পুনরায় চৈত্র আসিয়া পড়িল। বাংলার মানুষের শীত এবং বসন্তের আতিশয্য কাটিতে না কাটিতে যাবতীয় দাবদাহর প্রতিশ্রুতি লইয়া তিনি প্রকৃতি মঞ্চে আবির্ভূত হন। বাজারে নতুন পঞ্জিকা আসিয়া গিয়াছে। পলাশ শিমূলের রঙে রুদ্ররূপের প্রস্তুতিও অনুভূত হয়।
কিছুকাল পূর্বেও গাজন সন্ন্যাসীদিগের সুর করিয়া “বাবা তারকনাথের চরণে সেবা লাগে, মহাদেব” শব্দবন্ধ পাড়ার অলিতে গলিতে ধ্বনিত হইত। গৃহস্থ বাড়ি হইতে যৎসামান্ন খুদকুঁড়া পাইয়াই তাহারা খুশী হইয়া যাইতেন।
মূলতঃ সমাজের প্রান্তিক শ্রেণীর শ্রমজীবী মানুষের, এই একটি সময়ে দেবত্ব লাভ হইত। শিবের আর্চনার কল্যাণে তাঁরা সব দুঃহসাহিক ব্রত ধারণ করিতেন, যার মধ্যে বাণ ফোঁড়, কাঁটা ঝাঁপ, বটি ঝাঁপ ইত্যাদি অন্যতম। রোদে পোড়া জলেভেজা শক্তপোক্ত শরীরিক কাঠামোতে জড়াইয়া থাকিত নতুন রাতুল গামছা। কষ্টিপাথর সদৃশ শরীরে অগ্নিশিখার দর্পসম সে রঙ ফুটিয়া উঠিত। সারামাস ভিক্ষান্নে ক্ষুণ্ণিবৃত্তি করিয়া, কঠিন ব্রত সাধনার অন্তিম পর্বে তাঁরা উপনীত হইতেন সংক্রন্তির দিন। চড়কের মেলায় সেই সব দুঃসাহসিক আচার প্রত্যক্ষ করিয়া সাধারণ দর্শকদের প্রাণ কাঁপিয়া উঠিত। সবই ঐশ্বরিক শক্তির প্রভাব জানিয়া জনতা জনার্দন, প্রণতঃ হইতেন গাজন সন্ন্যাসীদের পদপ্রান্তে।
সমাজের বদলে আজ চড়কের মেলা দুর্লভ, তদুপেক্ষা দুর্লভ ব্রতধারী সন্ন্যাসীর দল। আজও প্রান্তিক মানুষের দলবদ্ধ মিছিল, বাঁক কাঁধে ছুটিয়া যাওয়া পরিলক্ষিত হয়, দন্ডী কাটিয়া ঈষ্ট দর্শনেও বিরাম নাই। তথাপি কোথাও যেন “বাবা তারকনাথ”-এর চরণস্পর্শী এই ব্রতাচার ইতিহাসের পাতায় মুখ লুকাইয়াছে।

ইতিহাস পট পরিবর্তন করিয়াই থাকে, ইহাতেও কোন ব্যত্যয় হয়না। এখন চৈত্রের নব্য অবতার চৈত্র-সেল। গাজন সন্ন্যাসীদিগের ন্যায় একদল ব্রতধারী, সম্বৎসর অপেক্ষায় থাকেন কখন এই ‘সেল’-এর জোয়ার আসিবে। এক্ষণে ক্রেতা ধরা পড়িলেন। বাঙালির হুজুগ প্রবণতা, বিপণন বিজ্ঞানীদের অজানা নয়। ‘ছাড়’ শব্দটি তাঁরা সার বুঝিয়াছেন। মোক্ষম শব্দভেদী বাণের ন্যায় অলিতে গলিতে, রেডিও টিভিতে, হোডিংএ কাগজে এই শব্দটির সুচারু প্রচার করিয়া থাকেন। হ্যামলিনের বাঁশীওয়ালার পশ্চাতে ধাবিত মন্ত্রমুগ্ধ মূষিকের ন্যায় বাঙালি ক্রেতাদল প্রতিটি বিপণিতে ঝাঁপাইয়া পড়েন। দশ বিশ পার হইয়া, সে ছাড় সত্তর আশি এমনকি একশো শতাংশ পর্যন্ত বিজ্ঞাপিত হইতে দেখা যায়। এক সময় অবাক লাগিত, এত পণ্য যদি অবিক্রীত মজুত পরিস্কারহেতু ছাড় সহ বিক্রী করিতে হয়, তাহা হইলে সারা বৎসর ইঁহারা কী বিক্রয় করিলেন? সামান্য খোঁজ লইতেই তাহা জলবৎ তরল হইল। এই ছাড়-এর খুব সামান্য অংশ-ই সম্বৎসরের অবিক্রীত মজুত হইতে আনত হয়। অধিকাংশ চৈত্র-সেল-এর পণ্য আলাদা করিয়া সৃষ্টি করা হয়, যাহার গুণাগুণ সমগোত্রীয় পণ্যের তুলনায় অনেক কম হয়। তাহার ফলস্বরূপ, বিক্রয়কারীর নিকট ইহার অতিরিক্ত ছাড়ের পরেও যথেষ্ট পরিমাণ মুনাফার সুযোগ আনয়ন করে। ভুবনায়নের কালে বাণিজ্যই একমাত্র সত্য।

ইত্যাবসরে এক করুণরসের গল্প না বলিয়া থাকিতে পারিতেছি না। চৈত্রের নিয়মানুসারে শহরের অন্যতম সেরা একটি গহনার বিপণিতে, নানারূপ ছাড়সহ বিজ্ঞাপন দেখিয়া, এক প্রেমিকপ্রবর তাহার দয়িতাকে সঙ্গে লইয়া, বিশেষ হৃদয়-চিহ্ন খোদিত একটি গহনা ক্রয় করিতে ইচ্ছা প্রকাশ করেন। সংস্থার পক্ষ হইতে সকল বিপণিবালাদের স্থির নির্দেশ দেওয়া হইয়া থাকে, ক্রেতার ক্ষমতা বুঝিয়া একটির বদলে দুইটি কখনও তাহারও অধিক পণ্য বিক্রয় করিবার চেষ্টা করিতে উদ্যোগী হইতেই হইবে।
নতুন উপহার কন্ঠে ধারণ করিয়া, কন্যাটি তখন মুকুরে নিজ স্বর্ণালী মুখশ্রী ঘুরাইয়া ফিরাইয়া অবলোকন করিতে ব্যস্ত। সেই সময় বিপণিবালাটি পুরুষটিকে নির্দোষ স্বরে বলিলেন, “আর একটি হার দেই?”
কন্যাটির কর্ণকুহরে বাক্যটি ধ্বনিত হইবামাত্র যেন একটি নৈঃশব্দের বিষ্ফোরণ হইল। অলঙ্কারটি একমুহূর্তে কন্ঠচ্যুত করিয়া তিনি পুরুষটিকে বলিলেন, “আর কয়টি বান্ধবীর জন্য তোমার উপহার সংগ্রহ করতে হবে?” এই বলিয়া তিনি তিলমাত্র অপেক্ষা না করিয়া দরজার বাইরে যাইবার জন্য অগ্রসর হইলেন। বেচারী হতবুদ্ধি প্রেমিকপ্রবর এবং বিপণিবালা-টি, তৎক্ষণাৎ ঠিক কী হইল বুঝিতে পারিলেন না। এমতাবস্থায় কার্ড ঘর্ষণ সম্পূর্ণ, স্বীয় ব্যাঙ্ক হইতে বিপণির ব্যাঙ্কে অর্থ স্থানান্তরিত হইয়াছে। অথচ তিনি বুঝিতে পারিতেছেন না, এই অলঙ্কার লইয়া তিনি কী করিবেন?
যদিও দিন নির্ঘন্ট অনুসারে ফাল্গুন ও চৈত্র বসন্তকাল, তথাপি ফাল্গুন পার হইতেই চৈত্রের তাপ পরিস্ফুট হয়। যাহা আসন্ন গ্রীষ্মের আভাষ লইয়া আবির্ভূত, তাহা যে কতটা প্রদাহযুক্ত হইবে, ভুক্তভোগীমাত্রেই অবগত আছেন। অতয়েব ‘চৈত্র-সেল’ শুধুমাত্র বিপণিতে সীমাবদ্ধ থাকিবে না, হৃদয় মেদুরতাতেও তাহার প্রভাব পড়িবে, ইহাতে আশ্চর্য কী? “বাবা তারকনাথের চরণে সেবা লাগে, মহাদেব।” (সুর করিয়া)


রবিচক্র অনলাইন আপনাদের কেমন লাগছে? নিচের ঠিকানায় লিখে জানান। ইমেল-ও করতে পারেন। চিঠি অথবা ইমেল-এর সঙ্গে নাম, ঠিকানা এবং ফোন নম্বর থাকা বাঞ্ছনীয়।
রবিচক্র
‘প্রভাসতীর্থ’, ৭৬ ইলিয়াস রোড, আগরপাড়া, কলকাতা – ৭০০০৫৮, ভারত
editor@robichakro.com
আহা কী পড়িলাম! বঙ্গভারতীর বিশ শতকের প্রাচীন প্রকোষ্ঠের দ্বার সহসা খুলিয়া গিয়া যেন এক ঝলক অম্বুরী তামাকের সুবাস নিমেষে ছড়াইয়া পড়িয়া পাঠকমনকে স্মৃতিকাতর করিয়া তুলিল। আনন্দবাজারী সম্পাদকীয় ভিন্ন সম্প্রতিকালে কবে শেষ সাধুগদ্যে কোন সমসাময়িক বাংলারচনা পাঠ করিয়াছি তাহা স্মরণ করিতে পারি না। ওই বাজারের নীতিনির্ধারকরা শিবরাত্রির সলিতার মতো সাধুবাংলায় রচিত সম্পাদকীয় কলমটিকে বহুদিন বাঁচাইয়া রাখিবার পর কয় বৎসর পূর্বেই সম্ভবত পিছাইয়া পড়িবার ভয়ে স্বেচ্ছায় তাহাকে অতীতের গর্ভে প্রেরণ করিয়া নিশ্চিন্ত হইয়াছেন।
দুই শতক পিছাইয়া গেলে দেখিতে পাই, যে-সময় সাধু গদ্য ব্যতিরেকে আমজনতার মুখের ভাষায় কেতাব রচনা করার কথা কেহ চিন্তাও করে নাই, সেই সময়ে টেকচাঁদ ও হুতোম সেই মাঠঘাটের কথ্য ভাষারীতিকে গ্রন্থে স্থান দিয়া অমর করিয়াছিলেন। বিশেষত হুতোমের নকশায় বাঙালির চরক-চর্চাকে আবার মনে করাইয়া দিল রবিচক্র-সম্পাদকের একই বিষয়ে রচিত এই বয়ানখানি। কিন্তু এই সম্পাদকের যাত্রা প্রকৃতপক্ষে যেন হুতোমের গতির বিপরীত দিকে। সমকালের প্রচলিত গদ্যরীতিকে ব্যবহার না করিয় দুইজনেই পাঠকের মুখ বদলের প্রয়াস করিয়াছেন বটে, তবে হুতোম যেখানে সাধু রীতিকে ছাড়িয়া চলিত ভাষাকে আশ্রয় করিয়াছিলেন, আমাদের সম্পাদক মহাশয় সেখানে হালের ভাষাকে আপাতত দেরাজে তুলিয়া রাখিয়া সাবেকি গদ্যরীতিকে আবাহন করিয়াছেন। বাঙালি গৃহিণী যেমন তাহার যৌবনকালের পরিধেয় জামদানি, বেনারসি বা কোন সাবেকি ফ্যাশনের গহনা দেরাজ, তোরঙ্গ বা সিন্দুক হইতে মাঝে মাঝে বাহির করিয়া তাহার উপর সযত্নে ও সস্নেহে হাত বুলাইয়া, এমন কী কখনো কখনো শখের বশবর্তী হইয়া পরিধানও করিয়া থাকেন, রবিচক্রের সম্পাদক মহাশয়ও বোধ হয় তেমনি যত্ন ও স্নেহ সহকারে বর্তমানে অব্যবহার্য এবং হয়তো বা শ্লথগতি বা অপ্রয়োজনীয় বিধায় দিনানুদৈনিক সারস্বতচর্চা ও পঠনপাঠন হইতে নির্বাসিত ভাষাজননীর পুরাতন অলঙকারখানি বিসর্জিত প্রতিমার মতো বিস্মৃতিসলিল হইতে আবার তুলিয়া আনিয়া পাঠকের দরবারে পেশ করিলেন! তাঁহার এই সাধুগদ্যের চর্চাকে সাধুবাদ না জানাইয়া পারিলাম না।
এক্ষণে যাহা ঘটে নাই, তাহার পূর্ব মুহূর্ত অবধি ভবিষ্যত। আর যাহা ঘটিতেছে, পরমুহূর্তেই অতীত। এই কালযাত্রায় বর্তমান বলিয়া সময়ের খন্ডাংশ নির্ধারণ করা দুরূহ। আমাদিগের সম্মিলিত সামান্য সময় যাপন, স্বীয় অস্তিত্বকে গরিমান্বিত করিতে বর্তমান উদযাপন করিয়া থাকি। সেই পরিপ্রেক্ষিতেই কিছু অভিজ্ঞতা পূর্বাপর অনুষঙ্গে স্থান পায়। প্রতিটি প্রজন্ম তাহাদের ন্যায় প্রত্যক্ষ করেন।
রচনাটি সম্পর্কে আপনার সাধুবাদ রবিচক্রের পক্ষ হইতে নত মস্তকে গৃহীত হইল।