নীলকন্ঠ পাখি কৈলাসাভিমুখে উড়ে গেল। উমা-র ফিরে যাওয়ার খবর সে পৌঁছে দেবে। ইট কাঠের জঙ্গলে, প্রকৃতি আর পাখ-পাখালির সঙ্গে সম্পর্ক কমে এসেছে, বহুদিন। এখন হাতে গোণা কেউ কেউ হয়তো ভাসানের পর নীলকন্ঠ পাখি উড়িয়ে দেয়, তার ওপর বন্যপ্রাণ বিষয়ক সরকারী নিয়মের বাধা নিষেধ তো আছেই।

গল্পগুলো ভাবতে ভালো লাগে, কেমন করে দেবী দুর্গা, বাংলার ঘরে উমা হয়ে গেলেন! পৃথিবীর আর কোথাও এমন দেবত্বের নিগড় ছিঁড়ে, মাটির সংসারের ধুলোমাটি মাখতে, কোন ঐশ্বরিক প্রতিভূকে দেখা যায় কিনা, জানা নেই। তিনি ঘরের মেয়ে, তিনি উমা।
তাঁর আগমন ঘিরে বাঙালির সম্বৎসর প্রস্তুতি। সব মিলিয়ে এই পুজোর ক’টি দিনকে নিয়ে পঞ্চাশ হাজার কোটি টাকার বেশি (২০২২ টাইমস অফ ইন্ডিয়া সার্ভে) লেনদেন হয়। এই অঙ্কে পুজো উপলক্ষে কেনা পোশাক, ঘরের পর্দা, বিছানার চাদর থেকে টিভি, ফ্রিজ বা গাড়ি ইত্যাদি ধরা হয়নি। সামাজিক অর্থনৈতিক পরিকাঠামোতে, মেলা উপলক্ষে টাকাপয়সার দ্রুত লেনদেনের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বিশেষকরে এই শারদীয় কর্মকান্ডে সমাজের তলানিতে পড়ে থাকা মানুষগুলোও রোজগারের সুযোগ পায়। এই কটা দিনের জন্য, তাঁরা তাঁদের অন্যান্য কৃষিকাজ, মাছধরা অথবা বিবিধ পারিবারিক বৃত্তি ছেড়ে মন্ডপ সজ্জার কাজে এসে যোগ দেন। সমাজের কাঠামোতে, অত্যন্ত অকিঞ্চিতকর, যিনি দড়ি আনেন, বাঁশ বয়ে দেন, প্রতিমা বয়ে দেন বা ঢাক বাজান তাঁদেরও লক্ষ্মীলাভ হয়। আর পুজোটা কোন একক ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।
শুকনো কঠিন আচার বিচার পার হয়ে, এই পুজো উত্তীর্ণ হয় এক শহরজোড়া শিল্প প্রদর্শনীতে। বিষয় ভাবনার বৈচিত্র্যে, নৈপুণ্যের পারদর্শীতায় প্রতিটি মন্ডপে ইন্সটলেশন আর্টের অভূতপূর্ব স্থাপত্য নির্মিত হয়। ধর্মীয় আড়ম্বর থেকে, কেন শৈল্পিক প্রয়াস অধিকতর সমাদৃত হয়? এই উত্তরণ, অযোধ্যা-কেন্দ্রিক সহনাগরিকদের বোঝানো কঠিন হয়ে পড়ে। প্রাচীন ভারতের দেবস্থানগুলিকে লক্ষ্য করলেই আমাদের ঐতিহ্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যেমন ইলোরা, খাজুরাহো, কোনারক থেকে দাক্ষিণাত্যের অজস্র মন্দির নির্মাণের কুশলতা আর শিল্পভাবনা, বহু শতাব্দ পার করে আমাদের বিস্মিত করে! কলকাতার দুর্গা আরাধনার মধ্য দিয়ে সৃষ্ট শিল্প-চেতনা, সেই উত্তরাধিকারেরই দিক নির্দেশ।

এই কয়েকদিনের জন্য গোটা শহরটা হয়ে যায়, একটি অন্যন্য ক্যানভাস, যা দেশ ছেড়ে বিদেশের মানুষকেও সমান আকৃষ্ট করে। তাঁরা যে শুধু দর্শক হিসেবে আসেন, তা নয়, এ বছর যেমন, আয়ারল্যান্ড থেকে আগত দুই শিল্পী, লিসা স্যুইনি এবং রিচার্ড ব্যাবিংটন সমান ভাবে হাত মেলালেন এই শহরের শিল্পীদের সঙ্গে। মা দুর্গার সঙ্গে সহাবস্থান হল, আইরিশ দেবতা দানু-র। দানু উর্বরতার দেবতা, সৃষ্টির দেবতা, পরম মাতা-র প্রতীক।
কালীক্ষেত্র কলিকাতায় সব দেশের মায়ের পুজো মিলেমিশে এক হয়ে যায়। অথচ সেখানেই মেয়েরা তার মর্যাদা পায় না। একের পর এক নৃশংস অত্যাচারের নজির, গড়ে তুলছে তীব্র নাগরিক অসন্তোষ। উৎসবের মধ্যেও কাঁটা হয়ে জেগে থাকে রাজপথ, বিচার এখনও অধরা। কোথাও গিয়ে মানুষ, তার কষ্টের নিবৃত্তি প্রার্থনা করতে চায়। আদালত অথবা দুর্গা মন্ডপ। কিন্তু ফল কি মেলে? এখন অপেক্ষার কাল, দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে চলেছে। অসম্ভব জেদী কয়েকটি তরুণ নুইয়ে পড়া সমাজকে নতুন করে আলোর পথ দেখাচ্ছে। সেখানেও আসছে, অপরিসীম বাধা। সে বাধা শুধু প্রশাসনের তরফ থেকে নয়, নাগরিক সমাজও যেন, অজস্র ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ছেন। তাঁদের মনে বাসা বেঁধেছে দ্বিধা। আন্দোলনের অভিমুখের লক্ষ্য উদ্দেশ্য নিয়ে তারা সন্দিহান হয়েছেন। সে ঠিক না বেঠিক, সময় বলবে, কিন্তু অন্যায়টাকে অন্যায় বলার মতো সৎ সাহস যাঁরা দেখাতে পারেন, তাঁদেরকে ভাল না বেসে পারা যায়? এরা তো সব আমাদেরই সন্তান। আমরা যা পারিনি, ওরা তা করে দেখাচ্ছে।

কতদিন হয়ে গেল, ছেলেমেয়েগুলো না খেয়ে রয়েছে, কীসের জন্য? অভুক্ত সন্তানকে রেখে কোন্ মা নিজে খেতে পারেন? উমা ফিরে গেলেও এই প্রশ্ন যেন বাতাসে ঘুরে ঘুরে আঘাত করে আমাদের প্রত্যেককে।
প্রথা অনুযায়ী, পুজোর পর ‘শুভ বিজয়া’ জানানো দস্তুর, কিন্তু বিজয় কি এসেছে? অসুররা তো এখনও আমাদের সবার মধ্যেই স্বমহিমায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। আশা করে থাকি, সেই কাঙ্খিত বিজয় আসুক। অদূরবর্তী সেই বৈজয়ন্তর কথা চিন্তা করে, রবিচক্র-এর পক্ষ থেকে সমস্ত পাঠক বন্ধুকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা।
[চিত্র ঋণ- আন্তর্জাল]


রবিচক্র অনলাইন আপনাদের কেমন লাগছে? নিচের ঠিকানায় লিখে জানান। ইমেল-ও করতে পারেন। চিঠি অথবা ইমেল-এর সঙ্গে নাম, ঠিকানা এবং ফোন নম্বর থাকা বাঞ্ছনীয়।
রবিচক্র
‘প্রভাসতীর্থ’, ৭৬ ইলিয়াস রোড, আগরপাড়া, কলকাতা – ৭০০০৫৮, ভারত
editor@robichakro.com