শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

বাংলায় একটা শব্দ আছে, প্রাতঃস্মরণীয়। এমন শব্দবন্ধ অন্য ভাষায় একই ব্যঞ্জনায় আছে কিনা জানা নেই।

‘শব্দ’-এর ব্যবহারের সঙ্গে, সেই ভাষাভাষী নাগরিক চরিত্র সুস্পষ্ট হয়। একসময় বাঙালির নিশ্চয়ই দৃঢ় বিশ্বাস ছিল; এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের কথা সকাল সকাল স্মরণ করলে, দিন ভাল কাটে। ঘরের দেওয়ালে এই সেদিন পর্যন্ত এই সব যুগন্ধর ব্যক্তিত্বর ছবি টাঙানো থাকত, যেন ঘুম ভেঙে উঠেই তাঁদের দর্শন হয়।

জানুয়ারি মাসে তেমনই দুজন যুগপুরুষের জন্মদিন, স্বামী বিবেকানন্দ এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্র। আজ ভাবতে অবাক লাগে, আমাদের মতই, এই শহরে তাঁরা হেঁটে চলে অর্জন করেছেন এক অসাধারণ জীবন।

মহাকালের নিরিখে মানব জীবন ক্ষণস্থায়ী। সেই সীমিত পরিসরের উপস্থিতি কীভাবে কালোত্তীর্ণ হয়, এই মনীষীদের কাজের দিকে তাকালেই বুঝতে পারা যায়। বাঙালি মননে সর্বত্যাগী সন্ন্যাসীর যে সাধারণ রূপ, তাকে এক অনন্য দৃঢ় বলিষ্ঠ পরিচয়ে প্রতিষ্ঠা করলেন ‘বীর সেনাপতি বিবেকানন্দ’। একই রকমভাবে একজন রাজনীতিবিদ, যোদ্ধৃবেশে শোভিত নেতাজি সুভাষ; বাঙালির নরম সরম বুদ্ধিজীবী ভাবমূর্তিকে নতুন করে নির্মাণ করলেন। দুজন দুই পথের দিশারী। একজনের আধ্যাত্মিক মার্গ, আর অন্যজন রাজনীতি, কিন্তু একটি জায়গাতে দুজনের পথ মিলে যায়, তা হল মাতৃভূমির জন্য অকৃত্রিম ভালবাসা। দুজনেই নতুন ভারতের স্বপ্ন দেখেছেন। সেই ভারতে ভেদাভেদ নেই, পারস্পরিক হিংসা নেই, আছে শুধু সহযোগিতার কল্যাণময় উদ্যোগ এবং সেই স্বপ্ন সাকার করার লক্ষ্যে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন।

সমালোচনা, কটূকথা বা অপমানের কাঁটার মুকুট জীবদ্দশায় তাঁদেরও পরতে হয়েছিল। অথচ অবিচল ছিল তাঁদের অনুধ্যান, ভারতবাসীর জন্য প্রেম।

আজ যখন বাঙালি-মস্তিষ্ক ক্রম-অবনমনের শিকার, পশ্চিমবঙ্গে অথবা বাংলাদেশে, সর্বত্র একের পর এক দুরারোগ্য ব্যাধির মতো একেকটি কলঙ্কিত ঘটনায় তা ফুটে বের হচ্ছে। তখন খুব বেশি করে প্রয়োজন এই দুই মানুষের জীবন চর্চা আর বোধের অনুসন্ধান করা। আধুনিক আবাসের গৃহসজ্জায় মনীষীদের ছবি টাঙানো আজকাল খুব একটা প্রচলিত নয়। হয়তো বছরের একটা দিনের জন্য তাঁদের প্রতিকৃতিতে মালা দিয়ে, কিম্বা শোভাযাত্রা করে নিজেদের কর্তব্য সমাধা করি। পাড়ায় পাড়ায় পাঠাগার বা পাঠচক্র আজ লুপ্ত। বেসরকারি বিদ্যালয়গুলো শুধু নম্বর পাওয়ার কারখানায় পর্যবসিত। ‘এডুকেশন ইন্ডাস্ট্রি’ আজ একটি মুনাফা রোজগারের পথ। পশ্চিমবঙ্গের সরকারি বিদ্যালয় নিয়ে খুব বেশি বলার অবকাশ আর নেই। ধারাবাহিক অশিক্ষা আর কুশিক্ষার, স্বাভাবিক পরিণতির প্রতিচ্ছবি আজ বাঙালির সর্বদেহে।
কুম্ভীলক বৃত্তিকে কর্মসংস্থানের উপায় হিসেবে সামাজিক স্বীকৃতি, আজ যেন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এখন কেউই কিছুতে চমকে যাই না, আর পাঁচটা সৎ পেশার মতই ‘মহাবিদ্যা’-টিতে অবধারিত অর্থ যশ প্রতিপত্তি সমানভাবে কাঙ্খিত। গণমাধ্যমে, রাস্তার হোর্ডিংএ কিম্বা সমাজমাধ্যমে, প্রতিদিন বাঙালির মননের এই দীনতার সগর্ব বিজ্ঞাপন, ক্রমে এক ভয়ঙ্কর পূতিগন্ধময় আবর্জনার ভবিষ্যতকেই নির্দেশ করে।


সমগ্র বাঙালিকে যেন এক মেরুদন্ডহীন ক্লীব জাতি হিসেবে রূপান্তরিত করে ফেলেছে। যদি নিজেদের হৃতগৌরব পুনরুদ্ধার করতে চাই, কম্পিউটার অথবা মোবাইলের ‘রিসাইকেল বিন’-এর মতো, আমাদের সামাজিক তথ্যভান্ডারে ক্রমক্ষীয়মান হয়ে এখনও এই দুই মনীষীর আদর্শ উপদেশ রয়েছে। একটা গোটা জাতিকে বর্জ্যপদার্থে পরিণত হওয়ার কিনারা থেকে উদ্ধার করতে প্রয়োজন সেই ‘রিসাইকেল বিন রেস্টোর’ করা। এছাড়া অন্য কোন পথ নেই। মহাজনেরা ইতিমধ্যেই দেখিয়ে গিয়েছেন। দৈনন্দিন প্রাত্যহিকীতে আগামী প্রজন্মকে সেই পথের খোঁজ দিতে হবে। নতুন ভারত বেরবে সেই নতুনের হাত ধরেই। বর্তমান প্রজন্মের ওপর খুব বেশি আশা করা বৃথা। আমাদের ‘কাজের বহর’, ইতোমধ্যেই ইতিহাস আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করতে প্রস্তুত। তাই কিশলয় স্তরে শুরু করতে হবে নেতাজি আর স্বামীজির চর্চা, তবেই ভবিষ্যতকে সুরক্ষিত আর উজ্জ্বল করে গড়ে তুলতে পারব।

এই দুই মহীরুহসম বঙ্গসন্তানের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য রূপে রবিচক্রের পাতায় এই সংখ্যাটি নিবেদিত।

[ছবি- আন্তর্জাল]

রবিচক্র অনলাইন আপনাদের কেমন লাগছে? নিচের ঠিকানায় লিখে জানান। ইমেল-ও করতে পারেন। চিঠি অথবা ইমেল-এর সঙ্গে নাম, ঠিকানা এবং ফোন নম্বর থাকা বাঞ্ছনীয়।

রবিচক্র
‘প্রভাসতীর্থ’, ৭৬ ইলিয়াস রোড, আগরপাড়া, কলকাতা – ৭০০০৫৮, ভারত

editor@robichakro.com

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
2 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Himadri Kumar Das Gupta
Himadri Kumar Das Gupta
2 months ago

যথার্থ শ্রদ্ধার্ঘ্য

SulataBhattacharyasulata
SulataBhattacharyasulata
2 months ago

কোন্ পুণ্যের ফলে বাংলার মাটিতে দুই যুগপুরুষের আবির্ভাব জানিনা। সেই পুণ্য ভুমি আজ প্রকৃত অর্থেই ব্রাত্যজনের অর্থ সর্বস্ব মানসিকতার শিকার। শিক্ষা স্বাস্থ্য
সংস্কৃতির এমন অবনমন সত্ত্বেও মানুষ এখনও চিন্তারহিত।

2
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x