“ধর্ম এব হতো হন্তি ধর্ম রক্ষতি রক্ষিতঃ।”
মহাভারত বন পর্ব!
অর্থাৎ , ধর্মকে তুমি রক্ষা করিলে, ধর্ম তোমাকে অবশ্যই রক্ষা করিবে ।
পক্ষান্তরে যদি তুমি ধর্ম হইতে বিচ্যুত হও, তবে ধর্মই তোমাকে নির্মমভাবে বিনাশ করিবে।
অতএব সর্বদা ধর্মের পথে বিরাজ।
যাহা ধারণ করে তাহাই ধর্ম। এক্ষণে প্রশ্ন জাগ্রত হয়, কী ধারণ করে? একক মানব চেতন হইতে, গোষ্ঠীবদ্ধ মনুষ্যজাতিকেও সভ্যতার প্রাচীনকাল হইতে ধারণ করিয়া রহিয়াছে ধর্ম। বিভিন্ন ধর্মের প্রবুদ্ধ মহামানবেরা পৃথিবীতে আসিয়াছেন, তাঁহাদের উপলব্ধির আলোতে জগতকে পথ দেখাইয়াছেন। সেই পথ অবলম্বন করিয়া মানুষ হাঁটিতে শুরু করিয়াছে, সৃষ্টি হইয়াছে বিবিধ দেবতা এবং তাঁর অর্চনা প্রণালী। এ সবই মানুষের হিত সাধনের উদ্দেশ্যে গঠিত। জটিল উপাচারে সংগঠিত ব্যবহারিক ধর্মাচারণের কর্মপদ্ধতি সভ্যতার উপর চাপিয়া বসিয়া গেল। ধর্মকে ধরিয়া, সভ্যতা তার চলনের রূপ পাইল। সেই ‘রূপ’-এ যুক্ত হইল বিশ্বাস, বিশ্বাসে ভক্তি এবং ভক্তিতে মুক্তি। ভক্তির সঙ্গে আরেকটি ভ যুক্ত হইল, ভয়! ধর্মাচারণের প্রক্রিয়াগত স্খলনের ভয়।
যে কোন সময়ে সমাজে বিভিন্ন স্তরবিন্যাস পরিলক্ষিত হয়। ধর্মাধর্মের অভিভাবক হইয়া একটি শ্রেণী আত্মপ্রকাশ করিলেন, ক্রমে তাঁহারাই ঈশ্বরের প্রতিভূরূপে পরিগণিত হন। কোন কোন সভ্যতায়, তাঁহারা সম্রাটের সমকক্ষ অথবা উচ্চস্থান অধিকার করিলেন।
ঈশ্বরের সহিত সমকালে অথবা সমস্থানে সাক্ষাৎ হওয়া, সাধারণ মানবকুলের অনুকূলে নাই। স্বর্গ নামক একটি অপার্থিব স্থান দেবতাদিগের বাসস্থানরূপে প্রচলিত হইল, এবং সেই স্থানে মৃত্যুর দ্বার পার করিয়াই পৌঁছাইবার একমাত্র উপায় বলিয়া স্বীকৃত হইল। অতএব, যিঁনি মৃত্যুর পর সেখানে গিয়া পৌঁছাইলেন, তাঁহার পক্ষে স্বীয় অভিজ্ঞতা অন্যান্য মানুষের সহিত ভাগ করিয়া লইবার উপায় রহিল না। অতএব সাধারণের জন্য ঈশ্বরের প্রতিভূদের বাণী স্বর্গপ্রাপ্তির একমাত্র সংবেদ হইয়া রহিল।
সভ্যতার অগ্রগতির সহিত শিক্ষার ডানায় নির্ভর করিয়া নিঃসন্দেহে মননের অগ্রগতি হইয়াছে। সে শিক্ষাও মূলতঃ ধর্ম-নির্ভর। অতঃপর মানুষ যুক্তি খুঁজিয়া পাইল। সৃষ্টি হইল যুক্তিনিষ্ঠ পঠন পদ্ধতি। সেই পথে হাঁটিয়া মহাবিশ্বের সব রহস্য এখনও এই যুক্তি নির্ভর অনুসন্ধানের করায়াত্ত হয় নাই। অতএব যে স্থানে যুক্তি পৌঁছাইতে পারিলনা, সেইস্থানে ভক্তিনির্ভর জ্ঞানের সহাবস্থান রহিয়া গেল। কখনও সরাসরি সংঘাতে লিপ্ত হইল এই যুক্তি নির্ভর অধুনিক পঠনের সহিত আবহমান কালের ভক্তিনির্ভর জ্ঞানচর্চা।
যেক্ষণে একদল মানুষ মঙ্গলে পাড়ি দিয়া মহাকাশ স্বর্গের অস্তিত্ব খুঁজিয়া না পাইয়া অনন্য এক সত্যে স্থির হইতেছে, সেক্ষণে কোটি কোটি মানবের দল একটি বিশেষ তিথি নক্ষত্র নির্ভর স্নানের কারণে পৃথ্বীলোকের একটি বিশেষ স্থানে জমায়েত হইতেছেন। মাহেন্দ্রযোগের পূর্বে উপস্থিত হইয়া, অমানুষিক পথশ্রমে যখন সহস্রাধিক মানুষ দুদন্ড নিদ্রামগ্ন হন, ঠিক তখন আরও কয়েক লক্ষ মানুষ সেই একই কারণে স্নানযাত্রার উদ্দেশ্যে সেই ঘুমন্ত মানুষদের ওপর দিয়া অনায়াসে হাঁটিয়া যাইতে বাধ্য হন। হতভাগ্য নিদ্রিত তীর্থযাত্রীরা সামাজিক কীট পিপীলিকাবৎ পদপিষ্ঠ হইয়া প্রাণ ত্যাগ করেন। ধর্মালোকিত মানুষ বলিবেন ইহাতে স্বর্গারোহণের পথ প্রশস্ত হইল। মৃত্যু দ্বার পার হইয়া মানুষের অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করিবার সুযোগ নাই। অতএব সার সত্য মানিয়া লওয়া ব্যতীত উপায় নাই।

ধর্মাচারণের এহেন রক্তস্নাত প্রক্রিয়া সর্বকালে সর্বপ্রান্তে পরিলক্ষিত হয়। ধারণ করিয়া রহিয়াছে বলিয়াই যেন সে হইয়া ওঠে অনায়াস এবং অবধারিত। ইতিহাসের পৃষ্ঠাকে অস্বীকার করিবার হাতিয়াররূপে অস্ত্র ব্যবহার করিতে তাঁহার মগজকম্পন অনুভূত হয়না। প্রাচীন বামিয়ান সৌধ হউক কি অদূরবর্তী ৩২ নম্বর ধানমন্ডীর দালান হউক। ধর্মাচারণের আচ্ছাদনে আবৃত থাকে মানুষের বোধ বুদ্ধি আবেগ। একই সঙ্গে এমন মানুষের দর্শন পাওয়াও দুর্লভ নয়, যিনি স্বাচ্ছন্দ্য ও সুনিরাপত্তার প্রচলিত অভ্যাস অবহেলা করে, ধর্মাচারণের সেই অনায়াস এবং অবধারিত পথকে বাছিয়া লইতে দ্বিধা করেন না। বর্তমানকালের সামাজিক মাধ্যমে বিখ্যাত আইআইটি-বাবা হইতে কপিলাবস্তুর রাজকুমার ভোগ হইতে ত্যাগের জীবনের উৎকর্ষতাকেই নির্দেশ করেন।
মুক্তির আশায় কোটি কোটি নরনারী অন্যের রক্তের আশ্রয়ে, বোধের বিসর্জন দিতে কুন্ঠা বোধ করেন নাই। প্রকৃতিতে কত প্রজাতির প্রাণী রহিয়াছে, তাহাদের মধ্যে বোধকরি মানুষই অন্য মানুষকে দ্বিধাহীন ভাবে হত্যা করিতে পারে। একটি নেকড়ে অন্য নেকড়েকে আক্রমণ করিলেও নির্মূল করিতে হয়তো বাধাপ্রাপ্ত হয়, কারণ এই আক্রমণে প্রজাতি ধ্বংস হইবার সম্ভবনা লুক্কায়িত থাকে। পৃথিবীর বুকে এতটা পথ হাঁটিয়া মানুষ অদ্যাবধি সেই সত্যটি অনুধাবন করিতে পারে নাই।
অভিধান, ধর্মের আরও অনেক অর্থের সন্ধান দেয়। দ্বিতীয় প্রয়োজনীয় অর্থটি হইল, প্রাণী বা বস্তুর সেই গুণাবলী, যাহা হইতে বিচ্যুত হইলে, সেই প্রাণী বা বস্তুর মৌলিক পরিচিতির বিনাশ হয়। যেমন তরলের ধর্ম পাত্রের আকার ধারণ করা, সেই তরল যখন চাপে বা তাপের কারণে অন্য আকৃতি প্রাপ্ত হয়, সে তখন কঠিন বা বায়বীয় হইয়া যায়। জল তরলরূপ ত্যাগ করিয়া, বরফ তথা বাষ্পরূপ ধারণ করে। ‘সত্য এবং ন্যায়ের পথ’ যদি ধর্মের একটি প্রধান গুণাবলী হয়, সত্য লঙ্ঘিত হইয়া তাহা সত্যের আকারে পরিবর্তন হয়না, মানুষটির ধর্ম রূপান্তরিত হয়। যেমন মাধ্যাকর্ষণ শক্তির ধর্ম তাহার কেন্দ্রের দিকে টানিয়া আনে, বৃক্ষ হইতে পতিত হইয়া মস্তকটি ফাটিয়া যায়, মাধ্যাকর্ষণের পরিবর্তন হয় না। একই রূপে রক্ষক পরিবর্তিত হইয়া যায় ভক্ষকে। উহার বহিরঙ্গের আকৃতি হস্তপদচক্ষুমস্তক থাকিলেও অন্তরে কোন মতে আর মনুষ্যপদবাচ্য থাকিতে পারেন না।


রবিচক্র অনলাইন আপনাদের কেমন লাগছে? নিচের ঠিকানায় লিখে জানান। ইমেল-ও করতে পারেন। চিঠি অথবা ইমেল-এর সঙ্গে নাম, ঠিকানা এবং ফোন নম্বর থাকা বাঞ্ছনীয়।
রবিচক্র
‘প্রভাসতীর্থ’, ৭৬ ইলিয়াস রোড, আগরপাড়া, কলকাতা – ৭০০০৫৮, ভারত
editor@robichakro.com
খুব সময়োপযোগী লেখা। জাতের নামে বজ্জাতি, ধর্মের নামে অধর্ম এখন এমনই স্বাভাবিক এবং সংক্রামক হয়ে উঠেছে যে মুষ্টিমেয় যুক্তিনির্ভর মানুষের টিকে থাকা এখন কঠিন হয়ে উঠেছে। দেশ বিদেশের তাবড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী কৃতী বন্ধুদের যখন পূণ্যসঞ্চয়ের অভিলাষে ঐ নোংরা দূষিত জলে ডুব দিতে দেখি, তখন যারপরনাই হতাশ লাগে।শিক্ষার অভাবে অন্ধবিশ্বাস আঁকড়ে থাকা দেহাতি মানুষদের সাথে তাদের কোন তফাৎ দেখতে পাইনা।
যুগ যুগ ধরে এই বৈপরীত্য সমাজে পরিকল্পিত ভাবে জিইয়ে রাখা রয়েছে।