শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

সকালের রিকিঝিকি রোদ্দুর এসে পড়েছে মুখে রূপমতীর। লম্বা চোটির শেষে হরে-গুলাবি পারান্ধি দুলিয়ে এঁকে বেঁকে মেয়েটি চলেছে কুঁয়া থেকে পানি আনতে। তার সবুজ চোখদুটিতে পান্নার ঝিলিক লক্ষ্য করে বুড়ি যুগ্নি। এই এক ছোড়ি, তরোয়ালের ফলার মত। মনে মনে নিজের যৌবনে ফিরে যায় যুগ্নি, সেই তুরতুর ছুটে চলা, ঝুমঝুম ছোটবেলার মাইলের পর মাইল বালিয়ারী পেরোনো দিনগুলিতে। সাথে চলেছে যুগ্নির নিজস্ব উট শহরা আর তার আগে পর পর উটের সারি, ক্যারাভান। বানজারানদের ক্যারাভান চলেছে মরুভূমির এই প্রান্ত থেকে ওই প্রান্তে। সাথে যাচ্ছে বুড়া বুড়ি নানী দাদী দাদা ছেলে বউ ভাই বোন সবাই। সবাই এই যাত্রায় সামিল, যতদিন তারা এই যাযাবরের দলে থাকবে। আবার কখনও অন্য দলে সামিল হয়ে গেলে, চলতে থাকবে তাদের সাথে।
চলবেই। চরৈবেতি। এই চলার নাম জীবন। এ চলার শেষ নেই।

এখনো চলে বুড়ি যুগ্নি, লাঠিতে ভর দিয়ে । ওর জিনিসপত্র সাথে নেয় রূপমতী, কিম্বা ওর ভাই ভোগলু । টুকুর মুকুর পা ফেলে বুড়ি যোধপুরী চপ্পল পায়ে দিয়ে । তপ্ত বালুকা পায়ের তলায় ছ্যাঁকা লাগাতে থাকে । হঠাৎ কি ও!! পায়ের কাছ দিয়ে সরাৎ করে লাফিয়ে যায়। মুহূর্তে ক্ষিপ্র বেগে এক হাতে ওর গলা ধরে নেয় ভোগলু, বিষ খোপড়া, এক কামড়েই মৃত্যু কিন্তু কামড় বসাতে পারলে তবে তো? বজ্রমুঠিতে আটকা পড়েছে বিষ খোপড়ার মাথা। এখন বাবাজীর মুখ নড়বে না তিলার্ধ, কিন্তু দেহ ঝাপটাচ্ছে দেখো, ঝটপট ঝটপট বাড়ি দিচ্ছে ভোগলুর গায়ে হাতে যেখানে সেখানে সর্বাঙ্গে। ভোগলু ছাড়বে না কিছুতেই। সাদা ফেনার বুদবুদ বেরোতে থাকে তার মুখ দিয়ে, যেমন চিনে ড্রাগনের মুখ থেকে বেরোয় আগুন। আর রাগে বর্ণময় ওই বুনো গিরগিটির চোখ দুটি।

ইতিমধ্যে দলের সবাই এসে গেছে, রশি দিয়ে আটকে দিয়েছে ওই বুনো দানবের গলা । ব্যস, এইবার আস্তে আস্তে পোষ মেনে যাবে ও । যাযাবররা ওকে পোষ মানবার মন্তর পড়তে থাকে কিন্তু বুড়ি যুগ্নি জানে পোষ মানাবে আসলে গলার রশি আর খাবার, আর মানুষের স্নেহময় পরশ । স্নেহ যে কি ভীষণ বস্তু যুগ্নি বুড়ি জেনে গেছে জীবনের এই আশিটা বছর ধরে । এখন তাই কাউকে কোনো কাজ করাতে হলে, গায়ে হাত রাখে তার । শীর্ণ, খড়ি ওঠা, শির বের করা এক অশীতিপর হাত । আর কাজ হয়ে যায় । বিষ খোপড়া এতক্ষণে ঝটপট থামিয়ে নত হয়ে শুয়ে পড়েছে । ওকে বড় ঝুড়িতে তুলে নেয় মাধ্ভি । আর চলতে থাকে ওকে মাথায় নিয়ে । টং লং ঠং ঠং চলতে থাকে ওরা, উটের ঘন্টা, যাযাবরীদের হরেক রঙের মিছিল, ক্যারাভান এর রংবিরঙ্গী মিছিল বালিয়ারী আলো করে রঙের মশাল জ্বালিয়ে চলতেই থাকে । দূরে মরুদ্যান চোখে পড়ে । দিপদাপ করে আলো জ্বলে যেন । কে জানে ওখানে আগে ভাগে কোনো যাযাবরের দল পৌঁছেছে কি না । সন্ধ্যে নেমে আসে, জাড়া আরও বাড়তে থাকে । সর্দার গোঁফ চুমড়িয়ে হুকুম করেন । ওইখানেই চল । পায়ে পায়ে এগিয়ে যায় ঝিলমিলে মানুষ পশু, যুগ্নি, ভোগলু, রূপমতী, মাধ্ভি সব্বাই । কাছে এসে দেখে আলেয়ার আলো !! আর কোথায় মরুদ্যান …. সব ভেলকি, সব ফাঁকি ।

আবার চলা । যাযাবরের জীবন, থামা নেই …

এইসব কথাই বসে বসে ভাবে বুড়ি যুগ্নি । এই মেয়েটাকে চোখের সামনে জন্মাতে দেখেছে ও । ওই বুড়ি যুগ্নি কত তেলমালিশ করেছে ওর মাকে, এই বাচ্চাকে । তবে না আজ ঐরকম শক্ত সমর্থ হয়ে উঠেছে । ওর হাতের রোটি যে খাবে সে ভুলতে পারবে না, এত কাজের ওই মেয়ে । আর কি মিষ্টি কথাবার্তা । বড় ভালো নাচে রূপমতী । যাযাবরদের খালবেলিয়া নাচে ওর জুড়ি খুঁজে আন তো দেখি । গর্বের চোখে তাকায় বুড়ি । ওর নাকে কানে এত এত মাকড়ি, নথনী , কান কেটে ঝুলে গেছে, রোদ্দুর পড়ে চিকচিকায় যখন, বেশ লাগে । রূপমতী ওকে দূর থেকে দেখে হাসে ।
আজ বিহানে এস বুড়ি মায়ী, আমার নাচ আছে । সাহেবরা দেখতে আসবে গো।’
চোখ চকচক করে ওঠে যুগ্নির, ‘আররেরে বিটিয়া? সাহাব? কুন সা? আম্রিকান?’
‘হ্যাঁ গো হ্যাঁ, খলখল করে হাসে রূপমতী, ও হি … কাল যো আয়ে থে।
বাবাকে অনেক টাকা দেবে বলেছে । বাবা ভোজ দেবে নাচের পর ।’
‘তাই নাকি? তা বুড়ি কে নাচতে নিবি তো?’ হাসে যুগ্নি, খিক খিক করে, চোখ মটকে।
অনেক বছর আগের এক নাচের আসর মনে পড়ায়, যেখানে সুরজ্লাল ওকে বিয়া করতে চান।
শরম কি বাত, এখনো গাল রক্তিম হয় সে কথা মনে করে…

ভাঙা গালে বেলাশেষে সূর্য্যটা লালিমা রেখে যায়। ঔখল দিয়ে মশলা গুঁড়িয়ে রাখে রূপমতীর মা বাননো আর সেই মশলা হাত দিয়ে এপাশ ওপাশ করে দেয় বুড়ি যুগ্নি, সাত সতেরো ভাবতে ভাবতে। আজ হঠাৎ এত্ত দিন পর সুরজ্লাল মনে এলো কেন। খাল্বেলিয়া নাচের আসর থেকে উঠিয়ে নিয়ে গিয়েছিল সুরজ যুগ্নিকে। শাদি করে নিয়েছিল যুগ্নির মায়ের অমতে। কিন্তু এক বরষের মধ্যেই গেহান কেটেছিল সুরজলালকে। আর রাতের অন্ধকার নেমেছিল যুগ্নির জীবনেও। তার পর থেকে আর নাচেনি যুগ্নি । আর কোনো পুরুষের চোখে চোখ রাখেনি সে। যাযাবরী যুগ্নির সারাটা জীবন শুধু এক মরদের জন্য আঁধার হয়ে গিয়েছিল জীবনের মত। টস টস চোখের জল পড়ে যুগ্নির আর বাননো বুঝতে পারে …. এখন বুড়ি যুগ্নি তিন দিন এমন কষ্টে থাকবে।
তবু সেদিন নীরবে গায়ে পায়ে তেল মাখায় রূপমতীকে যুগ্নি বুড়ি । ওর সাধের উড়নি বের করে দেয় কোন ঝোলা থেকে । তাঁবুর কোন অন্দর থেকে এনে দেয় সুর্মা, এঁকে দেয় তাঁর চোখে বিলোল কটাক্ষ । ঠোঁটে রং দিয়ে আরো দীর্ঘ করে দেয় তার কমলকলির কোরকগুলি। কাঁপা হাতে চোটি বানাতে বসে তারপর, চোলির লটকন আর ঘাঘরীর ঘের সাজিয়ে দেয় ঠিকমত । এইবার তৈরী সে খালবেলিয়া নাচের আসরে যাবার জন্য । রূপমতীর নজর উতরে, আশীর্বাদ করে, মা বাননো, যুগ্নি মায়ী, আর এক ছুটে বেরিয়ে যায় রূপমতী সেই খালবেলিয়া নাচের আসরের উদ্দেশ্যে ।
সেই রাত এক আশ্চর্য রাত । বড় মায়াবী রাত সে । আকাশে তারা নেই, শুধু এক ঘুমঘুমে বুড়ি চাঁদ আছে পাহারায় । রূপমতীর নাচ দেখবে বলে জেগে । মরুভূমি রাত, বেশ ঠান্ডা এখন তাই মশাল জ্বলেছে বড় বড় । মশালের আলোয় বিচিত্র মরুভূমির পতঙ্গ এসে পুড়ে মরছে । দুরে মকমক শোনা যায় । কোনো কেউটে হয়ত এক মোটা কোলাব্যাঙ গিলে চুপ করে আছে । খালবেলিয়া শিল্পীরা এক এক করে নাচ দেখিয়ে যাচ্ছে, ছেলে ও মেয়ে উভয়েই। এর পরই শো স্টপার রূপমতীর নৃত্য।

সাহেব মেমরা নড়ে চড়ে বসছেন । এখানের এটাই পর্যটক আকর্ষণ, এই খালবেলিয়া নৃত্য, যার স্টার ডান্সার রূপমতী । রূপমতী নাচতে থাকে । তার দেহবল্লরী কেঁপে কেঁপে ওঠে শিঙা ও বাঁশির সুরে । বড় ঢাক বাজে । মুহূর্তের মধ্যে তার পা মাটিতে পড়তে দেখা যায় না । সবুজ চোখে আগুন ঠিকরে ওঠে নর্তকীর, ব্যালে নাচের থেকেও ক্ষিপ্র ভঙ্গিতে দেহ ঘোরে । লাস্যে, বিভঙ্গে, মাধুর্য্যে, ঊরগ, পন্নগের মতই এগোতে থাকে রূপমতী, এদিক থেকে ওদিক । তার মুখ দিয়ে বেরোতে থাকে হিস হিস শব্দ, তার জিহ্বা বিভক্ত হয়ে যেতে থাকে চোখের নিমেষেই ওকি … কে ও ……… কে ওই মায়াবিনী প্রশ্ন জাগে সব্বার মনে, সাহেব মেমও সচকিত । ‘ও মাই গড, শি মাস্ট বি এন ইলিউশনিস্ট!!’ যতক্ষণে এক মায়াজাল কাটে অন্য এক মায়াজাল সৃষ্ট হয় চোখের সামনে । চিনের ড্রাগন যেন কেশর ফুলিয়ে এগিয়ে আসছে তাদের দিকেই । অথচ আগুন রঙা ঘাঘরী চোলি পরা যে অসামান্যা নারীটি আজ মঞ্চ কাঁপাচ্ছে, সে যে আমাদের সেই চেনা রূপমতী বিটিয়া । ওই তো কুঁয়া থেকে জল তোলে, মায়ের হাতে হাতে মশলা করে, রোটি পাকায়, উটদের স্নান করায়, যত্ন করে পড়শন যাযাবরদের । সাহেবদের কাছে যে গার্ল নেক্সট ডোর ! তবে কে কে ওই মায়াময়ী, ছলনাময়ে মায়াদেবী? এমন সব প্রশ্নের ওঠা পড়া হতে হতেই, নাচ শেষ আর মুহুর্তের মধ্যে ছুটে বেরিয়ে যায় রূপমতী, ওদের তাঁবুর দিকে, যে ভাবে এসেছিল ঠিক সেই ভাবেই । হাততালির লহর বয়ে যায় । টাকা ছুঁড়ে দেন সাহেব মেমরা উল্লসিত হয়ে মঞ্চের উদ্দেশ্যে । এই একটা ব্যাপার তারা আয়ত্ত করেছে এ দেশে এসে। সেই টাকার মালা গলায় পরে একটু রাত করে বাড়ি ফেরে শরাবী বাপ । তখন রূপমতী গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন । স্বপ্ন দেখে ওর সাথে এক বিষ খোপড়ার “তকড়ার” হচ্ছে আর সেই লড়াইতে মেরে ফেলেছে ও ওই দানবটাকে । ভোগলু পাশের বিছানায় শুয়ে স্বপ্ন দেখে হেসে ওঠে । “রুপিয়া রুপিয়া” বলে চেঁচিয়ে ওঠে ভোগলু । রূপমতী ওকে নাড়িয়ে দেয়, বলে ‘ধুর বুরবক, স্বপ্নের টাকা কি কখনও সত্যি হয় নাকি রে ।’

কিছুদিন হলো খুব অশান্তিতে আছে বুড়ি যুগ্নি। এই যাযাবরের দলে একজন মানুষ এসে জুটেছে। মনে হয় ফিরঙ্গী, কিন্তু রং তামাটে রোদ্দুরে পুড়ে পুড়ে। লোকটার চাহনি ভালো লাগেনা যুগ্নির। আর লোকটা আড়াল আবডাল থেকে লক্ষ্য রাখে রূপমতীর উপর। যাযাবর হলেও, ওদের মান সম্মান আছে। দলের কোনো মেয়েকে ঐভাবে দেখা, কাছে চাওয়া অন্যায়। সর্দার জানলে অনর্থ হবে। আর রূপমতীর বাপ জানলে তো আর রক্ষে থাকবে না। যুগ্নির মনে হয় এক বার সাবধান করে দেয় রূপমতীকে আবার কি ভেবে চুপ করে থাকে বুড়ি।
লোকটা নাকি কোবরা ধরতে পারে। শুনেছে বুড়ি। তাতেই আরও ভয় পেয়েছে ও। এক বিশেষ কারণে।

সেই রাতটা এক ভয়ানক রাত। বুড়ি যুগ্নি, ভোগলু আর রূপমতীর তাঁবুতেই থাকে রাতে। সেই রাতে ভোগলুর জ্বর, ও মা-বাপের কাছে শুয়েছে। রূপ ঘুমিয়ে মরেছে। মরা চাঁদের আলোয় ওর মুখ দেখাচ্ছে বড় নিষ্পাপ। বুড়ি চুপ করে শুয়ে আছে, ওর ঘুম নেই, ভোরের দিকে যখন হিরণ, মোরগ, ময়ুর ডাকে, তখন ওর ঘুম আসে। এমন সময় খর খর শব্দ। যেন সেই বিষ খোপরা মাধ্ভির ঝুড়ি থেকে বেরিয়ে আসছে। বুড়ি উত্কর্ণ হয়ে থাকে। তাঁবু ফাঁক হলো, বুড়ি চেঁচিয়ে ওঠার আগেই বুড়ির মুখ চেপে ধরে ফিরঙ্গী। এই তবে বিষ খোপড়া? বুড়ি অনেক চেষ্টা করেও মুখ খুলতে পারে না। এক হাতে বুড়ির মুখ চেপে ধরে, অন্য হাত দিয়ে স্পর্শ করে রূপমতীকে সেই আগন্তুক। আর অচানক বুড়ি দেখে এক অদ্ভুত কান্ড। রূপমতীর ঠোঁট স্পর্শ করে ফিরঙ্গী আর মুহূর্তে ঘটে যায় এক অশ্রুতপূর্ব ঘটনা। রূপমতী নয়, এক কালো কোবরা আর বিষ খোপড়ার লড়াই চলতে থাকে তাঁবুর ভেতর। বুড়ি নীরব দর্শক, সে চলত্শক্তিহীন, নির্বাক। শেষ কোপে বিষ খোপড়া ওরফে ফিরঙ্গীকে চূর্ণ বিচূর্ণ করে কোবরা ফের বনে যায় রূপমতী। বিছানায় ঢলে পড়ে কোনমতে। আর বুড়ি যুগ্নি এই অদ্ভূত দৃশ্যের একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে থাকে। কাক পক্ষী জানতে পায় না এ ঘটনার কথা। পরদিন আবার কুঁয়ার পারে বসে থাকে যুগ্নি। দূর থেকে আসে হেলে দুলে রূপমতী, বালতি ভরতে। আর ফিক ফিক করে হাসে বুড়ি যুগ্নির দিকে তাকিয়ে।
ওদিকে মাধ্ভি সকাল থেকে চেঁচামেচি লাগিয়েছে। কে তার পোষা দানবটিকে মেরে দিয়েছে কাল। আজ রূপমতীদের তাঁবুর বাইরে নাকি পাওয়া গেছে তাকে।

[লেখকের অন্য রচনা]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x