শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

শিব্রাম চকরবরতি ও পেনেটির গুপো সন্দেশ

বিস্মৃতিচারণা (পর্ব ৪)

আমার এবারের বিস্মৃতিচারণায় ভেসে আসছে সত্তরের দশকের মাঝামাঝি বাংলা সাহিত্যের রসসম্রাট শিবরাম চক্রবর্তীর আগরপাড়ার প্রভাসতীর্থে আগমন ও তাঁর অসামান্য ভোজনপ্রিয়তার ইতিবৃত্ত।

কলকাতার বঙ্গ সাহিত্য সম্মিলনের তিন দিনব্যাপী আসর বসেছে প্রভাসতীর্থের সভাঘরে। এক এক দিন বিভিন্ন পর্বে এক একটি বিষয় নিয়ে বিশিষ্ট অতিথিদের বক্তৃতা, আলোচনা, সাহিত্য পাঠ। আসছেন বাংলা সাহিত্যের তদানীন্তন কুশীলবরা। দিনটা ছিল রবিবার। সকালের অধিবেশন, বিষয় শিশুসাহিত্য। সেদিনের অতিথিরা ছিলেন শিবরাম চক্রবর্তী, স্বপনবুড়ো (অখিল নিয়োগী), উত্তরবঙ্গের বিশিষ্ট শিশু সাহিত্যিক রত্নাকর এবং আরও কিছু সমকালীন শিশুসাহিত্য রচনাকার।

জনশ্রুতি ছিল যে শিবরামবাবু একটি শর্তেই যেকোনো সাহিত্য আসরে যেতেন। তাঁর জন্য মজুত রাখতে হবে রাবড়ি ! তবে সেদিনের অনুষ্ঠানের আয়োজকদের কাছে শুনেছিলাম যে, অন্যান্য সাহিত্যিকরা সকলেই সানন্দে বিনা দ্বিধায় আমন্ত্রণ গ্রহণ করলেও শিবরাম সেদিনের আসরে আসার জন্যে একটি শর্ত আরোপ করেছিলেন। শর্তটি হল, তাঁকে রাবড়ি নয়, নিকটবর্তী পেনেটির (যার পোষাকী নাম পানিহাটি) জনপ্রিয় গুপো সন্দেশ পর্যাপ্ত পরিমাণে খাওয়াতে হবে, তবেই তিনি সাহিত্য-সভায় আসার ব্যাপারে মনস্থির করবেন। বলা বাহুল্য, আমন্ত্রকরা সানন্দে সম্মত হয়েছিলেন। সেদিনের প্রভাতী আসরে বড়দের সঙ্গে যথেষ্ট শিশু কিশোর সমাগম হয়েছিল। তখনও শিশুরা, দিগ্‌গজ শিক্ষাবিদ ও সদা-উৎকণ্ঠিত বাবা-মা’দের ঐকান্তিক আগ্রহে ওদের শৈশব হারিয়ে ফেলেনি। তারা হাজির হয়েছিল তাদের কল্পলোকের অধীশ্বরদের চোখের দেখা দেখতে, কথা শুনতে ও অটোগ্রাফের খাতায় হস্তাক্ষর সংগ্রহ করতে। কচি-কাঁচারা ছেঁকে ধরেছিল শিবরামকেই। তাঁর জনপ্রিয়তা যদি এর একটা কারণ হয়, অন্য কারণটি ছিল, তাঁর আচার-আচরণে ও বাচনে একটি শিশুকে বোধহয় খুঁজে পাচ্ছিল তারা।


প্রথমেই তারা যেটিতে আমোদিত হল, তা হল অটোগ্রাফের খাতায় তাঁর স্বাক্ষরটি। সেটি সাহিত্যিক শিবরাম চক্রবর্তীর নয়, কোনো এক মজারু ‘শিব্রাম চকরবরতির’! জনসমক্ষে শিবরাম বাকপটু ছিলেন না, কিন্তু সেদিন নানান শিশুসুলভ প্রশ্নত্তোরে ছোটদের মধ্যে রীতিমতো আসর জমিয়ে ফেললেন তিনি অচিরেই। মনে আছে, এরই মধ্যে চকিত অবসরে সিং ভেঙে বাছুরের দলে ঢুকে রসভঙ্গ ঘটিয়ে হঠাৎই একটা গুরুগম্ভীর প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিলাম আমার প্রিয় লেখকের উদ্দেশে – ‘আচ্ছা, আপনার ‘ঈশ্বর পৃথিবী ভালবাসা’ কি আত্মজৈবনিক রচনা?’ সে সময়ে শিবরামের এই বইটি বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল সাহিত্য-পিপাসুদের কাছে। কৌতুহলও প্রচুর ছিল জনমানসে।

আকস্মিক এরকম একটা প্রশ্নের মুখোমুখি শিবরাম কিছুটা যেন হতচকিত। ছোটদের সঙ্গে কথোপকথন মুলতুবি রেখে একটু থমকে গেলেন তিনি। তারপর ভাবুক চোখদুটো ট্যারচা করে ছাদের দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, বলতে পার।‘ এরপর হাতদুটিকে মুঠো করে মুখের কাছে এনে গাঁজার কলকে টানার ভঙ্গি করে বললেন, ‘আত্মজীবনী যদি বল বলতে পার। তবে গাঁজায় দম দিয়ে লিখেছি।’


আমরা জানি যে আত্মজীবনীমূলক উপন্যাসের উপাদানে কিছু কল্পনার আশ্রয় থাকেই। কিন্তু তাই বলে সাহিত্যিকের কল্পনার জগৎকে স্বয়ং লেখক গাঁজার দমের সঙ্গে তুলনা করবেন! বুঝলাম, একমেবাদ্বিতীয়ম্ শিবরামের পক্ষেই এটা সম্ভব! হাসির ফোয়ারা ছুটল সভাস্থলে। তবে শিবরাম নির্বিকার।

অনুষ্ঠানের পরিসমাপ্তিতে এবার জলযোগের পালা। সব বিশিষ্টজন ও অতিথিদের আয়োজন অনুসারে একটি নির্দিষ্ট ঘরে এনে বসানো হল এবং ব্যবস্থা অনুযায়ী খাদ্যদ্রব্য পরিবেশিত হল। পর্যাপ্ত আয়োজন। সাহিত্যিকদের হাস্য পরিহাসের মধ্যে দিয়ে চলছে পরিবেশন। পরিশেষে মিষ্টান্ন, যার মধ্যে অবধারিতভাবে ছিল শিবরাম আবদারের গুপো সন্দেশ। আমার সৌভাগ্যক্রমে মিষ্টান্ন পরিবেশনের দায়িত্বটি বর্তেছিল এই অধমের ওপর। শিবরাম মাঝেমাঝে আমার দিকে তির্যক ভঙ্গিতে দৃষ্টিনিক্ষেপ করছেন আর আমিও আনন্দের সঙ্গে তাঁকে সন্তুষ্ট করে চলেছি। সকলের খাওয়া প্রায় শেষ। এমন সময় মৌনতা ভাঙলেন শিবরাম। বললেন, ‘ওহে শোন, তোমার থালায় তো দেখছি বেশ কিছু গুপো এখনও অবশিষ্ট। তুমি একটা কাজ কর। তুমি দুবার চক্রাকারে ঘুরে সকলকে আর গুপো নেবেন কিনা জিগেস কর। এবং তারপর তোমার হেফাজতে থাকা সবক’টি গুপো সদ্গতি করার দায়িত্ব আমাকে দাও।’… হাসির রোল উঠল সমাগত অতিথিদের মধ্যে। বলা বাহুল্য, কেউই আর গুপো গ্রহণে রাজি হলেন না। বরং আমাকে তাঁরা বাকি সন্দেশগুলো শিবরামের থালায় দিয়ে তাঁকে তুষ্ট করতে বললেন, যা আই অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলাম। মিষ্টান্নপ্রিয় ভোজনরসিক শিবরামকে সেদিন নিজে হাতে তাঁর ভালবাসার গুপো সন্দেশ পরিবেশন করতে পারার আনন্দ আজও আমার স্মৃতির সঞ্চয়।

পরিশেষে হৃদয়বিদারক তথ্য হল এই যে, পানিহাটির সেই মনোহারী গুপো সন্দেশ আর নেই। শিবরামও বিদায় নিয়েছেন জীবনের স্বাভাবিক নিয়মে। শুধু পরম তৃপ্তিতে তাঁর পেনেটির গুপো সন্দেশ খাওয়ার স্মৃতিটি উজ্বল হয়ে থেকে গেছে মনের সিন্দুকে।

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Sulata Bhattacharya
Sulata Bhattacharya
8 months ago

স্মৃতিবিস্মৃতিচারণার মধ্যদিয়ে সন্দেশ পরিবেশনেশনের ‘ সন্দেশ’ পেয়ে মনের সঙ্গে রসনাটাও রসস্নিগ্ধ হয়ে উঠল।চলুক এমন রসের বর্ষণ।