাইন চিরোল রচিত INDIAN UNREST-এর উদ্ধৃতি থেকে পুনরনুদিত]
নিবেদিতার আর একটি চিঠিতে আমরা ইঙ্গিত পেয়েছি যে, জেলখানায় কথা বের করার জন্য চারুচন্দ্রের ওপর শারীরিক নিগ্রহ চালানো হয়েছিল। র্যাটক্লিফ দম্পতিকে লেখা এই চিঠিটি থেকে জানা যাচ্ছে, বোমার মামলার দুই আসামী অশোক নন্দী ও উল্লাসকর দত্ত, জেলে চারুর খুব কাছের সেলেই ছিলেন, এরা দু’জনেই বলেছেন যে, অধিকতর সংবাদ আদায়ের জন্য চারুকে রাতে ইলেক্ট্রিক শক দেওয়া হয় :- “এরা তার চীৎকার শুনেছে – কথাবার্তাও। মনে হয়, অব্যাহতি পাওয়ার জন্য সে ভাঁওতা সংবাদ দেবে। যাচাইয়ের পরে যখন দেখা যাবে যে, সংবাদ মিথ্যা, তখন আবার নির্যাতন শুরু করা হবে।“ [১-৯ -১৯০৯] শত নির্যাতনেও চারু অবশ্য কারো নাম বলেন নি। তদন্তের সময় তিনি বলেছিলেন, “আমি আশু বিশ্বাসকে খুন করেছি, কারণ সে দেশের শত্রু। সে নির্দোষ মানুষদের বিরুদ্ধে মামলা চালিয়ে শাস্তির ব্যবস্থা করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করে।” তদন্ত শেষ হবার পর তিনি বলেন, “বিচারের আর কোন প্রয়োজন নেই, আজ বা কালই আমাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেওয়া হোক। আমার হাতে আশু মরবে, সেটাই নিয়তি আর আমি সেজন্য ফাঁসিতে ঝুলব।” চারু বসুর ফাঁসি হয়েছিল ১৯ শে মার্চ। এর আগে তিনি প্রাণভিক্ষার আবেদন করতে দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছিলেন।
বিপ্লবীদের চক্ষুশূল গোয়েন্দা শামসুল নিধন
আশু-হত্যার পর আলিপুর মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরবর্তী সফল হত্যাকাণ্ডটি হচ্ছে, এই মামলায় সরকারি গোয়েন্দা শামসুল আলমের নিধন, যা সমাধা করেন বাঘা যতীনেরই পাঠনো আর এক তরুণ বীরেন্দ্রনাথ দত্তগুপ্ত। ততদিনে আলিপুর ষড়যন্ত্র মামলায় মুক্তিলাভ করে অরবিন্দ ধর্ম (বাংলা) ও কর্মযোগিন্ (ইংরেজি) নামে দুটি পত্রিকা প্রকাশ শুরু করেছেন। গোয়েন্দা শামসুল আলম আলিপুর মামলায় বিপ্লবীদের চক্ষুশূলে পরিণত হয়েছিলেন, কারণ আসামীদের পেট থেকে খবর বের করায় এই লোকটির বিশেষ দক্ষতা খ্যাতিলাভ করেছিল। এই ঘটনার বিবরণ আমরা দেখতে পারি অরবিন্দ সম্পাদিত ‘ধর্ম’ পত্রিকার মাঘ সংখ্যা থেকে :- “গত সোমবার [২৪ জানুয়ারি ১৯১০] ৫-১০ মিনিটের সময় কলকাতা হাইকোর্টে আন্দাজ বিশ বৎসর বয়স্ক এক যুবক গোয়েন্দা বিভাগের ডেপুটি সুপারিন্টেনডেন্ট শামসুল খাঁ বাহাদুরকে গুলি করিয়া মারিয়াছে। মিঃ আলম গত ১৯০৮ অব্দের মে মাস হইতে আলিপুরের বোমার মামলার তদ্বির করিতেছিল এবং আশু বিশ্বাসের হত্যার পূর্বে আশুবাবুর ও পরে আলিপুরের দায়রায় ও হাইকোর্টে নর্টন সাহেবের দক্ষিণ হস্তস্বরূপ হইয়া কাজ করিতেছিল। …যে ঘুরানো পাথরের সিঁড়ি দিয়া নামিয়া আসিলে ওল্ড পোস্ট অফিস স্ট্রীটে আসা যায়, আলম যখন সেই সিঁড়ির কাছে আসিয়াছে, তখন প্রায় ১৯/২০ বৎসরের এক যুবক পশ্চাৎ দিক হইতে তাহার নিকটে আসিয়া আলোয়ানের ভিতর হইতে রিভলবার বাহির করিয়া তাহার পৃষ্ঠদেশে গুলি করে। যুবকটিকে গ্রেপ্তার করিবার জন্য আলম তখন একবার খুব চেষ্টা করিয়াছিল, কিন্তু পারে নাই। শাদী চাপরাশিকে পাকড়ো পাকড়ো বলিয়া তৎক্ষণাৎ সটান হইয়া চিৎ হইয়া পড়িয়া যায় এবং দুই একবার গোঁ গোঁ শব্দ করিয়া মরিয়া যায়। গুলি খাওয়ার তিন চার মিনিট পরে আলম মরিয়া যায়।“ [১-২-১৯১০] রসালো এই বিবরণের ভাষাভঙ্গী থেকে বুঝতে অসুবিধা হয়না যে, অরবিন্দ স্বয়ং বা অন্য যে-ই এটির রচয়িতা হোন, তিনি এই হত্যাকাণ্ডটি মনে মনে উপভোগ করেছিলেন। আরেকটি বিবরণ থেকে জানা যায়, আলম মারাত্মক আহত হয়ে সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে পড়ে। বীরেন্দ্রনাথ দালান থেকে উঠোন পার হয়ে দৌড় লাগায় কিন্তু ঘোড়সওয়ার পুলিশে রাস্তা অবরুদ্ধ দেখে সে উন্মত্তভাবে গুলি চালাতে শুরু করে। কিন্তু তাকে কাবু করে ফেলে গ্রেপ্তার করা হয়।

উপরে – বিপ্লবী যুবকদের ওপর শামসুর আলমের মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন। নিচে – শামসুল- নিধনে বীরেন্দ্রকে পাঠাচ্ছেন বাঘা যতীন (বাঁদিকে), শামসুলকে গুলি করছেন বীরেন্দ্র দত্তগুপ্ত
অরবিন্দ পরিচালিত ইংরেজি কাগজ ‘কর্মযোগিন্’-এ আলম-হত্যার মাত্র পাঁচদিন পরেই ঘটনাটিকে রীতিমতো তারিফ করে লেখা হয় :- “বহু সাহসিক হিংসাত্মক কাণ্ডের মধ্যে এটি সাহসিকতম।“ বীরেন দত্তগুপ্তের সঙ্গী সতীশ সরকার আলম গুলিবিদ্ধ হবার পর ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন ও তখনই গিয়ে খবর দেন যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়কে, যিনি আলম হত্যার জন্য বীরেন্দ্র ও সতীশকে পাঠিয়েছিলেন। এর পর বাঘা যতীনের নির্দেশে সতীশ ‘কর্মযোগিন্’ অফিসে গিয়ে অরবিন্দকে আলম-নিধনের সংবাদটি দেন ও নলিনীকান্ত গুপ্তের সাক্ষ্য অনুযায়ী খবরটি পেয়ে তিনি ‘খুব খুশি’ হন।
মুক্তিকামী বাঙালিজাতিকে যে-বিপ্লবকাণ্ড প্রোৎসাহিত করে, তা ব্রিটিশ শাসকদের মনে কী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। ব্রিটিশ মহলের ঘনিষ্ঠ ভগিনী নিবেদিতার একাধিক চিঠিতে (এস কে র্যাটক্লিফকে লেখা) এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় পুলিশের মনোবল চোট খাওয়ার এবং সরকারের প্রতিশোধমূলক পরিকল্পনার জনশ্রুতির কথা রয়েছে। একটি চিঠিতে তিনি লেখেন, “বিগত খুন ও দত্তগুপ্তের
ফাঁসির পর থেকে এই অস্পষ্ট ঘোষণা ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছে – বিরাট এক ষড়যন্ত্র ফাঁস হওয়ার মুখে, তা ‘সবাই’কে জড়াবে। পুলিশের মনোযোগ যে আমাদের সবাইকে ঠেলা দিচ্ছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।” [ ৩ মার্চ ১৯১০] তাঁর আর একটি প্রতিক্রিয়া দেখা যেতে পারে, যেখানে তিনি বোমার মামলায় সরকারপক্ষের দুই প্রধান স্তম্ভ হিসেবে শামসুল আলমের সঙ্গে আশুতোষ বিশ্বাসের তুলনা করেছেন :- “সাক্ষ্যপ্রমাণ উদ্ভাবন ও সাজানোর শক্তিতে শামসুল আলম অমূল্য ব্যাপার – এক্ষেত্রে তার স্থানপূরণ সম্ভব নয়। উচ্চতর ক্ষেত্রে বিশ্বাসের সম্পর্কে একই কথা সত্যি বলা যায়।“ [একই ব্যক্তিকে লেখা, ২২.৯. ১৯১০]
বাংলার প্রথম বিপ্লবপ্রচেষ্টার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সর্বশেষ শহিদ বীরেন্দ্র দত্তগুপ্তের ফাঁসির আগে তাঁর পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তি ও স্বীকারোক্তি-আদায়ে তাঁর ওপর নানারকম মানসিক চাপসৃষ্টি, এমন কি শারীরিক নির্যাতনের কথা কেউ কেউ উল্লেখ করেছেন। প্রভাতকুমার গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘বিপ্লবী যুগের কথা’-য় যে কাহিনিটি পাওয়া যায়, তা হল, পুলিশ একটি নকল ‘যুগান্তর’ পত্রিকা বীরেন্দ্রকে দেখায়, যাতে তাঁকে ধিক্কার দিয়ে বলা হয়েছিল যে, দলের প্রতি তিনি বিশ্বাসঘাতকতা করে দলকে ফাঁসাবার জন্যই ধরা দিয়েছেন। মর্মপীড়ায় কাতর হয়ে বীরেন্দ্র নাকি তখন বলে ফেলেন, তিনি কাপুরুষ নন, তাঁকে যতীন মুখার্জি রিভলবার দিয়েছেন। কালীচরণ ঘোষ এমন কথাও লিখেছেন যে, শেষ পর্যন্ত পুলিশের কারসাজি বুঝতে পেরে তিনি বাঘা যতীনের উদ্দেশে ক্ষমাও চেয়েছিলেন।
বীরেনকে জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে বাঘা যতীনকে শামসুল হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয় ১৯১০ সালের জানুয়ারিতে। পরের মাসে ম্যাজিস্ট্রেটের এজলাসে তাঁকে হাজির করা হলে ব্যারিস্টার জে এন রায় আগাম নোটিশ না পাওয়াতে বীরেনকে জেরা করতে অসম্মতি জানান। পুলিশ তখন বীরেনের ফাঁসি পিছিয়ে দেওয়ার জন্য ছোটলাটের কাছে আবেদন করলে তা প্রত্যাখ্যান করা হয়। তাঁর মত ছিল — এই ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড এক মিনিটের জন্যও স্থগিত করা যায় না। ২১শে ফেব্রুয়ারি শেষ পর্যন্ত বীরেনের ফাঁসির আদেশ কার্যকর করা হয়। তাঁকে আদালতে হাজির করতে না পারায় পুলিশের কাছে যতীন্দ্রনাথ সম্পর্কে তাঁর স্বীকারোক্তি অসিদ্ধ প্রতিপন্ন হয়।

শামসুল হত্যার পাঁচ বছর পর ব্রিটিশ বাহিনীর সঙ্গে অসম সংগ্রামে যতীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পরবর্তী কালেও এ দেশের শাসক মহলের গায়ের ঝাল যে মেটেনি, তা বোঝা যায় ১৯১৮ সালে সিডিশান কমিটির রিপোর্টে সিডনি রাওলাটের এই টিপ্পনি থেকে :- “হাইকোর্টের সিঁড়ির ওপর পুলিশের ডেপুটি সুপারিন্টেন্ডেন্ট শামসুল আলমের হত্যা এখানে আলোচ্য বিষয়। যে যুবক তাকে গুলি করেছিল, তার ফাঁসি হয়েছিল, কিন্তু ফাঁসির পূর্বদিন সে তার মতিচ্ছন্নতার কথা বলেছিল। এই তরুণের কীর্তির জন্য দায়ী সত্যিকারের অপরাধীটি হলেন যতীন মুখার্জি, যিনি আরও ছ’ বছর বেঁচে রইলেন আরও বহু যুবকের চরিত্র নষ্ট করতে, যতদিন না তিনি ১৯১৫ সালে বালেশ্বরের সংঘর্ষে নিহত হলেন।“ [‘বাংলায় বিপ্লব প্রচেষ্টা’/ হেমচন্দ্র কানুনগো] ]
বীরেন্দ্র স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন, রাওলাট সাহেব এমনটা বললেও নিবেদিতা কিন্তু সন্দেহ প্রকাশ করে একটি চিঠিতে লিখেছেন যে, বীরেন্দ্রনাথের স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছিল নির্যাতনের সাহায্যে এবং বীরেন্দ্রকে প্রভাবিত করতে ব্রাউন নামে এক পাদ্রিকে ব্যবহার করা হয়েছিল, বীরেন যার প্রিয় ছাত্র ছিলেন ও বীরেনকে জেলে দেখতে গিয়েছিলেন। নিবেদিতার আরও মন্তব্যঃ- “এই স্বীকারোক্তি মধ্যরাত্রে একজন ম্যাজিস্ট্রেট ও এস এন রায়ের সমক্ষে করা হয় তার ফাঁসির আগে। বেচারা বালকটি! মনের কোন নিদারুণ যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে তার আত্মা প্রস্থান করল!” [ মিসেস ম্যাকলাউডকে লেখা, ৩-৩-১৯১০]
যা-ই হোক, দেওঘরের পাহাড়ে বোমার পরীক্ষা করতে গিয়ে প্রফুল্ল চক্রবর্তীর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একদা যে-বিপ্লবপ্রচেষ্টার সূচনা হয়েছিল, বীরেন্দ্রর এই ফাঁসির মঞ্চে আত্মদানের ঘটনায় নানা ব্যর্থতা ও সফলতায় মিশ্রিত সেই দুঃসাহসিক পর্বের অবসান হল।
সমকালের নেতা ও বুদ্ধিজীবীরা যা-ই ভাবুন, দেশের সাধারণ জাতীয়তাবাদী মানুষের ভাবনাচিন্তা অনেকটা নিবেদিতার এই মনোভাবেরই কাছাকাছি ছিল। তারই একটি নমুনা পাওয়া যায় ‘হত্যা নয়, যজ্ঞ’ নামে কোনো অনামা লেখকের পূর্বোক্ত পুস্তিকা থেকে। তার একটি মন্তব্যের অনূদিত রূপ :- “সেই নীচ নরাধম শামসুল আলম, যে সেই আলমগীর বাদশার পথ গ্রহণ করেছিল, যিনি সম্পদের লোভে তাঁর পূর্বপুরুষদের গৌরবে কালিমালেপন করেছিলেন – আজ তোমরা সেই নীচাশয়কে ভারতবর্ষের পবিত্র মাটি থেকে সরিয়ে দিয়েছ। সেই শয়তানির জাদুকর শামসুল আলমের ফন্দি ও তার অত্যাচারের ফলেই নরেন গোঁসাই থেকে ললিত চক্রবর্তী পর্যন্ত সকলে রাজসাক্ষী হয়েছে। তোমরা যদি এই দানবদের সহযোগীদের সরিয়ে না দিতে, ভারতের জন্য কোনও আশা থাকত কি!“ মতিলাল রায়ের স্মৃতিকথায়ও পাই :- “… বিপ্নবকারীর হস্তে তাঁহার নিধন-বার্তা চতুর্দিকে ছড়াইয়া পড়িল। কলিকাতার বিপ্লব-কার্য মাণিকতলার আবিষ্কারেও পুলিস ব্যর্থ করিতে পারে নাই, এই প্রমাণ বাঙালী জাতিকে প্রোৎসাহিত করিল।“
সাধারণ মানুষের এই প্রতিক্রিয়াগুলি থেকে এ কথা নিশ্চিত ভাবেই বলা যায় যে, দেশের মানুষ বা দলের লোকজন তাঁকে শুধু দোষারোপই করছে – কূটচক্রী পুলিশ সরলমতি বীরেন্দ্রনাথকে ফাঁসিতে ঝোলাবার আগে এমনটা বোঝাতে সফল হলেও প্রকৃত পক্ষে তিনি পেয়েছিলেন বাংলার মুক্তিকামী জনমনের অকুন্ঠিত শ্রদ্ধার্ঘ্য, যার কল্পনা যুগে যুগে মুক্তিব্রতীদের কন্টকসঙ্কুল পথকে পুষ্পপেলব করে তোলে।



১৯০৯ সালের ৬ই মে আলিপুর বোমার মামলায় অরবিন্দ সহ ১৭ জন অভিযুক্ত শেষ পর্যন্ত মুক্তি লাভ করেছিলেন। দশজনের যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর, ছয়জনের নানা মেয়াদের দ্বীপান্তর ও একজনের এক বছর কারাদণ্ড হয়। বারীন্দ্রকুমার ও উল্লাসকরের মৃত্যুদণ্ড হলেও পরবর্তীকালে তা হ্রাস করে দ্বীপান্তরের সাজা দেওয়া হয়েছিল। এইভাবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের কুটিল ও কঠোর শাসনযন্ত্র বাংলায় বোমার প্রথম আবির্ভাব ও সংশ্লিষ্ট বিপ্লবপ্রচেষ্টাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করতে সমর্থ হয়েছিল। অবশ্য এর ফলে যে পরবর্তীকালে নব নব প্রচেষ্টার উদ্ভবকে দমন করা যায়নি, সে কথা আমরা আগেই বলেছি।
ইতিমধ্যে এই প্রথম প্রচেষ্টাটির প্রধান তাত্ত্বিক নেতা অরবিন্দের মানসিক পরিবর্তন হয়েছিল। রাজনৈতিক জীবন থেকে বিদায় নিয়ে আধ্যাত্মিক জীবনকে বরণ করে নিতে ১৯১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে কলকাতা থেকে তিনি যাত্রা করলেন চন্দননগরের দিকে। পেছনে পড়ে রইল অসমাপ্ত বিপ্লবের ব্যর্থ প্রয়াস আর অগণিত বাঙালির স্বপ্ন, অশ্রু ও রক্ত দিয়ে লেখা ঘুম ভাঙার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস — পড়ে রইল সাতটি বীর যুবকের আত্মবলিদান, চার দেশদ্রোহীর হত্যা ও দুই নিরপরাধা বিদেশিনীর করুণ প্রাণবলি — মোট এই তেরোটি মৃত্যুর রক্তাক্ত কাহিনী!
(সমাপ্ত)
আলোচিত বিষয়টিতে আরো বিস্তারিত তথ্য জানতে চাইলে রচনার মধ্যে উল্লিখিত বইগুলি ছাড়া নিম্নলিখিত বইগুলি ও দেখা যেতে পারে-
১। জাগরণ ও বিস্ফোরণ / কালীচরণ ঘোষ ( প্রথম খণ্ড)
২। ভারতের সশস্ত্র বিপ্লব / ভূপেন্দ্রকিশোর রক্ষিতরায়
৩। শ্রীঅরবিন্দ ও বাংলায় স্বদেশী যুগ / গিরিজাশঙ্কর রায়চৌধুরী
৪। The Bomb in Bengal / Peter Hees
৫। নিবেদিতা লোকমাতা / শংকরীপ্রসাদ বসু (তৃতীয় খণ্ড)
৬। স্বদেশী আন্দোলন : প্রেক্ষাপট ও ঘটনাপঞ্জী / অলকরঞ্জন বসুচৌধুরী

