প্রাগৈতিহাসিক যুগ হইতে মানব সভ্যতার অন্তহীন পথ পরিক্রমণ। যূথবদ্ধ গুহাবাসী তৎকালীন মানব, অন্যান্য পশুদিগের ন্যায় নিজ অস্তিত্ব সংরক্ষণেই কালাতিপাত করিয়াছে। প্রতিদিনের খাদ্য সংগ্রহ হইতে, আপন গোষ্ঠীকে প্রাকৃতিক বিপর্যয় কিম্বা অন্যান্য প্রজাতির আক্রমণ হইতে রক্ষা এবং পরবর্তী প্রজন্মকে পৃথিবীতে আনয়ন এবং প্রতিপালন করিয়া নিজ নিজ বংশধারা সচল রাখিবার নূন্যতম কার্যটুকু নির্বাহ করিয়া আসিয়াছে। ইহা পৃথিবীর অপরাপর প্রাণীকূলও করিয়া থাকে। ‘অতি স্বাভাবিক’ এই কার্য কারণে, জীব রূপে মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা লাভ হয় নাই। ঠিক যেক্ষণ হইতে মানুষ ভাবিতে সক্ষম হইল, মনুষ্যেতর প্রাণী হইতে নিজেকে সে ভিন্নতর উচ্চতায় পাইল। উক্ত ভাবনা, আবিষ্কারের ভাবনা। কেবলমাত্র বহির্জগতের নানাবিধ রহস্য উদ্ঘাটন নয়, মানুষই একমাত্র প্রাণী যে নিজ অন্তরেও অন্বেষণ করিতে সক্ষম। আত্মানুসন্ধানের পথে তাহার নিরলস প্রয়াস, তাহাকে পশুবৃত্তি হইতে মুক্ত করিতে সক্ষম হইয়াছে।
জৈবিক নিয়মানুসারে মানুষও অন্যান্য পশুদের ন্যায় একটি শরীরের অধিকারী। শরীর ধারণের প্রয়োজনে সকল প্রাণীকূলের ন্যায় আহার নিদ্রা মৈথুন প্রয়োজন। ইহাতে তাহার জীব ধর্ম রক্ষিত হয়। উক্ত ধর্ম হইতে উত্তীর্ণ হইয়া মানব ধর্মে পদচালনা করিতেই, মানুষ পৃথিবী শাসনের অধিকার লাভ করিয়াছে। বহিরাবরণে তাহার শ্রষ্ঠত্বের তকমা লাগিলেও তন্মধ্যে রহিয়া যায় পশুধর্মের বীজ। একবিংশ শতকের বর্তমানে আসিয়া দাঁড়াইয়াও তাহাকে সেই ধর্ম, আদিম জৈব উপাদানে পর্যবসিত করিতে বাধ্য করে। তাহার শতাব্দ লালিত শিক্ষা দীক্ষার প্রলেপ তাহাকে কণামাত্র পরিশীলতা দান করিতে অপারগ।
crime against woman in society school college home
যত্রতত্র ‘বীর’ পুঙ্গবেরা নারী শরীর দেখিলেই লালসার পাহাড় লইয়া লম্ফ দিয়া আক্রমণ করিয়া কাম চরিতার্থ করে, কখনওবা ব্যবহৃত নারী শরীরটিকে নির্মম অত্যাচার করিয়া হত্যাও করিয়া থাকে।
পচনশীল শরীরের নানা স্থান হইতে ক্রমবর্দ্ধমান বিষাক্ত ক্ষতের ন্যায় এইরূপ দুঃসহ ঘটনা আমাদের নিয়মিত পীড়িত করিয়া চলিয়াছে। পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় পুরুষের একাধিপত্য অন্যতম কারণ হইতে পারে, তৎসহ সমাজ এবং পরিবেশ পুরুষকে তাহার পশুসত্তার জাগরণে অণুঘটকের কাজ করিতেছে। ইহা হইতে কি নিস্তার নাই?

সমাজে ঘটিয়া চলা সমস্ত এইরূপ দুর্ঘটনা লোকচক্ষুর গোচরে আসিতে পারে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অত্যাচারিত নারী অপমানের জ্বালা সর্বসমক্ষে আনিতে অপারগ হইয়া থাকেন। অপরাধী অত্যাচার করিয়াও অব্যাহতি পাইয়া যায়। অন্যদিকে ন্যায়বিচারের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম প্রক্রিয়ার ফাঁক গলিয়া যায় বহু অপরাধী। সমাজব্যবস্থার আইনি প্রক্রিয়া ও সংগঠিত অপরাধের অনুপাতের অঙ্কে প্রশ্নচিহ্ন থাকিয়া যায়।
আইনের পথ, দুর্ঘটনা পরবর্তী প্রতিক্রিয়া। ইহাতে ভবিষ্যতের অপরাধ হ্রাস পাইবার লক্ষণ অদ্যাবধি গোচরে আসে নাই, পক্ষান্তরে তার ক্রমবর্ধমান পরিসংখ্যান আমাদিগকে ভীত সন্ত্রস্ত করিয়া তোলে।
সামাজিক মনন কি ক্রমবিকৃতির পথে ধাবিত? সমাজ মাধ্যমের সুলভ যৌনতার আয়োজন কি মস্তিষ্ক প্রক্ষালনের অনুঘটক? চিকিৎসাশাস্ত্রে স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রতিরোধ ক্ষমতা বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে চর্চিত হইয়া থাকে। সামাজিক মননের ক্ষেত্রেও সেই সূত্র খুঁজিতে হইবে, যাহা পুরুষকে অন্তর হইতে শুদ্ধ করিতে পারে। উহাকে জৈব তাড়না হইতে রক্ষা করিতে নিজ অন্তরে একটি স্বভাবিক রক্ষাকবচ সৃষ্টি করিবে। তাহাকে মানবিক বোধে উত্তীর্ণ করিবে।
অদ্যাবধি প্রবৃত্তিকে আইনের ভয় দেখাইয়া দমন করিবার চেষ্টা সফল হয় নাই। অজস্র ক্ষেত্রেই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করিয়া কার্যসাধনের দৃষ্টান্ত লক্ষণীয়। যেন নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণের অভ্যন্তরেই অতিরিক্ত আনন্দ নিহিত রহিয়াছে।
সভ্যতার অগ্রগতির প্রধান চালিকাশক্তি, তাহার শিক্ষা ব্যবস্থা। প্রজন্মের পর প্রজন্মকে ভাবনার ক্ষমতা দান করে এই ব্যবস্থা। কেবলমাত্র এই একটি মাত্র পথ আমাদিগকে এই সমস্যা হইতে উদ্ধার করিতে পারে।
বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা কেবলমাত্র জীবিকা উপযোগী শংসাপত্র লাভ করিবার উপায়ে পর্যবসিত হইয়াছে। ইহাকে আত্মানুসন্ধানের পথের দিক নির্দেশ করিতে হইবে, নচেৎ সামাজিক ব্যাধি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাইয়া চলিবে আর তৎসহ সম্মিলিত হাহাকারও গগন আচ্ছন্ন করিবে।
[crime against woman]


রবিচক্র অনলাইন আপনাদের কেমন লাগছে? নিচের ঠিকানায় লিখে জানান। ইমেল-ও করতে পারেন। চিঠি অথবা ইমেল-এর সঙ্গে নাম, ঠিকানা এবং ফোন নম্বর থাকা বাঞ্ছনীয়।
রবিচক্র
‘প্রভাসতীর্থ’, ৭৬ ইলিয়াস রোড, আগরপাড়া, কলকাতা – ৭০০০৫৮, ভারত
editor@robichakro.com


অনেক ছোটবেলার কথা। মনে পড়ে, আমার স্বর্গীয় ঠাকুরদার আক্ষেপ– ‘কী যে দিনকাল পড়ল….!’ তখন অতশত বুঝতাম না। একটু বড় হয়ে বোঝার চেষ্টা করতাম কারণটা কী হতে পারে। যখন বাবা-মা, বয়োজ্যেষ্ঠরাও কমবেশি একই শঙ্কায় ভুগতেন। আর এখন খোদ আমরা নিজেরাই একই সংকটের মুখোমুখি।
এখন প্রশ্ন হল এর দায় কার? বেশি দূর পেছানোর প্রয়োজন নেই। দু’ দশক পেছনে ফিরলেই বৈপরীত্য স্পষ্টই লক্ষ্য করা যায়। সপ্তাহের বিকেলগুলো আর ছুটির দিনের মাঠের চেনা পরিচিত দৃশ্যগুলো আজ কোথায়? আজ এই পেয়ারাবাগান তো কাল ওই পাড়ার আমবাগান। খেলাধুলা তো দূর, নিখাদ গল্প আড্ডাও আজ যেন বড্ড সেকেলে। বদলে মুঠোফোনের রিলস আর সমাজ মাধ্যমের অতল জ্ঞান ভান্ডারে অবগাহন। পড়ার বই ভিন্ন গল্পের বই কিংবা অন্য বই পড়া? সেটা আবার কী-ই বা কেন? ছাত্র-শিক্ষকের আত্মিক সম্পর্ক আজ কোথায়? মনে পড়ে, গরমের ছুটিতে দু’ ঘন্টা ধরে পুকুরে জলকেলি করার শেষে মায়ের কানমলা। কিংবা রাস্তার আলো জ্বলার আগেই বাড়িতে ফেরা নিয়ে বাবার কড়া নিদান। একটু বড় হয়ে বন্ধুদের সাথে হইহই করে সিনেমা হলে ফার্স্ট ডে ফার্স্ট শো দেখার উন্মাদনা আজ এক প্রাগৈতিহাসিক ধারণা। গোঁফের রেখা দেখা দেওয়ার পরে নিজের সেই দক্ষতা না থাকলেও টিউশন কিংবা পাড়ার দাদা-কাকা-জেঠাদের নজর এড়িয়ে বন্ধু-বান্ধবীদের প্রেম ভালবাসা দেখার রোমাঞ্চও নেহাৎ কম ছিলনা। দুঃসাহসিকতার সমস্ত ধাপ ডিঙিয়ে আজ যেন তার পুরোটাই লাগামছাড়া আর বে-আব্রু।
শৈশব কৈশোর যৌবন..সময় প্রবহমান। স্কুল পেড়িয়ে কলেজ হস্টেল কর্মক্ষেত্র। কী আশ্চর্য! ওই একই শঙ্কায় যেন আমরাও শঙ্কিত? পার্থক্য- এখন যেন সেই সংকট অহরহ দিবানিশি। এই আতঙ্কটাই যেন আজকের তারিখে নিউ নরমাল। অথচ, তথাকথিত মানব সভ্যতার উন্নয়ন তো আজ আকাশচুম্বী। মানুষের জীবনযাত্রা আরও আধুনিক। বুঝতে অসুবিধে হয়না। প্রগতিশীলতার এই পরিণতি যেন অমোঘ কিছুর বিনিময়ে। সাংঘাতিক কিছু। গলায় বিদ্ধ কাঁটার মত প্রতিনিয়ত জানান দিয়ে যাচ্ছে। কোথায় যেন একরাশ আপস, একগুচ্ছ সমঝোতা। ক্রমবর্ধমান সামাজিক অবক্ষয়ের সাথে পাল্লা দিয়ে অশ্বমেধের ঘোড়ার মত ধাববান। যার না আছে কোনও সীমানা না কোনও গণ্ডি।
“রাজা আসে যায় রাজা বদলায়
শুধু পোশাকের রং বদলায়
শুধু মুখোশের ঢং বদলায়…..”
আর এই সুযোগেই চলতে থাকে শাসক-বিরোধী রাজনৈতিক তালেবরদের ঘোলা জলে মাছ ধরার সেই পুরনো প্রবণতা — ক্লিশে কৌশল। রাজ্যে তথা দেশবাসীর আজ ‘জলে কুমির তো ডাঙায় বাঘ’ দেখার অসহায়তা।
পাশের বাড়ির আগুনে একটু আধটু ছ্যাঁকা লাগলেও গা তো পুড়ছে না…..! দেখা যাবে ‘খন– এক কিম্ভুত বিকৃত মানসিকতা অজান্তেই গ্রাস করছে আমাদের।
একদিকে নৈরাজ্য দুর্নীতি অপশাসনে যখন গোটা সমাজ জর্জরিত, ধর্মের সুড়সুড়ি দিয়ে বিরোধী দল তখন ব্যস্ত মেরুকরণে। নিশানা সেই ব্যালট বাক্স। গণতন্ত্র আজ বিপন্ন। রাজ্যে তথা সমগ্র দেশে সার্বিক চিত্র কমবেশি একই। বিকল্পের খোঁজে নাগরিক সমাজের পিঠ আজ কোণঠাসা।
এর শেষ কোথায়? প্রশ্ন ছিল, আছে, থাকবে। কিন্তু ব্যাক্তিগত স্তরে জাতির চরিত্র গঠনে প্রথম ধাপ আমরা কি সত্যিই নিতে পারি না? নিজের ঘর পরিবার দিয়েই হোক না শুরু। নাকি তার দায়ও অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে হাঁপ ছাড়ি?
যথার্থ বলেছো। প্রত্যেককেই দায়ভার নিতে হবে। এ আগুন থেকে পালিয়ে বাঁচবে না কেউ।