শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

মন্ত্রীমশাইয়ের বিকল্পের সন্ধানে

বিস্মৃতিচারণা (১৮)

বিস্মৃতিচারণার এই পর্বে ফিরে যাই ৮০-র দশকের শেষভাগের একটি ঘটনায়। মূল ঘটনাটি আহামরি কিছু না হলেও পর্বে পর্বে নাটকীয়তার কারণে ঘটনাপ্রবাহটি আজও ধরা দেয় স্মৃতিপটে।

ডব্লিউ বি ই আই ডি সি অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রথম বছরের সাড়া জাগানো সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার পরিকল্পনার অন্যতম শরিক সেদিনের তিরিশ পেরোনো এই স্মৃতি রোমন্থক। অনুষ্ঠানস্থল মধ্য কলকাতার বিড়লা সভাঘর। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, ফিরোজা বেগম, মমতাশঙ্করকে নিয়ে ছিল সে অনুষ্ঠানের বর্ণময় শিল্পীতালিকা।

সংস্থার ঊর্দ্ধ্বতন প্রবীণ আধিকারিকদের নেতৃত্বে আমাদের মতো নবীনরাও সামিল হয়েছিলেন অনুষ্ঠান পরিকল্পনায়। কিম্বদন্তীপ্রতীম শিল্পীদের সম্মতি পাওয়া সহজ ছিল না। তবু তা পাওয়া গেল এক এক করে। যতদূর মনে পড়ে এ’ ব্যাপারে মূল উদ্যমটি নিয়েছিলেন অগ্রজ চিরঞ্জীব রুদ্র, বন্ধু সুদীপ গঙ্গোপাধ্যায় এবং এই প্রতিবেদক। কিন্তু জটিলতা দেখা দিল এহেন অনুষ্ঠান উদ্বোধন করবেন কোন মহাজন, সেই প্রশ্নে। উচ্চ পদাধিকারী প্রবীণ সদস্যরা নিদান দিলেন, সরকার অধিগৃহীত সংস্থা আমাদের, সুতরাং উদ্বোধন করুন তদানীন্তন ডাকসাইটে জনৈক প্রভাবশালী মন্ত্রীমশাই। রীতিমত জোরের সঙ্গেই তাঁরা জানালেন যে এটাই দস্তুর।

মন সায় দিল না। তারুণ্যের উত্তেজনায় বলে বসলাম, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের উদ্বোধনে মন্ত্রী কেন? এ তো আর কোনো সরকারী প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের বা উদ্বোধনের ব্যাপার নয়! কিছুটা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া পেলাম চিরাচরিত ভাবনায় অভ্যস্ত প্রবীণদের কণ্ঠে। এই সিদ্ধান্তে প্রচ্ছন্ন রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা যে ছিল না, সেটা বলা বাহুল্য।… প্রশ্নকর্তার প্রশ্নটিকে প্রায় নস্যাৎ করে দিয়ে জনৈক বললেন, বাস্তববোধ দিয়ে ব্যাপারটা ভাবা প্রয়োজন, আবেগ দিয়ে নয়। কেউ বা বললেন, একাধিকবারের নির্বাচিত জনপ্রিয় নেতা ও ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী মন্ত্রী তিনি। সুতরাং তাঁকে দিয়ে উদ্বোধন করালে কর্তৃপক্ষের কাছে সংগঠনের গুরুত্ব বৃদ্ধি পাবে।

মৃদু হেসে বিনীতভাবে বললাম, স্বীকার করছি যে বাস্তববোধ আমার বেশ কম। কিন্তু তবু আমি মনে করি, এই অনুষ্ঠানের উদ্বোধন হওয়া উচিত সাংস্কৃতিক জগতের কোনো পছন্দের মানুষের দ্বারা। তাতে হয়তো রাজনীতির চটক থাকবে না, উদ্বোধককে ঘিরে থাকা ক্ষমতার বলয়ে আমরা আলোকিত হবো না, কিন্তু অনুষ্ঠানটিতে বাঙালি সংস্কৃতির আভিজাত্যের গরিমা থাকবে।

বলতে দ্বিধা নেই, নিজের সেদিনের অপরিণামদর্শী অবিমৃশ্যকারিতা নিয়ে আজ ভাবলে কিঞ্চিৎ সন্ত্রস্ত বোধ করি এটা ভেবে যে কী হতে পারত এই ভিন্ন ভাবনা প্রকাশের পরিণতি, সময়টা যদি আজকের দিন হোত!

সেদিন আমার অভিমতটি কিছু প্রবীণ সদস্যের মধ্যে উষ্মা ও বিরূপতা সৃষ্টি করলেও তাঁরা আমার কোর্টে বলটি ঠেলে প্রশ্ন করলেন – ‘বেশ, সাংস্কৃতিক জগতের কোন্ বিশিষ্ট জনকে তুমি আনতে পারবে বল। সময় হাতে বেশি নেই। সুতরাং দ্রুত জানাও।‘…আদেশটিতে যেন একটু চ্যালেঞ্জের সুর কানে বাজল।

তখন আমার বিশেষ কাছের মানুষ সেই সময়ের অতি জনপ্রিয় ও ঘরে ঘরে আলোচিত রসসাহিত্যিক শ্রী সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়। প্রায় নক্ষত্রসম সেলিব্রিটি তিনি। তাঁর সম্মতির পরোয়া না করেই মুহূর্তের উত্তেজনায় বলে দিলাম প্রস্তাবিত উদ্বোধক হিসেবে তাঁর নামটি।… নাম শুনে একটু যেন থমকে গেলেন মন্ত্রীপন্থীরা।… “সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়! তিনি রাজি হবেন এই অনুষ্ঠানে উদ্বোধন করতে আসতে?” … “পারবে তুমি তাঁকে রাজি করাতে?” … বেশ কিছুটা অবিশ্বাস তাঁদের কণ্ঠে। আত্মবিশ্বাস নিয়েই জানালাম – ‘আশাকরি আগামী দিন দুয়েকের মধ্যে তাঁর সম্মতি এনে দিতে পারব।’

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় তখন দেশ পত্রিকায় কর্মরত। সম্মতি চাওয়া হল এবং কিঞ্চিৎ দ্বিধার পর রাজি হয়ে গেলেন সঞ্জীব কাকু (এই সম্বোধনেই ডাকতাম তাঁকে।) । সুখবরটা সংগঠন সচিব ও অন্যান্য সদস্যদের জানিয়ে যেন যুদ্ধ জয়ের আনন্দ অনুভব করলাম মনে মনে। কতিপয় বন্ধু সদস্যের পিঠ চাপাড়ানিও পাওয়া গেল।

আর কোনো বাধা রইল না। আমন্ত্রণলিপি থেকে স্মারকগ্রন্থ বা স্যুভেনিরে তিন বিশিষ্ট শিল্পীর নামের আগে বিশেষ অতিথি ও উদ্বোধক হিসেবে বড় হরফে ছাপা হয়ে গেল বিশিষ্ট সাহিত্যিক শ্রী সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের নাম।

গোল বাঁধল অনুষ্ঠানের ঠিক দু’ দিন আগে। অফিসে বসে লোক মারফত ছাপার মতো সুন্দর হস্তাক্ষরের একটা চিঠি পেলাম সঞ্জীব কাকুর কাছ থেকে।…


স্নেহভাজনেষু তন্ময়,

খুব ইচ্ছে ছিল তোমাদের সুন্দর অনুষ্ঠানটিতে হাজির হবার। কিন্তু বিধি বাম। অত্যন্ত জরুরি একটি কাজে আমাকে হঠাৎ দু’দিনের জন্য কলকাতার বাইরে চলে যেতে হচ্ছে। ফলে এবারে আমি অপারগ। ভবিষ্যতে ইচ্ছে রইল। অনিচ্ছাকৃতভাবে তোমাকে হয়তো একটু বিপদে ফেলে দিলাম।

তোমাদের অনুষ্ঠানের সর্বাঙ্গীন সাফল্য কামনা করছি।

শুভেচ্ছাসহ –

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়


সেই মুহূর্তে মাথায় বজ্রাঘাত বললেও বোধহয় আমার পরিস্থিতিটা পুরোপুরি বোঝানো যাবে না। মন্ত্রীমশাইয়ের আগমনের পথ রুদ্ধ করার দায়িত্বটা উপযাচক হয়ে এককভাবে আমিই নিয়েছিলাম। বুঝলাম, এই মুহূর্তে পরিত্রাণের পথ সুদূরপরাহত বলে মনে হলেও, যদি কিছু থাকে, সেটাও আমাকেই বার করতে হবে। অন্যথায় অক্ষমতা স্বীকারপূর্বক আত্মসমর্পণ এবং নত মস্তকে কটু মন্তব্য হজমের যন্ত্রণা ভোগই আমার ললাট-লিখন।

তখন বেহালার তারাতলা শিল্পতালুকে আমার অফিস। সহকর্মী ও সহমর্মী বন্ধু ডক্টর বীরেশ মজুমদারের সঙ্গে পরামর্শ করে দু’জনে মিলে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম নতুন কোনো উজ্বল মুখের সন্ধানে। এই জ্বলন্ত সমস্যার মধ্যেও মনে পড়ে গেল শ্যামা নৃত্যনাট্যের কোটালের গান! মনটাকে হালকা করতে দু’তিনটি শব্দ বদল করে বন্ধুটিকে কিঞ্চিৎ সুর ভেঁজেই শোনালাম…

“বিপদ হয়েছে মোর দোষে
লোক চাই
যে করেই হোক,
হোক গুণী যে কোনো লোক
লোক চাই
নইলে মোদের যাবে মান…”!

রবীন্দ্রনাথের গানের দুর্বল প্যারোডিটি শুনেও হেসে ফেললেন সঙ্গী বন্ধু সহকর্মীটি। বললেন, “চিন্তা করবেন না। আমার আস্থা আছে আপনার ওপর, ঠিক কাউকে রাজী করিয়ে ফেলবেন আপনি।” আসলে এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটি মন্ত্রীমশাইকে দিয়ে উদবোধনের ঘোর বিরোধী ছিলেন তিনিও।

আধ ঘন্টার মধ্যে পৌঁছলাম প্রফুল্ল সরকার স্ট্রীটের আনন্দবাজার অফিসে। চটজলদি কোনো বিশিষ্টজনের কাছে পৌঁছবার ওটাই ছিল সহজ রাস্তা। ‘আনন্দবাজার’ ও ‘দেশ’ তখন বহু খ্যাতিমান শিল্পী সাহিত্যিকের কর্মস্থল, আড্ডাস্থল ও আস্তানা।

আমার এক নিকটজন তখন ওই অফিসে কর্মরত। তার সহায়তায় শুরু হল বিশিষ্ট জনের সুলুক সন্ধান, যিনি আমাদের ত্রাতা হতে পারেন। অতঃপর ঘরে ঘরে ঘুরে জনে জনে আমাদের আমন্ত্রণ ও আবেদন। কিন্তু কোনো না কোনো কারণ দেখিয়ে আমাদের আতিথ্য গ্রহণের আবেদন বিনীতভাবে ফেরালেন গৌরকিশোর ঘোষ, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, দিব্যেন্দু পালিত, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, অরুণ বাগচী প্রমুখ বিশিষ্ট সাহিত্যিক সাংবাদিকরা।

নিরাশ হয়ে ফেরার উপক্রম করছিলাম। হঠাৎই নজরে এলো, কাঁচ দিয়ে ঘেরা ‘দেশ’ পত্রিকার ঘরটিতে নিজের টেবিলে লেখায় মগ্ন ছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। কিন্তু প্রাথমিকভাবে আমাদের সাহসে কুলোয়নি এই সামান্য আর্জি নিয়ে আপাত গুরুগম্ভীর হাই প্রোফাইল সাহিত্যিকের ধ্যানভঙ্গ ঘটানোর। কিন্তু কাউকে না পাবার হতাশায় মরিয়া হয়ে শেষ পর্যন্ত গিয়ে দাঁড়ালাম তাঁর দরজাতেও। পূর্ব পরিচয় ছিল না, কিন্তু একটা স্মার্ট এ্যাক্টিং করে ‘সুনীলদা’ সম্বোধনেই পেশ করলাম আমাদের নিবেদন। সৌজন্য দেখিয়ে বসতে বললেন আমাদের। কাগজ থেকে কলম তুলে রেখে বললেন, “কিন্তু আপনাদের অফিস সংগঠনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ওখানে আমার ভূমিকা কি?”… কথায় যেন প্রত্যাখ্যানের পূর্বাভাস পেলাম।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে বললাম, “বর্তমান সময়ের বাংলা সাহিত্যের পুরোধাপুরুষ আপনি। আমাদের প্রথম বছরের অনুষ্ঠান। আপনি প্রদীপ জ্বালিয়ে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করলে খুবই আনন্দ পাব আমরা। আমাদের অনুরোধ, এই অবকাশে বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে বাংলা কাব্যগীতির যে অবিচ্ছেদ্য বন্ধন, সে সম্পর্কে দু’চার কথা যদি শোনান আমাদের। আপনার বক্তব্যের পর মঞ্চে উঠবেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। তারপর ফিরোজা বেগম। অন্তিমে মমতাশঙ্করের দুটি নৃত্যনাট্য।”

এক নিঃশ্বাসে পূর্ব প্রস্তুতিবিহীন কথাগুলো বলার পর দেখলাম একটা স্মিত হাসি ফুটে উঠল সুনীল বাবুর ভারি মুখমন্ডলে। বললেন, “হেমন্তদা’ তো অসুস্থ, আসতে সম্মত হয়েছেন?”… আমাদের সদর্থক উত্তর শুনে বললেন, “শুনেছি, ফিরোজা বেগম সম্প্রতি কলকাতায় এসেছেন। ওঁকেও তাহলে পেয়েছেন আপনারা।… আপনাদের শিল্পী নির্বাচন তো ভালোই হয়েছে।… ঠিক আছে। আমি যাব আপনাদের অনুষ্ঠানে। তবে খুব বেশিক্ষণ থাকতে পারব না।”

ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল আমাদের। আনন্দে কিছুটা আত্মহারা মনের অবস্থা। অনুষ্ঠান উদ্বোধনে সঞ্জীবের বিকল্প সুনীল! অনেক পিছিয়ে পড়লেন মন্ত্রীপন্থীরা… মান বাঁচল আমার। এটা ভেবেই মনটা ফুরফুরে হয়ে গেল!

আজও মনে পড়ে, সুনীলবাবুকে সেদিন আনন্দবাজার অফিস থেকে সসম্মানে নিয়ে এসেছিলেন আমার প্রাক্তন অগ্রজ সহকর্মী অধুনা ক্যানাডানিবাসী শ্রী পবিত্র চক্রবর্তী।

মনটা ভরে গেল যখন দেখলাম অনুষ্ঠান শুরুর আগে দর্শকাসনের প্রথম সারিতে বসে খোশগল্পে মজেছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। মনের ফ্রেমে বন্দী হয়ে রইল দৃশ্যটা। সেদিনের অনুষ্ঠানের সুরটি যেন বাঁধা হয়ে গেল ওই মুহূর্তটিতেই। এরপর মঞ্চে প্রদীপ জ্বালিয়ে উদ্বোধন করে আমাদের আবদার মতো কিছু জরুরি কথা শুনিয়েছিলেন সুনীল বাংলার সাহিত্য ও সঙ্গীতের মেলবন্ধন প্রসঙ্গে।

একটি সর্বাঙ্গসুন্দর সন্ধ্যার সাক্ষী ছিলেন দর্শকরা।

[লেখকের অন্য রচনা]

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Ashish Sen
Ashish Sen
4 months ago

এই কাহিনী আপনার কাছে আগে শুনেছি। তবে লেখার অক্ষরে কাহিনীটি আরো প্রাণবন্ত হয়ে উঠল। মনে আছে প্রতি বছর বিজ্ঞাপনদাতা হিসাবে নিমন্ত্রণপত্র আসত, কিন্ত যাওয়া হত না। সেটা নিয়ে আপনার অনুযোগ থাকত। তবে কোন এক বছর আপনাদের মহাজাতি সদনে অনুষ্ঠান ছিল, সেবার ফোনে অনুযোগের বদলে রীতিমত অগ্রজসুলভ ভর্ৎসনা শুনতে হয়েছিল। 😀