সব জাতিরই নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য থাকে, যেগুলো অপর একটি জাতির থেকে তাকে পৃথক করে চিনিয়ে দেয়। এই বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে যখন সেই জাতির মানুষ দীর্ঘ সময়কাল ধরে সচেতন থাকে, সশ্রদ্ধ থেকে তাকে লালন করে, তখন জন্ম হয় একটি সমৃদ্ধ জাতিসত্তার। অনেক সময় সেই জাতিসত্তায় বা জাতি-বৈশিষ্ট্যে কিছু পরিবর্তন আনে কালের প্রবাহ। ফলে প্রত্যেক প্রজন্মের হাত ধরে একটু একটু করে হয়তো কিছুটা বদলাতে থাকে জাতি-চরিত্র, কিন্তু জাতির মূল বৈশিষ্ট্যগুলি মোটামুটি একই থেকে যায়। থাকাটা বোধহয় কাঙ্খিতও বটে। বাঙালিজীবন ও সংস্কৃতিতেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি।
যে বিশেষ বৈশিষ্ট্যটি বাঙালিকে জাতি হিসেবে বিগত প্রায় দুটি শতক ধরে মর্যাদা দিয়ে এসেছিল, তা হলো তার সংস্কৃতিচেতনা। ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি ভালবাসা, সঙ্গীত, নাটক, চলচ্চিত্র, শিল্পকলা, বিজ্ঞানচর্চার প্রতি অনুরাগ ও আগ্রহ, নিত্য নূতন ভাবনার ও সৃষ্টিশীলতার উন্মেষে যে জীবনপ্রবাহ, তাকে যাপন-প্রক্রিয়া করে তোলা বাঙালিকে সম্ভ্রমের আসনে বসিয়েছিল। শুধু দেশের ভিন্ন প্রদেশবাসীদের কাছে নয়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও বাঙালি মনীষা ও তাঁদের সৃষ্টিকর্ম স্বীকৃতি ও সম্মানের আসনে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল বাঙালির এই চরিত্র-বৈশিষ্ট্য।
এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে, সংস্কৃতি, যা কোনো জাতি-চরিত্র গঠন করে বা তার ওপরে প্রভাব বিস্তার করে, সেটি আসলে ঠিক কি? এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে, ‘লোকভাষা লোকসংস্কৃতি’ গ্রন্থে করা অধ্যাপক পবিত্র সরকারের একটি উক্তি। সেখানে তিনি বলছেন – ‘মানুষ আসার আগে পৃথিবী যে অবস্থায় ছিল, আর মানুষ আসার পর পৃথিবী যে অবস্থায় দাঁড়াল – এ দু’য়ের তফাৎ হলো সংস্কৃতি, বাকিটা হলো ‘প্রকৃতি’।’ অন্যদিকে অভিধানে সংস্কৃতি শব্দটির অতিরিক্ত আর একটি অর্থ পাওয়া যায়। তা হলো ‘সভ্যতাজনিত উৎকর্ষ’।
বিদগ্ধ বাঙালি তো বটেই, রুচিশীল সাধারণ বাঙালিও এই সংজ্ঞা বা দর্শনকে মনে প্রাণে গ্রহণ করেছে, মান্যতা দিয়েছে। এমন কি, পাড়াগাঁয়ের তথাকথিত অশিক্ষিত বাঙালিও এই ভাবনা বা বোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকেছে। মাঠে ঘাটে খেটে খাওয়া মানুষগুলোও অবসর সময়ে তাদের মতো করে সংস্কৃতি-চর্চা করেছে, জীবনকে উদযাপিত করেছে। লোকগানে, কীর্তনে, বাউল গানে, কথকতায়, কবিগানে, যাত্রাপালায় এই উদযাপনের প্রতিফলন দেখা গেছে স্মরণাতীত কাল থেকে।
এ তো গেল ফেলে আসা সময়ের গল্প।

বাস্তববোধসম্পন্ন মানুষ মাত্রেই জানেন যে পরিবর্তন মানব সভ্যতার মূল চালিকাশক্তি। সেটিকে অস্বীকার করার অর্থ বাস্তবতার অস্বীকৃতি। বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও চিন্তাশীল প্রাবন্ধিক গোপাল হালদার তার ‘সংস্কৃতির রূপান্তর’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘মানুষের জীবন-সংগ্রামের বা প্রকৃতির ওপর অধিকার বিস্তারের মোট প্রচেষ্টাই হচ্ছে সংস্কৃতি …. জীবিকার প্রয়াসে মানুষ যেমন অগ্রসর হয় সংস্কৃতিরও তেমনই পরিবর্ধন ঘটে, পরিমার্জনও হয়, অর্থাৎ তার পরিবর্তন চলে।’
সুতরাং সময়ের প্রবাহে পর্বে পর্বে নতুন প্রজন্মের হাত ধরে বা সমাজ-বিবর্তনের মাধ্যমে একটি জাতিচরিত্রে কিছু কিছু পরিবর্তন আসা স্বতঃসিদ্ধ। কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। আকস্মিক এই পরিবর্তনের স্রোতটা যদি হুড়মুড় করে ঘাড়ের ওপর এসে আছড়ে পড়ে জাতির মনন, বুদ্ধিবৃত্তি, চেতনা ও সংবেদকে আঘাত করে নতুন একটা জাতিচরিত্র সৃষ্টি করার চেষ্টা করে, গোল বাঁধে তখনই। গোল বাঁধে তখনই, যখন সচেতন মানুষের বৌদ্ধিক চেতনা আক্রান্ত হয়, যখন যা কিছু পুরোনো তাকে তাচ্ছিল্য ভরে হেলায় ভাসিয়ে, ভিন্ন ভাষা ও ভিন্ন সংস্কৃতির সঙ্গে সমমর্যাদার সহাবস্থান নয়, তাদের আধিপত্যবাদ ও আগ্রাসনের স্রোতে গা ভাসিয়ে নতুন প্রজন্ম মাটির সঙ্গে সম্পর্কবিহীন একটা নতুন ও বিচিত্রগামী জাতিচরিত্র গঠনে প্রয়াসী হয়। এতে যে এঁদের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও আত্মমর্যাদাবোধের অবনমন ঘটে, সে সম্পর্কে এঁরা হয় উদাসীন, নাহয় বোধহীন।
বর্তমান বাঙালির উদারতাবাদের সীমা নেই। সে এখন যতটা বাঙালি, তার থেকে অনেক বেশি জাতীয় বা আন্তর্জাতিক। কথ্য ভাষায় অপ্রয়োজনীয়ভাবে ভিন্ন ভাষার অবাধ মিশেল, ঘরোয়া উৎসবে, অনুষ্ঠানে পাঁচমিশেলী সংস্কৃতির দাপাদাপি, কুৎসিত দুর্বোধ্য শব্দরাজি সমন্বিত গানের ডিজে মিউজিকের তালে তালে পুজোর বিসর্জন এখন বাঙালিকে প্রায়শই ভিন প্রদেশবাসী বলে ভ্রম করায়।
পরিবর্তনের স্রোতে উচ্চবিত্ত শ্রেণীর ভাসাটা বেনজির নয়, সংখ্যায় ওঁরা নগন্য। কিন্তু সাধারণ মধ্যবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত? তাঁরা তো সমাজের গরিষ্ঠাংশ ও মূল চালিকাশক্তি। সাম্প্রতিক সময়ে পঠন-পাঠন, শিল্প-সংস্কৃতি ভাবনায়, লোকাচারে এই দুটি শ্রেণীর সংসার ও সমাজজীবন যেভাবে ভেসে চলেছে, তাতে বাঙালির জাতিসত্তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয় বৈকি। সেই নিরিখে এই প্রশ্ন জাগা বোধহয় খুব অমূলক নয় যে বাঙালি আর আদৌ বাঙালি থাকবে তো?
আজকের বাঙালিকে দেখে বঙ্কিমচন্দ্রর কপালকুন্ডলা থেকে ভাষা ধার করে বলতে ইচ্ছে করছে – বাঙালি, তুমি কি পথ হারাইয়াছ?
[চিত্র ঋণ- আন্তর্জাল]


রবিচক্র অনলাইন আপনাদের কেমন লাগছে? নিচের ঠিকানায় লিখে জানান। ইমেল-ও করতে পারেন। চিঠি অথবা ইমেল-এর সঙ্গে নাম, ঠিকানা এবং ফোন নম্বর থাকা বাঞ্ছনীয়।
রবিচক্র
‘প্রভাসতীর্থ’, ৭৬ ইলিয়াস রোড, আগরপাড়া, কলকাতা – ৭০০০৫৮, ভারত
editor@robichakro.com