শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

বাংলায় বোমার আবির্ভাব: সাত শহীদ, চার দেশদ্রোহী ও দুই নিরপরাধ নারী (পর্ব-২)

“বাঙলাদেশের হৃদয় হতে…”

কলকাতা হাইকোর্টে ক্ষুদিরামের মামলার আপিলে তাঁর মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে রায় দেওয়া হলে তার প্রতিবাদে কলেজ স্কোয়ার থেকে বিরাট মিছিল বের হয়েছিল। ক্ষুদিরামের ফাঁসির পরেও বাংলাদেশের নানা প্রান্তে শোকপালনের সংবাদ পাওয়া যায়। ‘সঞ্জীবনী’-তে কলকাতায় ফাঁসির দিন ছাত্রদের নগ্নপদে স্কুলে ও কলেজে উপস্থিত হবার ও নিরামিষ আহারগ্রহণের খবর পাওয়া যায়। [১২-৮-১৯০৮] শুধু কলকাতাতেই নয়, বরিশালেও ছাত্রদের শোক পালনের খবর পাওয়া যাচ্ছে পুলিশের রিপোর্টে।

ক্ষুদিরামের গ্রেপ্তার ও মামলা চলার সময়েই তিনি সাধারণ মানুষের ও দেশী সংবাদপত্রগুলোর সহানুভূতি যথেষ্ট পরিমাণে আকর্ষণ করতে পেরেছিলেন বলে মনে হয়। মামলা চলাকালেই ‘হিতবাদী’ পত্রিকাটি মন্তব্য করেছিল, “ক্ষুদিরামকে হত্যা কাপুরুষোচিত কাজ ও নারকীয় অস্ত্র ব্যবহারের জন্য যে দোষী বলা হচ্ছে, এর জবাবে বিপ্লবীরাও বলতে পারে যে, প্রত্যেক শাসক একই অপরাধে দোষী, যে মানুষকে নিষ্পেষণ করে ও তাদের ফাঁসিকাঠে ঝোলায়।”

স্যার অ্যান্ড্রু ফ্রেজার,
খবরকাগজে প্রকাশিত তাঁকে হত্যা প্রচেষ্টার সংবাদ,
ম্যাজিস্ট্রেট ডগলাস কিংসফোর্ড

ক্ষুদিরামের ফাঁসির পর ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় লেখা হয়েছিল, “ক্ষুদিরামের জীবনলীলা সাঙ্গ হইল। আমরা তাহার বিচারক হইবার অযোগ্য। কারণ, তাহার কার্য্য ধর্মবিরুদ্ধ হইলেও, তাহার হৃদয়ে দেশভক্তি উৎকট বিদেশী-দ্বেষে পরিণত হইলেও ইহা সত্য যে, দেশভক্তি যেমন করিয়া তাহাকে গ্রাস করিয়াছিল, উহা তেমন করিয়া আমাদিগকে গ্রাস করে নাই। তাহার জীবন যেমনই হোক, সে মরিয়াছে বীরের মতো।…” [ ‘বিবিধ প্রসঙ্গ, জ্যৈষ্ঠ ১৩১৫]

অপরপক্ষে ক্ষুদিরামকে যারা ‘দানবনিধনে’ পাঠিয়েছিলেন, কলকাতার বিপ্লবসমিতির সেই নেতারা কার্যত তাঁকে বাঁচাবার কোনো চেষ্টাই করেন নি! সমিতির সদস্য হেমচন্দ্র কানুনগোও স্বীকার করেছেন :- “ক্ষুদিরামের পক্ষ সমর্থনের জন্য মেদিনীপুর, কলকাতা বা পশ্চিম বাংলা থেকে কোন উকিল যান নি। গিয়েছিলেন রংপুর থেকে। বাঙ্গালীচরিত্রের এ-ও একটি মহিমা।” ক্ষুদিরামের পক্ষে স্বতপ্রবৃত্ত হয়ে যেসব আইনজীবী এগিয়ে এসেছিলেন, তাঁদের নাম সবার জেনে রাখা উচিত। শুনানির প্রথম দিনে উকিল ছিলেন মজঃফরপুরের বিখ্যাত আইনজীবী কালিদাস বসু, উপেন্দ্রনাথ সেন ও ক্ষেত্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। এছাড়া রংপুর থেকে আসেন দু’জন উকিল কুলকমল সেন ও নরেন্দ্রনাথ [মতান্তরে নগেন্দ্রনাথ] লাহিড়ি ও সতীশচন্দ্র চক্রবর্তী। দূরদেশে একাকী কিশোর ক্ষুদিরাম যখন “হাসি হাসি” ফাঁসি পড়ার জন্য নিঃশঙ্কচিত্তে বিদেশি শাসকের বিচারের প্রহসনের সম্মুখীন হচ্ছেন আর কলকাতা-মেদিনীপুরের সতীর্থরা তাঁকে একরকম পরিত্যাগ করেছেন, তখন কলকাতায় ক্ষুদিরামের সতীর্থ হেমচন্দ্র সহ আরও অনেককে নিয়ে শুরু হয়েছে আলিপুর ষড়যন্ত্র মামলা, যার প্রধান অভিযুক্তদের, বিশেষ করে সর্বোচ্চ নেতা অরবিন্দকে বাঁচাবার জন্য নিযুক্ত হয়েছেন নামজাদা সব উকিলেরা, খোলা হয়েছে অর্থভাণ্ডার, যাতে সহায়তার জন্য আবেদন করা হচ্ছে দেশবাসীর কাছে! কিন্তু তাঁদের প্রাণ বাঁচাবার ঐ সম্মিলিত প্রয়াস আর অভিযুক্ত নেতাদের জন্য ভবিষ্যতের প্রভূত স্তুতিগান – সবই যেন মজঃফরপুরের ফাঁসিমঞ্চে একলা দাঁড়ানো ঐ ক্ষীণতনু কিশোরটির স্বতন্ত্র সংগ্রামের মহিমার কাছে ম্লান হয়ে যায়!

বাঁদিক থেকে হেমচন্দ্র কানুনগো, উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, নলিনীকান্ত গুপ্ত

বাংলাদেশে ১৯০৮ সালে বোমার রাজনীতির উদ্ভবের ব্যাপারটা প্রকাশ্যে এসেছিল প্রায় একই সঙ্গে দু’টি ঘটনার মধ্য দিয়ে। কিংসফোর্ডকে হত্যার উদ্দেশ্যে ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল চাকির বোমানিক্ষেপ [৩০শে এপ্রিল] আর তার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই কলকাতায় মাণিকতলার বাগানবাড়িতে বোমার কারখানা আবিষ্কার ও সেখানে বিপ্লবী যুবকদের গ্রেপ্তারের [২রা মে] ঘটনায় সারা দেশের মানুষ রাজনীতির এই নূতন তন্ত্রের আবির্ভাব সম্পর্কে প্রথম জানতে পারে। তার পর থেকে ব্রিটিশ সরকারের আদালতে বোমা সংক্রান্ত মামলা চলতে থাকে দু’টি ধারায়। প্রথমটি ছিল মজঃফরপুরের আদালতে ক্ষুদিরামকে আসামী করে কিংসফোর্ড হত্যার মামলা [২১শে মে – ১৩ই জুলাই], আর অন্যটি হল আলিপুরের আদালতে অরবিন্দ ঘোষ ও তাঁর ভাই বারীন্দ্রকুমার সহ ৩০ জনেরও বেশি যুবকককে বোমা তৈরি ও সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্রের দায়ে অভিযুক্ত করে দায়ের করা আলিপুর ষড়যন্ত্র মামলা, যা চলেছিল ১৯০৮ সালের মে থেকে ১৯১০ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। এখানে উল্লেখ করা যায় যে, এই মামলা শেষ হবার আগেই ১৯০৮ সালের নভেম্বরে কলকাতায় প্রফুল্ল চাকীর মৃত্যুর জন্য দায়ী পূর্বোক্ত দারোগা নন্দলাল ব্যানার্জিকে হত্যা করা হয়। কে বা কারা হত্যা করেছিল, সে বিষয়ে পরিষ্কার কোন তথ্য পাওয়া যায় না, কারণ পুলিশ কাউকেই ধরতে পারেনি। যেসব রাজভক্ত ভারতীয়কে বিপ্লবীরা বিশ্বাসঘাতক বা দেশদ্রোহী বলে মনে করতেন, তাদের মধ্যে প্রতিশোধমূলক হত্যাকাণ্ডের প্রথম বলি রাজসাক্ষী নরেন্দ্রনাথ গোস্বামী, তারপরে কুখ্যাত এই নন্দলাল।

বাঁদিক থেকে মুরারিপুকুর গুপ্ত সমিতিতে বিপ্লবীরা যে ধরনের বোমা তৈরি করতেন,
কিংসফোর্ডকে হত্যার জন্য পাঠানো পুস্তক- বোমা,
বোমার নির্মাণপ্রণালী শেখার জন্য বিপ্লবীদের ব্যবহৃত বই

আলিপুর মামলাকালের তিনটি হত্যাকান্ড – পটভূমি ও পূর্বকথা

গ্রেপ্তারের পর সর্বপ্রথম মুরারিপুকুর বাগানবাড়ির গুপ্তসমিতির নেতা বারীন্দ্রকুমার ও পরে তাঁর প্ররোচনায় ইন্দুভূষণ রায়, উল্লাসকর দত্ত, বিভূতিভূষণ সরকার ও উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের সমক্ষে স্বীকারোক্তি করেন। এর ফলে পরের দিন পুলিশের হাতে শ্রীরামপুর থেকে ধৃত হন এই গুপ্তসমিতির নরেন্দ্রনাথ গোস্বামী, যিনি পরবর্তীকালে রাজসাক্ষী হন। বারীন ও ইন্দুভূষণ দু’জনের স্বীকারোক্তিতেই তার নাম ছিল। সেদিনই নরেন তাঁর প্রথম স্বীকারোক্তি দেন। এরপরে ধৃত হৃষিকেশ কাঞ্জিলাল ও সুধীর সরকারও স্বীকারোক্তি করেন। উল্লেখযোগ্য যে, এঁরা সকলেই গুপ্তসমিতির সঙ্গে নিজেদের ও অন্যান্য নানা ব্যক্তির যোগাযোগের কথা স্বীকার করেছিলেন, কিন্তু অরবিন্দের নাম এই ব্যাপারের সঙ্গে জড়িত হতে পারে, এমন কিছু তাঁরা কেউই বলেন নি।

কিন্তু ২৯ মে পুলিশের কাছে গোপন জবানবন্দি দিয়ে নরেন্দ্রনাথ গোস্বামী ওরফে নরেন গোঁসাই গুপ্তসমিতির বহু তথ্য ফাঁস করে দেন। এই স্বীকারোক্তিতে বিপ্লবসমিতির সঙ্গে জড়িত বলে অরবিন্দ সহ আরও নানা ব্যক্তির নাম করা হয়েছিল। ২৩শে জুন নরেন গোঁসাইয়ের রাজসাক্ষী হবার সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে সরকার তার বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার করে নেয়। এরপর আদালতে আরও পাঁচবার নরেনের প্রকাশ্য বিবৃতিদানের ফলে অরবিন্দ ও ষড়যন্ত্রে জড়িত অনেকের নাম প্রকাশ হয়ে যায়। এর ভিত্তিতে এই দলটির আরো কয়েকজন বিপ্লবীও ধরা পড়ে যান।

নরেনের এই বিবৃতির ফলে বোমার মামলায় ধৃত গুপ্তসমিতির সদস্যেরা প্রমাদ গণেন, কারণ তাঁরা বুঝতে পারেন, এর পরে যদি উকিলেরা নরেনকে জেরা করার সু্যোগ পান, তা’ হলে আদালতে তার এই জবানবন্দি প্রত্যয়িত হয়ে যাবে ও তার ফলে অরবিন্দের জড়িত থাকার ব্যাপারটি আইনসিদ্ধ হয়ে গেলে এই মামলা থেকে তাঁকে বাঁচানো দুরূহ হয়ে পড়বে। যে কোনো মূল্যে অরবিন্দকে বাঁচাবার তাগিদে তাঁরা নরেন গোঁসাইকে সরিয়ে দেবার সিদ্ধান্ত নেন।

বাঁদিক থেকে বিভূতিভূষণ সরকার, হৃষিকেশ কাঞ্জিলাল, মতিলাল রায়

গোঁসাই বধের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি

হেমচন্দ্র কানুনগো তাঁর পূর্বোক্ত বইয়ে জানিয়েছেন যে, বোমার মামলার অন্যতম অভিযুক্ত সত্যেন্দ্রনাথ বসু আলিপুর জেলে আসার পর থেকেই কখনও আমাশয়, কখনও বা হাঁপানিরোগে পীড়িত বলে প্রথম থেকেই হাসপাতালে স্থান পেয়েছিলেন। সহবন্দীদের কাছ থেকে গুপ্ত সংবাদ জোগাড় করার উদ্দেশ্যে জেল কর্তৃপক্ষ নরেনকে কিছুদিন অন্যান্য বন্দীদের সঙ্গে একই ঘরে রেখেছিলেন। কিন্তু এই উদ্দেশ্য বন্দীরা জেনে গিয়েছিল। হাসপাতালে সত্যেন যেহেতু আগে থেকেই ছিলেন, তাই পূর্ব পরিকল্পনামতো নরেনের সঙ্গে ‘ভাব জমিয়ে’ তার সহযোগীর ভূমিকায় অভিনয় করতে তাঁর সুবিধা হয়ে যায়। হেমচন্দ্র জানাচ্ছেন, “ক্রমেই আমাদের মধ্যে প্রচার হল, সত্যেন নরেনের corroborator হতে যাচ্ছে। এ খবর কোর্টে উকিলবাবুদের মারফৎ বাইরেও প্রচারিত হয়েছিল।” শেষ পর্যন্ত সত্যেনের ফাঁদে পা দিয়ে নরেন তাঁর ভুয়ো প্রার্থনা পুলিশ কর্তাকে জানালে “তিনি অনেক দিন ধরে সত্যেনকে নাড়াচাড়া দিয়ে, অবশেষে খুশি হয়ে সত্যেনের প্রার্থনা গ্রাহ্য করলেন, আর তাকে শিখিয়ে পড়িয়ে নেবার জন্য নরেনকে উপদেশ দিলেন। সত্যেন নরেনের প্রদত্ত খবর যথাস্থানে পাঠাতে লাগল। তিন মাস এইভাবে চলেছিল।” এই কৌশলে অনুমতি আদায় করে তিনি কয়েক দিন ধরে হাসপাতালের ডিস্পেনসারিতে নরেনের সামনে বসে প্রতিদিন একটু একটু করে এজাহার লিখছিলেন।

ইতিমধ্যে সত্যেন নিজে একটি পুরানো ধরনের পিস্তল জোগাড় করেছিলেন। তাঁর বন্ধু হেমচন্দ্র চন্দননগরের মতিলাল রায়ের দলের সহায়তায় আর একটি রিভলবার জোগাড় করে সেটি ন্যাকড়া জড়িয়ে কানাইলালকে দিয়ে হাসপাতালে পাঠান, তিনি তখনও এ ব্যাপারে কিছুই জানতেন না। কানাইলাল পেটব্যথার ভান করে হাসপাতালে গিয়ে এটি সত্যেনকে দেন। এই পিস্তলটি পেয়ে সত্যেন যখন পুরানো বড় পিস্তলটি তাঁকে দিয়ে ফেরত পাঠাতে চান, তখন তিনি সত্যেনকে জিজ্ঞাসা করে এই পরিকল্পনার কথা জানতে পারেন। কানাইলাল এর পর প্রস্তাব দেন যে, তিনি বড় পিস্তলটি নিয়ে সত্যেনকে সাহায্য করবেন। এতে সত্যেনের প্রথমে মত না থাকলেও পরে ঠিক করা হয় যে, প্রথমে সত্যেন ‘নরেন-বধে’র চেষ্টা করবেন, তিনি লক্ষভ্রষ্ট হলে কানাই আক্রমণ করবেন।

‘পাপিষ্ঠ নরেনে বধিল কানাই …’

নরেন গোঁসাইকে হত্যার পরিকল্পনা কীভাবে রূপায়িত হল, তার প্রথম বর্ণনাটি আমরা দেখব হেম কানুনগোর স্মৃতিকাহিনী থেকে:- “পরদিন… সোমবার সকালে নরেন অন্যান্য দিনের মত তার শরীররক্ষক দু’জন য়ুরোপীয়ান কয়েদী ওয়ার্ডার সঙ্গে করে হাসপাতালের দোতলার ওপর সিঁড়ির পাশে ডিস্পেনসারিতে গিয়ে সত্যেনের সামনে বসেছিল। রিভলবারটা সহজে কেউ কেড়ে নিতে না পারে, সেজন্য নাকি সত্যেনের কোমরে দড়ি দিয়ে সেটা বাঁধা ছিল। সত্যেন জামার ভেতর থেকেই নাকি নরেনকে তাক করে মারে। খট করে শব্দ হল, কিন্তু কার্তুজ আগুন দিলে না। সত্যেন পরমুহূর্তে জামার ভেতর থেকে রিভলবার বের করে আবার নরেনকে তাক করে। তখন …একজন য়ুরোপীয় কয়েদি ওয়ার্ডার রিভলবারটা ধরে টানাটানি করাতে আওয়াজ হয়ে তার হাতের কবজি ভেঙে যায়, কাজেই রিভলবার ছেড়ে দেয়। ইত্যবসরে গোঁসাই ঘর থেকে বেরিয়ে পড়তেই কানাই গুলি চালায়। কানাই দাঁত মাজার ভান করে ডিস্‌পেনসারির পাশে সিঁড়ির সামনে পায়চারি করছিল। যাই হোক, গুলি সামান্যভাবে পায়ের কোন স্থানে লেগেছিল।…কানাইও পেছনে তাড়া করেছিল।

“সত্যেন ডিস্‌পেনসারি থেকে বেরিয়ে … ছুটে গিয়ে কানাইয়ের সঙ্গে যোগ দেয়। দু’জনেই গুলি চালাতে থাকে। সত্যেনের একটা গুলিতে কানাইয়ের গায়ের চামড়া ছোলা হয়ে গিয়েছিল। এ থেকে বোঝা যায়, সত্যেন যখন সেখানে যায়, তখনও নরেন জমি ধরেনি। নরেন না-কি দু–একবার পড়ে গিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছিল। সে খুব বলিষ্ঠ জোয়ান ছিল।”.এই হত্যাকাণ্ডের আরো কিছু সমসাময়িক বিবরণ পাওয়া গেছে যেখানে ছোটখাটো বিষয়ে কিছু গরমিল রয়েছে, আমরা সেগুলির বিস্তারিত উল্লেখ করছি না।

হত্যাকাণ্ডের দিন বিকেলেই কানাইলাল আর সত্যেন্দ্রনাথকে ম্যাজিস্ট্রেট মারের সামনে হাজির করা হয়। সেখানেই তাঁদের ও হত্যার প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য লিপিবদ্ধ করা হয়। তাঁর কিছু বলার আছে কিনা, এই প্রশ্নের উত্তরে কানাই বলেন, “কেবলমাত্র আমি আর সত্যেন্দ্রনাথ বসুই এই হত্যাপ্রচেষ্টার জন্য দায়ী।” তিনি গুলিচালনায় অংশ নেবার কথা স্বীকার করেন কিনা, এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “এ কথাই আমি বলতে চাই যে, আমি তাকে হত্যা করেছি। কেন করেছি, তার কোনো কারণ আমি দেখাতে চাইনা। না, আমি একটি কারণ উল্লেখ করতে চাই। কারণটি এই যে, সে দেশের প্রতি বিশ্বাসঘাতক প্রমাণিত হয়েছে।”

জেলের মধ্যে অস্ত্র কীভাবে পাচার হল, সে ব্যাপারে অধিকাংশ বন্দী বিপ্লবীরাও কিছু জানতেন না। ওই মামলার অন্যতম বন্দী উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, কয়েদিরা গুজব রটিয়েছিল যে, বাইরে থেকে বন্দীদের জন্য যে ঘিয়ের টিন বা কাঁঠাল আসত, তার মধ্যেই পিস্তল ভরে পাচার করা হয়েছে, যদিও এ কথা তাঁর নিজের অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল, কারণ ঐ সামগ্রীগুলো ‘ডাক্তারসাহেব’ নিজে পরীক্ষা করে তবেই ঢুকতে দিতেন। পিস্তল সম্পর্কে কানাইলালকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি নাকি বলেছিলেন যে, ক্ষুদিরামের প্রেতাত্মা তাঁকে পিস্তল দিয়ে গেছে। এ নিয়ে কিঞ্চিৎ মস্করা করে উপেন্দ্রনাথ লিখেছেন, “প্রেততত্ত্ববিদ্‌দের এক আধখানা বই পড়িয়াছি, কিন্তু ভূতকে পিস্তল দিয়া যাইতে কোথাও দেখি নাই।” [‘নির্বাসিতের আত্মকথা’]

ওই পিস্তল পাচারের রহস্য ইত্যাদি নিয়ে শুধু বিপ্লবীদের মধ্যেই নয়, সাধারণ মানুষের মধ্যেও ছিল বিস্ময়মিশ্রিত বাহবার মনোভাব। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের ভাগ্নী সাহানা দেবীর লেখাতে আমরা পাই বাঙালি পরিবারের এক সাধারণ বালিকার প্রতিক্রিয়াঃ- “জেলে এত সতর্ক পাহারার মধ্যেও এমন অসম্ভব কাণ্ড কি করে সম্ভব হল! জেল কর্তৃপক্ষরা সকলেই থরহরিকম্প। সকলের মনেই এই প্রশ্ন, মুখে এই কথা। ওই রুগ্ন, রোগা ছেলে দুটির ভিতর কেমন করে এই বজ্রের আগুন যে থাকতে পারে তাই দেখে ইংরেজ শাসকদের ধারালো বুদ্ধি যেন বোকা বনে গেল। কত ফন্দী কত ফিকির করেও পুলিসের লোকেরা এদের কাছ থেকে বার করতে সক্ষম হয়নি রিভলবার এরা কোথায় পেল, কে দিল। …আমরাও শুনেছিলাম কাঁঠালের মধ্যে ভরে কেউ পার করেছিল।” [‘মৃত্যুহীন প্রাণ’]

বাংলাদেশের মানুষ এই বিশ্বাসঘাতক-নিধনে যে সাধারণভাবে খুশিই হয়েছিল, তার সপক্ষে পিটার হীস উল্লেখ করেছেন, নরেন-হত্যার সংবাদে কোন এক গ্রামে আনন্দ প্রকাশ করে ধন্যবাদসূচক অনুষ্ঠান হয়, মহিলারা খুশিতে শঙ্খধ্বনি করেন। নরেন গোঁসাইয়ের নিজের শহর শ্রীরামপুর সহ অন্যান্য স্থানেও অনুরূপ অনুষ্ঠান হয়। ব্রিটিশ প্রভুদের কাগজ ‘এম্পায়ার’ মর্মাহত হয়ে মন্তব্য করেছিল যে, গোঁসাই-হত্যায় একটিও শোকসূচক অভিব্যক্তি শোনা যায়নি।‘সন্ধ্যা’-র মতে এই রক্তাক্ত ঘটনায় বাঙালি জাতি ভালোভাবেই সন্তুষ্ট হয়েছে। [দ্রষ্টব্য- ‘The Bomb in Bengal’]

মানিকতলা বাগানবাড়িতে গুপ্ত সমিতির বিপ্লবীদের ঘাঁটি

আলিপুর জেল হত্যাকাণ্ড : বিচারপর্ব ও প্রতিক্রিয়া

নরেন গোঁসাই হত্যার বিচার শুরু হয় দায়রা জজ এফ আর রো’র এজলাসে [৭ই সেপ্টেম্বর]। আসামী পক্ষের উকিল নরেন্দ্রনাথ বসু আবেদন জানিয়েছিলেন, আসামী দু’জনকে যেন সাধারণ ভদ্র বাঙালি পোষাকে আদালতে আসতে দেওয়া হয়। বিচারক এই আবেদন গ্রাহ্য করেন নি। হেমচন্দ্র লিখেছেন, “… কানাই স্বীকারোক্তি দিয়েছিল, কারো নাম করেনি, আর পিস্তল কোথা থেকে পেয়েছিল, তাও বলেনি। সত্যেন সমস্ত অস্বীকার করেছিল।” দু’দিন ধরে জুরীরা ও জজ বিভিন্ন সাক্ষীর বক্তব্য শোনার পর বিচারক কানাইলালকে প্রশ্ন করেন, তিনি তার আগের বক্তব্যে কিছু যোগ করতে চান কিনা। “উল্লেখযোগ্য ভারসাম্যে’র সঙ্গে কানাইলাল বলেন যে, বিবৃতির যে অংশে তিনি বলেছিলেন যে, নরেনের হত্যার জন্য তিনি আর সত্যেন দায়ী, সেটি তিনি প্রত্যাহার করতে চান — “আমি বলতে চাই যে, আমি একাই দায়ী, আর কেউ নয়।” [বন্দেমাতরম’, ৮ ও ৯ সেপ্টেম্বর]

সত্যেন্দ্রনাথ আদালতে নিজেকে নির্দোষ ঘোষণা করেন। এ কারণে জুরীরা তাঁর সম্পর্কে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত না নিতে পারলেও কানাইলালের অপরাধ সম্পর্কে একমত হন। এর প্রেক্ষিতে সত্যেন্দ্রনাথের ব্যাপারে সিদ্ধান্তের প্রশ্নটি হাইকোর্টে পাঠিয়ে বিচারক কানাইলালের দিকে ফিরে তাঁকে ফাঁসিতে মৃত্যুর সাজা শোনান। প্রাণদণ্ড শুনে কানাইলালের মুখে ফুটে ওঠে ‘প্রসন্ন অবজ্ঞার হাসি’, তাঁর দৃষ্টি হয়ে ওঠে আগের মতোই স্থির ও নির্বিকার। কানাইলালের এই আত্মসংযম দেখে আদালতে উপস্থিত সবাই অভিভূত হয়ে পড়েন। জজসাহেব কানাইলালের উদ্দেশ্যে বলেন, “যদি আপনি আপীল করতে চান, আপনাকে তা সাত দিনের মধ্যে করতে হবে।” কানাইলাল জবাব দেন, “কোন আপীল হবে না – There shall be no appeal!” [বন্দেমাতরম’, ১৩-৯-১৯০৮]
জুরীরা সর্বসম্মতিক্রমে কানাইলালকে ‘দোষী’ বলে রায় দিলেও ৩-২ সংখ্যাধিক্যে সত্যেন্দ্রনাথকে হত্যার অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেন। কিন্তু দায়রা জজ সংখ্যাগুরুর রায়ের সঙ্গে একমত না হয়ে বিষয়টি হাইকোর্টে পাঠাবার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। উল্লেখ্য যে, পাঁচজন জুরীর মধ্যে তিনজন ছিলেন বাঙালি ও দু’জন ইয়োরোপীয়ান।

১৫ই অক্টোবর সত্যেন্দ্রনাথের মামলার শুনানি শুরু হয় কলকাতা হাইকোর্টে। এই মামলার দু’জন বিচারপতি সরাফউদ্দিন ও কক্‌স ২১এ অক্টোবর তাঁদের রায়ে জানান যে, কানাইলালের ক্ষেত্রে তাঁর প্রাণদন্ডের আদেশটিকে নিশ্চিত করা ছড়া তাঁদের কাছে আর কোনো বিকল্প নেই। সত্যেনের ব্যাপারে তাঁদের কোনো সন্দেহ নেই যে, তিনি ও কানাইলাল দু’জনে সম্পূর্ণ সম্মিলিতভাবেই কাজ করেছেন। যদিও এমন মনে করার কারণ আছে যে, সত্যেনের ‘ছোট কিন্তু অনির্ভরযোগ্য অস্ত্রটি’ থেকে নিক্ষিপ্ত গুলিগুলো লক্ষ্যভেদে ব্যর্থ হয়েছে, তবু “এতে কোনো সন্দেহ থাকতে পারেনা যে, চেষ্টার অভাবের জন্য তিনি গোঁসাইকে হত্যায় ব্যর্থ হননি।” এ জন্য তাঁরা সত্যেন্দ্রকেও দোষী সাব্যাস্ত করেন ও প্রাণদণ্ডের বিধান দেন।

‘আলিপুর জেল হত্যাকাণ্ড’ নামে খ্যাত এই গোঁসাইবধপর্ব সম্পর্কে বিপ্লবী মতিলাল রায় ‘প্রথম বিভীষণ নিপাত’ শিরোনামে লিখছেন, “সংবাদপত্রে আলিপুর জেলের এই নৃশংস হত্যাকান্ড প্রচারিত হইল। কানাইলাল ও সত্যেন্দ্রনাথের জয় দিল দেশবাসী। চন্দননগরবাসী গর্বোন্নতশিরে হাঁকিল –‘আমাদের কানাইলালের এই কীর্তি!’ ১৯০৮ খৃষ্টাব্দের ১লা সেপ্টেম্বর বিপ্লবেতিহাসের পৃষ্ঠায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকিবে – বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে স্বাধীনতান্দোলনের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করার প্রথম বিশ্বাসঘাতক বিপ্লবী শহীদের হস্তেই নিপাতিত হইয়াছে।” [দ্রষ্টব্য তাঁর পূর্বোক্ত গ্রন্থ]।
নরেন গোঁসাই যে বাংলার বিপ্লবকাণ্ডের ইতিহাসে ‘প্রথম বিভীষণ’, এ ব্যাপারে হেম কানুনগোও মোটামুটি একই ধারণা পোষণ করেছেন। তাঁর মতে “…নরেন দণ্ড হতে অব্যাহতির রাজকীয় প্রতিশ্রুতি তো পেয়েই ছিল, অধিকন্তু বিলাতে সপরিবারে রাজার হালে থাকার আশাও না-কি পেয়েছিল। সে বলত, বারীন তাকে এবং অন্য অনেককে ঈর্ষ্যাবশত ধরিয়ে দিয়েছে। তার প্রতিশোধ নিতেই সে approver হয়েছে। Approver হবার অন্তত এ একটা ছুতো সে পেয়েছিল।” [‘বাংলায় বিপ্লবপ্রচেষ্টা’]
নরেন গোঁসাই হত্যাকান্ড সম্পর্কে অরবিন্দ তাঁর ‘কারাকাহিনী’তে তেমন কিছু উল্লেখ না করলেও গোঁসাই যে বিশ্বাসঘাতক, এ ব্যাপারে অন্যদের সঙ্গে তাঁরও কোন মতান্তর নেইঃ- “আমি দিন দিন দেখিলাম, গোঁসাইয়ের মন কিরূপে বদলাইয়া যাইতেছে, তাঁহার মুখ, ভাবভঙ্গী, কথাবার্তারও পরিবর্তন হইতেছে। তিনি যে বিশ্বাসঘাতকতা করিয়া তাঁহার সঙ্গীদের সর্বনাশ করিবার যোগাড় করিতেছিলেন, তাহার সমর্থনের জন্য ক্রমে ক্রমে নানা অর্থনৈতিক ও রাজনীতিক যুক্তি বাহির করিতে লাগিলেন, এমন interesting psychological study প্রায়ই হাতের কাছে পাওয়া যায় না।” [কারাকাহিনী]

নরেন গোঁসাইয়ের সাক্ষ্য যাতে জজ-কোর্টে গ্রাহ্য না হয় [যেহেতু আগে তাকে জেরা করা হয়নি], সেজন্যই যে বিপ্লবীরা তাকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সরিয়ে দিতে চেয়েছিল, এ কথা উল্লেখ করে নলিনীকান্ত সরকার লিখেছেন, “এই ভাবে আমরা সকলেই রক্ষা পেয়ে গিয়েছিলাম আইনের কবল থেকে অন্তত।” [‘স্মৃতির পাতা’]

বাড়ি থেকে অরবিন্দের গ্রেপ্তার, গুপ্ত সমিতির বাগানবাড়িতে পুলিশের হানা ও বিপ্লবী যুবকদের গ্রেফতার, ‘মহাবিপ্লবী অরবিন্দ’ ছায়াছবির কয়েকটি দৃশ্য (পরিচালনা – দীপক গুপ্ত)

আলিপুরের জেল-হত্যাকান্ড ও তার বিচারপর্বের প্রতিক্রিয়া সংবাদপত্র মহলে কেমন হয়েছিল, এবার আমরা তার কিছু পরিচয় নেব। গোঁসাই-হত্যাকান্ড সম্পর্কে অমৃতবাজার পত্রিকার মন্তব্য ছিল, “এই রক্তপিপাসা পাশ্চাত্যের বস্তুবাদেরই ফল।” [১ সেপ্টেম্বর] লাহোরের ‘পাঞ্জাবী’ পত্রিকাটি লিখেছিল, “হিন্দু ছেলেরা, বিশেষত বাঙালিরা এমন বিপজ্জনক ও বেপরোয়া পন্থাপদ্ধতি অবলম্বন করছে, যা এক বছর আগে স্বপ্নেও ভাবা যেত না।” [৫ সেপ্টেম্বর] এই হত্যাকাণ্ডের বিচারে জুরীদের সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য করে দায়রা জজ বিষয়টি হাইকোর্টে পাঠাবার সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছিল ‘হাওড়া হিতৈষী’। ‘বেঙ্গলী’ পত্রিকাটি নিশ্চিত হয়েছিল যে, এর পর এই মামলার দ্বিতীয় দলের আসামিদের জন্য কোন রাজসাক্ষী থাকবে না। “তাদের সেই প্রয়োজনের সময় নরেনকে হত্যা করে সত্যেন ও কানাই তাদের অনেক সহযোগীর মাথা বাঁচিয়ে দিয়েছে” – এই মন্তব্যের পর পত্রিকাটি লেখে, “যেহেতু অভিযুক্তের উকিলেরা আগেই নরেনকে জেরা করার আবেদন পেশ করেছে, সে কারণে নরেনের স্বীকারোক্তি গ্রাহ্য হবে না। যদি সত্যি তাই হয়ে থাকে, তাহলে প্রমাণ হবে যে এই অপরাধ সুপরিকল্পিত এবং অভিযুক্তরা শুধু বোমা তৈরি নয়, আইনের ব্যাপারেও অভিজ্ঞ।”

বিপ্লবীদের সশস্ত্র অভিযানের প্রস্তুতি, লাঠিখেলা, গীতাপাঠ ও
বোমা তৈরির দৃশ্য। (‘মহাবিপ্লবী অরবিন্দ’ ছায়াছবির কয়েকটি দৃশ্য, পরিচালনা – দীপক গুপ্ত)

গোঁসাই-হত্যার মধ্য দিয়ে বিশ্বাসঘাতককে শাস্তি দেবার ব্যাপারে বাঙালি বিপ্লবীদের যে সংহতি ও বৈপ্লবিক পরিকল্পনার দৃষ্টান্ত সামনে এসেছিল, ভারতের ব্রিটিশ পরিচালিত কাগজগুলো প্রত্যাশিতভাবেই তাকে ভালো চোখে দেখেনি। ‘স্টেটসম্যান’ পত্রিকাটি এই হত্যাকান্ডের জন্য ‘প্রাচ্যদেশীয় ধূর্তামি’কে দায়ী করে লিখেছিল, রাজসাক্ষীর ঐ হত্যা নাকি “মারাত্মক সব অস্ত্রের অধিকারী লোকদের হাতে একজন নিরস্ত্র মানুষের কাপুরুষোচিত হত্যা।” ভারতের জাতীয়তাবাদীদের সম্পর্কে কোনো দরদ না থাকলেও একথা মেনে না নিয়ে এলাহাবাদের অ্যাংলো ইন্ডিয়ান কাগজ ‘পায়োনিয়র’ লেখে, “কাপুরুষোচিত তো এই কাজটি নিশ্চিতভাবেই নয়। জেলখানার চার দেওয়ালের মধ্যে সংঘটিত এ-ধরনের কাজে পালিয়ে যাবার কোনও সুযোগ থাকেনা – আত্মহত্যা ও ফাঁসি, এই দু’য়ের মধ্যে যে কোনো একটি ভবিতব্য। এমন একটি কাজকে সঠিকভাবে বেপরোয়া কাজ বলে বর্ণনা করা যায়, কিন্তু একে কাপুরুষোচিত বলাটা নির্বুদ্ধিতা।” [৪ সেপ্টেম্বর]

‘দি এম্প্রেস’ নামে শাসকপন্থী সচিত্র মাসিকটির সেপ্টেম্বর সংখ্যায় জেলে সত্যেন ও কানাইলালের একাধিক ছবি ও সরকারি উকিল আশুতোষ বিশ্বাস আর বিপ্লবীদের হাতে নিহত রাজসাক্ষী নরেন গোঁসাইয়ের ছবি সহ প্রতিবেদন ছাপা হয় ও সরকারকে যে ‘সাধ্যমতো সাহায্য করতে চেয়েছিল’, সেই নরেন গোঁসাইকে প্রায় শহিদের শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করা হয়!

‘গৌরবে মোরে নিয়ে যাও’: কানাইলালের ফাঁসি

কানাইলালের ফাঁসির আদেশ হয়েছিল ২১-এ অক্টোবর। কিন্তু তার বহু আগে থেকেই তিনি স্থিরনিশ্চয় হয়েছিলেন যে, তাঁর ফাঁসি হবে, এমন কি, তাঁর শবযাত্রা যে ধূমধামের সঙ্গে সম্পন্ন হবে, এমনটাও তিনি কল্পনা ও কামনা করেছিলেন। আলিপুর জেলে তাঁর সহবন্দী নলিনীকান্ত সরকার জানিয়েছেন যে জেলে তিনি প্রায়ই চুপচাপ থাকতেন ও মাঝে মাঝে বলতেন, “জেলজীবন আমার জন্য নয়, আমি ইংরেজরাজকে দেব ফাঁকি।” আর এক সহবন্দী উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, কানাইলাল নাকি বোমার মামলাপ্রসঙ্গে বলতেন, “খালাসের কথা ভুলে যাও, সব বিশ বৎসর করে কালাপানি।” এর সঙ্গে একমত না হয়ে একজন বলেন যে, বিশ বছরের মধ্যে দেশ স্বাধীন হবেই হবে। তখন “কানাইলাল খানিকক্ষণ গম্ভীরভাবে বসিয়া থাকিয়া বলিল- ‘দেশ মুক্ত হোক আর না হোক্‌ আমি হবো। বিশ বৎসর জেল খাটা আমার পোষাবে না।’ এই কথার দুই একদিন পরেই একদিন সন্ধ্যাবেলা হঠাৎ পেটে হাত দিয়া শুইয়া পড়িয়া সে বলিল যে, তাহার পেটে ভারি যন্ত্রণা হইতেছে। ডাক্তারবাবু আসিয়া তাহাকে হাসপাতালে পাঠাইয়া দিলেন।’’ [নির্বাসিতের আত্মকথা’]। বোঝা যায় যে, নরেন গোঁসাইকে হত্যার ব্যাপারে কানাইলাল ততদিনে পরিকল্পনা ছকে ফেলেছেন ও শুধু বিশ্বাসঘাতককে শাস্তির জন্যই নয়, জেলজীবন থেকে নিজের মুক্তির জন্যও তিনি এই কাজটি করতে উন্মুখ হয়েছিলেন।

নরেন হত্যার জন্য অস্ত্রসংগ্রহের সময়েও তিনি অস্ত্র সরবরাহকারী বন্ধু শ্রীশচন্দ্রকে বলেছিলেন, “আমি মরিব-নরেনের রক্ত-তর্পণের কথা তোমরা সংবাদপত্রে পড়িও। কেবল একটি অনুরোধ – আমার মৃতদেহ যেন বিপুল সমারোহ করিয়া শ্মশানক্ষেত্রে নীত হয়। ইহা আমার মহিমাপ্রচারের জন্য নহে – মীরজাফর, উমিচাঁদ যে দেশে প্রাণধারণ করিয়াছে, সেই দেশে প্রথম মৃত্যুদণ্ড বিশ্বাসঘাতক আমাদের হস্তে গ্রহণ করিল, ইহার গৌরব-মহিমা দেশ যেন উপলব্ধি করিতে পারে!” তিনি যেন মৃত্যুকে বরণের জন্যই উদ্‌গ্রীব ছিলেন, মৃত্যুদণ্ড লাভ করেও তাঁর আপিল করতে রাজি না হওয়া থেকেও সে কথাই মনে হয়। অপর পক্ষে সত্যেন্দ্রনাথের ফাঁসির রায় মকুবের চেষ্টা তাঁর আত্মীয়েরা করেছিলেন। মতিলালের ভাষায় “কানাইলাল মরণের জন্য প্রস্তুত ছিল বলিয়াই তাহার ফাঁসি অগ্রে সম্পন্ন করার ব্যবস্থা হইল।”

একদিন দেখা গেল, কানাইলালের কুঠুরির দরজা খোলা রয়েছে, বিস্মিত সহবন্দীরা জানতে পারলেন, যে তাঁর ফাঁসির দিন ধার্য হয়ে গেছে বলে তাঁকে শেষ দেখা দেখবার জন্য প্রহরীরা এই ছাড় দিয়েছে। এর পর কানাইলালের কুঠুরিতে গিয়ে উপেন্দ্রনাথ যা দেখেছিলেন, তার কিছুটা বর্ণনা :- “জীবনে অনেক সাধুসন্ন্যাসী দেখিয়াছি। কানাই-এর মত অমন প্রশান্ত মুখচ্ছবি আর বড় একটি দেখি নাই। সে মুখে চিন্তার রেখা নাই, বিষাদের ছায়া নাই, চাঞ্চল্যের লেশ মাত্র নাই- প্রফুল্ল কমলের মত তাহা যেন আপনার আনন্দে আপনি ফুটিয়া রহিয়াছে।… জগতে যাহা সনাতন, যাহা সত্য, তাহাই যেন কোন শুভ মূহুর্তে আসিয়া তাহার কাছে ধরা দিয়াছে। আর এই জেল, প্রহরী, ফাঁসিকাঠ সবটাই মিথ্যা, সবটাই স্বপ্ন! প্রহরীর নিকট শুনিলাম, ফাঁসির আদেশ শুনিবার পর তাহার ওজন ১৬ পাউন্ড বাড়িয়া গিয়াছে।”

ক্রমশঃ

[লেখকের পূর্ববর্তী রচনা]

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
2 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Ruchi Ghosh
Ruchi Ghosh
6 months ago

অনেক অজানা তথ্য জানা হল। পরবর্তীর অপেক্ষায়।

Ashish Sen
Ashish Sen
5 months ago

এঁদের ত্যাগ ও তিতিক্ষার কাহিনী পড়তে পড়তে চোখ ভিজে যায়, পাশাপাশি প্রচন্ড রাগ হয় যে এত কষ্টে অর্জিত স্বাধীনতার সুফল সাধারণ মানুষের বদলে একদল চোর, গুন্ডা, খুনী, মিথ্যাচারী ও অশিক্ষিত রাজনৈতিক নেতানেত্রীরা লুটেপুটে খাচ্ছে।