
দর্পহারী দাম সাবধানে সদ্য ছাড়া সার্টটিকে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। প্রথম পর্যায়ের নিরীক্ষণ সন্তোষজনক হওয়ায় তিনি দ্বিতীয় পর্যায়ে গেলেন অর্থাৎ নাক থেকে ছয় ইঞ্চি দূরে রেখে একবার অনুলোম স্টাইলে দীর্ঘনিশ্বাস নিলেন। ঠিক তখনই পিছন থেকে শৈবলিনী দাম বললেন ‘ওটা কি হচ্ছে’? দর্পহারী বাবু – যাকে বলে – তড়িতাহতবৎ পিছনে ঘুরে দেখলেন হাতে ধূমায়িত চায়ের কাপ সহ স্ত্রীকে। মুখের ভাব – সে – অনেক রকম ভাবে সম্প্রসারণ করা যায়। অপরাধী সার্টটি সঙ্গে সঙ্গে খাটে ছুঁড়ে ফেলে দাম বাবু শুধু বলতে পারলেন ‘হে হে’। গুঁড়ো দুধ চুরি করে খেতে গিয়ে যেমন বালকরা মায়ের হাতে ধরা পড়ে – গোঁপে দুধের আস্তর সহ – তেমনি ধরা পড়েছেন তিনি। হাতের কাপ টেবিলে রেখে শৈবলিনী বললেন –
‘বলি, সার্ট তো একটা নেই। সারা দিন পরে থাকার পর এটা কাচতে দিলে কি এমন মহাভারত অশুদ্ধ হবে’?
দাম বাবু মিনমিন করে বললেন –
‘তা ঠিক, তবে কলারটা তেমন নোংরা হয় নি তাই ভাবছিলাম … না না কাচতে দিচ্ছি এখুনি’।
শৈবলিনী মরা ইঁদুর ধরার মত অপরাধীকে দু আঙুলে উঠিয়ে ঘর ছাড়তে ছাড়তে বিড়বিড় করলেন –
‘গন্ধে ভেলুও পালাবে … আর এটা কি না …… সকাল আটটায় গায়ে ওঠে আর নামছে সাড়ে নটায়। অফিস ছুটি সাড়ে পাঁচটায় । তারপর যে কি রাজ কাজ থাকে প্রতিদিন – কে জানে। চা-টা খেয়ে চানে যাও। হেঁসেল উদ্ধার করি’।

দাম বাবু তাঁর নামটিই স্মরণ করলেন ‘হে দর্পহারী মধুসূদন, সারা সন্ধে রাত বসে বসে দপ্তরে মাছি তাড়াতে হয়। একটা কিছু করো ঠাকুর’। পোষা নেড়ি ভেলু তার পায়ের কাছে ল্যাজ নাড়াচ্ছে। দাম বাবুরও প্রায় তাই দশা।
আসলে সমস্যা সার্ট নয়। দর্পহারী বাবু এমনিতে সৌখিন মানুষ। গোলাপি সার্টের সঙ্গে হলুদ প্যান্ট তিনি কদাপি পরেন না। দাড়ি কামান উল্টে পালটে। প্রাক টাক ঢাকার জন্যে অন্তত সাড়ে সাত মিনিট কসরত করেন চানের পরে। খুশবু মাখেন নিয়মিত আর সে সব বেশ উঁচু মানের। তবে সেই যে ছোটবেলায় তাঁর মাত্র দুটি জামাপ্যান্ট ছিল । আর সে দুটিই সারা সপ্তাহ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পরতে হত। আজ সে কষ্ট অতীত হলেও – সমস্ত মধ্যবিত্তের মতই – সে কথা তিনি ভুলতে পারেন নি। একটি সার্ট অন্তত দু দিন পরাই যেত । পরতেনও তিনি। কিন্তু মাস ছয়েক আগে এলেন প্রল্হাদ পাকড়াশী, নতুন বস। তারপর থেকেই জ্যাগারিতে স্যান্ড। আগে মোটামুটি সাতটায় অফিস ছাড়তেন তিনি, পৌনে আটটায় ঘর। এখন নটার আগে বস বেরুচ্ছেন না। কাজেই তাকেও ধুনি জ্বালিয়ে একা বসে থাকতে হচ্ছে দোতলায়।
এমন নয় যে কাজের চাপ হঠাৎ করে খুব বেড়ে গেছে বা নতুন বস অম্লশূলে ভোগা বাঙালি। প্রবৃত্তি সিঙ্গি মাছের মত – হাত বাড়ালেই কাঁটা । ইনি বিহারে মানুষ। যাকে বলে প্রবাসী বাঙালি। কথায় একটু রাষ্ট্র ভাষা ঝলক দিয়ে যায়। নাদুস নুদুস নেয়া পাত্তি ভুঁড়ির মালিক। একটু পানাসক্ত। তাঁর হাত ফেরতা সব কাগজেই বেনারসি জর্দার গন্ধ লেগে থাকে। যতটা খারাপ হলে অফিস চালানো যায় – তার বেশী তাঁকে কেউ খারাপ বলবে না। তাছাড়া ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দর্পহারী বাবু দেখেছেন ভুঁড়িয়াল মানুষরা খুব একটা খারাপ হতে পারেন না। তারও একটু আছে কি না । কিন্তু দোষ বলতে কিছুতেই নটার আগে অফিস ছাড়েন না। আরেক জন অফিসার মহিলা, আসেন কিছুটা দূর থেকে। তার ঘরে বাত ও বাতিকগ্রস্ত শাশুড়ি রয়েছেন । কাজেই ছটা বাজলেই তিনি মেট্রো ধরেন। রইলেন ভাঙা কুলো দাম বাবু। তার আবার এটাই প্রমোশনের বছর।

পাকড়াশী সাহেবের আবার সমস্যা তার নতুন বস গগনবিহারী গোপ। দুষ্ট জনে বলে তিনি যার আন্ডারে – অর্থাৎ তাঁর স্ত্রী – এক খাণ্ডার মহিলা । যে কোন সময় ‘অরন্যদেবের ব্যান্ডার’ সেনার মত বিষ লাগানো তীর ছুঁড়ে থাকেন। তাই গগনবিহারী স্যার বাড়ি যেতেই চান না এবং স্বাভাবিক প্রতিহিংসার বশে সন্ধে নাগাদ গোটা দুয়েক ছোটা পেগ নিয়ে বসেন । তারপর সমস্ত ছোটো অফিসের মাথাদের ল্যান্ড লাইনে ফোন করতে থাকেন। তাঁর সারা জীবনের বহু কথিত সাফল্যের ইতিহাস শোনাতে থাকেন ‘টিক টক’ এর মত টকাটক। মিনিট কুড়ি এমন ভূমিকার পর ব্যবসার খবর। কালকের খতিয়ান। ছোটো মাথাদের ধুয়ো ধরা কাজ। নইলে অরুণাচলে ট্রান্সফার আটকায় কে? কখন তোমার আসবে টেলিফোন – তা তো আগে থাকতে বোঝা যায় না। অতএব নিশি কুটুম্বের মত নিশি যাপন। মাথা থাকলে ঘাড়ও থাকবে। সুতরাং মাঝে মোলো দর্পহারী বাবুর মত কিছু কিছু নির্দোষ প্রাণ। কাজ থাকলে থাকাই যায় । কিন্তু সে তো প্রতিদিন থাকে না। আবার পাকড়াশীবাবুর ব্যথার কথা দাম বাবু জানেন। তিনিও খুব আমোদে থাকেন এমনটা নয়। কাজে কাজেই তাঁকেও কিছু বলে উঠতে পারেন না। জীবন যেন ‘হাড়দা’র জিলিপি মেলার মত পেঁচিয়ে গিয়েছে।
রাত্রে খেতে বসে স্ত্রীকে বলেই ফেললেন ব্যাপারটা। সাধারণত অফিসের ব্যাপার বাড়িতে বলেন না তিনি। উভয়েরই সেটা না পসন্দ। কিন্তু স্ত্রীর উপস্থিত বুদ্ধির দাম দেন দাম বাবু। তাই তাঁর বাড়ি ‘হালুম’ কম আর ‘ম্যাও’ বেশী শোনা যায়। শৈবলিনী হাতের রুটি – কাশির পান্ডা যেমন গঙ্গা স্নানার্থীকে ঝুঁটি ধরে চোবায় – তেমনি মত ডালে চোবাচ্ছিলেন। সেটা নামিয়ে রাখলেন থালায়। পাখা দেখলেন, ফ্রিজ দেখলেন, সোফা দেখলেন তারপর দেখলেন দাম বাবুকে। ধীরে ধীরে বললেন –
‘তাহলে তোমাদের দু-জনেরই একই সমস্যা’?
‘হ্যাঁ’।
‘তবে দু-জনে একবার একসঙ্গে বসে কথা বলে দেখ না । অনেক দিন তো হল এই গোলকধাঁধায় । দু-জনের মগজ ঠোকাঠুকি হলে সমাধান কিছু বেরোতে পারে’ ।
পরামর্শটি ভেবে চিন্তে খারাপ লাগলো না দাম বাবুর। পাকড়াশীবাবু লোক মন্দ নন। তাঁর স্ত্রী সাধারণের অতিরিক্ত ঝগড়া করে – এমন খবর কোন খোঁচর তো দেয় নি। আসলে যেকোনো অফিসেই বড় সাহেব আসার আগে – তার সম্বন্ধে – কিছু কিছু গুপ্ত সমাচার সংগ্রহ করার চল আছে। সেই প্রশ্নাবলীর মধ্যে – জাতি, ধর্ম, মদ্যপানের পরিমাণ, ঘুষ, কাদের সঙ্গে মাখামাখি ইত্যাদির সঙ্গে স্ত্রী অত্যাচারী কি না – এ প্রশ্নও থাকে। পাকড়াশী বাবুর মোটের উপর ফার্স্ট ডিভিশন আছে। তাহলে সন্ধ্যা লগ্নে বাড়ি ফিরিতে তার তো আপত্তি থাকার কথা নয়। কপাল ঠুকে কালকে বলেই দেখা যাক।
পরদিন সাড়ে সাতটা নাগাদ পাকড়াশী বাবুর চেম্বারে ঢুকলেন দাম বাবু। পাকড়াশী বাবু ল্যান্ড লাইনের ফোনটির দিকে তাকিয়ে মোবাইলে কথা বলছিলেন। চোখে যে খুব প্রীতি ফুটছিল এমন নয়। হাত নেড়ে দাম বাবুকে বসতে বলে মোবাইলে কথা শেষ করলেন । কিছু ক্ষণ চুপচাপ। তাঁর পর নাতিদীর্ঘ শ্বাস ফেলে বললেন –
‘মেয়েটার জ্বর জ্বর মত হয়েছে। ঠাণ্ডা লাগার ধাত। বাড়তে দিলে মুস্কিল। কিন্তু ডাক্তার যে দেখাবো … ভাঁড় মে যায় এইসি নোকরি’।
‘আজ তাহলে যদি একটু তাড়া তাড়ি অফিস টা …’।
‘খেপেছেন। ফোন আসেনি এখনো’।
‘যদি স্যার আপনিই একবার যদি ফোন করে বলেন যে মেয়ে অসুস্থ, তাহলে …’।
‘তাহলে আমাকে শুনতে হবে সতেরো নম্বর গল্পটি’।
‘সতেরো নম্বর ‘?
‘হ্যাঁ সতেরো নম্বর। বড় সাহেব আমাদের একই গল্প এত বার করে শোনান না যে আমরা … মানে এই শাখা প্রবন্ধকরা … সব গল্পের একটা করে নম্বর দিয়ে রেখেছি। মোট আছে একুশটি। সতেরো নম্বর গল্পে উনি শোনাবেন যখন ওনার শ্বশুর মশাই দেহ রাখেন তখন উনি একেবারে কাজের দিনেই পৌঁছেছিলেন। ছুটি পাননি। কিছু বুঝলেন?’
‘হ্যাঁ স্যার। কিন্তু আমাদের সবার তো পরিবার আছে। তা ধরুন … এই আপনার আজকে যেমন … হটাত কিছু দরকার তো হতেই পারে।‘
‘প্রমোশন নিয়েছেন আর এটা জানেন না – শনিবার – রবিবার – পরিবার আমাদের থাকতে নেই? মাঝে মাঝে মনে হয় … অন্যেরা যেমন সুযোগ পেলেই গ্লাসে ডুবে যায় … তেমনি …’।
‘সে কি স্যার আপনি কি জলপথে … । কই তেমন তো খবর ছিল না?’
‘আপনারা আমার সম্বন্ধে খুফিয়া খবর নেন নি? সে লোক কি বলেছে আমি মদ খাই?’
‘খুফিয়া খবর …ছি ছি স্যার … না মানে সে রকম …’।
‘লজ্জা পাবেন না। আমিও আপনাদের মাঝখান দিয়েই এখানে এসেছি। আপনাদের খবর সচ হৈ। দারু নহি পিতে হম।‘
‘হ্যাঁ হ্যাঁ স্যার মদ খুব খারাপ। আমাদের এখানে এক সুইপার ছিল । রাম ঠনাঠন। খুব খেত। আপনি আসার দিন দশেক আগে একদিন নালিতে পড়ে – ব্যাস – অক্কা। এখনও ওর সব টার্মিনাল বেনিফিট সেটল হয় নি। মদ খেয়ে মরেছে বলে কিছু কিছু অবজেকসন আসছে।‘
‘কয়া -য়া -য়া -য়া হুয়া । মরে গেছে? ওর পরিবার টাকা পায় নি?’
‘হ্যাঁ। তবে সেদিন শুনলাম ফাইল ক্লিয়ার হয়েছে। এবার পেয়ে যাবে।‘
‘হ্যাঁ, কিন্তু এখনও পায় নি তো?’
‘না স্যার।‘
‘জয় বজরংবলী। জয় শ্রী কৃষ্ণ। আপনার নাম দর্পহারী, তিনি কে জানেন তো? ত্রাতা মধুসূদন। মনে হচ্ছে আমাদের সমস্যার একটা সমাধান হতে পারে’।
‘মানে কিভাবে …’।
‘দাম বাবু আপ অ্যাক্টিং উগারা জানতে হৈ ? থোড়া বহুত?’
‘অ্যা … অ্যা … অ্যাক্টিং … মানে অভিনয় ?’
‘হ্যাঁ। করেছেন কখনো ? ইশকুলে, কলেজে, অফিসে বিজয়া সম্মিলনীতে?’
‘হ্যাঁ … সে মানে স্যার টুক টাক …’।
‘বাস। বস কা ইলাজ হো গয়া। এখন মন দিয়ে শুনুন আমি কি বলছি।‘
পাকড়াশী সাহেব নতুন পান মুখে গুঁজে ঝুঁকে পড়লেন দাম বাবুর দিকে। নিচু স্বরে বলে যেতে লাগলেন তাঁর পরিকল্পনা। শুনতে শুনতে নানা রকম ভাব খেলে যেতে লাগলো দাম বাবুর মুখে। হর্ষ, ভয়, ভয় জয়, মুক্তির আনন্দ । খুব কাছাকাছি বসার জন্যে দাম বাবুর সাদা সার্ট পানের পিকে ডিজাইনার হয়ে গেল, কিন্তু পরোয়া করলেন না। এর মধ্যেই ফোন এসে গেল। কোন রকমে কথা শেষ করে পাকড়াশী বাবু বললেন –
‘অব আপ পর হি ইনকিলাব টিকি হুই হৈ। মোর্চা আগে বঢ়ো’।
…টিং টং … টিং টং … টিং টং (মাঝে দিন দুয়েকের বিরতি )
গগন বিহারী গোপের চেম্বারে কাঁচু মাচু মুখে দাঁড়িয়ে দুজন। গোপ বাবু পাকালিয়া চোখ পাকড়াশী বাবু আর দাম বাবুকে ঘড়ির পেন্ডুলামের মত চোখ নাড়িয়ে নাড়িয়ে দেখছেন। মিনিট পাঁচেক পরে যেন দয়াপরবশ হয়ে বললেন –
‘বসুন। এসব আজগুবি গল্প ফেঁদেছেন কেন ? আমাকে কি হাঁদা ভোঁদা পেয়েছেন আপনারা।‘
পাকড়াশী বাবু বিনয়ের কলা পাতা হয়ে বললেন
‘রাম কহো। কি যে বলেন স্যার। আপনাকে হাঁদা ভোঁদা? না আ আ না। কেল্টুদাও নয়। বড় জোর হস্টেল সুপারিন্টেনডেন্ট বলতে পারি। তেমনি দাপট, তেমনি ভুঁ … না মানে স্বাস্থ্যবান। আপনাকে সত্যি বলছি। এই দাম বাবুই শোনাবেন আপনাকে। আমার তো শুনেই পেট গুররাবত। বলুন না দাম বাবু , স্যারের কাছে ইয়ে কি।‘
দাম বাবু অনেক রিহার্সাল দেওয়া বয়ান গড়গড় করে আউড়ে দিলেন –
‘সে স্যার গত পরশুর কথা। রাত তখন … বেশী না … এই সওয়া আটটা হবে। একাই আছি দোতলায়। স্যার নিজের চেম্বারে। হটাত শুনি খস খস খস খস বললে প্রত্যয় যাবেন না স্যার – দেহ রোমাঞ্চিত হয়ে গেল।‘
গোপ বাবু নিজের কামানো গোঁপে তা দিয়ে দাবড়ালেন –
‘পয়েন্টে আসুন। ভারি ভারি বাংলা বলে আমাকে চমকাবার চেষ্টা করবেন না।‘

‘না স্যার হ্যাঁ স্যার … বলছিলাম গায়ের লোম খাড়া খাড়া হয়ে গেল । সামনে দেখি রাম ঠনাঠন। বলল হুজুর হমার বকায়া। কি বলি ? এতো স্যার আমাদের সুইপার। মাস ছয়েক আগে মদ খেয়ে ড্রেনে পড়ে পটল তুলেছে। ওর পরিবার সব টাকা পায় নি এখনো। তাই বোধহয় বলতে এসেছিল’।
‘বটে! তো আপনি কি করলেন?’
‘কি করবো স্যার। প্রাণ নিয়ে পালালাম স্যারের চেম্বারে। তারপর অনেক সাহস জুটিয়ে দু-জনে এক সঙ্গে দোতালায় এসে দেখি কেউ নেই ভোঁ ভাঁ। কোন রকমে লাইট নিভিয়ে অফিস বন্ধ করে পালিয়েছি।
‘হুম। আর পাকড়াশী বাবু আপনি কি দেখেছেন?’
‘আমি স্যার ঠিক কিছু দেখিনি তবে কালকে সন্ধ্যে বেলা যখন একা বসে ছিলাম মনে হল কেউ যেন হাঁটছে ওপরতলায়।‘
‘একা কেন ? কালকে দাম বাবু ছিলেন না?’
‘ছিলাম স্যার । কিন্তু নিচে, পাঁচুর চায়ের দোকানে। ও বেটা আবার রাম ঠনাঠনের বন্ধু। থাকেও এক পাড়ায়। সে তো বলল রাম ঠনাঠন প্রায়ই এসে বৌ এর থেকে মদ খাবার টাকা চাইছে আর ওর বৌ ঝাঁটা মেরে তাঁকে দূর করছে। ক্যাডাভারাস কাণ্ড স্যার।‘
‘বটে ? ভুত হয়েও বৌয়ের ভয় যায় নি? ঝাঁটা দেখে পালাচ্ছে।‘
‘বৌ এর ভয় কি যাবার স্যার? সবাই কি আর আপনার মত সাহসী ? আমাদের তো বৌ শুনলেই … থাক গে।

তাছাড়া ভুত তাড়াবার সনাতন প্রথা তো তাই । আমি দেখেছি ছোটবেলায় আমাদের গ্রামে। সর্ষে ছুঁড়ে ঝাঁটা মেরে ভুত তাড়াতে। আমাদের ওঝা ভয়ংকর ঢোল তাই করত।‘
‘মানুষের নাম ভয়ংকর ? আমাকে বুড়বক পেয়েছেন ?’
‘না স্যার। আসল নামটা ভবেশ কি ভরত – কিছু একটা ছিল। কিন্তু জটা জুট, ভুঁড়ি পর্যন্ত দাড়ি এমন একটা চেহারা নিয়ে ঘুরত তো । লোক মুখে ভয়ংকর হয়ে গেছল। অবাধ্য ছেলেদের দুধ খাওয়াতে হলে – ওর নাম করলেই হত’।
‘দেখুন পাকড়াশী বাবু … দাম বাবু আপনি ও শুনে রাখুন … এসব গল্প শুনিয়ে আমাকে কোন লাভ নেই । আমি ছোট বেলা গ্রামের শ্মশানে …’।
‘মাঝরাতে বন্ধুদের সঙ্গে বাজি ধরে বট গাছে গজাল পুঁতে এসেছিলেন। তা ছাড়া দোর্দণ্ডপ্রতাপ দোরাবজী সাহেবের অন্যায় আচরণের প্রতিবাদ করেছিলেন। সাহেব অবশ্য রাগেন নি বরং আপনার প্রমোশন করে দিয়েছিলেন।‘
‘হ্যাঁ … কিন্তু দাম বাবু আপনি এসব জানলেন কি করে?’
‘পাকড়াশী বাবু বলেছেন স্যার। আপনার সব কীর্তি কাহিনীই উনি আমাকে বলেন । খুব শ্রদ্ধা করেন কি না।‘
‘হুম। এখন আপনারা চানটা কি খোলসা করুন তো?’
‘বলছিলাম স্যার যদি একবার আজ সন্ধেবেলা আমাদের ব্রাঞ্চে আসেন। হয়ত আমাদের ভুল হচ্ছে … মানে আমরা ভয় পেয়ে যাচ্ছি তো। আপনার মত সাহসী লোক দেখলে রাম ঠনাঠন হয়ত পালাবে। আর দর্শন দেবে না।‘

‘আমাকে কি ভুতের রোজা পেয়েছেন না কি? না না ওসব হবে টবে না। অপঘাতে মরেছে বলছেন … কোন দোষ পেয়েছে কি না …’।
‘আজ্ঞে দেখেছি স্যার । পঞ্জিকা বলছে ত্রিপাদ দোষ । এ তে আত্মার মুক্তি হয় না। তবে এসব কুসংস্কার । আমি মানি না।‘
‘আপনি না মানলে কি শাস্ত্র মিথ্যে হয়ে যাবে? বোকার মত কথা বলবেন না। তারপর টাকা পায় নি। এ সব ক্ষেত্রে মুখোমুখি হওয়া হঠকারিতা হয়ে যাবে।‘
‘ঠিক স্যার।‘
‘হুম। ভাবছি … আপনারা … বরং একটু তাড়াতাড়ি অফিস বন্ধ করুন।‘
‘সে কি করে হবে স্যার। আপনাকে ফোনে সারা দিনের রিপোর্টটা না দিলে … ‘।
‘রাখুন তো। বিরাট ব্যবসা করছেন সব। আমি বলেই শুধু ফোনে অল্প গাল দিচ্ছি। পড়তেন যদি দোরাবজী সাহেবের খপ্পরে । চেম্বারে ডাক পড়লে না প্যান্ট ঢিলে হয়ে যেত। না না আমার হত। অন্যদের দেখেছি আর কি।‘
‘সে তো বটেই স্যার আপনার সাহস বাবু কুয়ার সিং-এর পরে আর কারু ……। কুয়ার সিং জানেন তো স্যার।পরাধীন ভারতে ভোজপুরের জমিদার। সে কালে বলে বলে সাহেব পেটাতেন, ধোনির বাটিং স্টাইলে। প্রায় আপনারই মত হেঁ হেঁ। তবু একেবারে ফোনটা না এলে বড় খালি খালি লাগবে তো। অভ্যাস হয়ে গেছে। বলছিলাম তাহলে কি স্যার কালকে প্রথমে আমাকেই ফোনটা করে নেবেন ?’
‘তাই করতে হবে – যেমন ভীতুর ডিম আপনারা। ঠিক আছে এখন আসুন। দিনের বেলা যাব একবার। আপনাদের সাহস যোগানোটাও একটা কাজ বাড়ল দেখছি।‘
‘হেঁ হেঁ স্যার নিশ্চয়ই স্যার। আসি আজ।‘
… টিং টং… টিং টং … টিং টং (পরের দিন সন্ধ্যে সাড়ে ছটা)
পাকড়াশী বাবুর চেম্বারে দাম বাবু বসা। দুজনের মুখেই চওড়া হাসি। ফোন এসে গেছে । তেমন কড়া কথা হয় নি। বরং একদম নতুন একটি বীরত্বের গল্প শোন গেছে গোপ বাবুর কণ্ঠে। নম্বর হল বাইশ । সহাস্য দাম বাবু জিজ্ঞেস করলেন –
‘আচ্ছা স্যার এ বুদ্ধিটা যে লাগবেই সেটা আপনি নিশ্চিত ছিলেন?’
‘আরে মশাই বিপণন কিছু জানা আছে আপনার? সেখানে নিশ্চিত কিছু হয় না, আবার হবে না এটাও অভিধানে নেই। কিছু কিছু প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সূত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়। এই গোপবাবু – আসামে রাত্রি বেলা – গেস্ট হাউসের জানলা দিয়ে কলা গাছে হিলছে দেখে খুব চিল্লা মেল্লি করেছিলেন। উ ব্রাঞ্চ কা মানিজর সাব হমারা খাস দোস্ত থা।’
‘তাই লাগিয়ে দিলেন ‘?
‘হ্যাঁ। লাগিয়ে দিলাম। অওর লগ গয়া জামুন মে ঢেলা। বিলকুল ডরপোক আছে। দেখেন না আপনার গোপ বাবুর গোঁপই নেই। মর্দও কা মুছ শান হোতি হৈ। আর দোরাবজী কা কহানি? ওকে হোজাই ব্রাঞ্চে ট্র্যান্সফার করে ছিল। হাত পা ধরে রিটেন্সন। বস হবার পরে এটাকেই বীর গাথায় কনভার্ট করেছে। ও আসবে আপনার ভুত দেখতে। আমার মাথায় টাক এমনি এমনি পড়েনি দাম বাবু। চলুন চলুন আজ বিটিয়ার সঙ্গে লুডো খেলতে হবে। আর হ্যাঁ রাম ঠনাঠন আমাদের অনেক উপকার করল। একটু জোর লাগান যাতে ওর পরিবার পুরো টাকাটা তাড়াতাড়ি পেয়ে যায়।‘
সস্মিত দাম বাবু মাথা নাড়লেন। তারপর বহুদিন পরে চড়লেন সাতটা পনেরোর মেট্রোতে।


গল্পটা বেশ মজাদার, হাস্যরস আর অফিস-রাজনীতির খোঁচা একসাথে মিশেছে। ভাষা খুবই প্রাণবন্ত, চরিত্রগুলো আলাদা আলাদা ভাবে ফুটে উঠেছে—দর্পহারীর মিনমিনে ভদ্রলোকসুলভ স্বভাব, পাকড়াশীর কৌশলী কিন্তু লোকাল স্বভাব, আর গগনবিহারীর ঢঙের গল্পগুজব—সব মিলিয়ে পাঠককে ধরে রাখে।
কিছু জিনিস বিশেষভাবে ভালো লেগেছে:ডায়লগগুল একদম বাস্তব, যেন ঠিক সামনে বসে কেউ বলছে।অফিসের পরিবেশ ও “বড় সাহেব”-এর আচরণ একেবারে চিনে ফেলা যায় এমনভাবে বর্ণনা করা।
ো