বিস্মৃতিচারণা – পর্ব (৭)
বাংলা সাহিত্যের সম্মেলন থেকে ভেসে আসা বর্ণময় কিছু খন্ডচিত্র ইতিপূর্বে আপনাদের শুনিয়েছি বোম্বাইতে অনুষ্ঠিত ১৯৭৬-এর সাড়া জাগানো বঙ্গ সাহিত্য সম্মিলনের প্রথম দিনের প্রভাতী অধিবেশনে বিশিষ্ট সাহিত্যিকদের শরৎ-সাহিত্য বিতর্ক। তারই রেশ ধরে মনে পড়ছে অধিবেশনের তিনটি দিন ধরে পর্বে পর্বে ছোট ছোট ঘটনার আরও কিছু খন্ডচিত্র।
সকালের অধিবেশনে বাঙালির শরৎচন্দ্র-প্রীতির আবেগের তন্ত্রীতে ঢেউ তুলে শ্রোতাদের তাবৎ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিলেন ধুতি চাদর পাঞ্জাবিতে পরিপাটি সভাপতি সমরেশ বসু। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আঙিনায় তাঁকেই দেখা গেল খোলামেলা এক ভিন্ন মেজাজে। পরনে টকটকে লাল টি সার্ট ও ঘি রঙের ট্রাউজার। হাতে লম্বা দৈর্ঘ্যের সিগারেট নিয়ে স্মিত হাস্যে দাঁড়িয়ে উপস্থিত দর্শক ও গুণগ্রাহীদের সঙ্গে হালকা আলাপচারিতায় মগ্ন। দূরে দাঁড়িয়েই উপভোগ করছিলাম দৃশ্যটা। হঠাৎই আমার পরিচিত এক গুরুজন এসে বললেন, ‘চলো, হাতের নাগালে যখন পেয়েছি, একটু আলাপ করা যাক সমরেশ বসুর সঙ্গে।’

কিছুটা চিন্তায় পড়লাম। ভদ্রলোক প্রাচীনপন্থী ও নীতিনিষ্ঠ ধরণের মানুষ। আর সমরেশ বসু তখন এমন এক সাহিত্যিক, যিনি ‘কালকূট’ ছদ্মনামের লেখায় যতটা প্রশংসিত, স্বনামে ‘বিবর’, ‘প্রজাপতি’ ইত্যাদি লিখে ততটাই বিতর্কিত, এমনকি কিছু মহলে নিন্দিতও বটেন। পাশাপাশি জনমোহিনী ক্ষমতায় ও জনপ্রিয়তাতেও তিনি অদ্বিতীয়।
যেটা ভয় পেয়েছিলাম, সেটাই ঘটল। প্রাথমিক আলাপ ও দু’চারটি কথার পর আমাকে সঙ্গী করে নিয়ে যাওয়া ভদ্রলোক সমরেশকে প্রশ্ন করে বসলেন, ‘যে হাত দিয়ে আপনি ‘অমৃত কুম্ভের সন্ধানে’, ‘গঙ্গা’, ‘বি টি রোডের ধারে’র মতো উপন্যাস লেখেন, সেই হাত দিয়ে ‘বিবর’, ‘প্রজাপতি’ ইত্যাদি লেখেন কি করে? আমরা তো মেলাতেই পারিনা। খুব জরুরি কি এই লেখাগুলো?’
এমন আকস্মিক আক্রমণে কিন্তু চটলেন না সমরেশ। মুচকি হেসে সিগারেটের ধোঁয়াটা ওপরের দিকে ছেড়ে বললেন, ‘সবই যদি আপনাদের জন্য লিখব, তাহলে খাব কি?’… উত্তরটা স্বাভাবিকভাবেই পছন্দ হল না প্রশ্নকর্তার, যদিও একটু মলিন হেসে নীরব রইলেন। সমরেশ বলে চললেন, ‘সব ধরণের পাঠককে সঙ্গে নিয়েই আমাদের চলতে হয়। তাছাড়া চিরকালীনের পাশাপাশি সমকালীন বলেও তো একটা কথা আছে। সেভাবেই দেখুন না বিষয়টাকে।’
সেদিন সন্ধ্যায় দ্বিধাহীন প্রাঞ্জল স্বীকারোক্তি শুনেছিলাম আধুনিক সময়ের এক ক্ষমতাবান ঔপন্যাসিকের কণ্ঠে, যিনি তাঁর সমসাময়িক বিশিষ্ট সাহিত্যিকদের মতো সংবাদপত্র জগতের চাকরির আহ্বানে সাড়া না দিয়ে শুধুমাত্র সাহিত্য রচনাকেই পেশা করবার সাহস দেখিয়েছিলেন তৎকালীন সময়ে।
এই অধিবেশনে প্রথা অনুযায়ী প্রতি সন্ধ্যায় বসত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জমজমাট ও মনোগ্রাহী আসর। যতদূর শুনেছি, সম্মেলনের মান বর্তমানে ক্ষীয়মান হলেও এই ধারাটি এখনও অব্যাহত।

বোম্বাই অধিবেশনের প্রথম দিনের সন্ধ্যার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের বিশেষ আকর্ষণ ছিল বম্বের চলচ্চিত্র জগতের অভিনেতা অভিনেত্রীদের অভিনীত শরৎচন্দ্রের ‘চরিত্রহীন’ উপন্যাসের সংক্ষিপ্ত হিন্দী নাট্যরূপ। আজও মনে পড়ে, দুটি মূখ্য ভূমিকায় তখনকার হিন্দি ছবির ডাকসাইটে চলচ্চিত্রাভিনেতা শত্রুঘ্ন সিনহা এবং জারিনা ওয়াহাবের কুশলী মঞ্চাভিনয়।
দ্বিতীয় দিনের প্রভাতী আলোচনায় আমরা পেলাম বিশিষ্ট মারাঠী সাহিত্যিক ও অনুবাদক পুলকেশ দেশপান্ডেকে। অনুরোধ করতেই বাংলায় স্বাক্ষর করলেন আমার সই সংগ্রহের খাতাটিতে, আজও যা সংরক্ষিত আমার হেফাজতে। দেখলাম, বাংলা সাহিত্যের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা ভিন্ ভাষার প্রবীণ এই সাহিত্যসেবীর। শরৎচন্দ্রের উপন্যাস নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করতে করতে বললেন, ‘মহারাষ্ট্রের গ্রামাঞ্চলের বহু মানুষ তাঁর উপন্যাসের অনুবাদ পড়ে এতটাই একাত্মতা বোধ করেন যে তাঁরা অনেকেই তাঁকে বাঙালি নয়, একজন মারাঠী ঔপন্যাসিক বলে মনে করেন।’ বাংলা ভাষার সাহিত্যিকদের প্রতি তাঁর প্রণতি জানাতে গিয়ে দেশপান্ডে বললেন, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্রকে তিনি শুধুমাত্র বাংলা সাহিত্য নয়, সমগ্র ভারতীয় সাহিত্যের ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর বলে তিনি মনে করেন। আজও মনে পড়ে, তাঁর মুখ থেকে বাংলা সাহিত্যের ও সাহিত্যসাধকদের সম্পর্কে মন্তব্যগুলো আমার তরুণ হৃদয়ে এক ধরণের শ্লাঘাবোধের জন্ম দিয়েছিল।

সেদিনের দুপুরের অধিবেশনটি ছিল ‘সাহিত্য ও সঙ্গীতের সম্পর্ক’ বিষয়ক। এলেন প্রবাসী প্রখ্যাত দুই সঙ্গীত শিল্পী-দম্পতি অপরেশ লাহিড়ী ও বাঁশরী লাহিড়ী। সঙ্গে ওঁদের যুবক পুত্র বাপী লাহিড়ী, যিনি তখনও ততটা পরিচিতি লাভ করেননি সাধারণের মহলে। আলোচনার ফাঁকে সেদিন অপরেশ ও বাঁশরী লাহিড়ীর কণ্ঠে শুনেছিলাম ‘ধন ধান্য পুষ্প ভরা’ সহ বেশ কয়েকটি কালোত্তীর্ণ দেশাত্মবোধক গান ও পল্লীগীতি। কিন্তু আমাদের চমকিত করে নবীন বাপী লাহিড়ী অসামান্য নৈপুণ্যে শুনিয়েছিলেন একগুচ্ছ লালন ফকিরের গান। এক উজ্বল প্রতিভার সন্ধান পেয়ে সত্যিই পুলকিত বোধ করেছিলাম। কিন্তু পরবর্তী কালে সঙ্গীতের ভিন্ন আঙ্গিকে উনি খ্যাতির শীর্ষে উঠলেও সেদিনের বাপী লাহিড়ীকে আর কখনোই খুঁজে পাইনি।
মনে করতে ভাল লাগে যে এই মঞ্চেই দ্বিতীয় সাংস্কৃতিক সন্ধ্যায় বাংলার পঞ্চ কবির গানের পসরা নিয়ে স্থানীয় চব্বিশ পরগণা শাখার তরফ থেকে আমরা মঞ্চস্থ করেছিলাম ‘মনের মানুষ’ শিরোনামের একটি গীতিআলেখ্য, যা গুণীজনের প্রভূত প্রশংসা অর্জন করেছিল। ভাষ্যপাঠে অংশ নিয়েছিল সেদিনের তরুণ এই অভাজনও।

তিনটি দিনের অধিবেশনের তৃতীয় সন্ধ্যাটিতে শতবর্ষে শরৎচন্দ্রকে কুর্নিশ জানাতে মঞ্চে হাজির হয়েছিলেন বম্বের চলচ্চিত্র জগতের উজ্বল প্রতিনিধিরা। অর্ধ শতাব্দী পরে উপস্থিত বহু বিশিষ্টজনের নাম চলে গেছে বিস্মৃতির আড়ালে। যে কজনকে মনে পড়ছে, তাঁরা হলেন স্বনামধন্য দিলীপকুমার, প্রখ্যাত চিত্রপরিচালক বাসু ভট্টাচার্য, অভিনেত্রী কামিনী কৌশল, সুলক্ষণা পন্ডিত প্রমুখ এক ঝাঁক তারকা। সুলক্ষণার অভিনয়ের পাশাপাশি গানের গলাটি ছিল ভারি মিষ্টি। অনুরুদ্ধ হয়ে গেয়ে শুনিয়েছিলেন সলিল চৌধুরী সুরারোপিত লতা মঙ্গেশকর গীত ‘না যেয়ো না রজনী এখনও বাকি’ গানটি। যন্ত্রানুসঙ্গবিহীন খালি গলায় অনবদ্য পরিবেশন।

শরৎচন্দ্রের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনে মাতিয়ে দিলেন দিলীপকুমার। মূলত হিন্দীতেই বললেন, কখনো বা ইংরেজীতে। একবার ভাঙা বাংলাতেও হাসতে হাসতে বললেন, ‘শরৎচন্দ্রের গোল্প, পোড়েছ, কি মোরেছ! পালাবার পোথ নেই!’ দিলীপকুমার জানালেন, কিভাবে প্রমথেশ বড়ুয়ার দেবদাস দেখে মুগ্ধ হয়ে পরিচালক নীতিন বোসের হিন্দী ছবি ‘দেবদাস’-এ নাম ভূমিকায় অভিনয়ের প্রস্তাবে নিজের অক্ষমতা জানিয়ে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি এবং পরে কিছুটা বাধ্য হয়েই নতি স্বীকার করে গ্রহণ করেছিলেন সেই প্রস্তাব। প্রবীনেরা জানেন, সেই ছবির অভাবনীয় সাফল্যের ইতিহাস। হিন্দী ছবিতে শরৎচন্দ্রের কাহিনিগুলোর অসামান্য গ্রহণযোগ্যতা ও নিশ্চিত বাণিজ্যিক সাফল্যের কথা কৃতজ্ঞ কণ্ঠে উল্লেখ করেছিলেন দিলীপকুমার। শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের পরিসমাপ্তিতে দিলীপকুমার এর সশ্রদ্ধ মন্তব্য: Sharat Chandra Chattopadhyay is therefore not a writer of only one century. I am sure, he would be remembered in the centuries to come!
সাড়ে চার দশক আগের তিনটি দিনের অজস্র ঘটনা, যা উপভোগ করেছিলাম মন-প্রাণ ভরে । সময়ের গহন অরণ্য পেরিয়ে তার কতটুকুই বা ধরতে পারলাম ! যেটুকু স্মৃতিকক্ষপথে ধরা পড়ল, সেটুকু তুলে ধরলাম আপনাদের কাছে । বাকিটুকু তলিয়ে গেছে বিস্মৃতির গর্ভে চিরতরে।
(পুনশ্চঃ ছবিগুলি আন্তর্জাল থেকে সংগৃহীত হয়েছে। তবে এগুলিতে সেই সময়ে দেখা শিল্পীদের তদানীন্তন চেহারার মোটামুটি প্রতিচ্ছবি আমার দৃষ্টিতে ধরা পড়েছে।)
অপূর্ব লেখা ! খুব খু–ব ভালো লাগলো । খুব আনন্দে ratingটা 5 দিয়েছিলাম, কে ওটাকে 3.5 করলো, জানিনা । আমাদের মতো সাধারণ পাঠকদের মতামত প্রকাশের limit কি বেঁধে রাখা আছে !!