
বিস্মৃতিচারণা (১৫)
১৯৮৬ সালের এপ্রিল মাস। সেবার ব্যঙ্গচিত্রী চন্ডী লাহিড়ী এলেন আগরপাড়ার প্রভাসতীর্থে কচি-কাঁচাদের একটি আঁকার প্রতিযোগিতা পরিচালনা করতে এবং আসর শেষে পুরস্কার বিতরণী সভায় পৌরোহিত্য করতে। সারাটা দিন কাটিয়ে বিকেলে ফিরেছিলেন তিনি। সদাহাস্যময় আড্ডাবাজ আমুদে মানুষ। বড়দের সঙ্গে তো বটেই, ছোটদের সঙ্গেও মিশতে পারতেন অনাবিল আনন্দে। সুতরাং অনুষ্ঠানের ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি নানা গল্পে ও আড্ডায় দিব্য কেটেছিল দিনটা।

সেদিন ওঁর কাছেই জেনেছিলাম কার্টুন সম্পর্কিত দুটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য । তা হল, বাংলার প্রথম উল্লেখযোগ্য ব্যঙ্গচিত্র শিল্পী ছিলেন গিরীন্দ্রনাথ দত্ত এবং ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে ফেব্রুয়ারি মাসে অমৃতবাজার পত্রিকায় মিউনিসিপাল আইনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রকাশিত হয়েছিল প্রথম বাংলা কার্টুন ।
এই অবকাশে যাঁরা সেভাবে চন্ডী লাহিড়ীর কাজের সঙ্গে পরিচিত নন, বিশেষত এই প্রজন্মের পাঠকদের জন্য কার্টুনিস্ট চন্ডী লাহিড়ীর পরিচিতি একটু দিয়ে রাখি । ১৯৫২ সালে সাংবাদিক হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেন চণ্ডী লাহিড়ী। ১৯৬১ সালে কার্টুনিস্ট হিসেবে পথ চলা শুরু হয় তাঁর। ইংরেজীতে ‘Chandi’ স্বাক্ষরে দীর্ঘকাল ধরে তিনি আমজনতার কাছে পরিচিত ও জনপ্রিয় ছিলেন। আনন্দবাজার পত্রিকার প্রথম পাতায় প্রতিদিনের কোনো একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে ‘তির্যক’ শিরোনামে বুদ্ধিদীপ্ত ছোট্ট একটি ব্যঙ্গচিত্রের (পকেট কার্টুন) চিত্রকর হিসেবে তিনি বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন।


তবে শুধুমাত্র আনন্দবাজার নয়, চার-পাঁচটি দশক জুড়ে নানা পত্র পত্রিকায় তাঁর কার্টুন মাতিয়ে রেখেছিল বাঙালিকে, বাঙালির খবরের কাগজ পড়ার আনন্দে আলাদা মাত্রা যোগ করেছিলেন চন্ডী । তাঁর অনবদ্য সৃষ্টি ছিল ‘চণ্ডীপাঠ’ । রাজনৈতিক ও সামাজিক দুই ধরনের কার্টুন আঁকতেন চণ্ডী লাহিড়ী। কার্টুন আঁকার পাশাপাশি বেশ কিছু রঙ্গ রচনাও লিখেছেন তিনি। তাঁর লেখা বইগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘কার্টুনের ইতিবৃত্ত’, ‘বাঙালির রঙ্গব্যঙ্গচর্চা’, ‘গগনেন্দ্রনাথের কার্টুন ও স্কেচ’ ইত্যাদি। সর্বভারতীয় নানা পত্রিকাতেও কার্টুন এঁকেছেন চন্ডী । তাঁর অসংখ্য ব্যঙ্গচিত্র ভারতের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে । অনেকে তাঁকে বাংলার আর কে লক্ষ্মণও বলতেন। তাঁর কার্টুন সংগ্রহের নাম চণ্ডী লুকস অ্যারাউন্ড এবং ভিজিট ইন্ডিয়া উইথ চণ্ডী ।
একটি উল্লেখযোগ্য তথ্য হল, শ্রী চন্ডী লাহিড়ী তাঁর ভারত-জোড়া এই কার্টুন-সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন আক্ষরিক অর্থেই একটি মাত্র হাতকে হাতিয়ার করে। শারীরিক পঙ্গুত্বকে তিনি জয় করেছিলেন অসীম স্থৈর্যে ও নিষ্ঠায়।
কেবল ব্যঙ্গচিত্র অঙ্কন নয়, নিজের দক্ষতায় অনেকগুলি চলচ্চিত্রে অ্যানিমেশন করেছেন তিনি, যার মধ্যে ছিল ‘হংসরাজ’, ‘ধন্যিমেয়ে’, ‘মৌচাক’, ‘চারমূর্তি’ প্রভৃতি জনপ্রিয় চলচ্চিত্র । পরবর্তীকালে তাঁর মেয়ে তৃণার সঙ্গে যৌথভাবে ‘মানুষ কি করে মানুষ হল’ নামে তাঁর একটি নৃবিজ্ঞান বিষয়ক কাজের জন্য দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে নরসিংহ দাস পুরস্কারে সম্মানিত হন চণ্ডী লাহিড়ী।

মনে পড়ে, সেদিন আলাপচারিতার ফাঁকে এই অধমের তাঁর সঙ্গে একটি হালকা বিতর্কে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা। আড্ডার আসরে চন্ডী বাবু বললেন, “প্রত্যেক বাবা মায়ের অন্তত একটি কারণে ছেলেমেয়েদের অঙ্কন শিল্পে আগ্রহী করে তোলা উচিত । কারণটি হল, যে হাতে একবার রঙ পেন্সিল বা তুলি-ক্যানভাস ওঠে, সেই হাতে ছোরা, ছুরি, বোমা ওঠে না। সেই শিশুটি ভবিষ্যতে বড় শিল্পী না হতেও পারে, কিন্তু সমাজবিরোধী হয়ে উঠবে না, এটা বলা যায়।”
আমি কিঞ্চিৎ ইতস্তত করে চন্ডী বাবুকে প্রশ্ন করলাম, “নিঃসন্দেহে চিত্রাঙ্কন জীবনবোধের উচ্চস্তরের একটি শিল্প, কিন্তু এই শিল্পটির চর্চা ভবিষ্যতে নাগরিকের একটি হিংস্র মানুষ বা সমাজবিরোধী হবার পথ রোধ করবে, এতটা নিঃসংশয় হওয়া যায় কি ? বিশ্বত্রাস হিটলার তো প্রথম জীবনে বেশ কিছুকাল চিত্রশিল্পী হবার বাসনায় অঙ্কন শিল্পের চর্চা করেছিলেন ! ইতিহাস বলে, ১৯০৭ সালে ১৮ বছর বয়সে চিত্রাঙ্কন শেখার জন্যই তিনি ভিয়েনায় গিয়ে প্রখ্যাত একাডেমি অব ফাইন আর্টসে ভর্তির হওয়ারও চেষ্টা করেছিলেন । অবশ্য সে প্রচেষ্টায় অসফল হয়ে তিনি সৈন্য বাহিনীতে যোগ দিয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন ।”
ধৈর্য্য ধরে আমার কথাগুলো শুনে মুহূর্তের জন্য থমকে গেলেন চন্ডী লাহিড়ী । জীবনের পরতে পরতে জড়িয়ে থাকা শিল্পটির অন্তর্নিহিত মানবিক চেতনার প্রতি তাঁর গভীর আস্থাটি প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ায় তাঁর মুখে যেন একটা বেদনার ছায়া পড়ল । একটু সামলে নিয়ে বললেন, “তুমি ভাল একটা বিপরীত দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছ । কিন্তু মনে রেখো, হিটলার সব দিক দিয়েই এক অতি ব্যতিক্রমী মানবচরিত্র । কোনো চিরাচরিত নিয়মের মাপকাঠিতে ওই চরিত্রটিকে মাপা যায় না । শুনেছি, ভিয়েনায় তাঁর শিল্পী হবার প্রবল বাসনা ব্যর্থ হবার হতাশায় তিনি প্রায় পাঁচটি বছর আত্মগোপন করে ছিলেন । জানিনা এই ব্যর্থতা তাঁর মধ্যে ভবিষ্যতের এক হিংস্র রাজনীতিকের জন্ম দিয়েছিল কিনা ।”
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর চন্ডী বাবু বললেন, “শিল্পের অসীম ক্ষমতার প্রতি কখনও বিশ্বাস হারিয়ো না। কদাচিত দু’একটি ব্যতিক্রম দেখা গেলেও শিল্প মানবিক চেতনার উত্তরণ ঘটায় বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি ।”
শিল্পের দায়বদ্ধতার প্রতি গভীর আস্থাশীল এই আদ্যন্ত শিল্পী মানুষটি সেদিন আমাদের অন্তরের শ্রদ্ধা অর্জন করেছিলেন।

তাঁর বিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন তুললেও বিদায় বেলায় তাঁর দাক্ষিণ্য লাভে বঞ্চিত হইনি । আমার খাতাটি নিয়ে কয়েক লহমার কলম চালনায় এঁকে দিয়েছিলেন সারস পাখীর একটি নয়নাভিরাম স্কেচ । ছবির মতই তাঁর অতি পরিচিত Chandi স্বাক্ষর সহ 6.4.86 তারিখটা আজও জ্বলজ্বল করছে খাতার পাতায় ও আমার স্মৃতির গহনে ।
২০১৮ সালের ১৮ জানুয়ারী ৮৮ বছর বয়সে এই সদাহাস্যময় কৃতী মানুষটি বাঙালির ব্যঙ্গচিত্রের দুনিয়াকে অনেকটাই রিক্ত করে দিয়ে পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চ থেকে বিদায় নিয়েছিলেন।
তথ্যঋণঃ আন্তর্জাল
চিত্রঃ ব্যক্তিগত সংগ্রহ ও আন্তর্জাল


লেখাটি ছোট বলে পড়ে মন ভরল না! অবশ্য যতটা পড়লাম, ভালো লেগেছে। মনে পড়ে গেল, একেবারে ছেলেবেলার কথা, যখন আনন্দবাজারে প্রকাশিত তাঁর দৈনিক কার্টুনগুলির মাধ্যমে আমার কার্টুনের সঙ্গে প্রথম পরিচয় ঘটে এবং চন্ডী আমার প্রথম পরিচিত ব্যঙ্গচিত্রী। আরো মনে আছে, তাঁর প্রয়াণের পর ফেসবুকে একটি পোস্টে আমার সংগৃহীত চণ্ডীর কয়েকটি কার্টুনের মাধ্যমে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছিলাম। এখানেও শ্রদ্ধা জানাবার উদ্দেশ্যে সেই পোস্টটির একটি লিংক তুলে দেওয়া গেল।
https://www.facebook.com/share/p/1AoYtdiPW7/
ধন্যবাদ। আসলে আমার সঙ্গে সেদিন যেটুকু কথোপকথন ও আলাপচারিতা, তারই একটা ছোট স্মৃতিচিত্র এটি। তারপর একাডেমী ইত্যাদি বিভিন্ন জায়গায় দেখা হলেই ওঁর সঙ্গে কুশল বিনিময় হয়েছে। কিন্তু উল্লেখযোগ্য কিছু স্মৃতি নেই।