
একজন পুরুষ অথবা একজন নারী যখন সজ্ঞানে নিজেদের জন্য জীবনসঙ্গী বা জীবনসঙ্গিনী নির্বাচন করবে তার মধ্যে ধর্ম কেন এসে নাক গলাবে এ নিয়ে বহু বিতর্ক হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঐতিহ্য, পরম্পরা, বিশ্বাস, ইতিহাস, শিকড়, পুরুষানুক্রম এই রকম কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যখন চলে এসেছে তখন অন্য সব আধুনিকতার যুক্তিগুলি পিছু হটেছে। রয়ে গেছে যা আমাদের চিয়ায়ত, তাই। ইংরেজীতে যাকে বলে Institution of marriage তা ইদানীং আক্রান্ত হচ্ছে বটে, তবে মনে হয় না তা ধসে পড়বে আগামী এক দুই শতাব্দীর মধ্যে।
একুশ শতকের সিকি ভাগ পার করার পরে দেখা যাচ্ছে বিবাহোৎসবের পরিসরে যতই উত্থান ঘটুক ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিদের, যতই বঙ্গীয় রীতি রেওয়াজের মধ্যে ঢুকে পড়ছে অন্য প্রদেশের কিছু প্রথা, তবু বাঙালি বিয়েতে এখনও দরকার পড়ছে পাঁজি, পুরুত, নাপিত, সাতজন এয়োদের, কনের জ্যেষ্ঠ ভগ্নীপতি এবং বর ও কনের মা বাবাকে। এবং পাড়াপড়শি, আত্মীয়স্বজনদের। প্রশ্ন উঠছে, কন্যা সম্প্রদানের প্রথা এবং মন্ত্র নিয়ে, মেয়েদের গোত্রান্তর, পদবী বদলের আবশ্যিকতা নিয়ে। তবুও দেখা যাচ্ছে ছাঁদনাতলার সমস্বরে উলুধ্বনি ও শঙ্খবাদনের আবহে, যে মেয়েটি কাজেকম্মে একা একাই দুনিয়া চষে বেড়াচ্ছে তাকেও পিঁড়িতে চেপে পানপত্রে মুখ ঢেকে এখনও ছাঁদনাতলায় প্রবেশ করতে হচ্ছে। সময়ের দর্পনে এই সব প্রথার এবং বিবাহাচারের যৌক্তিকতার দিকটি আপাতত তোলা থাকা। আমরা বরং এই সব বিয়েকে ঘিরে যে সব রীতি রেওয়াজ প্রচলিত আছে, আগে সে সবের উৎসের দিকটি নিয়ে একটু অনুসন্ধান করি।
যদি হোমো স্যাপিয়নদের আদিম মানুষ বলে ধরে নিই তাহলে এই পৃথিবীতে তাদের উৎপত্তি হয়েছিল দুই লক্ষ বছর আগে। আর তারা বিয়ে নামক একটি সামাজিক বন্ধনে নিজেদের বাঁধতে শুরু করেছে খুব বেশি হলে পাঁচ হাজার বছর আগে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এতদিন কেন সময় লাগলো এই কথাটা বুঝতে যে বিবাহ নামের একটি প্রথার দরকার আছে তাদের জীবনে। নইলে অন্য পশুদের সঙ্গে তারা নিজেদের আলাদা বলে দাবি করতে পারবে না।
আসলে জৈবিক নিয়মেই নারী ও পুরুষ একজন আর এক জনের কাছে আসত। তারপর তাদের যখন সন্তান হত তখন তারা তাদের অন্য যে কোনো পশুর মতই সযত্নে লালন পালন করে বড় করে তুলত। কিন্তু মানুষ নামক প্রাণির ক্ষেত্রে অন্য সব প্রাণিদের তুলনায় সেই সন্তানকে বড় করে তুলতে অনেকটা বেশি সময় লাগত প্রকৃতির নিয়মেই। এই শিশুকে বড় করার সময়টা নারীকে সব ব্যাপারেই পুরুষদের উপর সম্পূর্ণ ভাবে নির্ভর হয়েই থাকতে হত। অথচ আদিম যুগে মানুষকে খাদ্য অন্বেষণে যেতে হত তার বাসস্থান ছেড়ে দূরে দূরে। চাষ বাস করা শিখতেও তো বেশ কয়েক হাজার বছর লেগে গেছে। তখন শিকারই একমাত্র খাবার জোগাড়ের উপায় ছিল। যখন তারা শিকারে বেরোতো, এই সময়টাতে নারী একেবারেই সুরক্ষিত থাকতে পারত না। বন্য প্রাণির আক্রমণ তো ছিলই। এমন কি একজন অসুরক্ষিত নারীকে অন্য পুরুষ এসে দখল করে নিত মাঝে মাঝে। সেই নিয়ে পুরুষে পুরুষে লড়াই, ঝগড়া রক্তপাত হত হামেশাই। অনেক নৃতত্ববিদ মনে করে এই রকম রক্তপাত, হানাহানি বন্ধ করার জন্যে নারী পুরুষের সম্পর্কের একটা সামাজিক স্বীকৃতির দরকার হয়ে পড়ল। সেখান থেকেই প্রাথমিক ভাবে বিয়ের মতন কিছু একটা করার ভাবনার উৎপত্তি হয়ে ছিল।
কিন্তু সেটা ঠিক কবে এবং কি ভাবে, তার কোনো সন তারিখ বা ধারাবিবরণী কেউ লিখে যায় নি। তবে গবেষকরা তার একটা আনুমানিক সময় বলতে পারছেন।
একটি ইতিহাস বলছে, খৃষ্টপূর্ব ২৩৫০ সালে মেসোপোটামিয়াতে প্রথম বিবাহের রীতিনীতি প্রচলিত হয়েছিল। সেই রীতিনীতি ক্রমে হিব্রু, রোমান এবং গ্রীকদের মধ্যে প্রচলিত হয়। গ্রীকরা প্রথমে কিছু নারী ও পুরুষের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের কিছু নিয়মাবলী বেঁধে দেওয়া শুরু করে। যেমন পুরুষদের বিয়ের বয়স ৩০ বছর এবং নারীদের যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। পুরুষদের বয়স ৩০ করার পিছনে যুক্তি ছিল ঐ বয়সে পুরুষদের সামরিক শিক্ষা এবং যুদ্ধ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করা হয়ে যায়। এ ছাড়া তারা এই নিয়মও চালু করে যে বিয়ের জন্যে নারী ও পুরুষ উভয়ের সম্মতির প্রয়োজন। বিয়ের পর সন্তানদের মধ্যে সম্পত্তির ভাগ বাঁটোয়ারা কি ভাবে হবে সেই বিষয়েও তারা কিছু নিয়মাবলী চালু করে।

প্রতিবেশী দেশ রোম মোটামুটি ভাবে গ্রীসদেশের নিয়মাবলি গ্রহন করলেও তারা এই নিয়মের মধ্যে কিছু সংযোজন করে। বিয়ের পরে নারী তার নিজের পরিবারের সম্পত্তির ভাগ পাবে কিনা, বা তারা তাঁদের স্বামীর পদবী গ্রহন করবে কি না এই ব্যাপারে তারা বিবাহের কিছু শ্রেণিবিভাগ করে। যতটুকু বোঝা যাচ্ছে বিয়েতে যে পারষ্পরিক প্রেম ভালোবাসা যে একটি ধর্তব্যের বিষয়, তা তারা তখন অবধি মনে করেনি। তাদের মূল লক্ষ ছিল সম্পত্তির অধিকার নিয়ে একটি যথাযথ বিধিব্যবস্থা শুরু করা এবং একটি নারীকে একটি পুরুষের সম্পত্তি বলে নির্দিষ্ট করে দেওয়া। গ্রীস দেশে বিয়ের সময় যে শপথ গ্রহনের অনুষ্ঠান (betrothal ceremony) হত, সেখানে কন্যার পিতা বলতেন – ‘আমি আমার কন্যাকে ভবিষ্যতে আইনসম্মত সন্তানসন্ততির উৎপাদনের জন্যে সম্প্রদান করছি।’
হিব্রুদের অবশ্য পুরুষের একাধিক বিবাহ করাতে সম্মতি ছিল। গ্রীক এবং রোমানদের একাধিক বিয়ে করার অনুমতি না থাকলেও তাদের বিয়ের পর রক্ষিতা রাখাতে কোনো বাধা ছিল না। এমন কি সমকামিতাও নিষিদ্ধ ছিল না।
ইয়োরোপে বিয়ে অনুষ্ঠানের মধ্যে ধর্মের প্রবেশ ঘটে অনেক পরে । অষ্টম শতাব্দীতে যখন ইয়োরোপে চার্চের শাসন শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তখন বিয়ের অনুষ্ঠান চার্চের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। অবশ্য এর আগে ১৫৬৩ সালে রোমান ক্যাথলিক ক্যানন আইনে বিয়েকে একটি ধর্মীয় রীতি বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বিয়ের আঙ্গিনায় চার্চের শাসন প্রবেশ করাটা মেয়েদের জন্যে অনেকটা ভালো হয়। পুরুষদের স্বেচ্ছাচারিতাকে চার্চ নিয়মের নিগড়ে বেঁধে দিল। বিয়ের পর নারী ও পুরুষ উভয়কেই একে অপরের প্রতি বিশ্বস্ত থাকার নির্দেশ দিল চার্চ। অবশ্য পুরুষই পরিবারের কর্তা হবে সেটাও চার্চই বলে দিল।
তখন অবধি অবশ্য ইয়োরোপে বিয়ে ব্যাপারটা নেহাত একটি বস্তুতান্ত্রিক ব্যাপারই ছিল। এর মধ্যে প্রেমের স্বীকৃত কোনো ভূমিকা ছিল না। এই প্রেমের ভূমিকাকে প্রথম স্বীকৃতি দেওয়া হয় ফরাসী দেশে। অনেক ঐতিহাসিকের মতে রোমান্টিক দাম্পত্যের ধারনার জন্ম হয় ফরাসিদের দেশে। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে নারীর রূপ বর্ণনা না করে কাব্য রচিত হতে দেখা যায়। স্ত্রীকে পুরুষের সম্পত্তি হিসেবে দেখার যে ধারাটি এতদিন ইয়োরোপে চলে এসেছিল, ফ্রান্সে দাম্পত্য প্রেমকে মর্যাদার আসনে বসাবার পর সেখানে বদল ঘটতে লাগল।
প্রাচ্যের মধ্যে চিনে Xia এবং Shang সাম্রাজ্যের সময়ে বিবাহ প্রথা শুরু হয়। এই সময়ে নুয়া (Nuya) এবং ফৌ হি (Fu Xi) নামের একজন নারী ও একজন পুরুষ ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে দুজনে একসঙ্গে থাকার সঙ্কল্প নেয়। সেখান থেকেই বিবাহের ধারণার জন্ম হয়। খৃষ্টপূর্ব ২০০ বছর আগে এক রাজার নির্দেশনামায় একই গোত্র, বংশ বা গোষ্ঠীর মধ্যে বিবাহ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ধরে নেওয়া যেতে পারে, বিয়ে তার আগে থেকেই সেই দেশে চালু হয়ে গিয়েছিলই।
আমাদের দেশে বিয়ের প্রথা ঠিক কবে থেকে শুরু হয়েছে তার কোনো গ্রহণযোগ্য নথি পাওয়া যায় নি। তবে মহাভারতের এক জায়গায় শ্বেতকেতুর উপাখ্যান উল্লেখিত আছে। শ্বেতকেতু ঐ সময়ের সমাজে মদ্যপান এবং ব্যাভিচারের বিরুদ্ধে কিছু একটা ব্যবস্থা নেবার কথা ভেবেছিলেন। সেখান থেকেই তিনি পুরুষদের একপত্নীকবিবাহের কথা ভাবেন এবং সেখান থেকেই বিবাহ প্রথার শুরু।
ঋগ্বেদে আমরা একটি উৎসবের উল্লেখ পাচ্ছি, যেটাকে বলা হত সমন উৎসব। এই উৎসবে নানা ক্রীড়াবিদ, শস্ত্রবিদ, অশ্বারোহী, রথী, ধনুর্বেত্তা, নট, নটী, কবি এই উৎসবে অংশগ্রহণ করে নিজ নিজ দক্ষতার প্রদর্শন করত পুরস্কার লাভের আশায়। সেই সঙ্গে এই উৎসবে যুবতী মেয়েরাও সাজ গোজ করে আসতেন নিজেদের জন্যে পতি খুঁজতে। কিন্তু সবার কপালে যে পতি জুটে যেত এমনটা নয়। যাদের বর জুটত না তাঁদের বলা হত অনূঢ়া। যাদের বিয়ে হয়ে যেত তাঁদের বলা হত জায়া। যারা অবিবাহিত অবস্থায় বাপের বাড়ি রয়ে যেত অনেকদিন তাদের বলা হত ‘আমাজুর’।
হতে পারে, বৈদিক যুগেই বিবাহ প্রথার সূচনা হয়েছিল। তবে বৈদিক যুগে কন্যাকে নিজেদের গোষ্ঠীর বাইরে থেকে নিয়ে আসার রীতি ছিল বলে তাকে ‘বধূ’ বলা হত যার অর্থ যাকে বহন করে আনা হয়েছে। এবং একটি পরিবারে বধূ আসা মানে সেই পরিবারের সম্পত্তি হয়ে যাওয়া। একটি মেয়ের অন্য পরিবারের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার সঙ্গে বিয়ে হওয়ার মানে সেই পরিবারের অন্য ভ্রাতাদের সেই মেয়ের উপর অধিকার থাকত। পরবর্তীকালে মনু বিধান দেয় যে একটি কন্যার বিবাহ যেন একটি পরিবারের সঙ্গে না দেওয়া হয়। অথর্ব বেদে বিয়ের কিছু নিয়মাবলীর কথা বলা হয়। গৃহসূত্রসমুহের মধ্যে সেইগুলিকে আরও নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। সুলক্ষণযুক্ত পাত্রী কি ভাবে নির্বাচন করতে হবে তারও সূত্র দেওয়া হয়। নক্ষত্রের কোন অবস্থানে বিয়ের পক্ষে উপযুক্ত সময় এটাও বলে দেওয়া হয়।
মহাভারতের যুগে আমরা চার রকম বিবাহের উল্লেখ পাচ্ছি। ব্রাহ্ম, গান্ধর্ব, অসুর ও রাক্ষস। এর মধ্যে একমাত্র ব্রাহ্ম বিবাহের ক্ষেত্রেই মন্ত্র তন্ত্রের প্রয়োজন হত না।
মনুস্মৃতিতে আমরা দেখতে পাই আরও চার রকমের বিবাহ যোগ হয়েছে। দৈব, আর্ষ, প্রজাপত্য, পৈশাচ। পরবর্তীকালে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্যর সময়ে (আনুমানিক খৃষ্টপূর্ব ৩০০ বছর) তাঁর প্রধান অমাত্য কৌটিল্য তাঁর অর্থশাস্ত্রে বিয়ের কিছু নিয়ম বিধি লিখে দিয়েছিলেন। তিনি আগেকার আট প্রকারের বিবাহকেই স্বীকৃতি দিয়ে ছিলেন। কিন্তু মেয়েদের কিছু বাড়তি অধিকারের কথা বললেন।
পরবর্তীকালে মনুস্মৃতি হিন্দু ধর্মের লোকেদের জন্যে শিরোধার্য্য হয়ে উঠল। মহাভারতের সময়ে যৌন জীবনে যে সব অবাধ ছাড় দেওয়া ছিল, মনুস্মৃতিতে তা অনেকটাই বিধিবদ্ধ হয়ে গেল। সেই সঙ্গে বর্ণাশ্রম প্রথাকে মান্যতা দেওয়া হল। বিবাহ বিধির উপর এর প্রভাব পড়ল। স্মৃতিকারদের বিধানে বিবাহ হয়ে উঠল একটি ধর্মবিহিত কর্তব্য। মনুসংহিতায় বলা হল পিতৃপুরুষের উদ্ধারের জন্য বিয়ে করে পুত্র উৎপাদন করা অবশ্যকর্তব্য। মেয়েদের বিয়ের সঠিক বয়স বলা হল দশ বছর। এবং বলা হল এই বয়সে মেয়েদের বিয়ে না দেওয়া হলে মেয়ের পরলোকপ্রাপ্ত পিতৃপুরুষকে সেই মেয়ের রজঃ পান করতে হয়। সগোত্রে বিয়ে হওয়া অনুচিত বলা হলেও ব্রাহ্মণ পুরুষদের জন্যে নিম্ন বর্ণে বিয়ে করাতে ছাড় দেওয়া হল।
মনুর বিধান অনুযায়ী মানুষকে পাপমুক্ত করে তাকে বিশুদ্ধিকরণ করবার যে দশবিধ সংস্কার আছে তার মধ্যে বিয়ে হল দশম সংস্কার। এক কথায় বিয়ে হল হিন্দুদের জন্যে একটি অবশ্যপালনীয় সংস্কার। মনু এও বলে দিলেন যে বিবাহের মধ্যে দিয়ে নারীদের পিতৃকুলের গোত্র পরিত্যাগ করে স্বামীকুলের গোত্র গ্রহণ করতে হয়। তাই বিবাহ হিন্দুনারীর জন্যে জন্যে একটি পরম সন্ধিক্ষণ। তাই এই অনুষ্ঠান শুদ্ধ ভাবে নিয়ম মেনে হওয়া বাঞ্ছনীয়।
মনুও বিবাহকে আট রকমের শ্রেণীতে ভাগ করলেন আগের মতই। এর মধ্যে ব্রাহ্ম বিয়ের ক্ষেত্রে মনু বললেন – বিদ্বান ও চরিত্রবান ব্যাক্তিকে নিজে আহ্বান করে, তাকে বস্ত্রাদি দ্বারা আচ্ছাদিত করে, এবং সম্মানিত করে কন্যা দান করাকে ব্রাহ্ম বিবাহ বলা হবে। তিনি বিধান দিলেন এই রকম ভাবে ব্রাহ্ম বিবাহ দিলে যার বিয়ে হল সেই কন্যার পুণ্যবান পুত্রের উর্ধতন দশপুরুষ এবং অধস্তন দশপুরুষ এবং নিজে এই একুশ পুরুষ সম্পূর্ণ পাপমুক্ত হয়ে যাবে। তেমনি দৈব বিবাহে এদিকে সাত পুরুষ ওদিক সাত পুরুষ এবং প্রজাপত্য বিবাহে এদিকে ছয় পুরুষ ওদিকে ছয় পুরুষ পাপ মুক্ত হয়ে যাবে।
বাঙালিদের বিবাহের প্রথা মূলত হিন্দু বিবাহের প্রথাকে, যা আসলে আর্য ব্রাহ্মণ্য প্রথা, তাকে অনুসরণ করলেও বাঙালি এর মধ্যে তাঁদের স্বকীয়তা নিয়ে এসেছে। হিন্দু ধর্মের মূলে যে অদৃষ্টবাদ নিহিত আছে তা বাঙালির বিবাহাচারের মধ্যে চলে এসেছে। হিন্দুদের বিশ্বাস জন্ম, মৃত্যু এবং বিবাহ ঈশ্বরের দ্বারা পূর্ব নির্ধারিত। প্রজাপতি অর্থাৎ ব্রহ্মার নির্বন্ধ।

বাঙালিদের মধ্যে এখন যে সমস্ত ধর্মীয় আচার পালন করা হয়, তা অবশ্য প্রধানত স্মৃতিকার রঘুনন্দন ভট্টাচার্য্যের রচিত বিধান অনুযায়ী। রঘুনন্দন চৈতন্যদেবের আবির্ভাবের পঁচিশ বছর পরে নবদ্বীপে জন্মগ্রহন করেছিলেন, তিনি মাত্র পঁচিশ বছর বয়সেই স্মৃতিকার হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন তাঁর অগাধ পান্ডিত্যের জন্য।
রঘুনন্দন মোটামুটি ভাবে মনুস্মৃতিকে মেনে চলেছেন। দু’ এক জায়গায় তিনি তাঁর নিজস্ব ভাষ্য যোগ করেছেন। বিয়ের বিষয়ে তাঁর নির্দেশ যে বইতে করে গেছেন সেটির নাম – উদ্বাহতত্ব। বিবাহ কাকে বলে তার ব্যখ্যা দিতে গিয়ে রঘুনন্দন বিবাহের বুৎপত্তিগত অর্থ অর্থাৎ বিশেষ ভাবে এবং বিশেষ উদ্দেশ্যে কন্যাকে বহন করাকেই বিবাহ বলা হবে।
পাত্রের বিবাহযোগ্য বয়সের উল্লেখ না করলেও পাত্রীর বয়স নির্দিষ্ট করে বলেছেন আট থেকে বারোর মধ্যে। এবং মনুর মতই বলেছেন রজদর্শনের পরে কন্যার বিবাহ না দিলে কন্যার পিতার পরলোকে নরকবাস সহ আরো অনেক শাস্তি নির্দিষ্ট। পুরুষের একাধিক বিয়ে করতে বাধা নেই। কিন্তু কন্যার সেই অধিকার নেই। পাত্রীর কি কি যোগ্যতা থাকা উচি্ত তার লম্বা ফিরিস্তি দিয়েছেন। যেমন ‘সৎকুলসম্ভূতা, সুলক্ষণা, বয়স্থা কন্যার পাণিগ্রহণ করাই বিধেয়।’
কিন্তু, পাত্রের প্রয়োজনীয় যোগ্যতার কোনো উল্লেখ নেই। পাত্রী একবার পাণিগ্রহণ হয়ে গেলে তার আর দ্বিতীয়বার বিবাহ সম্ভব নয়। অর্থাৎ বিধবা বিবাহে তাঁর সমর্থন ছিল না। কন্যাশুল্ক গ্রহন করা মহাপাপ, কিন্তু বরশুল্ক নেওয়া দোষের নয় ।
বিবাহবিচ্ছেদ একমাত্র একটি কারণেই হতে পারে, কন্যা যদি ব্যাভিচারিণী হয়। পাত্র ব্যাভিচারী হলে সেটা ধর্তব্য বিষয় নয়। বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে গেলে স্ত্রীকে ভরণ পোষণ দেবারও কোনো বিধান মনুর শাস্ত্রে নেই।

তবে রঘুনন্দন যে সব নিয়মাবলী লিখে গেছেন সেগুলিকে তিনি তিন ভাগে বিভক্ত করেছেন।
১) এই নিয়মগুলি মেনে চললে ভালো কিন্তু না মানলে তেমন কোনো ক্ষতি নেই।
২) এ’গুলি না মানলে পতির পাতিত্য হয়
৩) এ’গুলি না মেনে চললে বিবাহ সিদ্ধ হয় না।
বিয়ের আচার অনুষ্ঠান মূলত দু ভাগে বিভক্ত স্ত্রী-আচার এবং পুরোহিত দ্বারা সম্পাদিত ধর্মীয় অনুষ্ঠান। স্ত্রী-আচারের উদ্দেশ্য হল স্বামী ও স্ত্রীর জীবন থেকে বাধা বিপত্তি দূর করা আর পুরোহিত ধর্মীয় অনুষ্ঠান করে নতুন গড়ে ওঠা সম্পর্ককে পবিত্রীকৃত (solemnised) করা। এই দুই মিলে মূল উদ্দেশ্য নবদম্পতির সুখ, শান্তি, আয়ু ও মঙ্গল কামনা করা।

বাঙালির বিয়েতে যে সব আচার অনুষ্ঠান হয় সেগুলি আমাদের প্রাচীন ঐতিহ্যের অংশ বলে আমরা ধরে নিই বলেই আমরা তা আজও নিষ্ঠা ভরে পালন করে যাই। কিন্তু এই সব প্রথাগুলির মধ্যে নিহিত অর্থ কি আছে তা নিয়ে খুব একটা কেউ খুব একটা মাথা ঘামাই না। এই সব আচার অনুষ্ঠানে সমাজকে জড়িয়ে দেবার একটা উদ্দেশ্য ছিল যে বৈধ ভাবে যে একটা বিয়ে হয়েছে এটা অনেককে জানিয়ে দেওয়া। আসলে যখন লিখিত ভাবে কিছু নথি তৈরি করার প্রচলন হয় নি, তখন সমাজকে সাক্ষী রাখাটা খুব দরকারী ছিল। ঐতিহাসিকদের মতে বাঙালি জাতি আর্য অনার্যের মিশ্রণে সৃষ্টি হয়েছিল। তাই আর্যদের কাছে কিছু শাস্ত্রীয় প্রথা এবং অনার্যদের কাছ থেকে কিছু স্ত্রী আচার বাঙালি বিয়ের মধ্যে ঢুকে পড়েছে।
অধিবাস, নান্দীমুখ, জল সওয়া, ছাদনাতলা, বাসরঘর, বাসি বিয়ে, বধূবরণ, কালরাত্রি, ভাত-কাপড়, বউভাত, ফুলশয্যা, দ্বিরাগমন – এইগুলি স্ত্রী-আচারের মধ্যে পড়ে। জাতি, বর্ণ, বংশ, অঞ্চল এ সবের সঙ্গে এই সব নিয়মের কিছু কিছু পরিবর্তন আছে। আর ধর্মীয় বিধি হচ্ছে পিতৃপুরুষের প্রীতির জন্যে নান্দীমুখ এবং কন্যা সম্প্রদানের অনুষ্ঠান।
আমাদের ছাঁদনাতলার অনুষ্ঠানে মাস্টার অফ সেরিমনি হচ্ছে নরসুন্দর মানে নাপিত আর ধর্মীয় আচারগুলি পরিচালক পুরোহিত।
কন্যা সম্প্রদান বিয়ের একটি প্রধান অঙ্গ বলে শাস্ত্রে বলা আছে। যদিও যখন খুব কম বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেওয়া হত তখনকার কথা ভেবেই এই অনুষ্ঠানটি বিয়ের প্রধান অঙ্গ বলে ভাবা হয়েছিল।’সম্প্রদান’ শব্দের অর্থ স্বত্বত্যাগপূর্বক দান।

সম্প্রদানের সময় কন্যার পিতাকে মন্ত্র পড়তে হয় – ‘দূর্বাপুষ্পং ফলঞ্চৈব বস্ত্রং তাম্বুলমেবচ এভি কন্যা ময়া দত্তা রক্ষণং পোষণং কুরু।’ এর অর্থ হল – দূর্বা, ফল, ফুল, বস্ত্র এবং তাম্বুল সহ এই কন্যাকে দান করা হল। এবার তাকে রক্ষণাবেক্ষণ ও পোষণ করার দায়িত্ব কন্যার স্বামীকে দেওয়া হল।
সম্প্রদানের পর সিঁদুরদান অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। যদিও সিনেমা সিরিয়ালের গল্পে সিঁদুরদান অনুষ্ঠানকে একটু বেশিই গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু বৈদিক শাস্ত্রে সিঁদুরদান অনুষ্ঠানের উল্লেখ নেই। বাঙালি স্মৃতিকাররা বেদে এর উল্লেখ না পেয়ে এটিকে ‘শিষ্টসমাচারাৎ’ অর্থাৎ ভদ্রসমাজে প্রচলিত বলে উল্লেখ করেছেন। খুব সম্ভবত এই প্রথা কোনো এক সময়ে অনার্যদের কাছ থেকে এসে গিয়েছে। ঠিক কবে থেকে এই প্রথা এসেছে বলা মুশকিল, তবে খুব প্রাচীনকালে লাল রঙের জন্য রক্ত চন্দন ও কুমকুমের ব্যবহার করা হত। সিঁদুরের নয়। তেমনি শাঁখা ও নোয়ারও কোনো আর্য স্বীকৃতি নেই।

আর একটি অনুষ্ঠান যা সম্প্রদানের পর লাজহোমের সময় হয়ে থাকে সেটির নাম হস্তগ্রহণ (পাণিগ্রহণ)। এই উপলক্ষে যে বৈদিক মন্ত্র বরকে বলতে হয় সেটির বাংলা করলে দাঁড়ায় – হে নারী, আমাদের উভয়ের সৌভাগ্যের উদ্দেশ্যে আমি তোমার হস্তগ্রহণ করছি, তুমি আমার অন্তিম বয়স অবধি আমার সৌভাগ্য ভোগ কর। তুমি আমার গৃহের স্বামিনী হও, এ কারণে ভগ, অর্যমা, সবিতা এবং পুষ্যা তোমাকে আমার হস্তে প্রদান করলেন।

বিয়ের আগের দিন দুটি অনুষ্ঠান থাকে, গায়ে হলুদ এবং অধিবাস। দুটিই লৌকিক অনুষ্ঠান। গায়ে হলুদ অনুষ্ঠানে এয়োরা হলুদ কুটে তা বরের শরীরে লাগায় এবং বরের গায়ে স্পর্শ করা সেই হলুদ কনের বাড়িতে পাঠানো হয়। কনেকে নতুন কাপড় পরিয়ে সেই হলুদ পাঁচ বা সাতজন এয়ো মিলে কনের কাঁধে, বুকে এবং পায়ে সেই হলুদ লাগান। বরের বাড়ি থেকে হলুদ পাঠানোর সময় গায়ের হলুদের তত্ত্বও পাঠানো হয়।
অধিবাসের অর্থ বর ও কনেকে সুগন্ধযুক্ত করা। বাঙালি নিয়মে একটি বরণডালায় তেল, হলুদ, গঙ্গামাটি, চন্দন, নুড়ি, শিলা, সাদা ধান, সাদা সর্ষে, দূর্বা, ফুল, ফল, দই ঘি, স্বস্তিক, সিঁদুর, শাঁখ, লাটাই জড়ানো সুতো, কাজল, গোরোচনা, সোনা, রুপো, তামা, ঘিয়ের প্রদীপ, আয়না, চামর এই সব জিনিস সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা হয়। বরণডালা বর ও কনের কপালে ছোঁয়ানো হয়।
ছাঁদনাতলায় একটি বিশেষ অনুষ্ঠান শুভদৃষ্টি। কনেকে ছাঁদনাতলায় এনে সাতবার বরকে প্রদক্ষিণ করানোর সময় কনের মুখ একটি পান পাতা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়, এবং কনের মুখে সুপারি রাখা হয়।
এর কারণ হচ্ছে পান এবং সুপারির এই কম্বিনেশন নাকি এমন এক যাদু শক্তি উৎপন্ন করে যা শুভদৃষ্টির আগে অন্য কোনো অশুভ দৃষ্টি বা অশুভ শক্তি থেকে বর কনেকে সুরক্ষা দেয়।

বাঙালি বিয়ের আর আর একটি অন্যতম পরিচিত অনুষ্ঠান সপ্তপদীগমণ। এর নিয়ম সাতটি মন্ডলের শেষ মন্ডলে বর বধুর পিছনে দাঁড়াবে। বধুর ডান পা সব সময় আগে থাকবে আর বর তার ডান পা দিয়ে কনের ডান পা প্রথম মন্ডলের দিকে ঠেলে দেবে। এই ভাবে সাত পা এগিয়ে যাবে। প্রতি পদেই একটি করে মন্ত্র বলতে হবে। সেগুলি এই রকম –
– প্রথম চরণ – “ওঁ ইশে একপদী ভব, সা মামনুব্রতা”। অর্থাৎ, প্রথম চরণ ফেলো, তুমি আমার অনুবর্তিনী হও।
দ্বিতীয় চরণ – “ওঁ উর্জে দ্বিপদী ভব, সা মামনুব্রতা ভব”। অর্থাৎ, দ্বিতীয় চরণ ফেলো, সমস্ত কর্মে আমার অনুবর্তিনী হও।
তৃতীয় চরণ – “ওঁ রায়স্পোষায় ত্রিপদী ভব, সা মামনুব্রতা ভব”। অর্থাৎ, ধন পুষ্টির জন্য তৃতীয় চরণ ফেলো, এবং তুমি আমার অনুবর্তিনী হও।
চতুর্থ চরণ – “ওঁ মায়োভব্যায় চতুষ্পদী ভব, সা মামনুব্রতা ভব”। সুখ লাভের জন্য তুমি চতুর্থ পদ ফেলো এবং তুমি আমার অনুবর্তিনী হও।
পঞ্চম চরণ – “ওঁ প্রজাভ্যঃ পঞ্চপদী, সা মামনুব্রতা ভব”। অর্থাৎ, পুত্রবতী হওয়ার জন্যে পঞ্চম পদ ফেলো এবং তুমি আমার অনুবর্তিনী হও।
ষষ্ঠ চরণ – “ওঁ ব্রতেভ্যঃ ষট্ পদী ভব, সা মামনুব্রতা ভব”। অর্থাৎ সকল ঋতুর জন্যে ষষ্ঠ পদ ফেলো এবং তুমি আমার অনুবর্তিনী হও।
সপ্তম চরণ – “ওঁ সখে সপ্তপদী ভব, সা মামনুব্রতা ভব”। অর্থাৎ, সপ্তম পদ ফেলো, এবং সখ্যতায় তুমি আমার অনুবর্তিনী হও।
এখানে লক্ষ করার বিষয় প্রতি পদক্ষেপেই ‘আমার অনুবর্তিনী হও’ এই কথাটি মনে করিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এবং এই সপ্তপদীর পরে রীতি অনুযায়ী তাদের প্রথমে ধ্রুবতারা পরে অরুন্ধতী নক্ষত্র দেখানো হয়। বৈদিক রীতিতে এই নক্ষত্র দেখানোর উদ্দেশ্য বর-কনেকে দেখিয়ে বলবে আমি ধ্রুবতারা আর তার কাছে যেমন একটি ছোট্টো নক্ষত্র অরুন্ধতীর মত সর্বদা তার সঙ্গে থাকে তুমিও সর্বদা আমার সঙ্গেই থাকবে ।
বাঙালি বিয়ের এই স্ত্রী-আচারগুলি ঠিক কি ভাবে এবং কবে সৃষ্টি হয়েছে তা জানা যায় না। এই সব স্ত্রী-আচার অনেক সময় এক এক পরিবারে বা এক এক অঞ্চলে এক এক রকম দেখা যায়। এগুলি সাধারণত পুরোনো গানের সুরের মত কিছু কিছু পরিবর্তন হয়ে যুগ থেকে যুগে চলে এসেছে।
ঠাকুর বাড়ির মেয়ে ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণী ‘বাংলার স্ত্রী-আচার’ নামের একটি বইতে এই স্ত্রী-আচারের নিয়মগুলি সঙ্কলিত করেছিলেন। ভূমিকাতে তিনি মন্তব্য করেছিলেন – “আমার অনেক কন্যাদায়গ্রস্ত আত্মীয়াও তাঁদের ভাবীকালের শুভকার্য সুসম্পন্নের সাহায্যকল্পে আমাকে এই সব আচারের কথা লিখে রাখতে অনুরোধ করেছেন। প্রত্নতত্বের গভীর গহনে পথ কেটে বের করবার ইচ্ছে বা ক্ষমতা আমার নেই। তবে বহুকালাবধি এই রকম একটা অস্পষ্ট ধারণা রয়েছে যে বাংলার স্ত্রী-আচার বেদ- বেদান্তের পূর্ব থেকে এ এদেশে প্রচলিত।”
এখন যে স্ত্রী-আচার গুলি প্রচলিত আছে সেগুলি ঠিক বেদ-বেদান্তের চেয়েও পুরোনো কিনা তার কোনো প্রমাণ অবশ্য পাওয়া যায় না। তবে এর মধ্যে আর্য এবং অনার্য সংস্কৃতি মিলে মিশে গেছে এমনটা অনেকেই মনে করেন।
মনুস্মৃতি রচিত হওয়ার সময় বা তার অনেক পরে স্মৃতিকার রঘুনন্দনের সময় তো এখন ধূসর অতীত। এমন উনিশ শতকে আমাদের সমাজে নারীদের যে শোচনীয় অবস্থান ছিল তার তুলনায় আমরা যে সময়ে এসে পৌঁছেছি সেই আমাদের সমাজে নারীর অবস্থানে যে আমূল পরিবর্তন হয়ে গেছে, তা সকলেই মেনে নেবেন। এখন আলোকপ্রাপ্ত পরিবারে নারী ও পুরুষ ঘরে ও বাইরে সব বিষয়েই সমান অংশীদারিত্ব দাবী করে। সমাজের নিম্নস্তরেও তার ঢেউ এসে লাগছে। আমাদের বিবাহবিধি যা ছিল প্রখর ভাবে পুরুষতান্ত্রিক তার পরিবর্তন দরকার কিনা তা ভেবে দেখবার সময় হয়ত এসেছে।
কিন্তু একটি বিয়ের ছোটো ছোটো লৌকিক আচারে পালনের মধ্যে থাকে নবদম্পতির জন্যে মঙ্গল কামনা, থাকে পূর্বপুরুষের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন, থাকে উৎসবের আনন্দে পাড়া পড়শি আত্মীয় স্বজনকে জড়িয়ে ফেলার অজুহাত, এবং থাকে কিছু ইঙ্গিতবহ কৌতুক এবং দুষ্টুমিও। সব মিলিয়ে থাকে দেশজ সংস্কৃতি এবং মাটির সঙ্গে জুড়ে থাকা এক ধরণের মাধুর্য্যের পরশ।
আধুনিকতার দর্পে এ সব হারিয়ে যেতে দেওয়াটাও খুব ভালো কাজ হবে বলে মনে হয় না। আজকের সমাজের বিন্যাসে এবং জীবন যাপনের শৈলীতে যে বিপুল বদল এসে গেছে সেটা মাথায় রেখে কি ভাবে বাঙালির বিবাহ উৎসবে সনাতন এবং আধুনিকতার মেলবন্ধন ঘটানো যেতে পারে তা নিয়ে ভাবনা চিন্তা শুরু করার বোধহয় সময় এসেছে।
[তথ্যঋণঃ
১। ভারতে বিবাহের ইতিহাস – ডঃ অতুল সুর
২। বাংলার স্ত্রী আচার – ইন্দিরা দেবী
৩। বাঙালী জীবনে রমণী – নীরদচন্দ্র চৌধুরী
৪। বিয়ের শব্দকোষ – হরিপদ ভৌমিক
৫। বাঙ্গালী জীবনে বিবাহ – শঙ্কর সেনগুপ্ত
চিত্রঋণঃ আন্তর্জাল]