শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

বঙ্গজীবনের পাঁচালি : চোদ্দ শতক (৮)

নির্মলকুমার বসু একজন পন্ডিত কীর্তিমান,
নৃতত্ত্ব, সমাজতত্ত্বে তাঁর বিপুল অবদান।।
তাঁর আরো আগ্রহের বিষয় মন্দির-স্থাপত্য,
লোকসংস্কৃতি নগরবিজ্ঞান এবং প্রত্নতত্ত্ব।।
আরো কত বিদ্যায় যে তাঁর বিচিত্র গবেষণা,
সকল কার্যেই মানবকল্যাণ তাঁর ধ্রুব প্রেরণা।।
ভারতের সংস্কৃতির ধারায় যে পরিবর্তন —
নৃতত্ত্বের আলোয় তিনি তার করেন বিশ্লেষণ।

নির্মল কুমার বসু

মানুষকে জানতে ও বুঝতে চালান অন্বেষণ,
পায়ে হেঁটে করেন তিনি ভারত পর্যটন।।
উদ্যোগে অক্লান্ত তিনি উদ্যম অফুরন্ত–
ইংরেজি ও বাংলাতে তিনি রচেন কত গ্রন্থ।।
সাহিত্য পরিষদ এবং এশিয়াটিক সোসাইটি —
নানান সংস্থায় যুক্ত ছিলেন এই কৃতী মানুষটি।।
গজদন্ত-মিনারবাসী বিদ্বান তিনি নন-
রাজনীতির সংগ্রামেও তাঁর ছিল আকর্ষণ।।
লবণ সত্যাগ্রহ এবং আগস্ট আন্দোলন–
এসবে যোগ দিয়ে করেন গ্রেপ্তার বরণ।।
দাঙ্গাত্রস্ত পূর্ববঙ্গে গান্ধীর সঙ্গে তিনি
যোগ দিয়েছেন পদযাত্রায় — অমর সে কাহিনী।।

মতুয়া সম্প্রদায়ের নেতা গুরুচাঁদ ঠাকুর
তাদের সামাজিক দুর্দশা করিতে চান দূর।।
চন্ডাল নামেতে যাদের ছিল পরিচিতি
তাদের সংঘবদ্ধ করে গড়িলেন সমিতি।।
সরকারের নথিপত্রে তাঁহারই চেষ্টায়
‘নমঃশূদ্র’ নামে তারা পরিচিতি পায়।।
সার্থক করিতে তাদের নব পরিচয়
প্রতিষ্ঠা করেন তিনি বহু বিদ্যালয়।।

গুরুচাঁদ ঠাকুর

শিক্ষাহীন ও পাশ্চাৎপদ ছিল আগে যারা,
তাঁর নেতৃত্বে তাদের মাঝে পড়ে যায় সাড়া।।
নিজ সমাজের করিতে সংস্কার সাধন
বিধবাবিবাহের তিনি করেন প্রবর্তন।।
সংগঠিত করেন তিনি কৃষক সম্মেলন,
ক্রমে শুরু করেন ভূমি সংস্কার আন্দোলন।।
পূর্ববঙ্গের নানা জেলায় আন্দোলন ছড়ায়,
চাকরিতে তপশিলিরা ক্রমে সংরক্ষণ পায়।।
সম্রাট পঞ্চম জর্জ ডাকিয়া দিল্লির দরবারে
রৌপ্যপদকে ভূষিত করেন তাঁহারে।।
অসহযোগ আন্দোলনে করিতে যোগদান
ডাক পেলে গুরুচাঁদ তা করেন প্রত্যাখ্যান।।
প্রচলিত অর্থে তিনি ছিলেন না দেশপ্রেমিক,
দলিত উন্নয়নের যুদ্ধে অক্লান্ত সৈনিক।।
( ধুয়া:-“অক্লান্ত সৈনিক, তিনি অক্লান্ত সৈনিক!”)

★★★★★     ★★★★★     ★★★★★

পাঁচালির এই আসরে এবার শুন সভাজন
বাংলার সংবাদপত্রের কথা করিব বর্ণন।।
জনসাধারণকে করতে সমাজ সচেতন
জনমত সংগঠন করা প্রথম প্রয়োজন।।
শিশিরকুমার ঘোষ বিগত শতকের শেষে
অমৃতবাজার পত্রিকা স্থাপেন সে উদ্দেশ্যে।।

শুরুতে এই পত্রিকা ছিল বাংলা সাপ্তাহিক,
কালক্রমে হল নামী ইংরেজি দৈনিক।।
প্রথমদিকে এর সম্পাদক ছিলেন বহুকাল
দুই ঘোষ ভাই শিশিরকুমার আর মতিলাল।।
শতাধিক বৎসর এর প্রকাশ ছিল নিরন্তর,
এই গোষ্ঠীরই বাংলা সংবাদপত্র যুগান্তর।।

কলকাতা থেকে প্রকাশিত যুগান্তর পত্রিকার ১৯৪৫ সালের একটি সংখ্যা

এটি ছিল জাতীয় ভাবধারার প্রচারক,
তুষারকান্তি ঘোষ ছিলেন এর প্রথম সম্পাদক।।
সমকালের আরো দুই কাগজ জনপ্রিয় অতি —
আনন্দবাজার পত্রিকা দৈনিক বসুমতী
প্রথমটির প্রথম সম্পাদক সুরেশ মজুমদার,
জাতীয় ভাবধারার প্রসার লক্ষ্য ছিল তার।।
স্বাধীনতা-চেতনার বার্তা প্রচারের দোষে
বারবার এই পত্রিকা পড়েছে রাজরোষে।।
নানা সম্পাদক-সাংবাদিক এ গোষ্ঠীতে ছিলেন-
প্রফুল্ল সরকার, সত্যেন মজুমদার, মাখনলাল সেন।।
শত বাধা কাটিয়ে আজও এ কাগজ জীবিত
শতাধিক বছর ধরে এর প্রকাশ অবারিত।।

আনন্দবাজার পত্রিকা
দৈনিক বসুমতী সংবাদপত্রের একটি সংখ্যা

কত পত্রিকার উদয় আর বিলয় ক্রমান্বয়ে
হয়েছিল এই শতকের বিভিন্ন সময়ে।।
এদের মধ্যে কেউ রক্ষণশীল, কেউ বা সংস্কারক,
কেউ বা ছিল জাতীয়তাবাদের প্রচারক।।
ছিল সঞ্জীবনী, বঙ্গবাসী, হিতবাদী,
হিন্দু পেট্রিয়ট, ইন্ডিয়ান মিরর ইত্যাদি
বিভিন্ন পত্রিকা — আর নানা অভীষ্ট তাদের
কেবল উদ্দেশ্য নয় নিছক প্রচার সংবাদের ।।
কৃষক, স্বরাজ, নায়ক, লাঙল ইত্যাদি পত্রিকা
জ্বেলেছিল স্বাধীন চিন্তা প্রকাশের বর্তিকা।।
[ধুয়া- “আগে কহ আর, আহা, আগে কহ আর!”]

সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিক এক কালীনাথ রায়
তাঁর কীর্তি সীমিত শুধু ছিল না বাংলায়।।
লাহোরের ট্রিবিউন নামী ইংরেজি দৈনিক,
কালীনাথ ছিলেন তার সম্পাদক নির্ভীক।।

ট্রিবিউন সম্পাদক কালীনাথ রায়

জালিয়ান-হত্যাকান্ডের পর যখন পাঞ্জাবে
সামরিক আইনের পেষণে সাধারণ মানুষ কাঁপে,
তখন ব্রিটিশ গভর্নরের কড়া নিয়ন্ত্রণে
সেই বর্বরতার সকল খবর ছিল সংগোপনে।।
সামরিক দণ্ডবিধির না করে তোয়াক্কা
কালীনাথ তা পত্রিকায় ছেপে সরকারকে দেন ধাক্কা।।
এইভাবে ব্রিটিশের করে মুখোশ উন্মোচন
সামরিক আইনে কালীনাথ রায় কারারুদ্ধ হন।।

ট্রিবিউন পত্রিকার সহ-সম্পাদক অমল হোম

সেই সঙ্গে অমল হোম যে তাঁর সহ-সম্পাদক —
তাঁকেও গৃহবন্দী করে, পাঞ্জাবের শাসক।।
( ধুয়া — “ধিক ধিক ধিক! ওরে, ধিক শত ধিক!”)

সংবাদপত্রে জাতীয়তা প্রচারের ধারা
অব্যাহত রাখেন বাংলার রাজনৈতিক নেতারা।।
সুরেন্দ্রনাথ নরমপন্থী রাজনীতিক বাংলার,
বেঙ্গলী কাগজটি ছিল সম্পাদিত তাঁর।।
বিপিন-অরবিন্দ গরম দলের নেতা বঙ্গে,
যুক্ত ছিলেন বন্দেমাতরম পত্রিকার সঙ্গে।।

বন্দেমাতরম পত্রিকা

তিনের দশকে দুই নেতা দেশবন্ধুসুভাষ
কয়েকটি সংবাদপত্রিকা করেছিলেন প্রকাশ।।
কংগ্রেসের মধ্যে তৈরি হবার পর স্বরাজ্য পার্টি
শুরু করেন ফরোয়ার্ড কাগজ, তারপরে লিবার্টি।।
সুভাষের সম্পাদনায় দৈনিক বাংলার কথা নামে
জনপ্রিয় হয়েছিল স্বরাজ্য-সংগ্রামে।।
শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির কাগজ দৈনিক হিন্দুস্তান
আজাদ পত্রিকা চালাতেন মৌলানা আকরাম খান
নানা মতের সংবাদপত্রের নানা রকম স্বাদ —
পরিবেশন করে কতরকম বিচিত্র সংবাদ।।
শুধু কলকাতাতেই তো নয়, বঙ্গের অন্যত্রও
ছাপা হত ছোট বড় নানা সংবাদপত্র।।
বর্ধমান, কুষ্টিয়া, বরিশাল আর চট্টগ্রাম,
নোয়াখালী, বগুড়া, ঢাকা – কত করি নাম!
এসব স্থানে প্রকাশ হত যে-সকল কাগজ,
সবগুলির তালিকা করা নয়কো সহজ।।
চট্টগ্রামের জ্যোতি-র নাম আজ এজন্য বিদিত-
এ প্রথম কাগজ, যা পূর্ববাংলায় প্রকাশিত।।
কুষ্টিয়ার জাগরণ, নোয়াখালীর দেশের বাণী,
বগুড়ার কথা, রাষ্ট্রবার্তা, ফরিদপুর হিতৈষিনী,
ঢাকাপ্রকাশ, দি হেরাল্ডদৈনিক আজাদ
এরপরও কত কাগজের নাম পড়ে গেল বাদ!
চলো বঙ্গজীবনের এই পাঁচালীর শ্রোতাগণ
ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে ঝাঁপ দিই আবার এখন।।
(ধুয়া :- “ঝাঁপ দিই আবার এখন চলো ঝাঁপ দিই আবার এখন!”)

★★★★★     ★★★★★     ★★★★★

তেরো শো সাতচল্লিশ সনে ফজলুল হক সরকার
চেয়েছিল চাষীদের স্বার্থে কৃষিজমির সংস্কার।।
সে উদ্যোগে প্রস্তাব করে ফ্লাউড কমিশন:-
জমিদার নয়, সরকারের প্রজা হবে চাষীগণ।।
তারাই পাবে দুয়ের তিন ভাগ শস্যের অধিকার
তবু এতে দেয় না আমল জমিদার জোতদার।।
এর ফলে কৃষকগণের যে বিক্ষোভ হয় পুঞ্জিত,
নিখিল ভারত কৃষকসভা করে তা কেন্দ্রিত।।
বাংলা চতুর্দশ শতকের ত্রিপঞ্চাশৎ সনে
দিনাজপুরে বর্গাদার সব নামে আন্দোলনে।।
তিন ভাগের দুই ভাগ উৎপন্ন ফসলের উপরে —
তেভাগার এই দাবি চাষী জানায় যে সজোরে।।

তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী ইলা মিত্র

রংপুর, ময়মনসিংহ জেলা আর মেদিনীপুরে
ছড়ায় এই আন্দোলন ক্রমে সারা বাংলা জুড়ে।।
ক্ষেত হতে এই দাবিমতো অংশ ফসলের
নিতে গেলে চাষীগণ হয় সৃষ্টি সংঘাতের।।
পুলিশ ও জোতদারের গুলি আর লাঠির আঘাতে
হতাহত হয়ে কতজন ঠাঁই নিল ধরাতে।।
প্রথম শহীদ হলো নিজের জীবন রেখে বাজি
তালপুকুরের সামিরউদ্দিন আর শিবরাম মাঝি।।
খাঁপুর গ্রামে পুলিশ গেলে কৃষকদের ধরিতে
প্রতিরোধ হয় সাঁওতালদের তীর, দাঁ এবং টাঙ্গিতে।।
পুলিশের গুলিতে শহীদ হয়েছিল বাইশ জন-
কৌশল্যা, চিয়ারসাই শেখ, যশোদা,গুরুচরণ,
হোপন মাঝি, দুখনা, পুরনা, ফাগুয়া কোলকামার।।
ভোলা, কৈলাস, থোতো, ভাদো — কব কত আর।।
নেতা থেকে কর্মীর স্তরে যোগদান নারীদের
অনন্য এক বৈশিষ্ট্য ছিল এই আন্দোলনের।।
আন্দোলনের নেতা ছিলেন হাজী দানেশ আর
অজিত, দেবপ্রসাদ, বিষ্ণু, কংসারি হালদার।।
নাচোলের রমেন্দ্র ও ইলা মিত্র – এ দম্পতি
এবং আরো কত নেতা সয়েছেন ক্ষয়ক্ষতি।।
ক্ষুধা, ধর্মের বিভেদ ভুলে বাংলার কৃষকগণ
একজোট উত্তরবঙ্গ হতে কাকদ্বীপ, সুন্দরবন।।
অমর হল এ আন্দোলন গল্পে কাব্যে গানে
এবং সোমনাথ হোড়ের মতো শিল্পীর তুলির টানে।।
গণনাট্য সংঘের শিল্পী সলিল চৌধুরী
কিবা গান বাঁধিলেন শুন, আহা, মরি মরি।।

সোমনাথ হোড় ও তাঁর আঁকা তেভাগা আন্দোলনের ছবি

(সলিল চৌধুরীর রচিত গণসংগীত)
“হেই সামালো হেই সামালো
হেই সামালো ধান হো
কাস্তেটা দাও শাণ হো
জান কবুল আর মান কবুল —
আর দেবনা আর দেবনা
রক্তে বোনা ধান, মোদের প্রাণ হো।।…
মোরা তুলব না ধান পরের গোলায়,
মরব না আর ক্ষুধার জ্বালায়, মরব না,
ধার জমিতে লাঙ্গল চালাই,
ঢের সয়েছি, আর তো মোরা সইব না ।।
এই লাঙ্গল ধরা কড়া হাতের শপথ ভুলো না।
জান কবুল আর মান কবুল
আর দেবনা আর দেবনা
রক্তে বোনা ধান মোদের প্রাণ হো!

★★★★★     ★★★★★     ★★★★★


একই সঙ্গে এ সময়ে সোনার এ বাংলায়
সাম্প্রদায়িকতার ভূত নাচিয়া বেড়ায়।।
মুসলিম লিগ নেতাদের ছিল এ অপকৌশল-
হাসিল করবে পাকিস্তান তারা দেখিয়ে পেশীবল।।
সে উদ্দেশ্যেই হয়েছিল বিদ্বেষের ফাঁদ পাতা,
হইল যে তার শিকার হায় রে, শহর কলকাতা।।
মুসলিম লীগ দল প্রত্যক্ষ সংগ্রামের দিল ডাক,
নেমে পড়ে সমর্থকদল না রেখে রাখঢাক।।
ভারত জুড়ে পাকিস্তানের প্রচার করে তারা,
কিন্তু বঙ্গে উগ্রতর তাহাদের চেহারা।।
তাদেরই দখলে যখন প্রাদেশিক সরকার,
প্ররোচনা দিতে তখন কীসের বাধা আর।।
মনুমেন্ট ময়দানে লীগের ডাকা এক সভায়
বক্তারা সব খোলাখুলি বিদ্বেষবিষ ছড়ায়।।
জনসভা-প্রত্যাগত জনতা তখন
শুরু করে অবাধ ভাঙচুর, হত্যা ও লুণ্ঠন।।
প্রধানমন্ত্রী সুরাবর্দি সবিশেষ তৎপর,
তার হাতেই যে ছিল আবার স্বরাষ্ট্র দপ্তর।।
নিজের ফন্দিমতো পুলিশ-দপ্তরে বসিয়া
পুলিশদলে রাখেন তিনি নিষ্ক্রিয় করিয়া।।
( ধুয়া:- ‘ধিক, ধিক, ধিক! তারে ধিক, শত ধিক!)

The Great Calcutta Killing

হিন্দুরা শুরুতে ক’দিন হলেও ক্ষতিগ্রস্ত,
তার পর হতে তারা আর না থাকিয়া সন্ত্রস্ত
সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে শুরু করে প্রত্যাঘাত,
কলিকাতায় হত্যালীলা চলে দিনরাত।।
হিন্দু-শিখ ও মুসলিম সবে মাতে রণরঙ্গে
কলঙ্কের এক ইতিহাস রচিত হল বঙ্গে।।
কলকাতায় এই দাঙ্গা চলে সাতদিন ধরিয়া।
পরে সারা দেশ জুড়ে তার চলল প্রতিক্রিয়া।।
ভ্ৰাতৃঘাতী দাঙ্গার ফলে রক্তের এই বন্যায়
শুভবোধকে গ্রাস করে হায়, নৃশংস অন্যায়।।
ক’মাস পরে ত্রিপুরা নোয়াখালী জেলায়
হিন্দু- নিধন হয় একতরফা এর প্রতিক্রিয়ায়।।
দেশভাগের বুনিয়াদ এবার বঙ্গে হল পাকা,
সম্প্রীতির সব ইতিহাস হায়, পড়ে গেল ঢাকা।।

★★★★★     ★★★★★     ★★★★★


তেরোশ’ তিপ্পান্ন সনের শেষের দিক তখন
সরকার জানায়, এবার হবে ভারত বিভাজন।।
মুসলিমপ্রধান অঞ্চল নিয়ে পাকিস্তান হবে।
বাকি অংশ ভারতরাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্তই রবে।।
মুসলিম লীগের দাবি মেনেই তৈরি এ প্রস্তাব —
সেই মতো ভাগ হবে এবার বাংলা ও পাঞ্জাব।।
হিসেব শুরু হল এই রাজনীতির ছুরির দাগে
কোন রাজ্যের কোন অঞ্চল যাবে পাকিস্তানের ভাগে।।
সুরাওয়ার্দি, যেন না হয় বাংলার বিভাজন —
সেই মর্মে এক নূতন প্রস্তাব করেন উত্থাপন।।

অবিভক্ত স্বাধীন বঙ্গ নামক এই প্রস্তাবে
বলা হল, বাংলা কারো অধীনে না যাবে।।
ভারত ভেঙে তৈরি হবে তিন ডোমিনিয়ান —
অখণ্ডিত বঙ্গ, ভারত এবং পাকিস্তান।।
কংগ্রেস-লীগের কিছু নেতা দিলেন এতে সায় —
আব্দুল হাশেম, শরৎ বসু, কিরণশঙ্কর রায়
বাংলাভাগ রোধের প্রয়াসকে করতে ফলপ্রসূ
একত্রিত হলেন হাশেম, সুরাওয়ার্দি, বসু।।
আলোচনা করেন এঁরা যুক্ত রাখতে বঙ্গে
কংগ্রেস, লীগ আর ব্রিটিশরাজের প্রতিনিধির সঙ্গে।।
কিন্তু কংগ্রেস, লীগ — দুই পক্ষের কেহও না চায় –
পুরোপুরি বাংলা তাদের হাতের বাইরে যায়।।
তা ছাড়া সেই দাঙ্গার স্মৃতি তখনও দগদগে,
কী করে হিন্দুরা সাড়া দেবে এ উদ্যোগে!
হিন্দু-মুসলিম পারস্পরিক সন্দেহের নেই অন্ত,
যুক্ত বঙ্গের উদ্যোগ ব্যর্থ হয় তাই শেষ পর্যন্ত।।

হিন্দু মহাসভার ছিল আশঙ্কা এই পর্বে –
বাঙলা পুরোপুরিই না যায় পাকিস্তানের গর্ভে ।।
তার চেয়ে কিছুটা না হয় পাকিস্তানেই যাক,
বাকিটা বাঙালি হিন্দুর বাসভূমি থাক।।
লিগের সাম্প্রদায়িক হিংসার তিক্ত পরিচয়
পেয়েছে যেহেতু হিন্দু সদ্য সাতিশয় ,
পাকিস্তানের অঙ্গীভূত হবার আশঙ্কায়
লীগ ছাড়া সব দলই তখন বাংলা বিভাগ চায়।।
শ্যামাপ্রসাদও এই সময় বঙ্গের বিভাজন
দাবি করে করেন দেশের জনমত সংগঠন।।
( ধুয়া — “আগে কহ আর, শুনি আগে কহ আর!”)

আগস্ট ১৯৪৭ – ভারত ভাগ করে দুটি ডমিনিয়নের সৃষ্টি — সংবাদপত্রের শিরোনাম

বড়লাট লর্ড মাউন্টব্যাটেন ঘোষেন অবশেষে —
ক্ষমতার হস্তান্তর হবে কী ভাবে এই দেশে।।
সেই মতো সম্পন্ন হল ভারত বিভাজন
তেরোশ’ চুয়ান্ন সনের উনত্রিশে শ্রাবণ।।
ধর্মের ভিত্তিতে করে ভারতবর্ষ ভাগ
বাঙালি জাতির বুকে তীক্ষ্ণ ছুরির দাগ
রেখে গেল বিভেদপটু কূট সে ইংরাজ।
বাঙালির শক্তিও হল দ্বিখণ্ডিত আজ।।
এক শতকে দুইবার বঙ্গ ভঙ্গ হল হায়–
স্বাধীনতা আসিল এই খণ্ডিত বাংলায়।।

উদ্বাস্তু

মুসলিম গরিষ্ঠতার ফলে কাজেই শেষ পর্যন্ত
পূর্ববঙ্গ হল পাকিস্তানের কুক্ষীগত।।
লীগ সরকারের সাম্প্রদায়িক প্ররোচনার ফলে
পূর্ববঙ্গে হিন্দুরা হয় উৎখাত দলে দলে।।
বাস্তুহারা হয়ে তারা আসে এ ভারতে —
পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় তারা চায় যে কোনমতে।।
দিল্লির গদিতে ব’সে যেসব কংগ্রেস নেতা,
বাঙালিদের জন্য তাদের নাই যে মাথাব্যথা।।
উদ্বাস্তুরা পশ্চিমবঙ্গে পায় না কোনো স্থান,
ঊষর দণ্ডকারণ্য আর সুদূর আন্দামান
নির্ধারিত হল শেষে বাসস্থান তাহাদের–
এর পরেও হয় না ক’ শেষ তাদের দুর্ভাগ্যের ।।
( ধুয়া – ”তাদের দুর্ভাগ্যের, হায়, তাদের দুর্ভাগ্যের!”)

[লেখকের অন্য রচনা]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x