শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

বঙ্গজীবনের পাঁচালি : চোদ্দ শতক (১)

[এটি বাঙালির একশো বছরের অর্থাৎ বঙ্গাব্দের চতুর্দশ শতকের ইতিহাসের একটি ধারাবিবরণী। গ্রামীন কথকতার আসরে যেভাবে সাধারণত পাঁচালি গান পরিবেশিত হয়, এটি তার উপযোগী করে রচনা করা হয়েছিল এই শতকের শুরুতে। পাঁচালির মাঝে মাঝে যাতে বিশিষ্ট রচয়িতাদের কবিতা বা গান সংযোজন করা যায়, তার দিকে লক্ষ রেখেই পাদটীকায় বিভিন্ন গানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পাঠ্য রচনা হিসেবে প্রকাশের সময় সুপরিচিত গানগুলির শুধু প্রথম কয়েকটি পংক্তির ও নির্বাচিত কিছু কবিতার অংশবিশেষ উল্লেখ করা হল। মূল কথকের পাঁচালী পরিবেশনের মাঝে মাঝে সহযোগীরা যেরকম ধুয়া ধরেন, সেই রীতি বজায় রেখে এখানেও পাঁচালীর মাঝে মাঝে বিভিন্ন ধুয়া সংযোজিত হল এটিকে বর্তমান কালের মঞ্চেও গীতি আলেখ্য হিসেবে পরিবেশনার সম্ভাবনা মাথায় রেখে।]

পর্ব – ১

আসর বন্দনা


প্রথম প্রথমে বন্দনা করি যত সভাজন —
শতাব্দী বরণ আসরে যাদের পদার্পণ।।
তারপরে বন্দনা গাই বঙ্গজননীর,
তাঁর কৃপাতে বিশ্ব মাঝে মোরা উচ্চশির।।
উত্তরে বন্দনা করি শুভ্র হিমালয় —
দেবতাত্মা — সংস্কৃতির মূর্ত পরিচয়।

দক্ষিণে বন্দনা করি বঙ্গোপসাগর–
বঙ্গভূমির প্রহরায় সর্বদা জাগর।
পশ্চিমদিকে বন্দিলাম পাশ্চাত্য সংস্কৃতি–
যার স্পর্শে এ শতাব্দী লভিলা প্রগতি।।।
পূর্বেতে বন্দনা করি দেব দিবাকর,
সে সাথে বন্দনা করি গৌরাঙ্গসুন্দর —
বাঙালির প্রাণধারা সে-ই সব আগে
বিতরিলা ভারতের সাধনার যাগে।।
সবশেষে বন্দনা করি রবীন্দ্র ঠাকুর—
বাঙালির বীণাতে যে দিল নব সুর।।
বাঙালির সংস্কৃতিকে নব অভিজ্ঞান
আর যত মহাজন করিলেন দান,
আজি এই পনেরো শতকের গোড়ায়
তাদের সবার কীর্তি রাখিনু মাথায়।
[ধুয়া – “আহা, বেশ বেশ বেশ!
আহা, বেশ বেশ বেশ!”]

ভূমিকা

নববর্ষ প্রতিবার যত বঙ্গজন
গতানুগতিক ধাঁচে করেন পালন।
কিন্তু সুধী সভাজন করুন চিন্তন,
এবার তো নহে শুধু বর্ষ সমাপন।
পুরাতন বৎসরের সঙ্গে সমুদায়
একটি শতাব্দী আজ লইছে বিদায়।।
চোদ্দশত এক সনে পশিবার ক্ষণে
বিগত শতকের কথা ভাবি আজ মনে ।।
গত একশো বছরের যে ঘটনা সংঘাত
বাঙালির ইতিহাসে করিল রেখাপাত,
যে সকল অশ্রু হাসি জয় পরাজয়,

গৌরবের বেদনার কাহিনীনিচয়
গাঁথা আছে শতকের পরতে পরতে,
তাকে ভুলে যাওয়া ঠিক নহে কোনমতে।।
তাই আজ বঙ্গীয় চতুর্দশ শতকের
ঘটনাপ্রবাহ যাহা বঙ্গজীবনের
নানা ক্ষেত্রে আলোড়ন জাগালো একদা,
আজ নব বরষেতে শোনাই সেই কথা।।


[ধুয়া :- “আহা, বেশ বেশ বেশ!…”

পাঁচালীর কথারম্ভ

ইউরোপীয় সংস্কৃতির যে প্রাণ-জোয়ার
ভেঙেছিল ভারতের জড়ত্বের দ্বার,
তাকে বয়ে এনেছিল ব্রিটিশ শাসন —
এই বাংলাদেশেই তার হৈছিল পত্তন।
আবার এই বাংলাতেই সে জোয়ার ফের
ফলাইল নবশস্য জ্ঞান বিজ্ঞানের !
শিক্ষাদীক্ষা ধর্মেকর্মে সে মাহেন্দ্রক্ষণ
ইতিহাসে চিহ্নিত — ‘নবজাগরণ”।।
তেরোশো সনের যবে হইল আগমন,
তার আগেই নবযুগের হয়েছে পত্তন।
জাতীয় চেতনা আর আত্মনির্ভরতা
এই নব শতকের ছিল মর্মকথা।
বঙ্কিম, রাজেন্দ্রলাল ও বিদ্যাসাগর
সবে গত হয়েছেন কয়েক বৎসর।
নূতন শতাব্দী এলো নূতন বাংলায়,
নবীন সে জ্ঞানে-কর্মে শিল্পে ও চিন্তায়।।
যেথা এ জাগরণের ভিত হল পাতা,
বাঙালির কমলালয় — শহর কলকাতা!
এ শতকে কলকাতায় যা করেছে বাঙালি,
সত্যেন দত্ত গেয়েছেন তারই যে পাঁচালী!

কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘স্বাগত’ কবিতার অংশ —


“…এই কলিকাতা ব্যাঘ্রবাহিনী, ছিল এ একদা বাঘের বাসা,
বাঘের মতন মানুষ যাহারা তাহাদেরই ছিল যাওয়া ও আসা।…
নাহি কলঙ্ক-কালিমা অঙ্ক, সাত সাগরের সলিল আনি,
করেছে ক্ষালন মৈত্র ইহার অন্ধকূপের মিথ্যা গ্লানি ।
সাধনার পীঠ সাধের আসন শিল্পের নব জীবন-ধারা,
এ মহানগরী ভারত-আকাশে সাতাশ তারার নয়ন-তারা ।
একদা যে দীপ জ্বালিল ধীমান সে দীপ আজি এ নগরী জ্বালে,
পঞ্চ প্রদীপ-অবনী-গগন-অসিত-মুকুল-নন্দলালে।
মাইকেল মধু হেথা সমাহিত, বঙ্কিম- হেম-ভস্মকণা।
ধূলিতে ইহার রয়েছে মিশায়ে কত না ভাবুক রসিকজনা। …
কবি-গুঞ্জনে এ ধূলিপুঞ্জ ধরেছে কুঞ্জবনের ছিরি,
জগৎ উজল যার প্রতিভায় এ সেই রবির উদয়গিরি ।
হেথা আশুতোষ আশু নিরমিল নব নালন্দা শিক্ষা-গেহ,
দেশের কিশোর হৃদয়গুলিতে বিথারি পক্ষীমাতার স্নেহ। …
গিরিশ হেথায় রঙ্গে মাতিল, রায় দ্বিজেন্দ্র হাসিল হাসি
স্বাগত কাব্য-কোবিদ! হেথায় উজ্জয়িনির বাজিছে বাঁশী।…”.

এই সব মনীষীর প্রাণের বন্যায়
এলো নবযুগ চোদ্দ শতকের বাংলায়!
তবু বাঙালির নবজীবনের স্রোতে
ভীরুতার কিছু টান ছিল পিছু হতে।
বাঙালি কবিরা শুধু গৌরবের গান
গেয়ে গেয়ে জনতার মাতান নি প্রাণ!
শঠতা, আলস্য দেখে বাঙালি ভাবুক
নির্মম ব্যঙ্গের গানে হেনেছে চাবুক।
বাঙালি চরিত্রের ওই কপট দেশপ্রীতি
লক্ষ্য করে দ্বিজেন্দ্র রায় গান ব্যঙ্গগীতি।।

দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের গানের অংশ :-
“নন্দলাল ত একদা একটা করিল ভীষণ পণ—
স্বদেশের তরে, যা করেই হোক, রাখিবেই সে জীবন।
সকলে বলিল ‘আ-হা-হা কর কি, কর কি, নন্দলাল?’
নন্দ বলিল ‘বসিয়া বসিয়া রহিব কি চিরকাল?’
আমি না করিলে, কে করিবে আর উদ্ধার এই দেশ?’
তখন সকলে বলিল— ‘বাহবা বাহবা বাহবা বেশ!’…”

পাশ্চাত্যের দিগ্বিজয় করি সমাপন
বিবেকানন্দ স্বদেশে করেন আগমন।।
আসমুদ্র হিমাচল মহা আলোড়ন,
বিজয়ী বীরেরে সবে করিল বরণ!
বাংলাদেশে ফিরে কর্মযোগী সে মহাত্মা
উচ্চারেন আত্ম-উদ্বোধন ও সেবার বার্তা।।
বিদেশি ভক্তেরা এসে তাঁরই আকর্ষণে
যোগ দেন ভারতের গণ উন্নয়নে ।।
এমনই সে শিষ্যা এক ভগ্নী নিবেদিতা
সেবা শিক্ষা কর্ম ব্রতে হলেন বিদিতা।।
স্বামীজীর ডাকে উদ্বোধিত যুবজন,
স্থাপিলেন সেবাব্রতে রামকৃষ্ণ মিশন।।
কর্মবীর না পৌঁছিতে চল্লিশের কোঠায়
তেরো শত নয় সনে নিলেন বিদায়।।
[ ধুয়া:- মরি হায়, হায় রে,
মরি হায় হায় রে!”]


তেরো শত দুই সন ঘটনাবহুল —
জ্ঞানে-কর্মে বাঙালির যশ যে অতুল!
জগদীশ ও প্রফুল্ল দুই বিজ্ঞানী সতেজে
গবেষণা চালান প্রেসিডেন্সি কলেজে।।
পদার্থ ও প্রাণতন্ত্রে জগদীশের কাজ
পরালো ভারতের শিরে গৌরবের তাজ!
বেতার যন্ত্র উদ্ভাবনেও তিনি সফল।
প্রফুল্ল রসায়নবিদ — বিজ্ঞানী মহল
সচকিত তাঁর নব যৌগ আবিষ্কারে,
বাঙালিকে উৎসাহ দেন শিল্প গড়িবারে।।
এ বছরই রবিকবি রচিলেন কবিতা
চোদ্দশত সালের পূর্বাভাসের ছবি তা!!

রবীন্দ্রনাথের কবিতা ‘১৪০০ সাল’ :-
“আজি হতে শতবর্ষ পরে
কে তুমি পড়েছ বসি আমার কবিতাখানি
কৌতূহল ভরে!
আজি নব বসন্তের প্রভাতের আনন্দের
লেশমাত্র ভাগ,
আজিকার কোন ফুল, বসন্তের কোন গান
আজিকার কোন রক্তরাগ
অনুরাগে সিক্ত করি পারিব কি পাঠাইতে
তোমাদের করে,
আজি হতে শতবর্ষ পরে।…”

চতুর্দশ শতকের এই প্রথম দশকে
ব্যতিব্যস্ত দেশ মহামারী ও মড়কে।।
রবীন্দ্রনাথ রূপ দেন নব তপোবনে–
ব্রহ্মবিদ্যালয় স্থাপি শান্তিনিকেতনে।।
কলকাতায় কংগ্রেসের বৈঠকে তখন
দাবি ওঠে – আরো চাই স্বায়ত্তশাসন ।।
এই দাবি যার কন্ঠে সবচেয়ে সোচ্চার,
বরিশাল-কেশরী তিনি অশ্বিনীকুমার!
অশ্বিনী দত্তেরই চেলা — সে মুকুন্দ দাস,
স্বদেশী যাত্রায় তার সে কি ভাবোচ্ছ্বাস!
গ্রামেগঞ্জে গান গায় — দৃপ্ত তার ভঙ্গি —
কারাদণ্ড দেয় তাকে শঙ্কিত ফিরিঙ্গি।।

মুকুন্দ দাসের স্বদেশী গান :-
“ভয় কি মরণে রাখিতে সন্তানে,
মাতঙ্গী মেতেছে আজ সমর রঙ্গে।।
তাথৈ তাথৈ থৈ দ্রিমী দ্রিমী দং দং
ভূত পিশাচ নাচে যোগিনী সঙ্গে।
দানব দলনী হয়ে উন্মাদিনী,
আর কি দানব থাকিবে বঙ্গে।।
সাজ রে সন্তান হিন্দু মুসলমান
থাকে থাকিবে প্রাণ না হয় যাইবে প্রাণ।।
লইয়ে কৃপাণ হও রে আগুয়ান,
নিতে হয় মুকুন্দে-রে নিও রে সঙ্গে।।”

[ক্রমশঃ]

[লেখকের অন্য রচনা]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
তন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়
তন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়
5 months ago

পাঁচালির লোকজ আঙ্গিকে বাঙালির সাম্প্রতিক ইতিহাস ও বিশিষ্ট কবিদের কবিতার কোলাজটি মনোরম ও সুখপাঠ্য ।