
বাংলা চলচ্চিত্রে ইদানীং ব্যোমকেশ বক্সীকে নিয়ে ছবি নির্মাণ করার আগ্রহ বেড়েছে। হবেই তো! ব্যোমকেশ বক্সী মানেই টানটান রহস্য এবং রোমাঞ্চ। বাঙালি আজ নতুন করে যেন ব্যোমকেশের প্রেমে পড়েছে। কিন্তু ব্যোমকেশের যিনি স্রষ্টা, তাঁকে আমরা কতটা চিনি। একদিন শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলমে সৃষ্টি হয়েছিল ব্যোমকেশ এবং তার সঙ্গী অজিত। অনেকটা শার্লক হোমস এবং ওয়াটসনের আদলেই আমরা তাদের পেয়েছিলাম এবং তাদের ঘিরে গড়ে উঠেছে অসংখ্য টানটান গোয়েন্দা গল্প। অনেক পরে সত্যজিৎ রায়ের হাতে সৃষ্টি হয়েছে ফেলুদা আর তোপসে। কিন্তু ফেলুদার জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও এতটুকু কমেনি ব্যোমকেশের জনপ্রিয়তা। দু’জনের পথ এক হতে পারে, কিন্তু পদ্ধতি ভিন্ন। সেই পথ হল সত্যের সন্ধান। ব্যোমকেশ তাই নিজেকে বলেন সত্যান্বেষী।
আশ্চর্য মানুষ ছিলেন ব্যোমকেশের স্রষ্টা শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। নিজের সম্পর্কে ব্যক্ত করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘আমি জন্মেছি উত্তরপ্রদেশের জৌনপুর শহরে, বড় হয়েছি বিহারের মুঙ্গের শহরে, লেখাপড়া করেছি কলকাতায়, কাজ করেছি বম্বেতে এবং বাণপ্রস্থ অবলম্বন করেছি পুণায়— নিখিল ভারতীয় বাঙালি যদি কেউ থাকে সে আমি।’তিনি শুধু ব্যোমকেশের কথাকারই নন। প্রাচীন ভারতের ইতিহাস যেমন তাঁর লেখনীতে জীবন্ত হয়েছে, তেমনিই ভূতান্বেষী বরদার হাত ধরে পাঠককে তিনি পৌঁছে দিয়েছেন রহস্যের এক অতীন্দ্রিয় জগতে। রোমান্স এবং কৌতুকের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে আছে তাঁর ছোটগল্পগুলিও। আবার কিশোর মনও তাঁর রচনায় আনন্দের জগৎকে খুঁজে পায়। কাহিনি এবং ভাষার মধ্য দিয়ে তিনি গড়ে তুলতে পারেন এক অন্য জগৎ, যা পাঠককে আজও আকৃষ্ট করে চলেছে।

শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম ১৮৯৯ সালের ৩০শে মার্চ। বাবার নাম তারাভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মায়ের নাম বিজলীপ্রভা দেবী। উত্তরপ্রদেশের জৌনপুরে তাঁর মামার বাড়ি। তাঁদের আদি নিবাস ছিল বরানগরের কুঠিঘাট অঞ্চলে। বাবা এবং মা, দু’জনের দিক থেকেই তিনি পেয়েছিলেন সাহিত্য এবং সংস্কৃতির মনন। বাবা যদিও পূর্ণিয়াতে ওকালতির কাজ করতেন, কিন্তু তিনি ছিলেন সুগায়ক। ছাত্রাবস্থায় তিনি রবীন্দ্রনাথের সংস্পর্শে এসেছিলেন এবং ঠাকুরবাড়িতে গান শিখেছিলেন। বাংলা সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ ছিল তাঁর মায়ের। এমনই পারিবারিক আবহে পরিপুষ্ট হয়েছিল শরদিন্দুর মানস-ভুবন।
দশ বছর বয়সে তিনি ভর্তি হলেন মুঙ্গের ট্রেনিং অ্যাকাডেমিতে। কিন্তু সেখানকার পরিবেশ তাঁর ভালো লাগল না। তাই কয়েক বছর পর তিনি ভর্তি হলেন মুঙ্গের জিলা স্কুলে। এখানে যেন তিনি নতুন জীবন পেলেন। এখানকার শিক্ষকদের সাহচর্যই তাঁর লেখকসত্তার উন্মেষ ঘটিয়েছিল বলে মনে করা হয়। শরদিন্দু নিজেই স্বীকার করেছেন সেকথা। এই স্কুলের ড্রিল মাস্টার ছিলেন পূর্ণচন্দ্র চক্রবর্তী। তাঁর কথা বলতে গিয়ে শরদিন্দু বলেছেন, ‘বাংলা সাহিত্যের প্রতি তাঁহার প্রবল অনুরাগ ছিল। আমার বাংলা সাহিত্য রচনার দীক্ষা পূর্ণবাবুর কাছে।’
ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা দেওয়ার পর থেকে এক দুনির্বার আকর্ষণ তাঁকে ক্রমেই টেনে নিয়ে গেল সাহিত্যের পথে। শুরু হল তাঁর গল্প লেখা। পরীক্ষার পর তিনি এলাহাবাদে কিছুদিন ছিলেন। সেখানে একদিন অলস দুপুরে হঠাৎ কী মনে হল, তিনি গল্প লিখতে শুরু করলেন। মোটামুটি একটা খাড়া করলেন বটে কিন্তু নিজেই বুঝলেন, গল্পটি তেমন দাঁড়ায়নি। তাই সেটি কাউকে না দেখিয়ে রেখে দিলেন। অনেক পরে তিনি সেই গল্পটিকেই নতুন ভাবে লিখেছিলেন। গল্পটির নাম ‘প্রেতপুরী’।
ম্যাট্রিকুলেশন পাস করার পর তিনি কলকাতায় চলে আসেন। ভর্তি হন বিদ্যাসাগর কলেজে। পড়াশোনার পাশাপাশি চলতে লাগল লেখা। লেখার তীব্র আকর্ষণে তখন তাঁর সময় কাটছে। একটা প্লট মাথায় আসছে। সেটা লিখে ফেললেন। কিন্তু শেষ হল না। অন্য প্লট মাথায় আসতেই শুরু হয়ে গেল অন্য গল্প লেখা। এভাবেই অনেক অসম্পূর্ণ গল্প তিনি তখন একে একে লিখে ফেললেন। এই সময় তিনি পেলেন বিশিষ্ট সাহিত্য অনুরাগী অজিত কুমার সেনকে। দু’জনেই তখন থাকতেন ওয়াই এম সি এ-র মেসে। এই মানুষটির প্রতি কৃতজ্ঞতা থেকেই তিনি ব্যোমকেশ সঙ্গীর নাম দিয়েছিলেন অজিত।

কলকাতা তাঁর জীবনে নতুন এক অধ্যায় রচনা করে দিল। সাহিত্যচর্চা, সাহিত্য সম্মেলনের পাশাপাশি চলল খেলাধুলো। খেলা দেখার পাশাপাশি নিজেও খেলাধুলো করতেন। আন্তঃ কলেজ ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় তিনি অংশগ্রহণ করতেন। কিছু কিছু খেলায় তিনি অধিনায়কও ছিলেন। পেয়েছেন অনেক পুরস্কারও। সেই সঙ্গে ছিল সিনেমা-থিয়েটার দেখা। তিনি নিজেই তাঁর দিনলিপিতে বলেছেন, ‘আমি চিরদিনই খেলাধূলা ভালোবাসি। YMCA’র হস্টেলের নানা খেলায় মাতিয়া উঠিলাম। সেইসঙ্গে আরও একটি উপসর্গ জুটিল— বায়োস্কোপ। তখন সিনেমার মৌনাবস্থা, হপ্তায় অন্তত দুই দিন সিনেমা দেখিতে যাইতাম। অপূর্ব লাগিত। আমার জীবন-দেবতা যে পরোক্ষভাবে আমার মনে গল্প রচনার ক্ষেত্র প্রস্তুত করিতেছেন, তাহা তখন জানিতাম না।’
১৯১৯ সালে শরদিন্দু বি এ পাস করে ল কলেজে ভর্তি হলেন। আইন পড়ার ইচ্ছে না থাকলেও বাবার ইচ্ছেকে মর্যাদা দিতেই তিনি আইন নিয়ে পড়া শুরু করলেন। এর আগের বছরেই তাঁর বিয়ে হয়। মুঙ্গেরের শ্যামলদাস চক্রবর্তীর নাতনি পারুলবালা দেবীর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। পারুলবালার ডাকনাম ছিল রাণু। জীবনের চলার পথে তিনি পেলেন যোগ্য সহধর্মিণী।
আইন নিয়ে পড়াশোনা শুরু করলেন বটে, কিন্তু একদিন ছেড়ে দিলেন। জোর করে পড়াশোনা চালাতে মন চাইছিল না। তাই পড়াশোনা ছেড়ে তিনি চলে গেলেন মুঙ্গের। সেখানে কাটতে লাগল অলস দিন। এসব দেখে তাঁর বাবা মনোকষ্টে ভুগতে লাগলেন। যদিও তিনি মুখে কিছু বললেন না। বাবার কষ্ট বুঝতে পেরে আবার তিনি আইন পড়া শুরু করলেন এবং দু’বছরের মধ্যে আইন পাস করে বাবার জুনিয়র হিসেবে ওকালতি শুরু করলেন।
ভিতর থেকে গল্প লেখার সেই তাগিদটা কিন্তু সুপ্ত আকারে থেকেই গিয়েছিল। আবার শুরু করলেন লেখা। একটা করে গল্প লেখেন আর পাঠিয়ে দেন কলকাতার পত্রিকায়। সেগুলি ছাপা হতে লাগল। একে একে গল্প প্রকাশিত হতে থাকল বসুমতী, প্রবাসী, ভারতবর্ষ প্রভৃতি পত্রিকায়। ‘সেতু’ প্রকাশিত হল প্রবাসীতে এবং শনিবারের চিঠিতে প্রকাশিত হল ‘তন্দ্রাহরণ’ । এই সময়ে আরও দু’টি বিষয়ে তিনি লেখা শুরু করলেন। একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস এবং অন্যটি গোয়েন্দা কাহিনী। ঐতিহাসিক উপন্যাস রচনার ক্ষেত্রে তাঁর একটি সহজাত অনুভব ও দক্ষতা ছিল। ছিল এক প্রচ্ছন্ন ভালোলাগা। তাই তিনি বলেন, ‘ইতিহাসের গল্প লিখেই বেশি তৃপ্তি পেয়েছি। মনে কেমন একটা সেন্স অব ফুলফিলমেন্ট হয়। ‘গৌড়মল্লার’ ও ‘তুঙ্গভদ্রার তীরে’ লেখার পর খুব তৃপ্তি পেয়েছিলাম। ‘চুয়াচন্দন’লিখেও তাই হয়েছিল।’

ইতিহাস আশ্রিত কাহিনি লিখতে গিয়ে তাই নতুন করে পড়াশোনা করলেন। তাঁর ইতিহাস আশ্রিত গল্পের সংখ্যা সতেরোটি এবং উপন্যাসের সংখ্যা পাঁচটি। আলাউদ্দিন খিলজির সময়কাল নিয়ে তিনি লিখেছেন দু’টি গল্প ‘শঙ্খ-কঙ্কণ’ এবং ‘রেবা রোধসি’। শিবাজির বিষয়ে লিখেছেন ‘বাঘের বাচ্চা’। চৈতন্যদেবের সময়কাল নিয়ে লিখেছেন ‘চুয়াচন্দন’। বৌদ্ধধর্ম এবং দর্শন নিয়ে লিখেছেন ‘মরু ও সঙ্ঘ’।
ইতিহাস আশ্রিত তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘ঝিন্দের বন্দী’। অ্যান্থনি হপের ‘দি প্রিজনার অব জেন্ডা’র ছায়া অবলম্বনে এই কাহিনী রচিত। লিখলেন ‘কালের মন্দিরা’। স্কন্দগুপ্তের কাল নিয়ে সম্পূর্ণ কাল্পনিক একটি আখ্যান তিনি রচনা করলেন। ঐতিহাসিক উপন্যাস হিসেবে আমরা পাই ‘তুমি সন্ধ্যার মেঘ’, ‘কুমারসম্ভবের কবি, ‘তুঙ্গভদ্রার তীরে’, ‘গৌড়মল্লার’ প্রভৃতি। বিভিন্ন জায়গা থেকে তিনি ঐতিহাসিক উপাদান নিয়েছেন। কিন্তু তার সঙ্গে কাল্পনিক আখ্যানকে মিশিয়ে দিয়েছেন অসাধারণ মুন্সিয়ানায়। সেই কাহিনী তিনি বিধৃত করেছেন এক ওজস্বী ভাষায়। বঙ্কিমচন্দ্রের ঐতিহাসিক ভাষাকে আদর্শ করে তিনি তৈরি করলেন এক নতুন ভাষা। সাধু এবং চলিতের মিশ্রণে যে দক্ষতা তিনি দেখিয়েছেন, তার জন্য বাংলা সাহিত্য তাঁর কাছে অনেকদিন ঋণী থাকবে। সেই ভাষার মধ্য দিয়ে তিনি তৈরি করলেন ঐতিহাসিক উপন্যাসের এক আধুনিক পরিবেশ এবং অদৃশ্য এক রোমান্স। একইসঙ্গে তা সকল পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্যও হয়ে উঠল।
একে একে গল্প প্রকাশিত হতে থাকল। একটু আধটু নামও হতে থাকল। সকলেই তখন পত্রিকার জন্য লেখা চাইতে লাগলেন। কিন্তু সাহিত্যে ডুবে যাওয়ায় অর্থাগম তেমন ঘটল না। এক লেখায় তিনি নিজেই একথা বলেছেন। ‘১৯৩৭ সালে আমার আয় (বই মাসিকপত্র গ্রামোফোন রেকর্ড রেডিও ইত্যাদি হইতে) হইয়াছিল ১৮০০ টাকা, অর্থাৎ গড়ে মাসিক দেড় শত টাকা। আমাদের বৃহৎ পরিবারের কাছে ইহা সমুদ্রে শিশিরবিন্দু। আমার তিন পুত্র, তন্মধ্যে একটি কলেজ ও দুইটি স্কুলে পড়িতেছে।’
সংসারে সেই সময় নানারকম সংকট দেখা দিল। একদিকে তাঁর বাবার আয় কমতে লাগল, অন্যদিকে খরচ বাড়তে লাগল। চারিদিকে তখন দেনা ক্রমেই বাড়ছে। অর্থাভাবে সংসারে অশান্তি বাড়তে লাগল। সেই অশান্ত মন নিয়ে সাহিত্য রচনা করা যায় না। তাই তিনি অস্থির হয়ে উঠলেন। মন চাইছিল এই পরিস্থিতির বাইরে গিয়ে একটু স্বস্তির শ্বাস নিতে। তবে কি সংসার ছেড়ে তিনি পালিয়ে যাবেন? দিশাহারা অন্ধকারের মধ্যে হঠাৎ দেখা গেল একটু আলোর রেখা।

সেই সময় একটা চিঠি হাতে পেলেন শরদিন্দু। চিঠিটা তাঁকে লিখেছেন হিমাংশু রায়। তিনি তখন বোম্বাই টকিজ নামক চলচ্চিত্র সংস্থাটির হর্তাকর্তা। তিনি চিঠিতে শরদিন্দুকে লিখলেন, ‘যদি ইচ্ছা করেন তবে বোম্বাই টকিজে গল্পলেখকরূপে যোগদান করতে পারেন। আপনার মতামত শীঘ্র জানান।‘ শরদিন্দু ‘রাজি’ জানিয়ে চিঠি দিলেন। কথাবার্তা সব পাকা হয়ে গেল। ১৯৩৮ সালে তিনি সস্ত্রীক বোম্বাই যাত্রা করলেন।
কঠিন সংসার সংগ্রাম থেকে ভাগ্যলক্ষ্মী তাঁকে সরিয়ে নিয়ে গেলেন শান্ত মন নিয়ে সাহিত্য চর্চার এক নিজস্ব বৃত্তে। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলেন, ‘এইবার সুযোগ পাইয়াছি। সিনেমা শিল্পকে উন্নত করিব, সাহিত্যের পর্যায়ে টানিয়া তুলিব। ইহা শুধু আমার জীবিকা হইবে না, আমার জীবনের পরম সাধনা হইবে।’
কলেজে পড়ার সময় থেকেই যে সিনেমা দেখার অভ্যাস ছিল, তা কাজে দিল। দেখতে লাগলেন বিদেশি সিনেমা। ভারতীয় সিনেমার দুর্বল গল্প ও অন্যান্য দিকগুলি তাঁর কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগল। কিন্তু তিনি চাইলেই তো সবকিছু বদলে ফেলা যায় না। তাঁর লেখা গল্পগুলি বদলে ফেলে বাণিজ্যিক ছবি গড়ে উঠতে লাগল। দেখে তিনি আঘাত পেলেও কিছু বললেন না। কেননা এখানেই তাঁর রুজি রোজগার। পাশাপাশি তিনি মনোনিবেশ করলেন বাংলা সাহিত্যের জন্য লেখা তৈরি করতে। সেগুলি সুদূর বোম্বাইয়ে বসে পাঠিয়ে দিতে লাগলেন এখানকার সাময়িকপত্রগুলিতে। ১৯৪১ সালে বোম্বাই টকিজের সঙ্গে তাঁর চুক্তির মেয়াদ শেষ হল। এরপর তিনি যোগ দিলেন আচারিয়া আর্ট প্রোডাকশনে। কয়েক বছর সেখানে ছিলেন। তারপর ফ্রি ল্যান্সার হিসেবে কাজ করতে থাকেন। এই পর্বটা চলেছিল ১৯৫২ সাল পর্যন্ত।
মুম্বইয়ে থাকার সময় তিনি থাকতেন মালাড অঞ্চলে। সেই সময় তাঁর বাড়িতে বাঙালি শিল্পীদের একটা জম্পেশ আড্ডা ছিল। শচীন দেব বর্মন, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, জগন্ময় মিত্র, সলিল চৌধুরী। আড্ডার মধ্যে জমে উঠত ‘অন্তাক্ষরী’ খেলা।
এই সময়ে অনেকগুলি ছোটগল্প লিখলেন। লিখলেন ‘ছায়াপথিক’ নামে একটি উপন্যাসও। ‘ছায়াপথিক’-এর মধ্যে ধরা পড়েছে তাঁর জীবনের একটি অধ্যায় ও ভাবনা। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র সোমনাথ কলকাতা থেকে বোম্বাই গিয়েছিল অনেক স্বপ্ন নিয়ে। ভেবেছিল চলচ্চিত্র শিল্পকে নতুন পথ দেখাবে। তারপর অনেক ভাঙাগড়া, উত্থান পতনের পর তার মোহজাল ছিন্ন হল। সে আবার ফিরে এল তার নিজস্ব মাটির কাছে।

কম বয়সে তিনি প্রচুর গোয়েন্দা গল্প পড়েছেন। তিনি ছিলেন আগাথা ক্রিস্টি এবং আর্থার কোনান ডয়েলের গল্পের দারুণ ভক্ত। একটু পরিণত হতেই তাঁর মনে হল, গোয়েন্দা গল্প লেখার মতো টেকনিক তিনি আয়ত্ত করে ফেলেছেন। ১৯৩৩ সালে তিনি প্রথম গোয়েন্দা গল্প লেখায় হাত দেন। সেই সময় জন্ম নেয় ব্যোমকেশ বক্সী। একে একে লিখে ফেললেন ‘পথের কাঁটা’, ‘সীমান্তহীরা’, ‘মাকড়সার রস’, ‘অর্থমনর্থম’, ‘রক্তমুখী নীলা’ ইত্যাদি গল্প। মাঝখানে কিছুদিন বন্ধ ছিল গোয়েন্দা গল্প লেখা। আবার তিনি পরে লিখলেন ‘চিড়িয়াখানা’, ‘আদিম রিপু’, ‘সজারুর কাঁটা’, ‘বেণীসংহার’, ‘মগ্নমৈনাক’, ‘লোহার বিস্কুট’-এর মতো গল্প। গোয়েন্দা গল্প লেখায় তিনি শুধু কাহিনীর বিন্যাসই করেননি, সেই সব গল্পে প্রকাশ পেয়েছে তাঁর দার্শনিক মনও। কাহিনী এবং পটভূমির বিশ্লেষণ করে তিনি অপরাধের উৎসে পৌঁছেছেন এবং সত্যকে প্রকাশ করে অপরাধীর মনের জটিল বিশ্লেষণও করেছেন। তিনি সেখানে যেন এক মনোবিদ।
ব্যোমকেশ কাহিনির বিন্যাস অসাধারণ। যে কোনও গোয়েন্দা কাহিনি নির্মাণের মূল তত্ত্বটি হল, অপরাধী পাঠকের সামনেই থাকে, কিন্তু সে তাকে চিনতে পারে না। একটি অপরাধ এবং তাকে কেন্দ্র করে একটি রহস্য বৃত্ত নির্মাণ। সেখানে উপস্থিত অনেককে দেখে পাঠকের বিভ্রম হতে পারে। ধীরে ধীরে সুকৌশলে রহস্যের ধোঁয়াকে অপসারিত করে অপরাধ নির্ণয় এবং অপরাধীকে শনাক্তকরণের অংশটি একইসঙ্গে যুক্তিগ্রাহ্য এবং পরিশীলিত হয়, তবে সেই কাহিনির মার নেই।

ব্যোমকেশ চরিত্রের সবথেকে বড়গুণ হল তাঁর পর্যবেক্ষণ শক্তি। একজন গোয়েন্দার প্রাথমিক দক্ষতাই হল তাঁর পর্যবেক্ষণ শক্তি। এরপর তিনি ঘটনাক্রমের মধ্য থেকে কোনও সূত্রের সাহায্যে সেটাকে যুক্তির মধ্য দিয়ে এটি বৃহত্তর আলোর সন্ধানে ব্রতী হন। সেখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে গোয়েন্দার অনুমান ক্ষমতা। সেই অনুমানের জোর যাঁর যত বেশি, তিনি তত সহজে রহস্যের সমাধান করতে সক্ষম হন। সেই সক্ষমতা ব্যোমকেশের মধ্যে প্রবলভাবে আছে। ব্যোমকেশ কাহিনি বাঙালি পাঠকের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠার অন্যতম কারণ সম্ভব, তার কাহিনির মধ্যে মিশে আছে সমকালীন একটা সমাজজীবন, আমাদের চারপাশে প্রতিদিন ঘুরে বেড়ানো মানুষগুলিই যেন গল্পের মধ্যে এসে অপরাধ করে বসে।

ব্যোমকেশের কাহিনির মধ্যে কলকাতা ভীষণভাবে জেগে আছে। জেগে আছে তার পথঘাট, অলিগলি ইত্যাদি। যেমন বউবাজার, গোলদিঘি, হ্যারিসন রোড, গড়িয়াহাট, কেয়াতলা, হিন্দুস্থান পার্ক— এসবের উল্লেখ দেখি তাঁর ব্যোমকেশ কাহিনিতে। ব্যোমকেশকে নিয়ে লেখা মোট ৩২টি গল্পের মধ্যে দেখি ২২টি গল্পের পটভূমি কলকাতা। সেই সময়ের গল্পে এসেছে সমসাময়িক নানা ঘটনার উল্লেখ। যেমন, স্বাধীনতা আন্দোলন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দাঙ্গা ইত্যাদি। বিপর্যস্ত এই সময়ের প্রেক্ষাপটে মানুষের ভালোমন্দ, মূল্যবোধের পতন, অপরাধ মনস্কতা এসবকে নিপুণ দক্ষতার সঙ্গে গল্পের পরতে পরতে মিশিয়ে দিয়েছেন।
শরদিন্দু বেশ কয়েকটি ভূতের গল্পও লিখেছেন। কিন্তু সেগুলি মোটেই সহজ সরল ভূতের গল্প নয়। এক অলৌকিক পরিবেশ সেখানে তিনি গড়ে তুলেছেন। ‘প্রেতপুরী’, ‘কামিনী’, ‘রক্তখদ্যোত’, ‘টিকটিকির ডিম’, ‘মরণভোমরা’ ইত্যাদি গল্পগুলি সেই অলৌকিক ভৌতিক কাহিনীকেই উপস্থাপন করে। ভৌতিক কাহিনির মধ্যে তিনি অনায়াস দক্ষতায় প্রকাশ করতে পারেন রোমান্টিক আমেজ। ‘অশরীরী’, ‘মধুমালতী’ গল্পগুলি সেই তত্ত্বকেই প্রকাশ করে। এক্ষেত্রে বরদার কথা বলতেই হয়। মুঙ্গেরবাসী বরদা অসাধারণ গল্প বলতে পারেন। গল্প বলার মধ্যে রয়েছে তাঁর এক সম্মোহন শক্তি। তাঁর ভূতের গল্পে যেমন গা ছমছমে ভয়ের চিহ্ন রয়েছে, তেমনই ভূতেদের মধ্যে একটা সামাজিক অনুভূতি ও মানবিক বোধ লক্ষ্য করা যায়। ‘আকাশবাণী’ কিংবা ভূত-ভবিষ্যৎ গল্পে সেই সব লক্ষণ আছে। অনেক ক্ষেত্রে মনে পরবর্তী কালে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ভূতের গল্পগুলি সম্ভবত শরদিন্দুর ধারাকে আরও নবতর প্রকাশের মধ্য দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যায়। শীর্ষেন্দুর গল্পে হাস্যরসের প্রকাশ অনেক বেশি। কিন্তু তারা শেষ পর্যন্ত আর ভূতসত্তায় বিরাজ করেন না।

একাত্তর বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। অনেক গল্প , উপন্যাস তিনি রচনা করেছেন। সেসব সমৃদ্ধ করেছে বাংলা সাহিত্যকেই। প্রমথনাথ বিশী, সৈয়দ মুজতবা আলি, প্রেমেন্দ্র মিত্র, রাজশেখর বসু, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তাঁর ছিল সুহৃদ সম্পর্ক। বাংলা সাহিত্যে নিজের অবদান নিয়ে বিরাট কিছু প্রত্যাশা তাঁর ছিল না। তিনি শুধু চেয়েছিলেন তাঁর লেখা পাঠকের ভালো লাগুক। এ সম্পর্কে তিনি একটি লেখায় বলেছেন, ‘আমি সমাজ সংস্কারক নই, ধর্ম প্রচারক নই। কাহাকেও উপদেশ দিবার স্পর্ধা আমার নাই। সাহিত্যের মাধ্যমে আমি রসসৃষ্টির চেষ্টা করিয়াছি, পাঠকের মনোরঞ্জনের চেষ্টা করিয়াছি। আমি ক্ষুদ্র লেখক, আমার ক্ষুদ্র চেষ্টা যদি সফল হইয়া থাকে তবেই আমার সাহিত্য জীবন সার্থক।’

