ক্যালেন্ডারের পাতায় পয়লা জুলাই দিনটি প্রতি বছর তাঁর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। দিনটা তো তাঁর চলে যাবার দিনও বটে। একই দিনে জন্ম এবং মৃত্যু— এমনই এক অদ্ভুত সমাপতন। আশি বছরের একটি অনন্য জীবন। ঠাকুমা আদর করে নাম রেখেছিলেন ‘ভজন’। ব্রহ্মানন্দ কেশবচন্দ্র তাঁর নাম দিয়েছিলেন ‘বিধান’, যিনি উত্তরকালের একমেবাদ্বিতীয়ম ডাক্তার বিধান চন্দ্র রায়। পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে মেধায়, কর্মচঞ্চলতায়, পেশাগত কুশলতায়, ত্যাগব্রতে পরিপূর্ণ এক ব্যক্তিত্ব।
একটি মানুষ যখন তাঁর কর্মকান্ডে জীবদ্দশায় প্রায় রূপকথার নায়ক হয়ে ওঠেন এবং ভবিষ্যতের ইতিহাস যখন তাঁর মহিমান্বিত রূপটিকে মান্যতা দেয়, তখন আমাদের বাক্-বিন্যাসে অতি ব্যবহারে জীর্ণ ‘জীবন্ত কিম্বদন্তী’ শব্দবন্ধটিও তাঁর ক্ষেত্রে অব্যর্থ বলে মনে হয়।

সংগ্রামী এক জীবন। পড়াশোনা ও নিজের খরচ চালাতে কখনও বেসরকারি নার্সিং হোমে পুরুষ নার্স হিসেবে, কখনও বড় ডাক্তারের সহায়ক-ছাত্র হিসেবে কাজ করেছেন বিধান। এমনকি কলকাতার রাস্তায় রাত্রে পার্ট টাইম ট্যাক্সি চালিয়েও উপার্জন করেছেন তিনি ডাক্তারী ছাত্রাবস্থায়। ৫ টাকা ২৫ পয়সা হাতে নিয়ে পাটনার বাঁকিপুর থেকে কলকাতা শহরে এসেছিল যে তরুণ, মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তিরোধানের পর তাঁর ঘরে পাওয়া যায় ১১ টাকা ২৫ পয়সা।
বিধান চন্দ্র যখন মুখ্যমন্ত্রী হলেন তখন ডাক্তারি থেকে তাঁর মাসিক আয় ছিল ৪২০০০ টাকা। সেই ডাক্তার মানুষটি মুখ্যমন্ত্রী হয়ে নিজের মাইনে নিজেই ঠিক করলেন ১৪০০ টাকা। এর বেশি নেওয়াটা তিনি বাহুল্য বলে মনে করেছিলেন। ডাক্তার রায়ের সেক্রেটারি সরোজ চক্রবর্তী এক জায়গায় লিখছেন, “প্রথম দু’বছর তিনি ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়িয়েছিলেন। নিজের জমি বিক্রি করেছিলেন, নিজের শেয়ার বিক্রি করেছিলেন, এমনকী শৈলশহর শিলং এর প্রিয় বাড়িটাও বিক্রি করে দিয়েছিলেন।” মনে রাখতে হবে যে এই তথ্যগুলো আমরা পাচ্ছি ডাক্তার বিধান চন্দ্র রায়কে খুব কাছ থেকে দেখা একটি মানুষের স্মৃতিচারণ থেকে।
আজকের দিনে, যখন দেশের ও রাজ্যের রাজনীতিতে অশিক্ষিত, দুর্বিনীত, দুর্নীতিপরায়ণরা স্ফীত বক্ষে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, অনৈতিক উপায়ে অর্থ রোজগার যখন শুধু সাধারণের নয়, সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে, শিক্ষক থেকে অধ্যাপক, নেতা-নেত্রী থেকে মন্ত্রীরা উৎকোচ গ্রহণে সদা তৎপর, যখন কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী ইত্যাদি সমাজের বৌদ্ধিক ও নন্দনতাত্ত্বিকরা নীরবে বা সরবে রাজনৈতিক কারবারীদের স্তাবকতা করছেন নানা সরকারী সুযোগ-সুবিধে ও পদের বিনিময়ে, যখন রাজ্যের শিল্পোদ্যোগ ও শিল্প-সম্ভবনা ছলনায় পর্যবসিত হয়ে প্রায় বিলীন হবার উপক্রম, তখন এক মেধাবী ও পেশাগত কর্মজীবনে চূড়ান্ত সফল বঙ্গসন্তান তাঁর উচ্চমূল্য পেশা পরিত্যাগ করে, শুধুমাত্র জনসেবা ও দেশগঠনকে ব্রত করে দেশভাগজনিত বিপুল উদ্বাস্তু সমস্যা ও পুনর্বাসনের হাজার প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও, স্বল্প বেতনের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর আসন গ্রহণ করে সুদূরপ্রসারী ভাবনা ও পরিকল্পনা নিয়ে রাজ্যটির বিনির্মাণের পথে যে বলিষ্ঠ উদ্যম নিয়েছিলেন, তা বিস্ময়কর।
সংক্ষেপে তাঁর অসামান্য শিক্ষাজীবনটির ওপর আগে একটু চোখ বোলানো যাক। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ থেকে ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ছাব্বিশ বছর বয়সে এম-ডি ডিগ্রি লাভ করে পড়াশোনার জন্য যান লন্ডনে। সেখান থেকে এম-আর-সি-পি (Membership of the Royal College of Physicians) ও পরে এফ-আর-সি-এস (Fellowship of the Royal College of Surgeons) ডিগ্রি অর্জন শেষে ফিরে আসেন দেশে। ১৯১১ সাল নাগাদ মাত্র দু’ বছর তিন মাসের ব্যবধানে বিধান চন্দ্র MRCP এবং FRCS দুটি ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। তাঁর বয়স তখন ৩৯।

১৯১১ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় ফিরে প্রথমে শিক্ষকতা করেছিলেন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ ও পরে কারমাইকেল তথা আর,জি,কর এবং ক্যাম্পবেল তথা নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজে। এছাড়া তিনি যুক্ত ছিলেন কলকাতার চিত্তরঞ্জন সেবা সদন, চিত্তরঞ্জন ক্যান্সার হাসপাতাল, ভিক্টোরিয়া ইনস্টিটিউশন এবং কমলা নেহরু হাসপাতালের (পুনে) সঙ্গে। পশ্চিমবঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন তিনি নিজ গৃহে প্রতিদিন সকালে কিছু সময় ব্যয় করতেন বিনা পারিশ্রমিকে শিশুদের চিকিৎসায়।
কালক্রমে ডাক্তার হিসেবে তিনি অর্জন করেছিলেন ‘ধন্বন্তরী’ খ্যাতি। সাধারণ মানুষের এই আস্থা তিনি অর্জন করেছিলেন যে তিনি মরণাপন্নকে নতুন জীবন দিতে পারেন, মৃতবৎকে বাঁচাতে পারেন। তাঁর চিকিৎসা পদ্ধতি ছিল যথাসম্ভব সহজ, সরল, জটিলতাবিহীন। ডাক্তারি টেকনিক্যাল ও দুর্মূল্য ওষুধ দিতেন কম। রোগীর মনকে জয় করে নিতেন বড় সহজে। তাঁর রোগ নির্ণয় ক্ষমতা ছিল অসামান্য। বিধানচন্দ্রের চিকিৎসা-নৈপুণ্যের অসংখ্য কাহিনি ছড়িয়ে আছে তাঁর সময়ের বহু বিশিষ্টজনের স্মৃতিকথায়।
শুধু রাজ্যে ও ভারতে নয়, দেশের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছিল তাঁর চিকিৎসক-খ্যাতি। রবীন্দ্রনাথ, মতিলাল নেহেরু, গান্ধীজী, প্যাটেল, জওহরলাল তো বটেনই, তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রপতি জে এফ কেনেডি বা সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী নিকিতা ক্রুশ্চেভের মতো আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বও উপকৃত হয়েছিলেন তাঁর চিকিৎসায়।
আমেরিকার রাষ্ট্রপতি কেনেডির সঙ্গে এক সৌজন্যমূলক সাক্ষাৎকারে কেনেডির রোগ ধরে দেওয়ায় অবাক কেনেডি ডাক্তার রায়কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “একজন রাজনীতিবিদ হয়ে আপনি একাজ করলেন কি করে? উত্তরে বিধান রায় বলেছিলেন- “Sir I am a doctor by profession and a politician my passion।” তাঁর ব্যক্তিত্বে ও কর্মকান্ডে মুগ্ধ নিকিতা ক্রুশ্চেভ তাঁকে প্লেন পাঠাতে চেয়েছিলেন রাশিয়ার আতিথ্য গ্রহণের অনুরোধ করে। সবিনয়ে তিনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, বিনিময়ে কলকাতা মেডিকাল কলেজের জন্য চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় কিছু উন্নত যন্ত্রাদি পাঠাবার আর্জি জানিয়ে। তাঁর আর্জি মেনে নিয়েছিলেন ক্রুশ্চেভ। বিধান রায় প্রসঙ্গে মহাত্মা গান্ধীর মন্তব্য – “Bidhan, the shifty hand of India.”

রাজনীতিতে তাঁর আগমন ১৯২৩ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের প্রভাবে। বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার নির্বাচনে তিনি পরাজিত করলেন রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়কে। পরবর্তীতে মেয়র নির্বাচিত হলেন কলকাতা পৌরপ্রতিষ্ঠানের। ১৯৩১ সালে মহাত্মা গান্ধীর আহ্বানে আইন অমান্য আন্দোলনে যোগ দিয়ে তাঁর কারাবরণ। ১৯৪২ সালে উপাচার্য মনোনীত হলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের। ১৯৪৭ সালে কংগ্রেস প্রার্থীরূপে নির্বাচিত হলেন আইনসভায়। ১৯৪৮ সালে গান্ধীজীর পরামর্শে তিনি গ্রহণ করলেন বিপুল সমস্যা জর্জরিত স্বাধীনতা ও দেশভাগ পরবর্তী নবগঠিত পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর গুরু দায়িত্বভার। তাঁর চোদ্দো বছরের মুখ্যমন্ত্রিত্বকালে দূরদৃষ্টিপ্রসূত নানান পরিকল্পনায় ভর করে ধীরে ধীরে যে অগ্রগতির পথে উঠে দাঁড়িয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ, তার স্মৃতিতেই আজও তিনি ‘বাংলার রূপকার’ হিসেবে চিহ্নিত।

দুর্গাপুর-আসানসোল শিল্পাঞ্চল থেকে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়, খড়গপুর আই, আই, টি, মেডিকেল কলেজ, হলদিয়া বন্দর, দার্জিলিঙে দেশের প্রথম ‘পর্বতারোহণ শিক্ষাকেন্দ্র’ সবই তাঁরই পরিকল্পনায় বা ব্যবস্থাপনায় প্রতিষ্ঠিত। আজকের সল্টলেক, হরিণঘাটা দুগ্ধ প্রকল্প, রাজ্য বিদ্যুৎ পর্ষদ, ব্যান্ডেল ও দুর্গাপুরে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, ফারাক্কা ব্যারাজ থেকে রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থা সবকিছুতেই ছিল ডাক্তার রায়ের উদ্যম। দুর্গাপুরে ইস্পাত কারখানা ও শিল্প নগরী গড়ে উঠেছিল বিধানচন্দ্রের উদ্যোগে। ডিভিসি, দুর্গাপুর ব্যারাজ ইত্যাদি আদতে তাঁরই ভাবনার ফসল। যাদবপুরের যক্ষ্মা হাসপাতাল, চিত্তরঞ্জন সেবাসদন তাঁর উদ্যোগ ছাড়া কঠিন হত। বাংলায় ভারী শিল্প এবং সমস্ত নতুন নতুন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর, সবই তো ব্যক্তিগত ভাবে তাঁর নিজের হাতে করা।আজকের কলকাতার গর্ব মেট্রো রেলের প্রথম ভাবনা ও উদ্যোগ তাঁরই।
কর্মপ্রাণ এই মানুষটিকে ‘ভারতরত্ন’ দেওয়া হয়েছিল ১৯৬১ সালে। নিঃসন্দেহে যে পরিমাণ বাধা ও প্রতিবন্ধকতার পাহাড় ঠেলে তিনি পশ্চিমবঙ্গকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছেন, স্বপ্ন দেখিয়েছেন, তাঁর চোদ্দ বছরের মুখ্যমন্ত্রীত্বের সময়কালটা বড় কম ছিল। ফলে যতটা তিনি করতে চেয়েছিলেন, যতটা তিনি করতে পারতেন, নানা বাধায়, বিরোধিতায় ও সময়াভাবে সবটা করে উঠতে পারেননি । তবে আমৃত্যু তাঁর প্রচেষ্টা ও উদ্যমে কোনো ঘাটতি ছিল না কোনোদিন। পশ্চিমবঙ্গ গড়ার কাজে ও উন্নয়ন যজ্ঞে বিধানচন্দ্র এক অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করে গেছেন। মূখ্যমন্ত্রী ও পশ্চিমবঙ্গ গড়ার কারিগর হিসেবে আজও তিনি অদ্বিতীয় ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
১৯৬২-র ৩০ জুন প্রবলভাবে হৃদরোগে আক্রান্ত হন বিধান চন্দ্র। বিশ্রামে ও চিকিৎসায় ছিলেন তাঁর ওয়েলিংটন স্ট্রিটের বাড়িতে। সেই ১৯১৫ সালে কেনা এই বাড়ি। এটিও দান করে দিয়েছিলেন দাতব্য চিকিৎসালয় গড়ার জন্য। ১ জুলাই তাঁর আশি বছরের জন্মদিন। গুণগ্রাহী ও আত্মীয়স্বজনরা আসছেন তাঁকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে। এক ঘনিষ্ঠ সহযোগীকে কাছে ডেকে বললেন ডাক্তার রায় – “আমি দীর্ঘ জীবন বেঁচেছি। জীবনের সব কাজ আমি সমাধা করেছি। আমার আর কিছু করার নেই।” এরপরই ধীর কন্ঠে বললেন – ‘‘আমার পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। মনে হচ্ছে বেশিক্ষণ নয়।’’ ডাক্তাররা ছুটে এলেন। বিধান রায়ের নাকে নল পরানো হল। ইঞ্জেকশন দেওয়া হল। ডাক্তারদের ছোটাছুটি চলতে লাগল। ডাক্তারদের ছোটাছুটির মাঝে স্তব্ধ হয়ে গেলেন ডাক্তার রায়। চলে গেলেন পশ্চিমবঙ্গের অবিকল্প রূপকার মুখ্যমন্ত্রী ডাক্তার বিধান চন্দ্র রায়।
মহাজীবনের শান্ত সমাহিত এক মহাপ্রস্থান।


রবিচক্র অনলাইন আপনাদের কেমন লাগছে? নিচের ঠিকানায় লিখে জানান। ইমেল-ও করতে পারেন। চিঠি অথবা ইমেল-এর সঙ্গে নাম, ঠিকানা এবং ফোন নম্বর থাকা বাঞ্ছনীয়।
রবিচক্র
‘প্রভাসতীর্থ’, ৭৬ ইলিয়াস রোড, আগরপাড়া, কলকাতা – ৭০০০৫৮, ভারত
editor@robichakro.com


স্বদেশের হিতভাবনায় নিবেদিতপ্রাণ এক মহাজীবনের জীবন আলেখ্য।
“হে মহাজীবন হে মহামরণ
লইনু শরণ লইনু শরণ।”
অশেষ ধন্যবাদ আপনাকে। ভাল থাকবেন।
খুব ভালো লাগল লেখাটা পড়ে। জীবন-আলেখ্য সুন্দর ভাবে তুলে ধরা হয়েছে।