
সে এক পা এগোল। আর এক পা এগোতে গেলে বড় সময় লাগে। সে দেখল বস্তির প্রায় সকলেই ছুটছে।
এখন জ্যৈষ্ঠ মাস। বেলা যত বাড়বে, রোদের তাপ বাড়বে ততই। পুড়ে যাবে সব। এই গরমে জলের বড় আকাল। সকাল থেকেই লাইনের কলে মানুষের ভিড়। কলসি, বালতি, জেরিক্যান মায় ঘটি বাটিও। লাইন নিয়ে বচসা, ঝগড়াঝগড়ি। এখন লাইন ভাঙছে। কোনও একটা খবর কানে পৌঁছেছে, তাই জলাধার ফেলেই সকলে ছুটছে সামনের দিকে। বস্তিটা পেরোলেই খানাখন্দ ভরা রাস্তা — তারপর পিচ।
সে বুঝতে পারছে, ওরা ছুটছে বড় রাস্তার দিকে। এই বস্তি উচ্ছেদ হবার কথা ছিল। উচ্ছেদ হলে কেউ জানে না কোথায় যাবে। তবু তারা বাঁচছে। ‘দিন আনি দিন খাই’ এর মতো প্রতিদিন তারা বাঁচে। ভবিষ্যতের কথা মাথায় নেই। এই বস্তির বাচ্চারা অন্ধকার ভালবাসে। অন্ধকারে কোঁচড়ে বা প্যান্টের পকেটে কিছু লুকিয়ে বস্তির ঝুপড়িতে ঢুকে পড়া সহজ। এই বস্তির অনেক বাচ্চাই কাগজ কুড়ায়। দেয়ালে দেয়ালে বিজ্ঞাপনের কাগজ, সিনেমার তারকাদের ছবি, ভোটের প্রচার কাগজ — টুক করে ছিঁড়ে অন্ধকারে বস্তায় ফেলে দেয়া সহজ।
ওদের মতো সে-ও ভালবাসে অন্ধকার। সারাদিন ধরে তার সবল দুটো হাত কাগজের ঠোঙা তৈরি করে। আটার আঠায় মাখামাখি সে, দিনান্তে স্নান সেরে নেয় পুকুরের জলে। বস্তির রাস্তায় ঘর থেকে কয়েক পা দূরে ভাতের দোকানে তার রোজকার খাওয়া। ভরাপেটে, পরিচ্ছন্ন শরীরে বিছানায় শোয়ামাত্র নেমে আসে অন্ধকার। সে অন্ধকারকে আলিঙ্গন করে। ছোট্ট জানালা দিয়ে একচিলতে আকাশ, এক টুকরো মেঘ… কখনও এরোপ্লেনের মিলিয়ে যাওয়া আলোর বিন্দু… ল্যাম্পপোস্টের ম্লান আলোয় অন্ধকারে নারকেল গাছের মাথা … । সে চোখ ফিরিয়ে নেয় আলো থেকে অন্ধকারে। ঘুম নেমে আসে।
এই বস্তিতে কয়েক ঘর মানুষ। ছুতোর মিস্ত্রী, রাজমিস্ত্রী, যোগানদার, ঠিকে ঝি, কাগজ কুড়ানি…. । বস্তির পেছনে কচুরিপানায় ভরা পুকুর। তাই সরিয়ে সরিয়ে ডুব দিয়ে মানুষগুলোর স্নান। বড় রাস্তা পেরোলেই নতুন কলোনি। বাড়ি উঠছে তো উঠছেই। শহুরেবাবুদের ফ্ল্যাটবাড়ি। আকাশছোঁয়া। জনমজুরের ভিড়। এসেছে দূর- দূরান্তের গ্রাম থেকে। মাঝেমাঝেই খাল সংস্কার। ঝুড়ি ঝুড়ি মাটি উঠছে। পার্টিবাবুরা গাড়িতে এসে ঘুরে যায়। বস্তির লাইনবন্দি কাঁচা- পাকা ইটের ঘর আর ঝুপড়িঘরগুলো দেখে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। মানুষগুলো ভয় পায়, এই বোধহয় উচ্ছেদের কথা বলবে। কিন্তু তারা বলে না, ভাবে, গরিব মানুষগুলো যাবে কোথায়? তাছাড়া সামনে ভোট আসছে। পঞ্চায়েত ভোট। অগত্যা আরও নতুন নতুন ঝুপড়ি উঠতেই থাকে। কেউ বাধা দেয় না।
সে অনেকটা পেছনে। তার সামনে বস্তির মানুষগুলো। ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে। ছোটার কারণটা সে জানে না। চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছে তার। কিন্তু একটা কৌতূহল আবার অজানা একটা ভয়ও আষ্টেপৃষ্ঠে তাকে জড়িয়ে ধরছে। তার ভালো লাগছে ওদের ছোটা দেখতে।

সে-ও ছুটত একদিন। নদীর পাড় যেখানে ঢালু হতে শুরু করেছে — সেই ঢাল বেয়ে সে ছুটত। বাবা পেছন থেকে চ্যাঁচাত –‘ ছুটিস না বাবু। পড়ে যাবি।’ সে ছুটতে ছুটতেই বলত –‘ ছুটব বাবা, ছুটব। তুমিও ছোটো না।’
বাবা হাঁফাত। বলত, ‘আমার কি আর ছোটার বয়স আছে রে বোকা? আমি বরং বসছি। তুই ছুটে নে। হাঁপিয়ে গেলে বলিস।’
বাবা সেখানেই বসে পড়ত আর সে ছুটত ঘোড়ার মতো।
নদীতে হাঁটুজল। নদীর পাড়ে একটা দুটো বাড়ি। টালির ছাদ। বেড়ার গায়ে রঙিন শাড়ি। নদী পেরিয়ে সে আর বাবা কোনো কোনোদিন মাঠে নেমে আসত। ধু-ধু মাঠ। দূরে ঝাপসা গাছপালা। আরো দূরে রেললাইন। লাইন ধরে এঁকেবেঁকে রেলগাড়ির কামরা। তার ইচ্ছে করত সেখানে যেতে। রেলগাড়িটাকে কাছ থেকে দেখতে। বাবা যেতে দিত না।

বাবার হাত ধরেই রোজ বেড়ানো। কিছুদূর গিয়েই বাবা হাত ছেড়ে দিত। তখন ছুট- ছুট আর ছুট। গ্রামের সেই বাড়িতে দমবন্ধ হয়ে আসত। মা রুগ্ন, বারোমাস অসুস্থতার জের। বাইরে বেরোতে পারত না। সংসারের মধ্যেই মা-র রোজকার বাস। বিকেল হতে না হতেই বাবা দোকানের ঝাঁপ বন্ধ করে ছেলেকে নিয়ে হাঁটতে বেরোত। মা রাগ করত।’ কী এত বেড়ানো তোমাদের? তার চেয়ে দোকানে আর একটু বসলে সংসারে আর একটু বেশি আয় হয়।’ মা-র জন্য তার মায়া হত। বাবা মুখে কিছু বলত না। মুখ টিপে হাসত শুধু।
দোকান থেকে বেরিয়ে গ্রামের সীমানা পেরোলেই ছেলের হাত ছেড়ে দিত বাবা। তখনও সূর্য ঢলে পড়েনি। সারা আকাশ রাঙিয়ে তবে সে বিদায় নেবে। ছুটতে ছুটতেই সে দেখত আকাশে রঙের খেলা। আলোর আভাস সরতে সরতে ধূসর আকাশ যখন নীলচে- কালো, তখন বাবা-ছেলে ঘরে ফিরত। একটা দুটো করে পাখি তখন ফিরে আসছে বাড়ির সামনে কাঁঠালগাছটায়। মা সন্ধ্যা- প্রদীপ জ্বালাচ্ছে। বাবার হাত ধরে যখন বেরিয়েছিল, তখন ঝকঝকে রোদ্দুর। বাতাসে গরমের ঝাপটা। সেই বাতাসেই এখন ঠান্ডা – ভিজে ভাব।
মা-র মুখভার। গজগজ করত, ‘রাজ্যজয় করে ফিরল বাপ- ব্যাটা। বাবা তখনও হাসত। তার চোখের দিকে এমন ভাব নিয়ে চাইত, যেন তার বোকা মা বুঝতেই পারবে না তাদের ঘুরে বেড়ানোর আনন্দ… সূর্যের ঢলে পড়া, ধু-ধু মাঠ, খোলা আকাশ, হুহু বাতাস, আঁকাবাঁকা রেলগাড়ি…।
সেদিন বাবা সঙ্গে ছিল না। কী একটা কাজে শহরে গিয়েছিল। সে একা একাই ছুটে বেড়াচ্ছিল নদীর ঢাল বেয়ে। তারপর নদী পেরিয়ে মাঠ — মাঠ পেরিয়ে দূরের সেই গাছপালা স্পষ্ট তখন। পাশেই রেললাইন। সবকিছু ভুলে আনন্দে আত্মহারা সে রেললাইন ধরে ছুটছিল এলোমেলো। আচমকা তার মনে হল একটা দমকা হাওয়ায় ছিটকে গেল সে। তখন মাথার ভেতর শুধু রেলগাড়ির ভোঁ। অসহ্য যন্ত্রণা…।

বস্তির মানুষগুলো ছুটতে ছুটতে সেই কখন পৌঁছে গেছে বড় রাস্তায়। সে তার এক পায়ে গ্রীষ্মের রুক্ষ মাটিতে ক্রাচের দাগ ফেলতে ফেলতে পৌঁছালো এই মাত্র। রাস্তা জুড়ে ভিড়। মাথা আর মাথা। বস্তির মানুষজন ছাড়াও আরো অনেক মানুষ। ভিড়ের পেছনে যানবাহন আটকে। পুলিশের গাড়ি। একজন মহিলার বুকফাটা কান্না আকাশ- বাতাস দুমড়ে মুচড়ে তালগোল পাকিয়ে…।
সে হাঁপাচ্ছে। বসে পড়ল রাস্তার ধারে গাছের ছায়ায়। এতটা পথ হেঁটে আসতে বেশ কষ্ট হয়েছে। ঘামে ভিজে গেছে জামা। কপালের ঘাম গাল বেয়ে। মাথার চুল ভেজা।
সেদিন যখন তার জ্ঞান ফিরেছিল, বাবা তার দিকে তাকাতে পারেনি। কিন্তু সে লক্ষ্য করেছিল তার রুগ্ন মা-র তীব্র চাহনি বাবাকে বিদ্ধ করছে। সেই অপরাধবোধ থেকেই বাবা বিছানা নিল। একদিন দোকানও বন্ধ হয়ে গেল।
পেছনের সেইসব দিনগুলো দ্রুত এসে মিশে যাচ্ছে আজকের দিনটায়। সেই অবারিত মাঠ-গাছপালা-নদী- রেললাইন – মা- বাবা। ছবির পর ছবি। এখন সবই ছবি।
অনেকদিন শুয়েছিল সে বিছানায়। ওঠেনি। পাশ ফিরতেও ইচ্ছে করত না। জানালার বাইরেই সকাল গড়িয়ে দুপুর… বিকেল … সন্ধে… রাত্রি। এভাবেই অন্ধকারকে চিনতে শিখেছিল সে। তারপর ভালবেসে ফেলল।
এক একসময় মনে হত ছুটে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। ভুলে যেত, সে আর ছুটতে পারবে না। ছোটার কথা ভাবলেই তার বাবার কথা মনে পড়ে। মলিন ধুতি-পাঞ্জাবির বাবা। হাসিমুখ। বাবা হাত ধরে আছে তার। তার হাতে এখনও লেগে থাকে বাবার হাতের স্পর্শ। তার জন্য বাবা ফেলে গেছে লম্বা লম্বা বিকেল। সে জানে, সেই বিকেলগুলো ফিরে আসবে না আর।

ভিড়টা সরে যাচ্ছে। দুটো পুলিশ লাঠির বাড়ি মেরে ভিড়টাকে ছত্রখান করে দিল। বস্তির তিন- চারজন বৌ একজন মাঝবয়সী মহিলার হাত ধরে টেনে নিয়ে আসছে। পাগলিনীর মতো বুকে আঘাত করছে মহিলা। সে মহিলাকে চিনতে পারল না। এই বস্তির সকলকে সে চেনে না।
ক্রাচ বগলে সে উঠে দাঁড়াল। এক পায়ে হাঁটতে লাগল যেখানে ভিড়টা জমাট বেঁধেছিল সেদিকে। জায়গাটায় পৌঁছে সে দেখতে পেল একটা মানুষের শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন দুটো পা। নিস্পন্দ।
মানুষটার হাঁটুর নীচ থেকে রক্তের ধারা। সে কেঁপে উঠল। মাথাটা ঘুরে গেল। তার বগল থেকে ক্রাচটা পড়ে গেল সশব্দে। টাল সামলাতে না পেরে সে পড়ে গেল নিজেও। রাস্তায় পড়ে থাকা বিচ্ছিন্ন দুটো পায়ের দিকে তাকিয়ে হাত বাড়িয়ে সে তার একমাত্র সুস্থ পা-টাকে আদর করতে চাইল।

